খুঁজুন
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০ ফাল্গুন, ১৪৩২

‘বসন্তের কোনো এক উদাস দুপুরে’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:৩৩ পিএম
‘বসন্তের কোনো এক উদাস দুপুরে’

বসন্তের দুপুরগুলো কেমন যেন আলাদা হয়—না গরম, না ঠান্ডা; যেন বাতাসের ভেতরেও একটা নরম ক্লান্তি লেগে থাকে। রোদ থাকে, কিন্তু সেই রোদ ঝলসে দেয় না; বরং মাটির ওপর নরম করে হাত রেখে যায়। এমনই এক দুপুরে, গ্রামের এক প্রাচীন শিমুলগাছের ডালে বসে ছিল একটি কাঠঠোকরা পাখি।

গাছটা ছিল গ্রামের প্রান্তে, পুরোনো পুকুরটার ধারে। শিমুলগাছটি যেন নিজের মতো করে বসন্তকে সাজিয়ে তুলেছিল। তার ডালভরা লাল-কমলা ফুলগুলো দূর থেকে দেখতে আগুনের মতো লাগে। কাছে গেলে বোঝা যায়—ওগুলো আগুন নয়, ওগুলো জীবনের রঙ। আর সেই ফুলের মাঝেই কাঠঠোকরা পাখিটি ঠোঁট দিয়ে আলতো করে ফুল ছুঁয়ে দেখছিল, যেন ফুলের ভেতর লুকোনো মধুর স্বাদ খুঁজছে। এই দৃশ্যটা দেখছিল রাশেদ।

রাশেদ শহর থেকে এসেছে। ঢাকা শহরের কোলাহল, গাড়ির হর্ন, ধোঁয়া আর দৌড়ঝাঁপের জীবন থেকে সে কয়েক দিনের জন্য মুক্তি নিতে এসেছে তার দাদুর গ্রামে। ছোটবেলায় এখানে অনেকবার এসেছে, কিন্তু তারপর পড়াশোনা, চাকরি—সবকিছু মিলিয়ে এই গ্রাম যেন তার জীবনের বাইরে চলে গিয়েছিল।

কিন্তু এবার সে ফিরে এসেছে—কিছুটা ইচ্ছায়, কিছুটা বাধ্য হয়ে।

তার জীবনে যেন সবকিছু হঠাৎ করে থেমে গেছে। চাকরিতে সমস্যার পর সমস্যা, প্রেম ভেঙে যাওয়া, বন্ধুদের দূরে সরে যাওয়া—সব মিলিয়ে সে যেন নিজের ভেতরেই আটকে গেছে। শহরের ভিড়ে থেকেও সে একা হয়ে পড়েছিল। তাই হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিয়েই সে চলে আসে এই গ্রামে।

দাদু তাকে দেখে খুশি হয়েছিল, কিন্তু খুব বেশি প্রশ্ন করেনি। শুধু বলেছিল, —“কিছুদিন থাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

রাশেদ তখন বুঝতে পারেনি—কীভাবে সব ঠিক হবে?

সেই উত্তর খুঁজতেই হয়তো আজ সে এই শিমুলগাছের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। পাখিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাশেদের মনে হলো—পাখিটা যেন কিছু বলতে চায়। তার গায়ে হলুদ, কালো আর সাদা রঙের মিশেল; মাথায় লাল ঝুঁটি—অদ্ভুত সুন্দর। ঠোঁট দিয়ে সে বারবার গাছের ডালে ঠোকর দিচ্ছে, তারপর আবার ফুলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

—“তুই কী খুঁজছিস?” নিজের অজান্তেই বলে উঠল রাশেদ। পাখিটা যেন থেমে তাকাল। সত্যিই কি তাকাল, নাকি শুধু রাশেদের কল্পনা—সে বুঝতে পারল না। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো, —“ওরা খাবার খোঁজে। গাছের ভেতর থেকে পোকা বের করে খায়।”

রাশেদ ঘুরে তাকাল। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে—মাঝারি উচ্চতা, গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা, চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি। হাতে একটা বাঁশের ঝুড়ি।
—“তুমি কে?” রাশেদ জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটা হাসল, —“আমি মিতা। এই গ্রামেই থাকি। তুমি নতুন এসেছ, তাই না?”
রাশেদ মাথা নাড়ল, —“হ্যাঁ। অনেক বছর পর এলাম।”

মিতা শিমুলগাছটার দিকে তাকাল, —“এই গাছটা আমার খুব প্রিয়। বসন্ত এলে আমি প্রায় প্রতিদিন এখানে আসি।”
রাশেদ বলল, —“পাখিটা খুব সুন্দর।”
—“হুম,” মিতা বলল, “ওরা খুব পরিশ্রমী। সারাদিন গাছ ঠোকরায়, খাবার খোঁজে। কখনো থামে না।”
রাশেদ একটু হেসে বলল, —“আমাদের মতো না। আমরা থেমে যাই।”

মিতা তাকাল তার দিকে, —“তুমি থেমে গেছ?”
প্রশ্নটা এত সরাসরি ছিল যে রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, —“হ্যাঁ, হয়তো। মনে হয় কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছে না।”

মিতা কিছু বলল না। শুধু শিমুলগাছের একটা ফুল ছিঁড়ে হাতে নিল। ফুলটার দিকে তাকিয়ে বলল, —“দেখো, এই ফুলগুলো কত সুন্দর। কিন্তু এরা খুব অল্প সময় থাকে। তারপর ঝরে যায়।”
—“তাই?” রাশেদ বলল।
—“হ্যাঁ। কিন্তু গাছটা কি দুঃখ পায়? না। আবার নতুন পাতা আসে, নতুন ফুল আসে।”

রাশেদ মৃদু হেসে বলল, —“গাছ তো মানুষ না।”
মিতা মাথা নাড়ল, —“কিন্তু মানুষ গাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে।”
সেদিনের পর থেকে রাশেদ প্রায় প্রতিদিন বিকেলে ওই শিমুলগাছের নিচে আসে। আর প্রায় প্রতিদিনই মিতার সঙ্গে দেখা হয়।

মিতা খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু তার কথা গুলো গভীর। সে গ্রামের মানুষ, কিন্তু তার চিন্তাগুলো যেন অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
একদিন রাশেদ তাকে জিজ্ঞেস করল, —“তুমি পড়াশোনা করো?”
—“করতাম,” মিতা বলল, “কলেজ পর্যন্ত। তারপর আর হয়নি।”
—“কেন?”
মিতা একটু থেমে বলল, —“বাবা অসুস্থ। সংসার সামলাতে হয়।”

রাশেদ চুপ করে গেল। শহরে বসে সে অনেক স্বপ্ন দেখেছে—ক্যারিয়ার, টাকা, সফলতা। কিন্তু এখানে এসে সে দেখছে, জীবনের অন্য একটা রূপ আছে—যেখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকাটাই একটা বড় অর্জন।
সেই দিনও কাঠঠোকরা পাখিটা গাছে বসে ছিল। রাশেদ তাকিয়ে বলল, —“ওটা কি প্রতিদিনই আসে?”
—“হ্যাঁ,” মিতা বলল, “ওর বাসা এই গাছেই কোথাও।”
—“ও কখনো ক্লান্ত হয় না?”

মিতা হাসল, —“হয়তো হয়। কিন্তু ও থামে না।”
একদিন দুপুরে হঠাৎ ঝড় উঠল। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। হাওয়া বইতে শুরু করল জোরে। শিমুলগাছটা দুলতে লাগল, ফুলগুলো একে একে ঝরে পড়তে লাগল।

রাশেদ তখন গাছের নিচেই ছিল। সে ভেবেছিল আজ হয়তো মিতা আসবে না। কিন্তু ঠিক তখনই সে দেখল—মিতা দৌঁড়ে আসছে।
—“এই ঝড়ে তুমি এখানে কেন?” রাশেদ চিৎকার করে বলল।
—“গাছটা দেখতে!” মিতা বলল, “ঝড়ে অনেক ডাল ভেঙে যায়।” হঠাৎ একটা বড় ডাল ভেঙে পড়ে গেল মাটিতে। রাশেদ চমকে উঠল।

ঝড়ের শব্দের ভেতরেও সে একটা কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পেল। মাটিতে পড়ে থাকা ডালের পাশে একটা ছোট্ট পাখির বাচ্চা কাঁপছে।
—“দেখো!” রাশেদ বলল।
মিতা দৌঁড়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে তুলে নিল, —“এটা কাঠঠোকরার বাচ্চা।”
রাশেদের বুকটা হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল। সে উপরে তাকাল—গাছের ডালে সেই কাঠঠোকরা পাখিটা অস্থির হয়ে উড়ছে।

—“এখন কী করব?” রাশেদ জিজ্ঞেস করল।
মিতা বলল, —“ওকে আবার বাসায় তুলতে হবে।”
—“কিন্তু বাসা কোথায়?”
মিতা চারদিকে তাকাল। তারপর গাছের একটা ফাঁপা অংশ দেখিয়ে বলল, —“ওখানে।”
—“ওটা তো অনেক উঁচু!”
—“তবু চেষ্টা করতে হবে।”

রাশেদ কখনো গাছে ওঠেনি। শহরের মানুষ হিসেবে তার জীবনে গাছে ওঠার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু আজ সে দ্বিধা করল না।
মিতা নিচে দাঁড়িয়ে রইল, হাতে পাখির বাচ্চাটা। রাশেদ ধীরে ধীরে গাছে উঠতে লাগল। ঝড়ের হাওয়ায় গাছ দুলছে, হাত পিছলে যাচ্ছে, তবু সে থামল না।

একসময় সে সেই ফাঁপা জায়গাটার কাছে পৌঁছাল। ভেতরে তাকিয়ে দেখল—আরও দুটো বাচ্চা আছে।
—“এখানে দাও!” সে নিচে চিৎকার করল।
মিতা সাবধানে বাচ্চাটাকে উপরে তুলল। রাশেদ সেটাকে নিয়ে বাসার ভেতরে রাখল।
ঠিক তখনই কাঠঠোকরা পাখিটা তার কাছেই এসে বসে পড়ল। খুব কাছে। এত কাছে যে রাশেদ তার চোখ দেখতে পেল।

পাখিটার চোখে ভয় ছিল, উদ্বেগ ছিল—কিন্তু সেই সঙ্গে একটা বিশ্বাসও ছিল।
রাশেদের মনে হলো—সে যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে।

ঝড় থেমে যাওয়ার পর তারা দু’জন গাছের নিচে বসে রইল। চারদিকে ঝরে পড়া ফুল। লাল-কমলা রঙে ভরে গেছে মাটি।
মিতা বলল, —“তুমি আজ খুব ভালো কাজ করেছ।”
রাশেদ চুপ করে রইল। তার ভেতরে অদ্ভুত একটা শান্তি কাজ করছিল।

—“জানো,” সে বলল, “অনেক দিন পর মনে হচ্ছে আমি কোনো কাজ ঠিকভাবে করতে পেরেছি।”
মিতা মৃদু হাসল, —“তুমি সব সময়ই পারো। শুধু নিজেকে বিশ্বাস করতে হয়।”
দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। বসন্ত ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগোতে লাগল। শিমুলগাছের ফুল কমে আসতে লাগল, নতুন পাতা গজাতে শুরু করল।
একদিন বিকেলে রাশেদ গাছের নিচে এসে দেখল—মিতা নেই।
সে অপেক্ষা করল। কিন্তু মিতা এল না।
পরদিনও না।

তৃতীয় দিন সে খোঁজ নিতে গেল। গ্রামের মানুষদের কাছে জানতে পারল—মিতার বাবা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

রাশেদের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল—মিতাকে সে কতটা মিস করছে।
সেই রাতে সে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না। তার মনে হতে লাগল—এই গ্রাম, এই গাছ, এই পাখি—সবকিছু যেন মিতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
পরদিন সকালে সে সিদ্ধান্ত নিল—সে শহরে যাবে।
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে রাশেদের মনে হচ্ছিল—সে যেন আবার সেই পুরোনো জীবনে ফিরে এসেছে। চারদিকে দৌড়ঝাঁপ, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা।
সে মিতাকে খুঁজে পেল একটা বেঞ্চে বসে।
—“মিতা,” সে ডাকল।
মিতা তাকাল। তার চোখ লাল, মুখ ক্লান্ত।
—“তুমি এখানে?” সে অবাক হয়ে বলল।
রাশেদ বলল, —“তোমার খোঁজ নিতে এসেছি।”
মিতা কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করল।
—“চিন্তা করো না,” রাশেদ বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে।”

মিতা মৃদু হাসল, —“তুমিও তো একদিন এটাই বলেছিলে—সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন কি বিশ্বাস করো?”
রাশেদ একটু থেমে বলল, —“হ্যাঁ। এখন করি।”
—“কেন?”
—“কারণ আমি দেখেছি—ঝড়ের পরও গাছে আবার ফুল ফোটে।”
মিতা তাকাল তার দিকে। তার চোখে এবার একটু আলোর ঝিলিক।
কয়েকদিন পর মিতার বাবা কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন। তারা গ্রামে ফিরে এল।
সেদিন বিকেলে আবার তারা শিমুলগাছের নিচে দাঁড়াল।
গাছটায় এখন আর আগের মতো ফুল নেই। কিন্তু নতুন পাতা এসেছে—তরতাজা সবুজ।
কাঠঠোকরা পাখিটা আবার এসেছে। এবার তার সঙ্গে তিনটা ছোট্ট পাখি—ওর বাচ্চারা।

রাশেদ হাসল, —“ওদের দেখো।”
মিতা বলল, —“ওরা উড়তে শিখছে।”
—“হুম,” রাশেদ বলল, “একদিন ওরাও উড়ে যাবে।”
মিতা বলল, —“সবাইকে একদিন উড়তে হয়।”
রাশেদ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, —“আমাকেও যেতে হবে।”
মিতা তাকাল, —“শহরে?”
—“হ্যাঁ,” রাশেদ বলল, “আমার জীবনটা আবার শুরু করতে হবে।”
মিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —“যাও। কিন্তু মাঝে মাঝে ফিরে আসবে?”
রাশেদ হাসল, —“অবশ্যই।”

বসন্ত শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু রাশেদের জীবনে যেন একটা নতুন ঋতু শুরু হয়েছে।
সে এখন আর আগের মতো ভেঙে পড়া মানুষ নয়। সে জানে—জীবনে ঝড় আসবে, ফুল ঝরে যাবে, কিন্তু আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করা যায়।
আর কোথাও না কোথাও—কোনো এক শিমুলগাছের ডালে—একটা কাঠঠোকরা পাখি তখনও ঠোকর দিয়ে যাবে, জীবনকে থামতে দেবে না।

বসন্তের সেই উদাস দুপুরটা তাই আর শুধু উদাস নয়—সেটা হয়ে উঠেছে নতুন শুরুর গল্প।

– লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

মধুখালীতে হাসপাতালে ঝটিকা পরিদর্শনে এমপি ইলিয়াস মোল্লা, সেবার মানে বড় বার্তা

মো. ইনামুল খন্দকার, মধুখালী:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:০২ পিএম
মধুখালীতে হাসপাতালে ঝটিকা পরিদর্শনে এমপি ইলিয়াস মোল্লা, সেবার মানে বড় বার্তা

ফরিদপুর-১ (মধুখালী, বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. মোঃ ইলিয়াস মোল্লা মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেছেন।

সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন এবং চিকিৎসাসেবার মান, অবকাঠামো ও জনবল পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করেন।

পরিদর্শনকালে এমপি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটসমূহ ঘুরে দেখেন। তিনি চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে হাসপাতালের বর্তমান কার্যক্রম ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেন। একই সঙ্গে রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করে চিকিৎসাসেবা নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ শুনেন।

পরিদর্শনের আগে তিনি নিজেই হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে সেবার মান উন্নয়নে সচেতনতার বার্তা দেন, যা উপস্থিত সবার মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ সময় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মামুন হাসান, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আলীমুজ্জামান, পৌর জামায়াতের আমির মাওলানা রেজাউল করিমসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এমপির কাছে চিকিৎসক ও নার্সের সংকট, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব, শয্যা সংকট এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতির বিষয় তুলে ধরেন। এছাড়া রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে সেবা দিতে নানা সীমাবদ্ধতার কথাও জানান তারা।

পরিদর্শন শেষে এমপি প্রফেসর ড. মো. ইলিয়াস মোল্লা বলেন, “জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাদের সেবা করাই আমার প্রধান দায়িত্ব। এই অঞ্চলের মানুষ যেন উন্নত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পায়, সেজন্য হাসপাতালের বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

স্থানীয়রা আশা করছেন, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের এই উদ্যোগের ফলে মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মান বৃদ্ধি পাবে এবং সাধারণ মানুষ আরও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে।

ফরিদপুরে সড়ক নির্মাণ কাজে অনিয়মকে পুজি করে দুইলাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:২০ পিএম
ফরিদপুরে সড়ক নির্মাণ কাজে অনিয়মকে পুজি করে দুইলাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ

ফরিদপুর পৌরসভার একটি সড়ক নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ তুলে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। একই সাথে নির্মাণ শ্রমিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও কাজে বাঁধা দেয়ারও অভিযোগ উঠেছে। তবে, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ওই পক্ষটি।

ফরিদপুর পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, পৌরসভার প্রকৌশলী বিভাগের অধীনে ১৪নং ওয়ার্ডের হাড়োকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় ৩৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩৮৮ মিটার ইউনিব্লক সড়ক নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছেন। কাজটি বাস্তবায়ন করছেন মেসার্স মির্জা কনস্ট্রাকশন নামে সিরাজগঞ্জের একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এছাড়া কাজটির তদারকিতে রয়েছেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দা মুরাদ শেখ নামে এক ব্যক্তি এবং গত তিনমাস আগে নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

জানা যায়, গত শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) বিকালে সড়ক নির্মাণ কাজে বাঁধা দেন স্থানীয় ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাহার শেখের নেতৃত্বে ৮ থেকে ১০ জন ব্যক্তি। তাঁরা নির্মাণ শ্রমিকদের হাত-পা কেটে ফেলার হুমকিও দেন বলে করিম আলী শেখ নামে এক শ্রমিক অভিযোগ করেন। এছাড়া দুই লাখ টাকা চাদা দাবির অভিযোগ করেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মুরাদ শেখ।

ঘটনাটি নিয়ে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কটি নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। সেখানে প্রায় ২০ জনের একদল লোক অবস্থান করছেন। তাঁদের নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় বাহার শেখ ও শামিম হোসেন ওরফে সামিউল নামে দুই ব্যক্তিকে। এ সময় তাঁরা নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে বলে ঘুরে ঘুরে সাংবাদিকদের সামনে উত্থাপন করেন।

তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, ব্যবহৃত ব্লকের মধ্যে নিম্নমানের উপদান রয়েছে, পুরুত্ব (এসএ) ৬ ইঞ্চির পরিবর্তে তিন ইঞ্চি রয়েছে। এছাড়া পলিথিন ও ময়লা মিশ্রিত মাটি ব্যবহার, নিম্নমানের ইট-খোয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ তুলে কখনও আবার নির্মাণ শ্রমিকদের ওপর চড়াও হোন, কখনও আবার কাজ বন্ধ রাখার জন্য শ্রমিকদের নির্দেশ দেন। এক পর্যায়ে সেখানে কোতয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল উপস্থিত হোন এবং কাজে বাঁধা না দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন।

এ সময় অভিযোগ তুলে মুরাদ শেখ বলেন, ‘তিনমাস যাবৎ কাজ চলতেছে এখানে কিন্তু হঠাৎ করেই এসে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে বাহার শেখকে আমার বাসায় আসতে বলি এবং আসার পরে জানতে চাই কি কারণে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তখন বাহার আমাকে বলে ঠিকাদারকে আমাদের দুই লাখ টাকা দিতে বলেন। আমার বাসার মধ্যেই বসে এই টাকা চেয়েছে, তখন বাহারের সাথে সুব্রত নামে এক লোকও উপস্থিত ছিল। পরবর্তীতে আমি ঠিকাদারকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম এবং গতকাল পৌরসভায় জানানো হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে বাহার শেখের কাছে জানতে চাইলে তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন। বাহার শেখ বলেন, শুক্রবার ইফতারির পরে মুরাদ শেখ নিজেই আমাকে দেখা করতে বলে এবং কয় টাকা ঘুষ দেয়া লাগবে-সেটা আমি দেখব। সে আমাকে প্রলোভন দেখিয়ে ও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাঁর বাসায় ডেকে নেয়। আমি ভিডিওর মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ দেয়া হয়েছে এবং ঠিকাদার চক্রটি আমাকে ফাঁদে আটকিয়ে ফেলায়ছে।

এদিকে অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নির্মাণকাজের দায়িত্বরত উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. লাইজিং হোসেন রাজু বলেন, কাজে কিছুটা অনিয়ম হচ্ছে আমিও দেখেছি এবং সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এটাকে পুজি করে স্থানীয় একটি গ্রুপ টাকা দাবি করেছে বলে শুনেছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পৌর প্রশাসক স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. সোহরাব হোসেন বলেন, কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি এবং ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে। এছাড়া চাঁদা দাবির বিষয়ে কেউ আমার কাছে অভিযোগ দেয়নি।

ফরিদপুরে এনসিপির যুগ্ম-সদস্য সচিব হায়দার মোল্যার পদত্যাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:৪৭ পিএম
ফরিদপুরে এনসিপির যুগ্ম-সদস্য সচিব হায়দার মোল্যার পদত্যাগ

ফরিদপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর জেলা কমিটির যুগ্ম-সদস্য সচিব হায়দার মোল্যা (২৭) পদত্যাগ করেছেন।

সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি পদত্যাগের বিষয়টি প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি লিখিত পদত্যাগপত্র জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের কাছে পাঠিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন।

ফেসবুক পোস্টে হায়দার মোল্যা জানান, ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ও পারিবারিক কারণে তিনি স্বেচ্ছায় এবং সুস্থ চিন্তাভাবনার ভিত্তিতে দলের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে তিনি কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছেন, “আমি হায়দার মোল্যা, ফরিদপুর জেলা এনসিপির যুগ্ম-সদস্য সচিব পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করছি।” পাশাপাশি দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ না করার অনুরোধও জানিয়েছেন তিনি। তার এ ঘোষণায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা এনসিপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক শাহেদ আহমেদ ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “হায়দার মোল্যার পদত্যাগপত্রের কপি আমি পেয়েছি। এটি কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পাঠানো হবে। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন, “গণতান্ত্রিক দেশে যেকোনো ব্যক্তি তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। কেউ চাইলে দল ছাড়তে পারে বা অন্য কোনো রাজনৈতিক ধারায় যুক্ত হতে পারে। এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই অংশ।”

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে এ ধরনের পদত্যাগ দলীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে হায়দার মোল্যার পদত্যাগের পেছনে কেবল ব্যক্তিগত কারণই রয়েছে, নাকি অন্য কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কারণ রয়েছে—তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চললেও দলীয়ভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করা হয়নি।