খুঁজুন
, ,

“কীভাবে ট্রাম্পবাদ বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে”

সাইমন টিসডাল
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ণ
“কীভাবে ট্রাম্পবাদ বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে”

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পত্রিকা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ ২০২১ সালে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনামলের প্রথম মেয়াদকালে মোট ৩০ হাজার ৫৭৩টি ‘মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর’ বক্তব্য দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে টানা চার বছর নিজ দেশের নাগরিক এবং বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিদিন গড়ে ২১টি করে মিথ্যা কথা বলতেন তিনি। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরে এসেও তিনি সেই অভ্যাসে একচুলও ছেদ টানেননি। এখনো নিয়মমাফিক তিনি আমেরিকান জনগণকে এবং গোটা বিশ্বকে বিভ্রান্ত করে চলেছেন।

জনজীবনে সত্য ও সততার প্রতি এ প্রেসিডেন্টের নির্লজ্জ অবহেলার দেখা মিলছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের ঘটনায় তার ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়ায় আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এ আচরণ। এ ঘটনা কেন্দ্র করে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা শুধু অশোভন নয়; বরং একই সঙ্গে বিপজ্জনকভাবে অনৈতিকও। নিরাপত্তা বাহিনীর বন্দুকের গুলিতে আমেরিকান নাগরিক নিহত হলেও, তিনি নাগরিকের পক্ষ না নিয়ে বরং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী নিরাপত্তাকর্মীর পক্ষ নিয়েছেন।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা করে বলেন, ‘আমার ক্ষমতার ওপর একমাত্র নিয়ন্ত্রণ হলো আমার নিজের নৈতিকতা এবং আমার নিজের মন।’ এ বক্তব্য থেকেই তার কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। তার কাছে ন্যায়-অন্যায় কোনো সর্বজনীন মানদণ্ডে আবদ্ধ নয়; বরং সেটা সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিনির্ভর। তিনি নিজেই নিজের নৈতিক উপদেষ্টা, নিজেই নিজের আইনজ্ঞ, নিজেই নিজের যাজক। তার স্বীকারোক্তি শুধু নিজের কাছে; কোনো রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কিংবা নিজ দেশের জনগণের কাছে নয়। নিজেকে একক ব্যক্তিনির্ভর একটি গির্জা হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন তিনি।

দুশ্চিন্তার ব্যাপার হলো, ট্রাম্প অন্যদের পাশাপাশি নিজেকেও মিথ্যা বলেন। আর এ আত্মপ্রবঞ্চনার পরিণতি ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষে এমন আচরণ সাধারণ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ভিত ভেঙে দেয়। মার্কিন ভোটারদের মতো বিদেশি নেতারাও ধীরে ধীরে এ প্রেসিডেন্টের দীর্ঘস্থায়ী মিথ্যাচারের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। কিন্তু এ অভ্যাসকে প্রশ্রয় দেওয়ার মূল্য তাকে প্রশ্ন না করার, প্রতিবাদ না তোলার, শক্ত অবস্থান না নেওয়ার মূল্য দিন দিন গুণোত্তর হারে বাড়ছে। এ সুবাদে তার আচরণ হয়ে উঠছে আরও স্বৈরাচারী ও খামখেয়ালি।

ট্রাম্পের মিথ্যা ও প্রতারণা আজকের তিনটি জটিল ও অমীমাংসিত আন্তর্জাতিক সংকটে একটি সাধারণ, উত্তেজনাবর্ধক উপাদান হিসেবে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছেন, চীনা ও রুশ যুদ্ধজাহাজ গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে রেখেছে, যার ফলে নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে হস্তক্ষেপ করা জরুরি। অথচ ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন, যিনি ডেনমার্কের অধীন এই স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপটির বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ট্রাম্পের চেয়ে অনেক বেশি অবগত, তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রশ্ন তোলেন, ‘কোথায় এসব জাহাজ? অমাদের চোখে তো পড়ে না।’ গ্রিনল্যান্ডবাসীর কাছে ট্রাম্পের মন্তব্য নিছক প্রলাপ।

ডেনমার্ক স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তারা গ্রিনল্যান্ডে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এবং তথাকথিত ‘চীনা বিনিয়োগের বন্যা’ আরেকটি হোয়াইট হাউস-উৎপাদিত কল্পকাহিনি মাত্র। জরিপে দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডবাসী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া কিংবা ট্রাম্পের কাছে বিক্রি হওয়ার ঘোরবিরোধী। বস্তুত তারা স্বাধীনতা চায়। রাজা তৃতীয় জর্জের বাহিনীকে ২৫০ বছর আগে আমেরিকান ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করে যেই দেশের জন্ম হয়েছিল, তার পক্ষে অন্তত এ স্বাধীনতার মর্ম বোঝা উচিত। ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডকে ‘নিরাপদ’ করতে চান। কিন্তু বাস্তবে তিনি চান এ ভূখণ্ডের খনিজ সম্পদ কবজা করতে আর আমেরিকার সীমানা বৃদ্ধি করতে।

গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার ঘটনা ঘটানোর আগে মিথ্যার এক প্রলয়ংকরী স্রোত বইয়ে দেওয়া হয়। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ গোত্রের প্রধান বলে দাগিয়ে দেন। তার প্রশাসনে আমেরিকান নৌবাহিনী ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়া শুধু মাদক পাচারে জড়িত থাকার সন্দেহের বশে আমেরিকানদের কাছে প্রাণ হারিয়েছে এ নাবিকরা। বেআইনিভাবে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা দখল করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধরত অবস্থা’ ঘোষণা করেন ট্রাম্প।

বাস্তবতা হলো, ২০১৮ সালে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের ক্ষমতা-পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা লালন করে আসছেন তিনি। এখন তিনি নিজেই স্বীকার করছেন, এ অপারেশনের মূল লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার নয়; লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার জনগণকে ‘উদ্ধার’ করা বা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও নয়। লক্ষ্য একটাই—তেল। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে সাক্ষাতে সম্মত হন। ট্রাম্প নির্লজ্জ ও নির্মমভাবে দেশটির সম্পদ লুণ্ঠন করছেন। একই সঙ্গে হুমকি দিচ্ছেন মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াকে।

সম্প্রতি ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেনেজুয়েলাকে অনির্দিষ্টকাল শাসন করার জন্য তার একটি ‘পরিকল্পনা’ আছে। এটিও আরেকটি নিরেট মিথ্যা। ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী ও মিলিশিয়া এখনো অক্ষত অবস্থায় আছে। মাদুরো নিজে ভেনেজুয়েলায় না থাকলেও তার স্বৈরতান্ত্রিক সরকার এখনো দেশটিতে টিকে আছে। আর ক্ষমতা দখলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক সাহসী গণতান্ত্রিক বিরোধী জোটের মুখে দেশটি অনিবার্য সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ব্যতীত ওয়াশিংটন ডিসি থেকে এ বিশৃঙ্খলার ঢাল থামানো সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ইউক্রেনের কথা ভুলে গেলেও চলবে না। এটি তৃতীয় একটি সংঘাতক্ষেত্র, যাকে ঘিরে ট্রাম্পের সত্য-মিথ্যার খেলা রয়েছে চলমান। বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে কোন পদক্ষেপটি সঠিক ও ন্যায় এবং কোনটি বেঠিক ও অন্যায়—ট্রাম্পের পক্ষে সেটা চিহ্নিত করতে পারার অক্ষমতা ইউরোপের ক্ষতি ডেকে আনছে। নির্বাচনী প্রচারণার দরুন তিনি মিথ্যা বলেছিলেন যে, ক্ষমতায় এলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন। সে ব্যাপারে ব্যর্থ হয়ে তিনি বারবার ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু পুতিন বিদ্রূপাত্মক হাসি হেসে তাকে সাময়িকভাবে তুষ্ট করে বরাবরই বোমাবর্ষণ চালিয়ে গেছেন। আর প্রতিবারই ট্রাম্প দুর্বলভাবে পিছু হটেছেন, দোষ চাপিয়েছেন ইউক্রেনীয় নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর।

ট্রাম্পের এ দ্বিচারিতা কিয়েভকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের মিত্রদের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিয়েছে। একদিন তিনি ন্যাটো নেতাদের তেলচিটে প্রশংসা সগর্বে গ্রহণ করেন, তো পরদিনই জোটটিকে উপহাস এবং অবজ্ঞা করে বলেন, ইউরোপ সভ্যতার বিলুপ্তির মুখে পৌঁছে গেছে। গত সপ্তাহে তিনি দাবি করেন, সংকটের সময়ে ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করবে না। এটিও ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর এবং আফগানিস্তানে ২০ বছরের ব্যর্থ অভিযানের দরুন ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, ইউরোপীয় দেশগুলো এ চুক্তিকে সম্মান করতে জানে।

গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন সমসাময়িক সংকটগুলোর মধ্যে ট্রাম্পের অসততার বাইরেও আরও কিছু ব্যাপারে মিল রয়েছে। তিন ক্ষেত্রেই উদ্বেগজনকভাবে প্রকাশ পেয়েছে ইউরোপের নেতাদের দুর্বলতা, বিভাজন এবং একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অক্ষমতা। এখন নিশ্চয়ই ইউরোপকে মেনে নিতে হবে, এ প্রেসিডেন্টের ওপর তারা আর আস্থা রাখতে পারে না। আর এ ভীতিকর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে যে, ব্রেক্সিট ছিল চরম ভুল একটি সিদ্ধান্ত। যুক্তরাজ্যের পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জোট ত্যাগ করার সিদ্ধান্তটা আত্মঘাতী বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা, সার্বভৌম অধিকার ও ভৌগোলিক স্বাধীনতার প্রকাশ্য লঙ্ঘন ঘটিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। জাতিসংঘ-সমর্থিত নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার জায়গায় নব্য-সাম্রাজ্যবাদী প্রভাববলয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে বর্তমান প্রশাসন, যা এ তিন আন্তর্জাতিক সংকটেই স্পষ্ট। একই সঙ্গে স্পষ্ট সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা। অহংকারবশত ও বেআইনিভাবে ভেনেজুয়েলার সর্বশেষ নির্বাচনকে বাতিল ও অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে লেগেছে রাশিয়া। গ্রিনল্যান্ডবাসীরা বলছে, তারা তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার চায়। অথচ এসব ক্ষেত্রেই অন্যায়ভাবে জয়ী হচ্ছে অধিক ক্ষমতাধর পক্ষ।

এ প্রবণতাগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। তবে ২০২৫ সালে এগুলোকে নিঃসন্দেহে ত্বরান্বিত করেছে ট্রাম্পের অস্থিতিশীল, নীতিহীন, আইনবহির্ভূত, বিশৃঙ্খল এবং মৌলিকভাবে অনৈতিক আচরণ। এসব অনিষ্টের মধ্যে তার নৈতিক অবক্ষয়ই সবচেয়ে ভয়ংকর। এ নতুন যুগে দেখা দিচ্ছে ‘ট্রাম্পবাদ’ নামক এক বিধ্বংসী রোগ, যা বিশ্বমানবতার ওপর কলুষ ছড়ায়, তাকে বিপর্যস্ত করে, অন্ধকারে ঢেকে দেয় ও বিষাক্ত করে তোলে। এর শিকার শুধু আমেরিকান নাগরিকরা নয়, বরং বিশ্বব্যাপী সবাই।

মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, ‘মিথ্যা তিন প্রকার—সাধারণ মিথ্যা, অসাধারণ মিথ্যা আর পরিসংখ্যানগত মিথ্যা।’ আমি তার কথাটিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটু পরিবর্তন করে বলব যে, রাজনীতির প্রাঙ্গণে মিথ্যা তিন প্রকার—সাধারণ মিথ্যা, অসাধারণ মিথ্যা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিথ্যা। এখন সময় এসেছে, অন্যায় ক্ষমতা চর্চার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার। ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইউরোপের মিত্রশক্তিদের আরও দৃঢ় হতে হবে। নচেৎ, ইতিহাসের অদক্ষ, স্বার্থপর ও স্বেচ্ছাচারী রাজা-বাদশাহদের মতো ট্রাম্পও হয়তো এমন কিছু করে বসবেন, যা আর ফেরানো যাবে না।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার সহকারী সম্পাদক, আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে নিয়োজিত স্থায়ী প্রতিবেদক। নিবন্ধটি ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের মতামত বিভাগ থেকে অনুবাদ করেছেন অ্যালেক্স শেখ

ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১০:২৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় বিষাক্ত সাপের কামড়ে সেক আব্দুল্লাহ (৫) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

শনিবার (২০ জুন) দুপুর ১২টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত আব্দুল্লাহ উপজেলার গাজিরটেক ইউনিয়নের চর অমরাপুর গ্রামের সেক শাহেদের ছেলে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল পরিবারের সবার ছোট এবং অত্যন্ত আদরের সন্তান।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে বাড়ির পেছনে খেলাধুলা করছিল আব্দুল্লাহ। এ সময় একটি কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে থাকা বিষাক্ত সাপ তার পায়ে কামড় দেয়। কামড় খাওয়ার পর শিশুটি বাড়িতে এসে মাকে জানায়, তাকে ‘ব্যাঙে কামড় দিয়েছে’। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়ায় পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে নিয়ে যান, যিনি নিজেকে ঝাড়ফুঁক ও চিকিৎসাজ্ঞানসম্পন্ন বলে পরিচয় দেন।

শিশুটির চাচি আখি আক্তার জানান, স্থানীয় শহীদ ফকির নামে এক ব্যক্তির কাছে নেওয়ার পর তিনি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, এটি সাপের কামড় নয়। তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে কিছু সময় সেখানে কাটানো হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আব্দুল্লাহর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে।

পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও দুপুরের দিকে শিশুটি মারা যায়।

গাজিরটেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “প্রথমে শিশুটিকে স্থানীয় এক ফকিরের কাছে নেওয়া হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

আব্দুল্লাহর অকাল মৃত্যুতে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো চর অমরাপুর গ্রাম। প্রতিবেশীরাও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

নগরকান্দায় স্ত্রীর তালাকের এক সপ্তাহ পর শ্বশুরবাড়িতে ঝুলছিল জামাতার মরদেহ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১০:১৮ অপরাহ্ণ
নগরকান্দায় স্ত্রীর তালাকের এক সপ্তাহ পর শ্বশুরবাড়িতে ঝুলছিল জামাতার মরদেহ

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে শ্বশুরবাড়িতে এসে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন আব্দুল কারিম মুন্সী (৪২) নামে এক ব্যক্তি।

শনিবার (২০ জুন) সকালে উপজেলার চরযশোরদী ইউনিয়নের আলগাদিয়া গ্রামে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

নিহত আব্দুল কারিম মুন্সী ভাঙ্গা উপজেলার কাপুড়িয়া সদরদী গ্রামের মৃত জালাল মুন্সীর ছেলে। তিনি নগরকান্দার আলগাদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ওমর আলী শেখের জামাতা ছিলেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে আব্দুল কারিম ও তার স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহ চলছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং কোনো স্থায়ী পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এসব কারণে তাদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি লেগেই থাকত। একপর্যায়ে কোরবানির ঈদের প্রায় এক সপ্তাহ আগে তার স্ত্রী একতরফাভাবে তাকে তালাক দেন।

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ধারণা, তালাকের পর থেকেই আব্দুল কারিম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ঘটনার আগের রাতে তিনি শ্বশুরবাড়িতে আসেন। পরে শুক্রবার দিবাগত রাতের কোনো এক সময় শ্বশুর ওমর আলী শেখের টিনশেড বসতঘরের সিঁড়ির আড়ার সঙ্গে দড়ি পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দেন।

শনিবার সকালে পরিবারের সদস্যরা তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। পরে খবর পেয়ে নগরকান্দা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে।

নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ জানান, খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফরিদপুরে রাতে স্বামীর সাথে ঝগড়া, ভোরে মিলল গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে রাতে স্বামীর সাথে ঝগড়া, ভোরে মিলল গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ

ফরিদপুর সদর উপজেলার চর মাধবদিয়া ইউনিয়নে শ্বশুরের সেবাযত্নকে কেন্দ্র করে স্বামীর সঙ্গে বিরোধের জেরে রিমা আক্তার (৩৩) নামে এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শনিবার (২০ জুন) ভোরে সদর উপজেলার চর মাধবদিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়াজউদ্দিন মুন্সির ডাঙ্গী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত রিমা আক্তার ওই এলাকার শাহেদ আলীর স্ত্রী। তিনি দুই সন্তানের জননী ছিলেন। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, রিমার শ্বশুর জহির উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন। তাকে দেখাশোনা ও সেবাযত্ন করার বিষয় নিয়ে প্রায়ই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হতো।

পুলিশ জানায়, শুক্রবার (১৯ জুন) সন্ধ্যায় শ্বশুরের দেখভাল করা নিয়ে রিমা আক্তার ও তার স্বামী শাহেদ আলীর মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে রিমা আক্তার স্বামীকে বিভিন্ন কথা বলেন। পরে রাতের খাবার খেয়ে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন।

পরদিন শনিবার ভোরে শাহেদ আলী ঘুম থেকে উঠে ঘরের বাইরে গেলে ওই সুযোগে রিমা আক্তার ঘরের বাঁশের ধরনার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।কিছুক্ষণ পর তার মেয়ে সাবিহা (৯) মাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে চিৎকার শুরু করলে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। পরে শাহেদ আলী ওড়না কেটে তাকে নিচে নামালেও ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়।

খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) খায়রুল বাশার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে এসআই খায়রুল বাশার বলেন, “মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”