খুঁজুন
, ,

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ’

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ১৫ জুন, ২০২৫, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ’

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও ধ্বংসের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হইয়া উঠিয়াছে। ইসরাইল ইরানের উপর বিমান হামলা চালাইয়াছে এবং ইরান পালটা প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়াছে। যুদ্ধের নূতন এই পর্ব শুধু ইরান ও ইসরাইলের জন্য নহে, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য এক গা-ছমছমে অশনিসঙ্কেত। ২০০১ সালে টইন টাওয়ার ধ্বংসের পর হইতে বিশ্ব একটি বারের জন্যও স্থির শান্তি দেখিতে পায় নাই। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, গাজা, ইয়েমেন, ইউক্রেন-সকল স্থানেই যেন মৃত্যু ও দুর্দশা নিত্যদিনের বাস্তবতা হইয়া উঠিয়াছে। আজকের এই সংঘাত সেই দুঃসহ ধারাবাহিকতারই নির্মম সংযোজন।

ইসরাইলের এই আকস্মিক হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, পরমাণু বিজ্ঞানীসহ বহুজন প্রাণ হারাইয়াছেন। ইরান তাহার আকাশপথ বন্ধ করিয়া দিয়া বলিয়াছে, যুদ্ধ এখন শুধু আশঙ্কা নহে-বরং এক চলমান বাস্তবতা। অনেকেই মনে করিতেছেন, ইরানে এই নূতন হামলা গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে। অনেক বিশ্লেষকই প্রশ্ন তুলিয়াছেন, এই যুদ্ধ কি আদৌ পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ প্রতিরোধের জন্য? না কি ইহা ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এক নির্মম খেলা? এই যুদ্ধে শুধু দুইটি দেশের বিষয় নহে, ইহাতে পরোক্ষভাবে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হইবে তৃতীয় বিশ্বের অসংখ্য দেশ।

তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের অবস্থা এমনিতেই নাজুক। ইতিমধ্যেই কোভিড-১৯-এর অভিঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন ইহাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে নাড়াইয়া দিয়াছিল। এই নূতন সংঘাত তেলের বাজারকে পুনরায় অস্থির করিয়া তুলিবে, বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতি ঘটাইবে এবং দাতা সংস্থাগুলির মনোযোগ আরো একবার পশ্চিমা কৌশলগত এলাকায় কেন্দ্রীভূত হইবে। আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চল তথা উন্নয়নশীল দেশসমূহ নূতন সংকটে পতিত হইবে।

অনেকেই মনে করেন, এই যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের নহে, তথ্য ও মতামতেরও যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তৈরির চেষ্টা চলিতেছে। ‘প্রতিরক্ষার স্বার্থে’ বা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ বলিয়া যাহা ব্যাখ্যা করা হইতেছে, তাহার পিছনে রহিয়াছে ভিন্ন সমীকরণ। সেইখানে রহিয়াছে বাণিজ্যিক স্বার্থ, সামরিক সরঞ্জামের বাজার সম্প্রসারণ এবং ভূরাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা। আর এই সকল কিছুর বিনিময়ে জীবন দিতেছে নিরপরাধ শিশু, মা, কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষ কিংবা হাসপাতালের নিরপরাধ রোগী।
যুদ্ধ মানে কেবল মৃত্যুই নহে-জীবনের সম্ভাবনাগুলিকেও হত্যা করে। যুদ্ধ মানে শিক্ষার বন্ধন ছিন্ন হইয়া যাওয়া, শৈশবের স্বাভাবিকতা ধ্বংস হওয়া, কৃষিকাজে বিরতি, শিল্পে মন্দা, স্বাস্থ্য খাতে বিপর্যয়। যুদ্ধ মানে শিশুর চোখে ভয় আর ভবিষ্যৎহীনতা। দুঃখজনক হইলেও সত্য যে, মানবজাতি যুদ্ধ ব্যতিরেকে যেন কিছু শিখিতে চাহে না। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, প্রতিটি যুদ্ধই পরবর্তী যুদ্ধের ভিত্তি রচনা করিয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত হইয়াছিল জাতিসংঘ, মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, বহু আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি: কিন্তু সেই আইনগুলিকে থোড়াই কেয়ার করে পরাশক্তির দেশসমূহ।

প্রশ্ন হইল, ইহার শেষ কোথায়? ইরান ও ইসরাইলের সংঘাত কি এক বিশ্বযুদ্ধে রূপ লইবে? না কি সময় থাকিতেই বৃহত্তর মানবিক বিবেক জাগ্রত হইবে? বিশ্বের শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্রসমূহ কি কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া ক্ষান্ত থাকিবে, না কি সক্রিয় শান্তিরক্ষা উদ্যোগ গ্রহণ করিবে? জীবনানন্দ দাশ সেই কবে বলিয়া গিয়াছেন, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ।’ হায়! এই আঁধার কবে দূর হইবে?

ফরিদপুরে ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৬:৪৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে গাঁজাসহ আটক হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা মো. ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের (২৮) মৃত্যুর ঘটনায় তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ।

রবিবার (২১ জুন) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং সার্বিক পরিস্থিতি তদন্তের জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলামকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামছুল আজম এবং ডিআই-১ মো. মোশারফ হোসেন।

এর আগে শনিবার (২০ জুন) দিবাগত রাত ২টার দিকে মধুখালী পৌরসভার গোন্দারদিয়া এলাকায় জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের সময় মাদক বিক্রির অভিযোগে প্রান্তকে আটক করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করে পুলিশ।

ডিবি পুলিশের তথ্যমতে, আটকের প্রায় এক ঘণ্টা পর প্রান্ত শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দ্রুত তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শিকদার আফ্রিদি রিজভী জানিয়েছেন, হাসপাতালে আনার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সিটিস্কানে দেখা যায়, প্রান্ত ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন এবং তার মাথায় বড় ধরনের রক্তক্ষরণ হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার শরীরে কোনো আঘাত বা নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “চিকিৎসকদের প্রাথমিক মতামত অনুযায়ী তিনি ব্রেনস্ট্রোকজনিত কারণে মারা গেছেন। তারপরও ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি সব দিক পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেবে। তদন্ত শেষে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।”

এদিকে প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনায় সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান শেষ হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ফরিদপুরের মধুখালীতে গাঁজাসহ আটক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ১:৩৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের মধুখালীতে গাঁজাসহ আটক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। মৃত যুবকের নাম মো. ইমতিয়াজ আহমেদ প্রান্ত (২৮)। তিনি মধুখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোন্দারদিয়া এলাকার মৃত ইসকেন্দার হায়দারের ছেলে।

জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তথ্যমতে, শনিবার (২০ জুন) দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে মধুখালী পৌরসভার গোন্দারদিয়া এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় মাদক বিক্রির অভিযোগে প্রান্তকে আটক করা হয়। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন জানান, আটকের ঘণ্টা খানেক পর প্রান্ত হঠাৎ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দ্রুত তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার (২১ জুন) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শিকদার আফ্রিদি রিজভী বলেন, হাসপাতালে আনার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ও সিটিস্কানে দেখা যায়, প্রান্ত ব্রেনস্ট্রোকের শিকার হয়েছেন। তার মাথায় বড় ধরনের রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার শরীরে কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্ন বা নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় ফরিদপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলার পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযানের সময় প্রান্তকে গাঁজাসহ আটক করা হয়। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, তিনি ব্রেনস্ট্রোকজনিত কারণে মারা গেছেন। তারপরও মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।”

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রান্তের বিরুদ্ধে মধুখালী থানায় পূর্বেও মাদক-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। তার মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান শেষ হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জেলায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও আবু নাসের হোসাইন, সালথা:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। প্রচলিত ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের গণ্ডি পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ শুরু হয়েছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায়। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির ৮ বিঘা জমিতে আনারসের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফরিদপুর অঞ্চলে এ ধরনের বৃহৎ পরিসরের আনারস চাষ আগে দেখা যায়নি। ফলে মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প ও লাভজনক ফলচাষের পথ উন্মুক্ত হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যদুনন্দী গ্রামের দুটি পৃথক প্লটে বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত বাগানজুড়ে চলছে নিয়মিত পরিচর্যা। দূর থেকে দেখলে সবুজের সমারোহে ভরা বাগানটি যে কারও দৃষ্টি কাড়ে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কৃষকরা বাগান পরিদর্শনে আসছেন এবং আনারস চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

জানা গেছে, মিলন ফকির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিপণ্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে তিনি বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারস গাছ লাগান। আশাতীত ফলন ও সফলতা তাকে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি পরিকল্পিতভাবে আনারস চাষের জন্য জমি নির্বাচন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

চলতি বছরে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের প্রায় ৮০ হাজার আনারসের চারা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ৮ বিঘা জমিতে এসব চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে বাগানের গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং আগামী বছর থেকে ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির বলেন, “প্রথমে শখের বসে বাড়ির ছাদে কয়েকটি আনারস গাছ লাগিয়েছিলাম। গাছে ভালো ফল আসার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তখন মনে হলো, বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই এবার বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, সেচ ব্যবস্থা, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী বছর ফল সংগ্রহ করা যাবে। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

মিলন ফকির জানান, শুধু ফল বিক্রিই নয়, ভবিষ্যতে আনারসের উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রিরও পরিকল্পনা রয়েছে তার। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত আয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরাও সহজে মানসম্পন্ন চারা সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, “আমার এই উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করবো।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সালথা এলাকায় এর আগে কখনো এভাবে বাণিজ্যিক আকারে আনারস চাষ হতে দেখা যায়নি। ফলে বাগানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা সাধারণত ধান, পাট ও সবজি চাষ করি। আনারস চাষের কথা কখনো ভাবিনি। মিলন ফকিরের বাগান দেখে মনে হচ্ছে এটি লাভজনক হতে পারে। ফলন ভালো হলে আমরাও এ ধরনের ফলচাষে আগ্রহী হবো।”

আরেক কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাগানটি দেখতে খুব সুন্দর। প্রতিদিন অনেক মানুষ দেখতে আসছে। সফল হলে এটি এলাকার কৃষকদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত হবে।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস একটি লাভজনক ফল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আনারসের চাষ হয়। বর্তমানে বাজারে আনারসের চাহিদা বাড়ছে এবং ফলটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হজম সহায়ক উপাদান। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে আনারসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “সালথা উপজেলায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে কৃষিতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাভজনক ফল ও ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. রইচ উদ্দিন বলেন, “ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের জেলায় সাধারণত ধান, পাট, গম ও বিভিন্ন সবজি চাষের প্রচলন বেশি থাকলেও কৃষিতে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নতুন নতুন ফল ও ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। মিলন ফকিরের মতো উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা বাগানের অবস্থা সন্তোষজনক দেখেছি এবং কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। যদি ফলন ও বাজারজাতকরণ সফল হয়, তাহলে ফরিদপুরের অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। এতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় ফরিদপুর অঞ্চলেও আনারস চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে মিলন ফকিরের এই সাহসী পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার স্বপ্ন সফল হলে শুধু একজন উদ্যোক্তার আর্থিক উন্নয়নই নয়, বরং ফরিদপুরে আনারস চাষের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন সম্ভাবনা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত হবে আয়ের নতুন দিগন্ত।