খুঁজুন
, ,

ফরিদপুর থেকে বম্বে, গীতা দত্ত মানে ‘তুমি যে আমার’

মাসুম অপু
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:১০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর থেকে বম্বে, গীতা দত্ত মানে ‘তুমি যে আমার’

শিরোনাম আর শুরুর তথ্যের পর তাঁকে নিয়ে লেখার কোনো ভূমিকা দরকার হয় না। এই বাংলার কন্যা গীতা দত্তের নামের আগে জুতসই বিশেষণ পাওয়াও মুশকিল। যেমন মুশকিলে পড়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ‘হারানো সুর’ সিনেমার গান করছেন। ‘তুমি যে আমার’ গানটি রেকর্ড হবে। সুচিত্রা মানেই তো সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। সবাই সে কথা বলেছিলেন, কিন্তু সুরকার হেমন্ত ঠিক আস্থা রাখতে পারছিলেন না। অন্য রকম ভাবছেন, এই গান গীতা ছাড়া আর কেউ গাইতে পারবে না! হেমন্তের কথামতোই ঠিক হলো, গীতা দত্তই গাইবেন। মুম্বাই (তৎকালীন বম্বে) গিয়ে গানের রেকর্ডিং করা হলো। এরপর যা হওয়ার তাই হলো। আজও সুচিত্রা সেনকে নিয়ে প্রতিবেদন বা গল্প তৈরি করতে গেলে শুরুতে এই গানের উল্লেখ এসেই পড়ে। যেন সুচিত্রাই গাইছেন, গভীর থেকে। কী অদ্ভুত টান, কী দারুণ গায়কি! এই গানের মতোই উজ্জ্বল ছিলেন গীতা দত্ত, আর এমনই ছিল তাঁর গান। ভারতের সংগীতজগতে একটা কথা খুব প্রচলিত ছিল—লতাকণ্ঠী, আশাকণ্ঠী হওয়া যায়, কিন্তু গীতাকণ্ঠী হওয়া যায় না।

ফরিদপুরের কন্যা
১৯৩০ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর জীবনের উন্মেষ বাংলাদেশের ফরিদপুরে। বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ রায়চৌধুরী ছিলেন জমিদার। তাঁর ১০ সন্তানের মধ্যে গীতা ছিলেন পঞ্চম৷ তখন তিনি গীতা ঘোষ রায়চৌধুরী। ছোট থেকেই গানের প্রতি কন্যার আগ্রহ আর সুরেলা কণ্ঠ মা-বাবার নজরে আসে। স্থানীয় গুরু হরেন্দ্রনাথ নন্দীর কাছে তালিমের ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁরা। এর মধ্যে কলকাতায় পাড়ি দেয় চৌধুরী পরিবার। কিছুদিন আসাম এবং কলকাতা থাকেন ঘোষ রায়চৌধুরীরা।

পরে ১৯৪২ সালে মুম্বাই পাড়ি দেন তাঁরা। ফরিদপুরের জমিদারি হারানোর পর আসাম, কলকাতা ঘুরে মুম্বাইয়ে থিতু হওয়া অত সহজ ছিল না। আর্থিক টানাপোড়েন পড়ে পরিবার। সেখানে আর কিশোরী গীতার জন্য সংগীতের তালিমের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি মা-বাবার। তাতে থেমে যান গীতা। সংগীত তো তাঁর আত্মায়, নিজের মতো করে চর্চা করে যেতেন। পাশাপাশি গানের টিউশনিও করাতেন। এবাড়ি–ওবাড়ি ছুটতেন টিউশনি করতে। বাসের ভাড়ার পয়সা বাঁচাতে হাঁটতেন মাইলের পর মাইল। যে বাড়িতে গান শেখাতেন, সেখানে গরিব বলে তাঁকে মাটিতে বসতে দেওয়া হতো। সংগীতের প্রতি দরদ ছিল বলেই হয়তো নিয়তি তাঁকে কাকতালীয়ভাবে সেদিকেই নিয়ে যায়। একদিন হঠাৎ পণ্ডিত হনুমান প্রসাদের নজরে পড়ে যান। শোনা যায়, মুম্বাইয়ে তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন পণ্ডিতজি। বারান্দায় বসে চর্চা করছিলেন কিশোরী গীতা। তাঁর কিন্নর কণ্ঠ ভেসে আসে পণ্ডিত হনুমান প্রসাদের কানে। দাঁড়ালেন, খোঁজ নিলেন। জহুরির মতো চিনে ফেললেন খাঁটি হীরা। ১৯৪৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পেশাদার কণ্ঠশিল্পী হিসেবে গীতার যাত্রা শুরু হয় হনুমান প্রসাদের হাত ধরে ‘ভক্ত প্রহ্লাদ’ ছবিতে। এই ছবিতে গীতা কোরাসে মাত্র দুই লাইন গান গাওয়ার সুযোগ পান।

১৯৩০ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর জীবনের উন্মেষ বাংলাদেশের ফরিদপুরে
১৯৩০ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর জীবনের উন্মেষ বাংলাদেশের ফরিদপুরেফেসবুক থেকে

শুরু হলো পথচলা

হাসনাহেনা জঙ্গলে ফুটলেও ঘ্রাণ ছড়ায় চারপাশ। একটি গানের কোরাসে অংশগ্রহণই গীতার পথচলার রাস্তা তৈরি করে। ‘ভক্ত প্রহ্লাদ’ ছবিতে গীতার কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে শচীন দেববর্মন তাঁর পরের ছবি ‘দো ভাই’তে গীতাকে মূল শিল্পী হিসেবে গাওয়ার দায়িত্ব দেন। ঠিক দেশ ভাগের বছরে; সে সময় নাকি অনেকে বারণ করেছিলেন শচীন দেববর্মনকে, এমন নতুন ‘অপরিপক্ব’ শিল্পীকে এত বড় দায়িত্ব না দিতে।

কিন্তু তিনি পরের পরামর্শে কান না দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। হয়তো বাঙালি বলে কিংবা এপারের মানুষ বলে বাড়তি স্নেহ দিয়েছিলেন গীতাকে। শচীন দেবের আস্থার প্রতি ষোলো আনা সম্মান দেখিয়েছিলেন গীতা, ‘মেরা সুন্দর স্বপ্না বিত গ্যায়া’র গানের সুর নাড়া দিয়েছিল শ্রোতাদের। মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে বুকভরা যন্ত্রণা নিয়ে নায়িকার হাহাকারের পুরোটাই ছিল গীতার গায়কিতে। এ সিনেমার ৯টি গানের ৬টিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন ১৬ বছরের সেই নবীন গায়িকা। আর কি চেনাতে হয়? শুধু মুম্বাই না, সারা ভারতের বিনোদন দুনিয়ায় তোলপাড় ঘটে যায়। কে এই গায়িকা? দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বাঙালি সেই গায়িকার নাম। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯—তিন বছরের মধ্যে শুধু প্রতিষ্ঠা না, গায়িকা হিসেবে শীর্ষে পৌঁছে যান গীতা। শীর্ষ তিনজনের তিনি একজন। জোহরাবাই অম্বালেওয়ালি বা নুরজাহান থেকে গীতার আলাদা গায়কির কদর বাড়তে থাকে।সেই সময়ে ভক্তিগীতির খুব চল ছিল। আর ভক্তিগীতিতে গীতা ছিলেন অনন্য। করুণ গলায় সমর্পণ, আকুতিতে সেই গানগুলো একদম বুকের গভীরে নাড়া দিত। আবার আধুনিক রোমান্টিক গানে তাঁর কণ্ঠ এবং গায়কিতে আস্থা রাখতেন নির্মাতারা। গরিব বলে গান শেখাতে গিয়ে তাঁকে যেসব বাড়িতে একসময় মাটিতে বসতে বলা হতো, তাঁকে নামডাক হতেই সেসব বাড়ি থেকেই নিমন্ত্রণ আসত। তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন না।  সেখানে গিয়ে জোর করে মাটিতেই বসতেন। হয়তো সেই অভিমানই সমকালীন ফর্মুলা গল্পের নায়িকার নেপথ্য কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়ে পর্দায় দারুণ ফুটে উঠত।শচীন দেববর্মনের সংগীত পরিচালনায় ১৯৫১ সালের ‘বাজি’ সিনেমা নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয় গীতাকে।

পরপর বেশ কিছু গানে যেন শ্রোতারা নতুন আরেক শিল্পী খুঁজে পান। কে জানত পদ্মাপারের সেই কিন্নরী কণ্ঠে পাশ্চাত্য সুর এভাবে মানিয়ে যাবে। সহজে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার জন্য ১৯৫০–এর দশকে লাস্যময়ী এবং ডান্স ক্লাবের গানে তিনি প্রথম পছন্দরূপে গণ্য হতে শুরু করেন। গীতার তীক্ষ্ণ বাঙালি টানকে কাজে লাগিয়ে ‘দেবদাস’ (১৯৫৫) এবং ‘পেয়াসা’ (১৯৫৭) ছবিতে তাঁর লোকসংগীতের ধার বাড়িয়েছিলেন শচীন দেববর্মন। ‘পেয়াসা’ ছবিতে ‘আজ সাজন মুঝে অঙ্গ লাগা লে’ বাংলা কীর্তন গানকে গীতা সফলভাবে হিন্দিতে গেয়েছিলেন। এরপর ও পি নাইয়ারের সুরে সব ধরনের গানেই তিনি সাবলীলতার ছাপ রেখে গেছেন।

গীতা ঘোষ থেকে দত্ত

‘তাদবির সে বিগরি হুই তাকদির বানা লে’ দেব আনন্দ আর নায়িকা গীতা বালি অভিনীত ‘বাজি’ সিনেমা গানটি হয়তো অনেকে শোনা। ১৯৫১ সালে এস ডি বর্মনের সংগীত পরিচালনায় এই গানটি রেকর্ড হয় মুম্বাইয়ের বিখ্যাত মহালক্ষ্মী স্টুডিওতে। সেদিন স্টুডিওতে এসেছিলেন ছবির পরিচালক গুরু দত্ত। গানে, গল্পে প্রেমে পড়ে যান গুরু দত্ত। টানা তিন বছরের প্রেমপর্বের পর বিয়ে করেন তাঁরা। সালটা ১৯৫৩। বাড়ির অমতে ২৬ মে বিয়েও করেন তাঁরা। গীতা ঘোষ হয়ে যান গীতা দত্ত। গীতা-গুরুর বিয়ের ছবি পাওয়া যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিয়ের দিন বাংলার শিকড়ের কথা ভোলেননি গায়িকা। নিজে লাল বেনারসি ও গয়নায় সেজেছিলেন। আর ধুতি-সিল্কের পাঞ্জাবি পরেছিলেন গুরু দত্ত।গুরু দত্তের ছবিতে গান সব সময় প্রাধান্য পেত। যেন গানটাও ছবির অন্য আরেকটা গল্প, একটা চরিত্র। গীতার বিয়ের কিছুদিন পরেই গুরু দত্ত নিজের প্রযোজনা ছাড়া স্ত্রীর অন্যত্র গাওয়া নিয়ে আপত্তি করতে থাকেন।

যার ফলে গীতার গান গাওয়ার সীমানা কিছুটা সংকীর্ণ হয়ে যায়। অবশ্য এর মধ্যেও ‘পেয়াসা’ সিনেমার ‘আজ সাজান মুঝে আঙ্গ লাগালো’, ‘সিআইডি’র  ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল জিনা ইহা, ‘আর পার’–এর ‘বাবুজি ধীরে চল না’, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফিফটি ফাইভ’–এর  ‘থান্ডি হাওয়া কালি ঘটা’, ‘সাহেব বিবি গুলাম’–এর ‘না যাও সাইয়া ছুড়াকে বাইয়া’–এর মতো তুমুল জনপ্রিয় গান উপহার দেন তিনি।

গুজরাটি ও বাংলা গানের গীতা

পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে গুরু দত্তের শর্ত মেনেও সুরকারেরা গীতার জন্য একটা গান তুলে রেখেছিলেন তাঁদের ছবির জন্য। এ পাশাপাশি গুজরাটি ছবিতেও দাপটের সঙ্গে গেয়েছিলেন তিনি। শুধু তা–ই নয়, গুজরাটি ছবিতেও প্রধান নেপথ্য গায়িকা ছিলেন তিনি। গুজরাটি ভাষায় বিখ্যাত সুরকার অবিনাশ ব্যাসের সুরে বেশ কিছু গান গেয়েছিলেন। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে গীতা বেশ কিছু বিখ্যাত বাংলা গান গেয়েছেন।

বিয়ের দিন বাংলার শিকড়ের কথা ভোলেননি গায়িকা
বিয়ের দিন বাংলার শিকড়ের কথা ভোলেননি গায়িকাফেসবুক থেকে

তাঁর বেশির ভাগ বাংলা গানেরই সুরকার ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। গেয়েছিলেন নচিকেতা ঘোষ এবং সুধীন দাশগুপ্তের সুরেও।

জীবনে নেমে এল ঝড়

অমিতাভ-জয়ার ‘অভিমান’ ছবিটির কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। অনেকেই এ ছবির গল্প বলতে গিয়ে গীতা-গুরু জুটির কথা তোলেন। বিয়ের তিন বছর কাটতে না কাটতেই জীবন ঘুরে যায় তাঁদের। দুজনই ছিলেন স্বাধীনচেতা, জেদি। এমনিতে গীতার খ্যাতি শিখরে, সে তুলনায় গুরু দত্ত তখনো যশপ্রার্থী বললে বাড়াবাড়ি হবে না। হয়তো এখানে কোথাও ব্যক্তিত্বের টানাপোড়েন তৈরি করে। শুরু থেকে গুরু দত্ত চাইতেন তাঁর ব্যানার ছাড়া অন্য কোনো ব্যানারের জন্য গান করবেন না গীতা।

এটা মেনে নিয়েও যেন ঠিক মেনে নিতে পারেননি গীতা। শোনা যায়, লুকিয়ে টুকটাক গাইতেন তিনি। তবে ‘সিআইডি’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় থেকে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও জটিল হয়। এ সময় ওয়াহিদা রহমানকে সামনে এনেছিলেন গুরু দত্ত। গুরু দত্তের ‘সিআইডি’ ছবিতে খলনায়িকা ওয়াহিদা; পরপর গুরু দত্তের ছবিতে অভিনয় করে চলেছেন ওয়াহিদা।

‘পিয়াসা’ ছবিতে নায়িকা। ‘চৌধভি কা চাঁদ’ ছবিতে ওয়াহিদা রহমানের বিপরীতে গুরু দত্তের অভিনয় সাড়া ফেলে। পর্দার প্রেম জীবনে ঢুকে পড়ছে, এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। গুরু দত্ত-ওয়াহিদা রহমান হয়ে ওঠেন ‘টক অব দ্য টাউন’। তবে শুধু কথার কথাই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও ওয়াহিদার প্রেমে পড়েন গুরু দত্ত। ওয়াহিদা রহমানকে কেন্দ্র করে নাকি মাঝেমধ্যে ঝগড়াও হতো। এর মধ্যে ‘কাগজ কা ফুল’ ছবিটি  ফ্লপ হয়। গুরু–গীতার বিবাহবিচ্ছেদ না হলেও তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন। অবসাদে ভুগতে থাকা গুরু দত্ত  দুবার আত্মঘাতীও হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৬৩ সালে আলাদা হয়ে যান পরিচালক, নায়ক-গায়িকা। গীতা থাকতে শুরু করেন মুম্বাইয়ের সান্তাক্রুজে। গুরু দত্ত ছিলেন পেডার রোডের ফ্ল্যাটে। বছরখানেক পর সেই ফ্ল্যাট থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হলো। মারা যাওয়ার আগের দিনও স্ত্রী গীতা দত্তের কাছেও যান গুরু দত্ত। দুই ছেলের সঙ্গে থাকতে চাইলে গীতা দত্ত রাজি হননি। গুরু দত্তের অপমৃত্যুর পর গীতা দত্তের জীবনেও সেই সময়ে নেমে আসে আরও বিপর্যয়। শোনা যায়, ঘোর পানাসক্ত হয়ে ওঠেন তিনিও।

আর্থিকভাবেও সংকটে পড়েন। অনেক চেষ্টা করছিলেন। সামলে উঠতে এমনকি বাংলা ছবি ‘বধূবরণ’-এ অভিনয়ও করেন। ওদিকে লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোসলে গানের বাজার দখল করে নেন। যদিও ‘অনুভব’ ছবিতে গীতার কণ্ঠে গাওয়া সব কটি গান হিট। কিন্তু ততক্ষণে নিয়তিই যেন সঙ্গ ছেড়ে দিয়েছে তাঁর। ফিরবেন ফিরবেন করছেন, তখনই ধরা পড়ে যকৃতের জটিল রোগ, সিরোসিস।

বিয়ের তিন বছর কাটতে না কাটতেই জীবন ঘুরে যায় তাঁদের
বিয়ের তিন বছর কাটতে না কাটতেই জীবন ঘুরে যায় তাঁদেরফেসবুক থেকে

অর্থের অনটন দূর করতে সেই সময়ে কলকাতার মঞ্চে গীতা অনেক অনুষ্ঠান করেছেন। গীতা পুরোদমে গানের তথা চলচ্চিত্রজগতে ফিরতে চাইলেও বম্বের ফিল্মি দুনিয়ার রাজনীতির সমীকরণ তাঁকে আর সেই সুযোগ দেয়নি। শেষের দিকে হাসপাতালে প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার ফাঁকেই সিনেমার চটুল গানে যথাযথ আবেদন ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে, নিজ প্রতিভার গুণে। সকালে হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা নিয়ে বিকেলে স্টুডিওতে গিয়েছেন ‘মুঝে জান না কাহো মেরি জান’! প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়েও রেকর্ডিংয়ে তিনি কীভাবে একের পর এক গান গেয়ে গেছেন, তা নিয়ে সমালোচকেরা এখনো আলোচনা করেন। গীতা দত্তের শেষের দিনগুলো শারীরিক যন্ত্রণায় কেটেছে। নাকেমুখে নল গোঁজা। কখনো কান বা নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হতো। বেশির ভাগ সময়ই অজ্ঞান থাকতেন গায়িকা ও অভিনেত্রী। সালটা ১৯৭২ সালের ২০ জুলাই, কোনো চিকিৎসাই গীতাকে আর সুরের জগতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। শেষ হয় গীতার জীবনযাত্রা। অবসান হয় সব যন্ত্রণার।

শোনা যায়, শচীন দেববর্মন তাঁর পছন্দের গীতার জন্য আলাদা করে রেখেছিলেন ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’ গানটি! শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। শচীন কর্তা নিজেই গানটি গেয়েছেন বটে, তবে এই গানটি আমাদের পদ্মাপারের মেয়ের কণ্ঠে শুনতে না পাওয়ার আফসোস থেকে যাবে সংগীতানুরাগী শ্রোতাদের।

নির্মল পুরজা : অসম্ভবকে জয় করা এক গুর্খা যোদ্ধার মহাকাব্য

রেহেনা ফেরদৌসী
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
নির্মল পুরজা : অসম্ভবকে জয় করা এক গুর্খা যোদ্ধার মহাকাব্য

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাদের জীবন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং একটি জাতির আত্মমর্যাদা, মানবিক সাহস এবং অদম্য সংকল্পের প্রতীক হয়ে ওঠে। তারা প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন, অসম্ভবকে সম্ভব করেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখান। নেপালের সন্তান নির্মল “নিমস” পুরজা, MBE (২০১৮) ছিলেন তেমনই এক বিরল মানুষ।

তিনি ছিলেন একাধারে Special Boat Service (SBS)-এ যোগদানকারী প্রথম গুর্খা সেনাসদস্যদের একজন (বিশ্বের অন্যতম কঠিন বিশেষ বাহিনী Special Boat Service (SBS) –এর সদস্য), উচ্চতাপর্বতারোহী, লেখক, প্রেরণাদায়ক বক্তা এবং মানবিক উদ্ধারকর্মী। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয়- তিনি প্রমাণ করেছিলেন, মানুষের মানসিক শক্তি যদি অটুট থাকে, তবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতও তার কাছে অজেয় নয়।

২০১৯ সালে মাত্র ১৮৯ দিনে বিশ্বের ১৪টি ৮,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গ আরোহণ করে তিনি বিশ্বপর্বতারোহণের ইতিহাস নতুন করে লিখেছিলেন। সেই কীর্তি শুধু একটি রেকর্ড ছিল না; এটি ছিল মানবিক সক্ষমতার এক নতুন সংজ্ঞা। কিন্তু নির্মল পুরজার গল্প শুরু হয়নি এভারেস্টের চূড়ায়। শুরু হয়েছিল নেপালের এক ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে, যেখানে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী, অথচ স্বপ্ন ছিল আকাশেরও ওপরে।

হিমালয়ের কোলে এক শিশুর জন্ম

১৯৮৩ সালের ২৫ জুলাই, নেপালের মিয়াগদি জেলার দানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নির্মল পুরজা। ধৌলাগিরি পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এই পাহাড়ি জনপদে প্রকৃতি যেমন ছিল অপরূপ, জীবনও ছিল তেমনি কঠিন। শৈশব থেকেই তিনি বরফঢাকা শৃঙ্গ, খাড়া পাহাড়, নদী আর জঙ্গলের মধ্যে বড় হয়েছেন। পাহাড় তার কাছে কোনো ভয়ের প্রতীক ছিল না; বরং ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ। হয়তো সেই কারণেই পরবর্তীকালে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক শৃঙ্গগুলোর সামনে দাঁড়িয়েও তিনি অটল থাকতে পেরেছিলেন।

নির্মল পুরজার পরিবার ছিল সাধারণ, পরিশ্রমী এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ। তার বাবা ছিলেন গুর্খা সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য, যিনি সামরিক জীবনের কঠোরতা ও দেশপ্রেমকে পারিবারিক মূল্যবোধ হিসেবে সন্তানদের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন। তার মা ছিলেন একজন গৃহিণী- সহনশীলতা, মমতা ও ত্যাগের এক নীরব প্রতীক। অভাব ছিল, কিন্তু আত্মসম্মানের অভাব ছিল না। পরিবারের সবাই জানতেন, কঠোর পরিশ্রম ছাড়া সাফল্যের কোনো বিকল্প নেই। নির্মল পরে বহুবার বলেছেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে নয়, এসেছে নিজের পরিবার থেকেই। দারিদ্র্য ছিল বাস্তবতা, পরাজয় নয়।

পাহাড়ি পথে দীর্ঘ হাঁটা, নদী পার হওয়া, প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই- এসবই ছিল তার প্রতিদিনের জীবন। অজান্তেই এই জীবন তাকে এমন শারীরিক ও মানসিক সহনশীলতা দিয়েছিল, যা পরে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতগুলো জয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে। অনেকেই প্রতিকূল পরিবেশকে জীবনের সীমাবদ্ধতা মনে করেন। নির্মল সেটিকেই নিজের শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন।

বিদ্যালয় থেকে জীবনের পাঠ নির্মল স্থানীয় বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনায় আগ্রহী হলেও তিনি বইয়ের বাইরের শিক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতেন। খেলাধুলা, দৌড়, পাহাড়ি পরিবেশে চলাফেরা এবং দলগত কাজ- এসব তার ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে তিনি উপলব্ধি করেন, নেতৃত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে শেখা যায় না; নেতৃত্ব শেখা যায় মানুষের সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে, কষ্টকে গ্রহণ করতে গিয়ে এবং সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

কৈশোরেই নির্মল বুঝতে পারেন, তিনি সাধারণ জীবন চান না। তিনি এমন কিছু করতে চান, যা তাকে নিজের সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করবে। এই আকাক্সক্ষাই তাকে সামরিক জীবনের দিকে নিয়ে যায়। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, শৃঙ্খলা মানুষকে শুধু শক্তিশালীই করে না, তাকে নিজের ভয়কে জয় করতেও শেখায়। পরে সেই সামরিক জীবনই তাকে নিয়ে যায় বিশ্বের অন্যতম কঠিন বিশেষ বাহিনীতে। আর সেখান থেকে শুরু হয় এমন এক যাত্রা, যা শেষ পর্যন্ত তাকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ উচ্চতাপর্বতারোহীদের কাতারে স্থান করে দেয়।

২০০৩ সালে মাত্র বিশ বছর বয়সে নির্মল পুরজা ব্রিটিশ আর্মির Brigade of Gurkhas-এ যোগ দেন। গুর্খাদের সাহস, সততা এবং আনুগত্যের ইতিহাস দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতে তাদের অসাধারণ অবদানের জন্য গুর্খারা আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত। কিন্তু গুর্খা হওয়া সহজ নয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়া পৃথিবীর অন্যতম কঠিন সামরিক বাছাই হিসেবে পরিচিত। হাজারো আবেদনকারীর মধ্য থেকে অল্প কয়েকজনই এই বাহিনীতে সুযোগ পান। শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, সহনশীলতা এবং নেতৃত্ব- সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ মান অর্জন করতে হয়। নির্মল সেই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রমাণ করেছিলেন, তার ভেতরে অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে।

গুর্খা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামরিক মিশনে অংশ নেন, যার মধ্যে আফগানিস্তান অন্যতম। যুদ্ধক্ষেত্র তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়; বরং ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। তিনি পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুদ্ধ তাকে জীবনের অনিশ্চয়তা বুঝিয়েছে। প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান, আর সংকটের সময় শান্ত থাকা একজন নেতার সবচেয়ে বড় গুণ। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে উচ্চতাপর্বতারোহণে তার অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়।

সামরিক জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় শুরু হয়, যখন তিনি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির Special Boat Service (SBS)-এ নির্বাচিত হন। ঝইঝ বিশ্বের অন্যতম অভিজাত বিশেষ বাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, জিম্মি উদ্ধার, বিশেষ গোয়েন্দা অভিযান, সমুদ্রপথে গোপন অপারেশন এবং উচ্চ-ঝুঁকির সামরিক মিশন পরিচালনায় এই ইউনিট বিশ্বব্যাপী খ্যাত। এই বাহিনীতে নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া এতটাই কঠিন যে অধিকাংশ প্রার্থী শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন না। নির্মল পুরজা সেই কঠিন পথ সফলভাবে অতিক্রম করেন এবং SBS-এ যোগদানকারী প্রথম গুর্খা সৈনিক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। SBS-এর প্রশিক্ষণ শুধু শরীরকে নয়, মনকেও নতুনভাবে গড়ে তোলে।

দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম, পাহাড়ি অভিযাত্রা, ভারী সরঞ্জাম বহন, গভীর সমুদ্রে ডাইভিং, প্যারাশুট জাম্প, চরম আবহাওয়ায় টিকে থাকা, ক্লোজ-কোয়ার্টার কমব্যাট এবং মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা- এসবই ছিল তার প্রতিদিনের প্রশিক্ষণের অংশ। এই প্রশিক্ষণ তাকে শিখিয়েছিল একটি মৌলিক সত্য- মানুষের শরীর ক্লান্ত হয় আগে নয়; আগে ক্লান্ত হয় মন। মনকে জয় করতে পারলে শরীর আরও অনেক দূর যেতে পারে। পরবর্তীকালে তিনি বলেছিলেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত জয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল আসলে ঝইঝ-এর প্রশিক্ষণক্ষেত্রেই।

বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক বিশেষ বাহিনীতে কর্মরত একজন সৈনিকের ভবিষ্যৎ সাধারণত নিরাপদ ও সম্মানজনক হয়। অনেকেই সারা জীবন সেই পেশাতেই থেকে যান। কিন্তু নির্মল পুরজার ভেতরে তখন আরেকটি স্বপ্ন বড় হয়ে উঠছিল। ছুটির সময় তিনি নিয়মিত পর্বতারোহণ করতেন। প্রতিটি অভিযানের পর তার মনে হতো, এটাই তার প্রকৃত পরিচয়। তিনি উপলব্ধি করেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; বরং পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলোর সঙ্গে।এই উপলব্ধিই তাকে এক কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করায়।

২০১৮ সালে তিনি SBS-এর সফল সামরিক জীবন থেকে সরে দাঁড়ান। অনেকেই তার এই সিদ্ধান্তকে অবিবেচক বলেছিলেন। নিশ্চিত আয়, মর্যাদাপূর্ণ পেশা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছেড়ে অনিশ্চিত পর্বতারোহণে ঝুঁকে পড়া সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু নির্মল বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো নিজের স্বপ্নকে সুযোগ না দেওয়া। পর্বতারোহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে তিনি ব্যক্তিগত সম্পদ বন্ধক রাখতেও দ্বিধা করেননি। কারণ তার লক্ষ্য ছিল শুধু পাহাড়ে ওঠা নয়- বিশ্বকে দেখানো যে, অসম্ভব বলে পরিচিত সীমাগুলোও ভাঙা যায়।

সামরিক জীবনের শৃঙ্খলা, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা, SBS-এর কঠোর প্রশিক্ষণ এবং অদম্য আত্মবিশ্বাস-এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই নির্মল পুরজা তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা তৈরি করেন। সেই পরিকল্পনার নাম Project Possible। এটি ছিল এমন একটি স্বপ্ন, যা প্রথমে অবাস্তব বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সেই স্বপ্ন বিশ্বপর্বতারোহণের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর অর্জনগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

অসম্ভব’ শব্দটির বিরুদ্ধে এক ঘোষণা

উচ্চতাপর্বতারোহণের জগতে ৮,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বতগুলোকে বলা হয় Eight-Thousanders। পৃথিবীতে এমন পর্বতের সংখ্যা মাত্র ১৪টি। প্রতিটি শৃঙ্গই মৃত্যু, বৈরী আবহাওয়া, অক্সিজেনের ঘাটতি এবং চরম শারীরিক ঝুঁকির প্রতীক। এই ১৪টি শৃঙ্গ জয় করতে অনেক কিংবদন্তি পর্বতারোহীর লেগেছে বছরের পর বছর। দক্ষিণ কোরিয়ার কিংবদন্তি পর্বতারোহী কিম চ্যাং-হো এই ১৪টি শৃঙ্গ আরোহণ করেছিলেন ৭ বছর ১০ মাস ৬ দিনে। তখন সেটিই ছিল বিশ্বরেকর্ড। নির্মল পুরজা ঘোষণা দিলেন-তিনি একই কাজ শেষ করবেন সাত মাসেরও কম সময়ে। অনেকেই এটিকে আত্মবিশ্বাস নয়, দুঃসাহস বলেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, বড় পরিবর্তনের শুরু প্রায়ই অসম্ভব বলে মনে হওয়া স্বপ্ন থেকেই হয়।

২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল অন্নপূর্ণা আরোহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার ঐতিহাসিক অভিযান। এরপর একের পর এক শৃঙ্গ-

* অন্নপূর্ণা
* ধৌলাগিরি
* কাঞ্চনজঙ্ঘা
* এভারেস্ট
* লোৎসে
* মাকালু
* নাঙ্গা পর্বত
* গাশেরব্রুম-১
* গাশেরব্রুম-২
* কে-২
* ব্রড পিক
* চো ওইউ
* মানাসলু
* শিশাপাংমা

২৯ অক্টোবর ২০১৯, শেষ শৃঙ্গ শিশাপাংমায় পৌঁছে নির্মল পুরজা পৃথিবীকে অবাক করে দেন। মাত্র ১৮৯ দিন (৬ মাস ৬ দিন)-এ তিনি ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। এই অর্জন শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি মানুষের সম্ভাবনার সীমাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে অমর নাম

Project Possible-এর মাধ্যমে নির্মল পুরজা Guinness World Records-এ নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে দেন।

তার সবচেয়ে আলোচিত রেকর্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে-

* বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ সবচেয়ে কম সময়ে আরোহণ।
* এভারেস্ট, লোৎসে এবং মাকালুÑএই তিনটি শৃঙ্গ মাত্র প্রায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আরোহণ।
* একই মৌসুমে একাধিক আট-হাজারি শৃঙ্গে ধারাবাহিক সফল আরোহণের নজির।

বিশেষজ্ঞদের মতে, Project Possible ছিল আধুনিক পর্বতারোহণের ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী এবং সবচেয়ে সুপরিকল্পিত অভিযানের একটি।

মৃত্যুর পাহাড়ে ইতিহাস

বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ক২ বহু পর্বতারোহীর কাছে এভারেস্টের চেয়েও কঠিন। তীব্র ঠান্ডা, খাড়া বরফঢাল এবং অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে এটিকে প্রায়ই “Savage Mountain” বলা হয়। ২০২১ সালে নির্মল পুরজা দশ সদস্যের সম্পূর্ণ নেপালি একটি দলের সঙ্গে ইতিহাস গড়েন। তাদের দলই প্রথমবারের মতো শীতকালে ক২ সফলভাবে আরোহণ করে। শীর্ষে ওঠার আগে তারা একসঙ্গে নেপালের জাতীয় সংগীত গেয়েছিলেন-যা আজও উচ্চতাপর্বতারোহণের ইতিহাসে এক আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়। এই অভিযানের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, নেপালি পর্বতারোহীরা শুধু সহায়ক নন; তারা নিজেরাই বিশ্বমানের অভিযানের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।

নির্মল পুরজার পরিচয় শুধু রেকর্ডধারী পর্বতারোহী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন অভিযানে তিনি বিপদগ্রস্ত বহু আরোহীর উদ্ধারকাজে অংশ নেন। এমনও হয়েছে, নিজের লক্ষ্য ও সময়সূচি পিছিয়ে দিয়ে তিনি অন্যের জীবন বাঁচানোর জন্য ঝুঁকি নিয়েছেন। ২০১৯ সালে এভারেস্টে দীর্ঘ আরোহী-সারির যে বিখ্যাত ছবি তিনি প্রকাশ করেছিলেন, তা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সেই ছবি বাণিজ্যিক পর্বতারোহণ, অতিরিক্ত ভিড় এবং নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করে।

নির্মল পুরজার অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাজ্য তাঁকে MBE (Member of the Order of the British Empire) সম্মানে ভূষিত করে। এই সম্মান শুধু তার সামরিক জীবনের জন্য নয়; নেতৃত্ব, মানবিক অবদান এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুপ্রেরণাদায়ক কাজেরও স্বীকৃতি। পর্বতারোহণের জগতে তার প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, অভিযাত্রী সংগঠন এবং ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান তাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করে।

২০২১ সালে মুক্তি পায় নেটফ্লিক্সের বহুল আলোচিত তথ্যচিত্র 14 Peaks: Nothing Is Impossible। এই চলচ্চিত্রে Project Possible-এর প্রতিটি ধাপ, শারীরিক সংগ্রাম, মানসিক চাপ, অর্থসংকট এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাহিনি তুলে ধরা হয়। ডকুমেন্টারিটি মুক্তির পর নির্মল পুরজা শুধু একজন পর্বতারোহী নন; বরং বিশ্বজুড়ে লক্ষ মানুষের কাছে সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

নিজের আত্মজীবনী Beyond Possible- এ নির্মল পুরজা লিখেছেন, মানুষের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা পাহাড় নয়, নিজের মন। এই বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন- কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পনা এবং দলগত নেতৃত্ব থাকলে অসম্ভব বলে মনে হওয়া লক্ষ্যও অর্জন করা যায়। বইটি কেবল পর্বতারোহীদের জন্য নয়; উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, সৈনিক কিংবা যে কেউ বড় স্বপ্ন দেখতে চান- সবার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তার এই অর্জন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল একটি রেকর্ড নয়- একটি মানদণ্ড, একটি অনুপ্রেরণা এবং একটি বার্তা: “অসম্ভব বলে কিছু নেই- যদি মানুষ নিজের সীমাকে অতিক্রম করার সাহস রাখে।”

Project Possible– এর পর তিনি থেমে যাননি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তরুণ পর্বতারোহীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, নেপালি শেরপা ও উচ্চতাপর্বতারোহীদের আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন এবং নিজের প্রতিষ্ঠান Elite Exped–এর মাধ্যমে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল অভিযানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তার প্রতিটি বক্তব্যে একটি কথাই বারবার ফিরে এসেছে- “অসম্ভব” শব্দটি মানুষের মনেই বাস করে; বাস্তবে নয়। তার নেতৃত্বে পরিচালিত বহু অভিযানে পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্বতে ফেলে যাওয়া বর্জ্য অপসারণ এবং নিরাপদ আরোহণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি প্রায়ই বলতেন, হিমালয় শুধু নেপালের সম্পদ নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির ঐতিহ্য। তাই এই পর্বতমালার প্রতি সম্মান দেখানো প্রতিটি অভিযাত্রীর নৈতিক দায়িত্ব।

শেষ অভিযানের মর্মান্তিক পরিণতি

২০২৬ সালে আবারও তিনি কারাকোরাম পর্বতমালায় অভিযানে যান। লক্ষ্য ছিল বিশ্বের অন্যতম কঠিন শৃঙ্গ ব্রড পিক। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং অসংখ্য সাফল্যের পরও তিনি জানতেন, পাহাড় কখনো কারও কাছে নিশ্চয়তা দেয় না। উচ্চতাপর্বতারোহণ এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রকৃতির অনুকূলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযানের সময় বৈরী আবহাওয়া ও তুষারধসের ঘটনায় তিনি নিখোঁজ হন। পরবর্তী অনুসন্ধান ও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বিশ্ব জানতে পারে-নির্মল পুরজা আর ফিরে আসবেন না। এই সংবাদ শুধু নেপাল বা যুক্তরাজ্যকেই শোকাহত করেনি; সমগ্র আন্তর্জাতিক পর্বতারোহণ সম্প্রদায় গভীর বেদনার সঙ্গে তাকে স্মরণ করেছে। অসংখ্য অভিযাত্রী, ক্রীড়াবিদ, সামরিক কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, তিনি তাদের কাছে সাহস, নেতৃত্ব এবং অধ্যবসায়ের এক অনন্য প্রতীক। বিশ্বের বহু তরুণ আজ নির্মল পুরজার জীবন থেকে শিখছে- স্বপ্ন বড় হতে পারে, পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু অধ্যবসায়, পরিকল্পনা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে অসম্ভব মনে হওয়া লক্ষ্যও অর্জন করা যায়। তার আত্মজীবনী Beyond Possible এবং তথ্যচিত্র 14 Peaks: Nothing Is Impossible ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু সাফল্যের গল্প নয়; বরং আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব এবং দায়িত্ববোধের এক অনন্য পাঠ হয়ে থাকবে।

ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবনকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। নির্মল পুরজা তাদেরই একজন। আজ তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু যখনই কোনো তরুণ অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখবে, যখনই কোনো অভিযাত্রী প্রতিকূলতার মুখে সাহস ধরে রাখবে, যখনই কোনো মানুষ নিজের সীমা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে-সেখানেই নির্মল পুরজার উত্তরাধিকার নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠবে।

হিমালয়ের বরফ একদিন গলতে পারে, পাথরের গায়ে মানুষের পদচিহ্নও সময়ের সঙ্গে মুছে যেতে পারে। কিন্তু যে মানুষ নিজের সাহস দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে পথ নির্মাণ করেন, তার নাম ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নয়-মানুষের বিশ্বাসে অমর হয়ে থাকে। নির্মল “নিমস” পুরজা- তিনি শুধু বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেননি; তিনি মানুষের সম্ভাবনার উচ্চতাও নতুন করে মেপে দিয়েছেন।

লেখক: সহ-সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের সেই হাতি আদালতের নির্দেশে ফিরছে মালিকের কাছে

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের সেই হাতি আদালতের নির্দেশে ফিরছে মালিকের কাছে

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় সড়কে হাতি নিয়ে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে ইজিবাইক দুর্ঘটনায় ১০ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জব্দ হয়ে এক সপ্তাহ ধরে থানা হেফাজতে থাকা হাতিটি অবশেষে আদালতের নির্দেশে মালিকের কাছে ফিরছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) আদালত এক আদেশে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে হাতিটি তার প্রকৃত মালিকের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।

এর আগে গত ২৮ জুলাই দুপুরে সদরপুর উপজেলার আটরশি এলাকায় হাতি নিয়ে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে মায়ের সঙ্গে থাকা ১০ মাস বয়সী আরিশা জান্নাত গুরুতর আহত হয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা হাতির মাহুতকে আটক করে গণপিটুনি দেয় এবং হাতিটিকে আটকে রাখে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাহুতকে উদ্ধার করে আটক করে এবং হাতিটিকে জব্দ করে সদরপুর থানায় নিয়ে আসে।

পরদিন পুলিশ আটক মাহুত জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার মাদারের চর গ্রামের আনিসউদ্দিনের ছেলে বকুল মিয়াকে (২৪) আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। একই সঙ্গে জব্দকৃত হাতিটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে নাকি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে-সে বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করে।

আদালতের আদেশ অনুযায়ী হাতিটির মালিক হিসেবে নওগাঁ জেলার বাসিন্দা ব্যবসায়ী দুলাল দেওয়ানের কাছে প্রাণীটি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জানা গেছে, তিনি নিজে সার্কাস পরিচালনা না করলেও বিভিন্ন সার্কাস দলের কাছে হাতিটি ভাড়া দিয়ে থাকেন।

তবে আদালতের নির্দেশ এলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হাতিটি সদরপুর থানা প্রাঙ্গনেই ছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেটি মালিকের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

গত সাত দিন ধরে হাতিটি সদরপুর থানা প্রাঙ্গনে বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। এ সময় হাতিটির দেখভাল ও পরিচর্যার জন্য মালিকের পক্ষ থেকে নাজমুল সরদার (১৭) নামে আরেক মাহুতকে সদরপুর থানায় পাঠানো হয়। তিনি নিয়মিত হাতিটিকে গোসল করানো, খাবার খাওয়ানো, সকালে হাঁটানো এবং সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করেন।

এক সপ্তাহ ধরে থানায় হাতিটি রাখার ফলে খাদ্যের ব্যবস্থা করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কলাগাছ, ঘাস ও অন্যান্য খাদ্যের প্রয়োজন হয়। থানা প্রাঙ্গণে এমন কোনো স্থায়ী খাদ্যব্যবস্থা না থাকায় পুলিশ ও মাহুতকে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও হাতির মালিকের সহযোগিতায় খাদ্যের ব্যবস্থা করা হলেও তা সবসময় পর্যাপ্ত ছিল না।

থানায় অবস্থানকালে বিশাল আকৃতির হাতিটি স্থানীয় মানুষেরও ব্যাপক কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। প্রতিদিন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে সদরপুর থানায় এসে হাতিটিকে দেখতে ভিড় করেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশকেও সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।

সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে আদালতের আদেশ হাতে পেয়েছি। আদালত হাতিটিকে তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুতই হাতিটি মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

ঘুম আসছে না? অনিদ্রা দূর করতে জেনে নিন ৭ কার্যকর উপায়

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ঘুম আসছে না? অনিদ্রা দূর করতে জেনে নিন ৭ কার্যকর উপায়

সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতে বিছানায় গেলেও অনেকের চোখে ঘুম আসে না। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এপাশ-ওপাশ করেন, আবার কারও মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। এমন সমস্যা এক-দুদিন হলে চিন্তার কারণ না হলেও দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা হতে পারে অনিদ্রা (ইনসমনিয়া)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ও মস্তিষ্ক ঠিকভাবে বিশ্রাম নিতে পারে না। ফলে পরদিন ক্লান্তি, কাজে অমনোযোগ, খিটখিটে মেজাজ, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এমনকি দীর্ঘমেয়াদে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

অনেকেই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ঘুমের ওষুধ সেবন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে প্রাকৃতিকভাবেই অনিদ্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন হয় অনিদ্রা?

অনিদ্রার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা

বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন)

আশপাশের অতিরিক্ত শব্দ

অস্বস্তিকর বিছানা বা ঘুমের পরিবেশ

মদ্যপানের অভ্যাস

অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইন গ্রহণ

রাতের শিফটে কাজ করার অভ্যাস

অনিদ্রা দূর করতে যা করবেন

১. নিয়মিত মেডিটেশন করুন

মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন মানসিক চাপ কমাতে এবং মনকে শান্ত রাখতে কার্যকর। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট মেডিটেশন করলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে।

২. ল্যাভেন্ডার অয়েলের ব্যবহার

ল্যাভেন্ডার অয়েল দীর্ঘদিন ধরে অ্যারোমাথেরাপিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি মানসিক প্রশান্তি এনে ঘুমে সহায়তা করতে পারে। বালিশে সামান্য স্প্রে করা বা ঘাড় ও কাঁধে অল্প পরিমাণে ম্যাসাজ করেও ব্যবহার করা যায়।

৩. নির্দিষ্ট সময় ঘুমানোর অভ্যাস

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের ‘বডি ক্লক’ বা সার্কাডিয়ান রিদমকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এতে ধীরে ধীরে ঘুমের সমস্যা কমতে পারে।

৪. ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খান

ম্যাগনেসিয়াম পেশি শিথিল করতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। ডার্ক চকলেট, বাদাম, অ্যাভোকাডোসহ ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত কোমল পানীয় ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা ভালো।

৫. মেলাটোনিন বাড়ায় এমন খাবার

মেলাটোনিন হলো ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। ডিম, দুধ, মাছ, কলা, মাশরুম, বাদাম ও আখরোটের মতো খাবার শরীরে মেলাটোনিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি ঘুমানোর আগে মোবাইল বা অন্যান্য স্ক্রিনের ব্যবহার কমানোও জরুরি।

৬. নিয়মিত শরীরচর্চা

প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট ব্যায়াম করলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম না করে অন্তত তিন ঘণ্টা আগে শরীরচর্চা শেষ করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

৭. ৪-৭-৮ শ্বাস-প্রশ্বাস পদ্ধতি

অনিদ্রা কমাতে ‘৪-৭-৮’ শ্বাস-প্রশ্বাস কৌশল বেশ জনপ্রিয়। এ পদ্ধতিতে চার সেকেন্ড শ্বাস নিতে হবে, সাত সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখতে হবে এবং আট সেকেন্ড ধরে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হবে। কয়েকবার অনুশীলন করলে শরীর ও স্নায়ু শিথিল হতে পারে।

আরও কিছু অভ্যাস বদলাতে হবে

ঘুমানোর আগে এক গ্লাস হালকা গরম দুধ পান করা উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি রাতে অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার, ভারী খাবার ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং ঘুমানোর পরিবেশ শান্ত ও আরামদায়ক রাখলে ভালো ঘুমের সম্ভাবনা বাড়ে।

তবে জীবনযাপনের পরিবর্তনের পরও যদি দীর্ঘদিন অনিদ্রা, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকে, তাহলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, অনিদ্রা অনেক সময় অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।

সূত্র : কালবেলা