খুঁজুন
মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

ফরিদপুরের যৌনপল্লিতে জন্মনিবন্ধন জটিলতায় স্কুলের বাইরে শিশুরা

শ্রাবণ হাসান, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ৯:১৫ এএম
ফরিদপুরের যৌনপল্লিতে জন্মনিবন্ধন জটিলতায় স্কুলের বাইরে শিশুরা
জন্মনিবন্ধনের ডিজিটাল ব্যবস্থায় বাবার পরিচয় দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় বিপাকে পড়েছে ফরিদপুরের যৌনপল্লির শিশুরা। অনেকেরই জন্মনিবন্ধন সনদ না থাকায় বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছে না। ফলে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা।
ফরিদপুর শহরের রথখোলা ও সিঅ্যান্ডবি ঘাট এলাকায় দুটি যৌনপল্লি রয়েছে। সেখানে থাকা ৩৮৯ যৌনকর্মীর শিশুসন্তান রয়েছে ২৯৬ জন। এসব শিশুর অধিকাংশের জন্মনিবন্ধন নেই।
এই শিশুদের আবাসিকের পাশাপাশি পড়াশোনার সুবিধা দিয়ে আসছে শাপলা মহিলা সংস্থা। দি ফ্রিডম ফান্ডের সহযোগিতায় শিশুদের জন্মনিবন্ধন নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি। এর কর্মকর্তারা জানান, ডিজিটাল হওয়ার আগে নিবন্ধন করা গেছে, কিন্তু বর্তমানে জটিলতা শুরু হয়েছে। জন্মনিবন্ধন করাতে না পারায় শিশুদের স্কুলে ভর্তি নিচ্ছে না।
শাপলা মহিলা সংস্থা শহরতলির গেরদায় শিশুদের আবাসনের জন্য গড়ে তুলেছে ভবন। বর্তমানে সেখানে ৫০ মেয়ে ও ৩৫ ছেলে রয়েছে। সেখানে থাকা শিক্ষার্থীরা জানায়, অনেকেই স্কুলে যাচ্ছে, ক্লাসও করছে, তবে ভর্তি হতে না পারায় হাজিরা খাতায় নাম উঠছে না। পড়াশোনা নিয়ে অনেক স্বপ্ন তাদের; কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জন্মনিবন্ধন।
সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার লক্ষ্মণ বিশ্বাস জানান, তাঁরা সারা দেশের ১১টি যৌনপল্লির মা ও শিশুদের বিভিন্ন অধিকার নিশ্চিতে কাজ করছেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মা ও শিশুদের জন্মসনদ। বর্তমানে যে অনলাইন সনদ, তা অনেকেরই নেই। এটা করতে যে কাগজপত্র দরকার, তা তাঁদের নেই।
লক্ষ্মণ বিশ্বাস বলেন, ‘২০২৫ সালে আমাদের হোমের ১৮টি শিশুকে এখনো ভর্তি করতে পারিনি। অনলাইন জন্মসনদ না থাকায় কোনো স্কুলই ভর্তি নেয়নি। এর মধ্যে কয়েকজন স্কুলে যাচ্ছে, ক্লাস করছে; কিন্তু ভর্তি হতে পারেনি। আমাদের লিখিত দিতে হয়েছে, স্কুলে কিছুদিনের মধ্যে জন্মসনদ দিতে হবে, তারপর স্কুল কর্তৃপক্ষ ভর্তি নেবে।’
এ নিয়ে কথা হলে সংস্থার উপ-নির্বাহী পরিচালক শ্যামল প্রকাশ অধিকারী জানান, অনেক মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থাকলেও জন্মনিবন্ধন সনদ নেই। আবার যাঁদের আছে, সেখানে পেশার জায়গায় পতিতা এবং ঠিকানা হিসেবে যৌনপল্লি লেখা রয়েছে। অনেকেই এগুলো ব্যবহার করছেন না। এ কারণে শিশুদের জন্মনিবন্ধন করাতে সমস্যা হচ্ছে। আবার কারও মায়ের এনআইডিতে স্বামীর নাম নেই। ফলে বাবার নাম না থাকায় শিশুদের জন্মনিবন্ধন করা যাচ্ছে না।
শ্যামল অধিকারী বলেন, ‘আগে জন্মনিবন্ধন করা সহজ ছিল। ডিজিটাল পদ্ধতি আসার পর সার্ভারে বাবার নাম ছাড়া শিশুদের জন্মসনদ করা যাচ্ছে না। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, যৌনপল্লির শিশুদের জন্মনিবন্ধন সহজীকরণ করলে তারা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারবে।’
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক চঞ্চলা মণ্ডল জানান, শুধু মায়ের নামে সন্তানদের জন্মনিবন্ধন করা গেলে শিশুদের স্কুলে ভর্তি করা সহজ হতো।
রথখোলা যৌনপল্লির এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমার জন্মসনদ নেই। এনআইডি কার্ড আছে। সন্তানদের জন্মনিবন্ধন করাতে গেলে বাবার নাম জানতে চায়। আমরা চাই, শুধু মায়ের নামেই জন্মনিবন্ধন করার সুযোগ দেওয়া হোক। এ ছাড়া ঠিকানা যৌনপল্লির স্থলে আশপাশের এলাকার নাম দেওয়ার দাবি জানাই।’
সিঅ্যান্ডবি ঘাট যৌনপল্লি সদর উপজেলার ডিক্রিরচর ইউনিয়নে অবস্থিত। ডিক্রিরচর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হায়দার আলী খান জানান, আগে জন্মনিবন্ধন করা যেত; কিন্তু ডিজিটাল হওয়ার কারণে সার্ভারে বাবার নাম বা মায়ের জন্মসনদ না থাকলে শিশুদের সনদ করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
এ বিষয়ে ফরিদপুরের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক চৌধুরী রওশন ইসলাম বলেন, ‘আমি শুনেছি যৌনপল্লির শিশুদের জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে কোথাও কোথাও সমস্যা হচ্ছে। সবাইকে বলে দিয়েছি, জন্মসনদ করে দেওয়ার জন্য। শিশুদের বাবার নাম ছাড়া মায়ের নাম দিয়েই জন্মনিবন্ধন করা যাবে, নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
সম্প্রতি এ জটিলতা নিয়ে দুই যৌনপল্লির অনিবন্ধিত শিশু ও মায়েদের সঙ্গে সভার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। এ সময় তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টরা যেসব তথ্য দিতে সক্ষম হবেন, এর ওপর ভিত্তি করেই শিশুর জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। শাপলা মহিলা সংস্থার প্যাডে শিশু ও তাঁদের মায়েদের তথ্যের প্রত্যয়ন দেওয়ার এবং ইউপি সচিবকে এর আলোকে জন্মনিবন্ধন দিতে ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন তিনি।

রমজানের শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা: সালথায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
রমজানের শিক্ষা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা: সালথায় জামায়াতের ইফতার মাহফিল

পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সালথা উপজেলা শাখার উদ্যোগে ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

সোমবার (৯ মার্চ) বিকেলে সালথা উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় মুসল্লি, আলেম-ওলামা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। রমজানের তাৎপর্য ও নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা এবং মিলনমেলার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়।

উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. তরিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মাওলানা আবুল ফজল মুরাদ।

আলোচনা সভায় প্রধান ও বিশেষ অতিথিরা মাহে রমজানের শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, রমজান কেবল রোজা পালনের মাসই নয়, এটি আত্মসংযম, ধৈর্য, ত্যাগ ও নৈতিকতার অনুশীলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। রমজানের শিক্ষা ব্যক্তি জীবনকে শুদ্ধ করার পাশাপাশি সমাজে ন্যায়, ইনসাফ ও সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

বক্তারা আরও বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধারণ করে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- ফরিদপুর জেলা জামায়াতের অফিস সেক্রেটারি মাওলানা মিজানুর রহমান, নগরকান্দা উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা সোহরাব হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বকুল মিয়া, নগরকান্দা উপজেলা জামায়াতের সুরা সদস্য ও তালমা ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. এনায়েত হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাবেক কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাওলানা মাহবুব হোসেন, ঢাকা মহানগরীর মুহাম্মদপুর থানা জামায়াতের সুরা সদস্য ও সাবেক ছাত্রনেতা মুহাম্মদ সাইফুর রহমান হিটু।

এ ছাড়া উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি চৌধুরী মাহবুব আলী সিদ্দিকী নসরু, সালথা প্রেসক্লাবের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভা শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পরে উপস্থিত সকলের অংশগ্রহণে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৯:৪৪ পিএম
১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করেছে সরকার। এ বিষয়ে সোমবার (৯ মার্চ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক উপকমিশনার (পশ্চিম) কোহিনূর মিয়ার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হবে। পাশাপাশি তিনি বিধি অনুযায়ী সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দুটি বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। এ কারণে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তকরণের গুরুদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে তিনি ফৌজদারী মামলা দুটির অভিযোগ থেকে আদালতের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণ হয়ে খালাস পান।

এছাড়া তার গুরুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন রাষ্ট্রপতি মঞ্জুর করায় আরোপিত চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশটি বাতিল করা হয়। তাই কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলায় ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে তার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হলো এবং তিনি বিধি মোতাবেক সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

 

 

বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও লাবলু মিয়া, সালথা:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৮:৫৯ পিএম
বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি। নেই কোনো ঘর, নেই আধুনিক সেলুনের ঝাঁ চকচকে সাজসজ্জা। তবু এই পুকুরপাড়েই প্রতিদিনের মতো বসে মানুষের চুল-দাড়ি কাটেন ৮৭ বছর বয়সী অকিল শীল। হাতে পুরোনো কাঁচি আর ক্ষুর—এই সামান্য সরঞ্জাম নিয়েই তিনি টানা ৬৬ বছর ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামেও এখন গড়ে উঠেছে অসংখ্য সেলুন। উন্নত চেয়ার, আয়না, বৈদ্যুতিক ট্রিমার আর সাজানো দোকান—সবই আছে সেখানে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারের এই পুকুরপাড়ে বসা বৃদ্ধ নাপিতের কাছে এখনও ভিড় করেন অনেকেই। কারণ তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বছরের স্মৃতি, বিশ্বাস আর গ্রামীণ জীবনের এক সরল অধ্যায়।

শৈশবেই পেশায় যুক্ত:

অকিল শীলের বাড়ি পাশের নগরকান্দা উপজেলার সদর গ্রামের চৌমুখা এলাকায়। তাঁর পিতা হরিবদন শীল ছিলেন পেশায় নাপিত। ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে বসে তিনি এই কাজ শেখেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাই কৈশোরেই জীবিকার তাগিদে পেশাটিকে বেছে নিতে হয় তাকে।

প্রথমদিকে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে নিজেই কাজ শুরু করেন। প্রায় ৬৬ বছর আগে মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে বসেই তিনি নিজের কর্মজীবনের যাত্রা শুরু করেন। সেই শুরু থেকে আজও একই জায়গায় বসেই কাজ করে যাচ্ছেন অকিল শীল।

হাটের দিনেই জমে ওঠে সেলুন:

মাঝারদিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। সাধারণত হাটের দিন সকাল থেকেই পুকুরপাড়ে চলে আসেন অকিল শীল। সঙ্গে থাকে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি, পুরোনো কাঁচি, ক্ষুর আর কয়েকটি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

পুকুরপাড়ে পিঁড়ি পেতে বসেই শুরু হয় তাঁর দিনের কাজ। গ্রামের মানুষজন একে একে এসে বসেন তাঁর সামনে। কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, কেউ আবার সিরিয়াল ধরে বসে থাকেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহে কোনো ঘাটতি নেই। মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে কাঁচি চালিয়ে চুল কাটছেন তিনি। মাঝে মাঝে ক্ষুর দিয়ে দাড়িও ছেঁটে দেন।

এই পুকুরপাড়ের ছোট্ট জায়গাটিই যেন তাঁর সেলুন, আবার কর্মজীবনের স্মৃতিবহ স্থান।

গ্রাহকদের কাছে প্রিয় ‘অকিল দা’:

স্থানীয় অনেকেই এখনও আধুনিক সেলুন ছেড়ে অকিল শীলের কাছেই চুল কাটতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ তাঁদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বৃদ্ধ নাপিতের সঙ্গে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন, “আমি সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকে অকিল দার কাছেই চুল কাটাই। এখন বয়স হয়েছে, তবু তাঁর হাতের কাঁচির ওপর ভরসা আছে।”

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “ওনার কাছে ধনী-গরিব সবাই চুল কাটান। কেউ তাকে অবহেলা করে না। বরং অনেকেই গল্প করতে করতে চুল কাটান। ওনার কাছে চুল কাটাতে অন্যরকম একটা আনন্দ আছে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, অকিল শীল শুধু একজন নাপিত নন, তিনি যেন বাজারের একটি জীবন্ত ইতিহাস।

সামান্য আয়েই চলে সংসার:

অকিল শীল জানান, বর্তমানে তিনি প্রতি জনের চুল কাটার জন্য ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে তাঁর কাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক আসেন। সেই হিসেবে প্রতিদিন খুব বেশি আয় হয় না।

তবুও এই সামান্য আয়ের ওপরই ভর করে তিনি নিজের সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে কোনো সেলুন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন অনেক সেলুন হয়েছে, তবুও পুরোনো গ্রাহকেরা আসে।”

বয়সের কারণে কাজ করা কঠিন হলেও তিনি এখনো থামতে চান না।

অকিল শীল বলেন, “বয়স তো অনেক হয়েছে। শরীরও আগের মতো শক্তি পায় না। কিন্তু কাজ না করলে মন ভালো লাগে না। তাই যতদিন পারি কাজ করেই যেতে চাই।”

পরিবারের কেউ নেননি পেশা:

অকিল শীলের পাঁচ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তবে তাঁদের কেউই বাবার পেশাকে অনুসরণ করেননি। সবাই ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি কখনো জোর করিনি। তারা যার যার মতো কাজ করছে। আমি আমার কাজ নিয়েই খুশি।”

তবে তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ কর্মযাত্রা এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।

গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক প্রতীক:

স্থানীয়দের মতে, মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড় মানেই অকিল শীল। বহু বছর ধরে তিনি এই জায়গাটিকে নিজের কর্মস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

একসময় গ্রামে এভাবেই খোলা আকাশের নিচে বসে নাপিতেরা মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন। আধুনিকতার ঢেউয়ে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারে এখনও সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রেখেছেন অকিল শীল।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি উনি এখানে বসে চুল কাটছেন। বাজারের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, দোকানপাট বেড়েছে, কিন্তু উনার জায়গা বদলায়নি।”

কাঁচির টুংটাং শব্দে লেখা জীবনের গল্প:

পুকুরপাড়ে বসে কাঁচির টুংটাং শব্দ তুলতে তুলতে যেন নিজের জীবনের গল্পই লিখে চলেছেন অকিল শীল।

গ্রামীণ জীবনের সরলতা, পরিশ্রম আর আত্মমর্যাদার এক অনন্য উদাহরণ তিনি। বয়সের ভার, আধুনিকতার চাপ—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

হাটের দিনগুলোতে এখনো মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে দেখা যায় সেই পরিচিত দৃশ্য—একটি ছোট পিঁড়ি, হাতে কাঁচি ও ক্ষুর, আর সামনে বসা গ্রাহক।

সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও, অকিল শীল যেন এখনো ধরে রেখেছেন সেই পুরোনো দিনের গল্প। তাঁর কাঁচির টুংটাং শব্দেই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে গ্রামীণ বাংলার এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।