খুঁজুন
, ,

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে তিন দেশের স্বীকৃতির তাৎপর্য কী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ১১:২১ পূর্বাহ্ণ
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে তিন দেশের স্বীকৃতির তাৎপর্য কী

অবশেষে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। একটি পরাশক্তিসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দেশের এ ঐতিহাসিক স্বীকৃতির আসলে তাৎপর্য কী, তা নিয়ে নানা পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, এই স্বীকৃতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখার রসদ যোগাল। একই সঙ্গে এই অঞ্চল ঘিরে স্থিতিশীল ও নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে।

 

রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাজ্য-কানাডা-অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। এতে তিনি বলেন, আজ আমরা শান্তির আশা ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে পুনরুজ্জীবিত করতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি, যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আমরা শান্তি ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা জিইয়ে রাখতে এই পদক্ষেপ নিচ্ছি। এর মানে হচ্ছে, একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত ইসরায়েল এবং একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র– যা বর্তমানে নেই।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিস তার ঘোষণায় বলেছেন, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ, যা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান আনতে সহায়ক হবে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তার বিবৃতিতে বলেন, আজ থেকে কানাডা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয়ের দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের জন্য শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্মাণে আমাদের অংশীদারিত্বের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের এমন স্বীকৃতি বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার এই পদক্ষেপ শুধু মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের আশা জাগাচ্ছে না, এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও গ্লোবাল ৭ (জি-সেভেন) দেশগুলোর মধ্যবর্তী সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে।

প্রথমত এই স্বীকৃতি ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিন একটি স্বীকৃত রাষ্ট্রের মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনের জন্য সংগ্রাম করে আসছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ফিলিস্তিনকে বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও দৃঢ় অবস্থান দিতে সহায়ক হবে।

দ্বিতীয়ত, এটি মধ্যপ্রাচ্যে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশগুলোর পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে শান্তিপ্রিয় দেশগুলোর একটি যৌথ উদ্যোগের বার্তা যাচ্ছে। এতে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য সংলাপের জন্য ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হবে।

তৃতীয়ত, স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে জি-সেভেন দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাতেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া প্রথম দুই জি-সেভেন দেশ যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অন্য দেশগুলোর জন্যও একটি উদাহরণ তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও দেশকে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনুপ্রাণিত করবে।

এ পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থন থাকলে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়ন সহজতর হবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে জোরদার করবে।

ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অত্যাচার-নিপীড়নের পঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালায় স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস। এর পর ইসরায়েলি সেনারা গাজা উপত্যকায় ভয়াবহ অভিযান শুরু করে। তারা হামাস দমনের কথা বললেও নির্বিচারে বেসামরিক এলাকায় চালাতে থাকা ওই হামলায় অর্ধ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, তখন থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬৪ হাজার ৯৬৪ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ ফিলিস্তিনকে ইতোমধ্যেই স্বীকৃতি দিয়েছে। গত বছর স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ে এই স্বীকৃতি দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে পর্তুগাল, ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াও একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে ফিলিস্তিনের কোনো সুনির্দিষ্ট সীমানা, রাজধানী বা সেনাবাহিনী নেই। তাই এই স্বীকৃতি মূলত প্রতীকী।

ফিলিস্তিন এক সময় ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানদের পরাজয়ের পর ব্রিটেন ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন ফিলিস্তিনে যারা থাকতো তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল আরব, সেই সঙ্গে কিছু ইহুদী, যারা ছিল সংখ্যালঘু।

ওই সময় ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটেন ইহুদী জনগোষ্ঠীর জন্য ফিলিস্তিনে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। এই উদ্যোগে রসদ পেয়ে ইহুদীরা ওই অঞ্চলকে তাদের পূর্বপুরুষদের ভূমি বলে দাবি করে। আরবরাও দাবি করে এই ভূমি তাদের।

এরপর ইউরোপ থেকে দলে দলে ইহুদীরা ফিলিস্তিনে যেতে শুরু করে এবং তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার বাহিনীর হাতে ইহুদী নিধনযজ্ঞের পর সেখান থেকে পালিয়ে তারা ফিলিস্তিনে ঘাঁটি গাড়ে।

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে এক ভোটাভুটিতে ফিলিস্তিনকে দুই ভাগ করে দুটি পৃথক ইহুদী এবং আরব রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়নি। ব্রিটিশরা এই সমস্যার কোনো সমাধান করতে ব্যর্থ হয়ে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ছাড়ে। ইহুদী নেতারা এরপর ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়।

এরপর জল গড়ায় বহুদূর। আরবদের সঙ্গে যুদ্ধেও জড়ায় ইসরায়েল। এতে ফিলিস্তিনিদের অনেক জমির দখলে চলে যায় ইসরায়েলের। তারপর নানা সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল।

এর মধ্যে ১৯৯৩ সালে ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ভিত্তিক অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি অনুসারে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়ার কথা ছিল ইসরায়েলের। ওই চুক্তির ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মধ্যে যে বোঝাপড়া হয়েছিল যে- ফিলিস্তিনিরা স্বশাসনের আংশিক অধিকার পাবে এবং ইসরায়েল প্রথমে পশ্চিম তীরের জেরিকো এবং তারপর গাজা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। এর পরিবর্তে, ইসরায়েলি রাষ্ট্রের বৈধতা স্বীকার করে নেবে পিএলও।

কিন্তু পরে ইহুদিবাদী দেশটি তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে ফিরে আসে। বারবার ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণ করে এবং সামরিক আগ্রাসন চালায়। বর্তমানে পশ্চিম তীর ও গাজা—দুটিই ইসরায়েলের দখলে, ফলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিজেদের ভূমি ও জনগণের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।

সম্প্রতি পশ্চিম তীরে একটি বসতি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা আমাদের সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে যাচ্ছি যে ফিলিস্তিন বলে কোনো রাষ্ট্র থাকবে না। এই ভূমি আমাদেরই। ’

ফরিদপুরের সালথায় পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষোভে পানিতে ফেলে দিচ্ছেন কৃষক

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬, ১:৪৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের সালথায় পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষোভে পানিতে ফেলে দিচ্ছেন কৃষক

দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল ফরিদপুরের সালথায় ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় অনেকেই ক্ষোভ, হতাশা ও অসহায়ত্ব থেকে খাল, পুকুর ও ডোবার পানিতে পেঁয়াজ ফেলে দিচ্ছেন। মাঠে ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদিত ফসলের এমন পরিণতি স্থানীয়দেরও ব্যথিত করেছে।

সম্প্রতি সালথা উপজেলার খোয়াড় গ্রামের একটি ডোবার পানিতে কৃষকদের পেঁয়াজ ফেলে দিতে দেখা যায়। এ দৃশ্য স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। কৃষকদের ভাষ্য, বাজারে বর্তমান দামে পেঁয়াজ বিক্রি করার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ফেলে দেওয়াই যেন কম কষ্টের।

পেঁয়াজ চাষি দাউদ মাতুব্বর বলেন, “বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদন করতে সার, বীজ, সেচ, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এরপর মৌসুম শেষে ঘরের চাঙ বা মাচায় সংরক্ষণ করতে হয়। পাঁচ-ছয় মাস পর সংরক্ষণের কারণে ওজন কমে এক মণ পেঁয়াজ প্রায় ৩০ কেজিতে নেমে আসে। সব মিলিয়ে লোকসান ছাড়া কিছুই থাকছে না।”

একই গ্রামের কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, “কৃষকের এমন দুর্দশা দেখেও সরকারের তেমন কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে একসময় মানুষ চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।”

শুধু সালথা নয়, জেলার নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরাও একই সংকটে রয়েছেন। উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে দাম না থাকায় অধিকাংশ কৃষক লোকসান গুনছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। এখন সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সালথার কৃষক আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, “এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর পেঁয়াজ চাষ করবো কি না, সেটাই ভাবছি।”

পাইকারি ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে। ফরিদপুর শহরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহজাহান বেপারি বলেন, “এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকেও প্রচুর পেঁয়াজ বাজারে আসছে। ফলে দাম কমেছে। তবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবের কারণে প্রতিবছরই পেঁয়াজের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। দাম বাড়লে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর দাম কমে গেলে সর্বস্ব হারান কৃষকরা। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করেন কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ফেলে দেন।

এ বিষয়ে সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “চলতি মৌসুমে সালথা উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর। তবে কৃষকদের আগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এ বছর উপজেলায় মোট প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের গড়ে প্রায় ২৪ টাকা খরচ হয়, অর্থাৎ প্রতি মণের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৯৬০ টাকা।”

তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। কৃষকদের সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাজারমূল্য নির্ধারণ কৃষি বিভাগের হাতে নেই।”

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “পেঁয়াজের দাম না থাকায় কৃষক কষ্টে আছেন, এটি সত্য। তারা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না বলে অবগত হয়েছি। বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের হলেও আমি ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও মাননীয় পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি তুলে ধরব, যাতে কৃষকদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়।”

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তা দিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে ৭০০টি বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে পেঁয়াজ সংগ্রহ, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ধীরে ধীরে পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে যাবেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের কৃষি অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।

ডিগ্রির পরীক্ষার আগেই কফিনে ফিরল সুমন, কৃষক বাবার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার

নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬, ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ
ডিগ্রির পরীক্ষার আগেই কফিনে ফিরল সুমন, কৃষক বাবার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার

“আমার তিন বছরের ছোট ভাইটা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। অথচ আজ আমার বৃদ্ধ বাবাকে নিজের সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে হবে। এর চেয়ে কষ্টের দৃশ্য আর কী হতে পারে! ভাইয়ের ডিগ্রি পরীক্ষা দেওয়া আর হলো না। বাবা একজন কৃষক, কত কষ্ট করে আমাদের লেখাপড়া করিয়েছেন। আমার ভাইটার সব স্বপ্ন শেষ করে দিল ওরা।”

কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় বারবার ভেঙে পড়ছিলেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় নিহত কলেজছাত্র সুমন শেখের বড় বোন সরজনা। কখনো মাটিতে বসে পড়ছেন, কখনো স্বজনদের জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছেন। তাঁর আহাজারিতে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ পূর্বপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উঠানজুড়ে স্বজন, প্রতিবেশী ও বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসা মানুষের ভিড়। কেউ শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ নীরবে চোখের জল মুছছেন। পুরো বাড়িজুড়ে শুধু কান্না আর আহাজারির শব্দ।

এর আগে শুক্রবার (২৬ জুন) সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলে যাওয়ার পথে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় কাশিয়ানী এম.এ. খালেক ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমন শেখকে (২৪)। পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পূর্বশত্রুতার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

নিহতের মা শেফালী বেগম ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে বারবার বিলাপ করছিলেন। শোকে তিনি কয়েক দফা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁর আর্তনাদ, “আমার সুমনকে ফিরিয়ে দাও। আমার ছোট ছেলেটাকে আমি আর একবার দেখতে চাই”—উপস্থিত সবার হৃদয় ভারাক্রান্ত করে তোলে।

অন্যদিকে সত্তরোর্ধ্ব বাবা শেখ আলাউদ্দিন, যিনি একজন সাধারণ কৃষক, ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই মানুষটি শুধু একবার ছেলের নাম ধরে ডাকছেন, আবার নির্বাক হয়ে বসে থাকছেন। স্বজনরা তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করলেও তিনি বারবার বলছিলেন, “আমার সুমন কোথায়?”

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শেখ আলাউদ্দিন অভাব-অনটনের মধ্যেও দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছেন। সুমন ছিল পরিবারের সবচেয়ে ছোট এবং সবার আদরের সন্তান। উচ্চশিক্ষা নিয়ে পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন ছিল তার। সামনে ডিগ্রি প্রথম বর্ষের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষার ফরমও পূরণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষার হলে বসার আগেই তাকে চলে যেতে হলো চিরবিদায়ের পথে।

ছোট বোন সরজনা বলেন, “আমার ভাই কারও ক্ষতি করেনি। সে শুধু পড়াশোনা করত। বাবা কৃষক হলেও আমাদের শিক্ষিত করতে জীবনের সব কষ্ট সহ্য করেছেন। ভাইটাও বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন নির্মমভাবে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা শুধু এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।”

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, সুমন শান্ত, ভদ্র ও মিশুক স্বভাবের ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের কাজেও সহযোগিতা করতেন। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না গ্রামের কেউ।

নিহতের মরদেহ শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নিজ গ্রাম বড়ভাগে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পরে স্থানীয় বড়ভাগ ঈদগাহ ময়দানে বাদ মাগরিব জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। শেষবারের মতো প্রিয় মুখটি দেখতে সকাল থেকেই গ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন তাঁর বাড়িতে।

একদিকে উঠানে পড়ে আছে সুমনের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, অন্যদিকে ঘরের ভেতরে বুক চাপড়ে কাঁদছেন মা। বৃদ্ধ বাবা নির্বাক, ভাই-বোনেরা শোকে স্তব্ধ। যে ঘরে কয়েকদিন আগেও ডিগ্রি পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল, সেই ঘরেই আজ শুধু কান্নার প্রতিধ্বনি। এক কৃষক পরিবারের বহু বছরের স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।

স্বজনদের একটাই দাবি—সুমন হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে আর কোনো কৃষক বাবাকে এভাবে সন্তানের লাশ কাঁধে নিতে না হয়।

দিনের বেলা কত মিনিট ঘুমানো সবচেয়ে ভালো? এক পলকে দেখে নিন

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
দিনের বেলা কত মিনিট ঘুমানো সবচেয়ে ভালো? এক পলকে দেখে নিন

ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে দুপুরের দিকে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া বা ‘পাওয়ার ন্যাপ’ আমাদের অনেকেরই অভ্যাস। গবেষকরা বলছেন, দিনের বেলার এই ছোট্ট ঘুম আমাদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং বার্ধক্যজনিত ক্ষয় রোধে অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে। তবে এই ঘুমের সুফল পেতে হলে এর সঠিক সময়সীমা জানা জরুরি।

গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের বেলা মাত্র ১০ মিনিটের একটি ন্যাপ আমাদের সতর্কতা এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকর। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ১০ থেকে ৬০ মিনিটের ছোট ঘুম দ্রুত মেজাজ ভালো করতে এবং ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়া ২০২১ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, ছোট ন্যাপ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং শারীরিক সক্ষমতা উন্নত করতেও ভূমিকা রাখে।

কেন দীর্ঘ সময় ঘুমানো ক্ষতিকর?

দিনের বেলা বেশিক্ষণ ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। অধিকাংশ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৩০ মিনিটের কম সময় ঘুমানো সবচেয়ে বেশি উপকারী। এর কারণ হলো:

স্লিপ ইনারশিয়া: ৩০ মিনিটের বেশি ঘুমালে শরীর গভীর ঘুমের স্তরে চলে যেতে পারে। এর ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর এক ধরণের জড়তা, অস্বস্তি বা মাথা ঘোরার অনুভূতি হয়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্লিপ ইনারশিয়া’ বলা হয়।

রাতের ঘুমের ব্যাঘাত: বিশেষজ্ঞ ড. ইশান ঝু-এর মতে, দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমানো অনেকটা ‘রাতের খাবারের আগে কেক খাওয়ার মতো।’ এটি রাতের স্বাভাবিক ঘুমের চাহিদা কমিয়ে দেয় এবং অনিদ্রার কারণ হতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন যে, দিনের বেলা ন্যাপ যেন কোনোভাবেই ৪০ মিনিটের বেশি না হয়।

অতিরিক্ত ঘুমের স্বাস্থ্যঝুঁকি

দিনের বেলা ৬০ মিনিটের বেশি সময় ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় দিনের বেলা ঘুমানোর ফলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

মস্তিষ্কের বয়স কমাতে ন্যাপ

একটি গবেষণায় ৩৫,০৮০ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, যারা নিয়মিত অল্প সময় ঘুমান তাদের মস্তিষ্কের আয়তন বা ভলিউম বেশি থাকে। নিয়মিত ন্যাপ নেওয়া ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের বয়স, ন্যাপ না নেওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ২.৬ থেকে ৬.৫ বছর কম বলে প্রতীয়মান হয়। আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়, আর দিনের বেলার পরিমিত ঘুম এই প্রক্রিয়াকে ধীর করতে সাহায্য করে।

কিছু জরুরি টিপস

দিনের বেলার ঘুমকে আরও কার্যকর করতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে পারেন:

অ্যালার্ম সেট করুন: দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পড়া এড়াতে অবশ্যই অ্যালার্ম ব্যবহার করুন।

হাঁটাচলা করুন: যদি ক্লান্তি বোধ করেন কিন্তু রাতে ভালো ঘুম না হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে ঘুমানোর বদলে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি বা শারীরিক পরিশ্রম করতে পারেন। অনেক সময় কেবল অবসাদ বা পুষ্টির অভাবেও ক্লান্তি লাগে, সেক্ষেত্রে ঘুমানোর চেয়ে সক্রিয় থাকা বেশি উপকারী।

সূত্র : কালবেলা