খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

বাংলাদেশে দায়মুক্তির ইতিহাস: কবে, কারা পেয়েছে?

তানহা তাসনিম
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:৩৫ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে দায়মুক্তির ইতিহাস: কবে, কারা পেয়েছে?

দায়মুক্তি! গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ঘুরেফিরে বারবার সামনে এসেছে এই প্রসঙ্গ। সম্প্রতি এ নিয়ে আইন উপদেষ্টার বক্তব্যের পর আবার শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।

গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি আইনটি কোন সময় অব্দি জারি করা হবে তা এখন পর্যন্ত পরিষ্কার নয়। তবে এবারও আইন করার ক্ষেত্রে অতীতেই ঘটনাগুলোই আলোচনায় আসছে।

কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর আগেও অন্তত তিনবার আইন ও অধ্যাদেশ জারি করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

আর রাজনীতির বাইরে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য আইন করে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়।

দেখা যাচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা – সবার আমলেই দেওয়া হয়েছে দায়মুক্তির আইনি ভিত্তি। তবে এর কোনোটিই পরবর্তী সময়ে আর কার্যকর থাকেনি।

ফলে এই সময়ে এসে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে দায়মুক্তি দেওয়ার উদাহরণ থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা বরাবরই ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।

একইসাথে বিচার পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। ফলে আইন করে যদি সেই অধিকার হরণ করা হয়, তবে তা কখনো তা ‘সংবিধানসংগত হয় না’ বলেও তারা মনে করছেন।

বাংলাদেশে কবে কখন দেওয়া হয়েছে দায়মুক্তি?

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমবারের মতো দায়মুক্তি দেওয়া হয় বিতর্কিত রক্ষীবাহিনীকে।

শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ১৯৭২ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গঠিত এই আধাসামরিক বাহিনীর জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ নিয়ে সমালোচনা যখন বাড়ছিল, তখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ১৯৭৪ সালে অধ্যাদেশে সংশোধনী এনে বাহিনীর সব কাজকে আইনসঙ্গত বলে ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, পরবর্তী সময়ে বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য এই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রুল জারি করেন।

পরে ১৯৭৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো অধ্যাদেশের সংশোধনী আনা হয় এবং সেখানে নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য শাস্তির উল্লেখ করা হয়।

একই বছর শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে রক্ষীবাহিনী বিলোপ করে সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এসংক্রান্ত আদেশ রদ করা হয়।

আবার এই আদেশের এক সপ্তাহ আগেই, ২৬শে সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো জারি করা হয় ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’।

এতে বলা হয়, শেখ মুজিব ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারীদের বিচার করা যাবে না। চার বছর পর ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে সংসদে আইনটি অনুমোদন পায়।

২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলে সংসদে আইনটি বাতিল করা হয়, পরে কার্যকর হয় হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের মধ্যে ছয়জনের বিচার ও শাস্তি

তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশে এই ঘটনা ঘটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় – ২০০৩ সালে। সেময় আইনশৃঙ্খলার যুক্তিতে পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিনহার্টের’ সাথে সংশ্লিষ্টদের জন্য যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন করা হয়।

সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ওই অভিযানে ৪০ জনেরও বেশি মানুষ হেফাজতে মারা যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব মৃত্যু হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ঘটেছে বলে দাবি করে তৎকালীন সরকার।

দায়মুক্তি দেওয়ার আইনটি চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হলে ১২ বছর পর ২০১৫ সালে একে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট।

যদিও বাতিল ঘোষিত দায়মুক্তি আইনটি আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এখনো কার্যকর দেখানো হচ্ছে। সংসদেও বিলুপ্ত হয়নি আইনটি।

দায়মুক্তি নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, “বিচার চাওয়ার অধিকারটা হলো আমার এক নম্বর মৌলিক অধিকার। আপনি বিচার চাইতে পারবেন না, এটা তো কোনো আইন করে বন্ধ করা কখনো সংবিধানসংগত হয় না”।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, জাতি গঠনের সাথে দায়মুক্তির সম্পর্ক রয়েছে। জাতীয় অখণ্ডতা ও সম্প্রীতি ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতে এ নিয়ে যেন কোনো ঝামেলা তৈরি না হয় এজন্য দায়মুক্তির প্রসঙ্গটা আসে।

কিন্তু বাংলাদেশে বরাবরই তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কতিপয় ব্যক্তিকে কিংবা কতিপয় গোষ্ঠীকে কিংবা একটা বিশেষ বাহিনীকে কিংবা একটা রাজনৈতিক দলকে রক্ষা করার জন্য এই আইনগুলো করা হয়েছে”।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি কতটা যৌক্তিক?

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এর তিনদিন পর গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার।

গত ১৭ মাসে আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং সরকারে থাকা উপদেষ্টাদের কয়েকজনকে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি দেওয়া নিয়ে আলাপ তুলতে দেখা গেছে। জুলাই সনদেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই বিষয়টি।

সবশেষ হবিগঞ্জে থানায় বসে একজন সমন্বয়কের পুলিশ কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়া এবং ঢাকা থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটককৃত আরেকজন সমন্বয়ককে ঘিরে যখন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি নিয়ে আইন বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন।

“জুলাই যোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছিল। অবশ্যই তাদের দায়মুক্তির অধিকার রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে ফ্যসিষ্ট শেখ হাসিনার খুনীদের বিরুদ্ধে তারা যে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম করেছিল সেজন্য তাদের দায়মুক্তি দিয়ে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনও রয়েছে”, লেখেন তিনি।

একইসাথে বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তির আইনের বৈধতা রয়েছে উল্লেখ করে ১৯৭৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দায়মুক্তি আইনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।

তবে এমন তুলনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

“ওইটা ছিল পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে, বিশেষ একটা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। আর এটা একটা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল, উইদইন দ্য কান্ট্রি (দেশের ভেতরে)। সুতরাং এই দুইটার মধ্যে কখনো তুলনা হয় না”, বলছিলেন অধ্যাপক রহমান।

তিনি আরও বলেন, “আপনি যদি দায়মুক্তির কথা আনেন, তাহলে কীসের জন্য আপনি দায় দিচ্ছেন? আপনি কী অপরাধ করলেন যে আপনি দায়মুক্তি চান? এখন আপনি যদি বলেন, আমি পুলিশ মেরে ফেলেছি, থানা জ্বালিয়ে দিয়েছি, আমি খুন করেছি, লুট করেছি – আমাকে দায়মুক্তি দেন – এটাতো ন্যায্য না”।

একই কথা বলছিলেন শাহদীন মালিকও। তার মতে, বিচার না করে দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি ইতিহাসে ভালো চোখে দেখা হবে না।

“এখন হয়তো বিপ্লবোত্তর এক, দেড় বছর হয়েছে। আমাদের মননে-চেতনায় অনেক বেশি দাগ কেটেছে। কিন্তু ১৫ বছর পরে তো লোকে ভাবা শুরু করবে, এটা কী হলো? তাদের এত লোক মেরে ফেলেছে, হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তাদের দায়মুক্তি কেন দেওয়া হলো – এই প্রশ্নগুলো আসবে,” বলেন তিনি।

তথ্য সূত্র : বিবিসি বাংলা

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা