খুঁজুন
, ,

“কীভাবে ট্রাম্পবাদ বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে”

সাইমন টিসডাল
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ণ
“কীভাবে ট্রাম্পবাদ বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে”

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পত্রিকা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ ২০২১ সালে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনামলের প্রথম মেয়াদকালে মোট ৩০ হাজার ৫৭৩টি ‘মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর’ বক্তব্য দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে টানা চার বছর নিজ দেশের নাগরিক এবং বিশ্ববাসীর কাছে প্রতিদিন গড়ে ২১টি করে মিথ্যা কথা বলতেন তিনি। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরে এসেও তিনি সেই অভ্যাসে একচুলও ছেদ টানেননি। এখনো নিয়মমাফিক তিনি আমেরিকান জনগণকে এবং গোটা বিশ্বকে বিভ্রান্ত করে চলেছেন।

জনজীবনে সত্য ও সততার প্রতি এ প্রেসিডেন্টের নির্লজ্জ অবহেলার দেখা মিলছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের ঘটনায় তার ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়ায় আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এ আচরণ। এ ঘটনা কেন্দ্র করে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা শুধু অশোভন নয়; বরং একই সঙ্গে বিপজ্জনকভাবে অনৈতিকও। নিরাপত্তা বাহিনীর বন্দুকের গুলিতে আমেরিকান নাগরিক নিহত হলেও, তিনি নাগরিকের পক্ষ না নিয়ে বরং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী নিরাপত্তাকর্মীর পক্ষ নিয়েছেন।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা করে বলেন, ‘আমার ক্ষমতার ওপর একমাত্র নিয়ন্ত্রণ হলো আমার নিজের নৈতিকতা এবং আমার নিজের মন।’ এ বক্তব্য থেকেই তার কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। তার কাছে ন্যায়-অন্যায় কোনো সর্বজনীন মানদণ্ডে আবদ্ধ নয়; বরং সেটা সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিনির্ভর। তিনি নিজেই নিজের নৈতিক উপদেষ্টা, নিজেই নিজের আইনজ্ঞ, নিজেই নিজের যাজক। তার স্বীকারোক্তি শুধু নিজের কাছে; কোনো রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কিংবা নিজ দেশের জনগণের কাছে নয়। নিজেকে একক ব্যক্তিনির্ভর একটি গির্জা হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন তিনি।

দুশ্চিন্তার ব্যাপার হলো, ট্রাম্প অন্যদের পাশাপাশি নিজেকেও মিথ্যা বলেন। আর এ আত্মপ্রবঞ্চনার পরিণতি ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষে এমন আচরণ সাধারণ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ভিত ভেঙে দেয়। মার্কিন ভোটারদের মতো বিদেশি নেতারাও ধীরে ধীরে এ প্রেসিডেন্টের দীর্ঘস্থায়ী মিথ্যাচারের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। কিন্তু এ অভ্যাসকে প্রশ্রয় দেওয়ার মূল্য তাকে প্রশ্ন না করার, প্রতিবাদ না তোলার, শক্ত অবস্থান না নেওয়ার মূল্য দিন দিন গুণোত্তর হারে বাড়ছে। এ সুবাদে তার আচরণ হয়ে উঠছে আরও স্বৈরাচারী ও খামখেয়ালি।

ট্রাম্পের মিথ্যা ও প্রতারণা আজকের তিনটি জটিল ও অমীমাংসিত আন্তর্জাতিক সংকটে একটি সাধারণ, উত্তেজনাবর্ধক উপাদান হিসেবে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছেন, চীনা ও রুশ যুদ্ধজাহাজ গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে রেখেছে, যার ফলে নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে হস্তক্ষেপ করা জরুরি। অথচ ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন, যিনি ডেনমার্কের অধীন এই স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপটির বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ট্রাম্পের চেয়ে অনেক বেশি অবগত, তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রশ্ন তোলেন, ‘কোথায় এসব জাহাজ? অমাদের চোখে তো পড়ে না।’ গ্রিনল্যান্ডবাসীর কাছে ট্রাম্পের মন্তব্য নিছক প্রলাপ।

ডেনমার্ক স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তারা গ্রিনল্যান্ডে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এবং তথাকথিত ‘চীনা বিনিয়োগের বন্যা’ আরেকটি হোয়াইট হাউস-উৎপাদিত কল্পকাহিনি মাত্র। জরিপে দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডবাসী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া কিংবা ট্রাম্পের কাছে বিক্রি হওয়ার ঘোরবিরোধী। বস্তুত তারা স্বাধীনতা চায়। রাজা তৃতীয় জর্জের বাহিনীকে ২৫০ বছর আগে আমেরিকান ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করে যেই দেশের জন্ম হয়েছিল, তার পক্ষে অন্তত এ স্বাধীনতার মর্ম বোঝা উচিত। ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডকে ‘নিরাপদ’ করতে চান। কিন্তু বাস্তবে তিনি চান এ ভূখণ্ডের খনিজ সম্পদ কবজা করতে আর আমেরিকার সীমানা বৃদ্ধি করতে।

গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার ঘটনা ঘটানোর আগে মিথ্যার এক প্রলয়ংকরী স্রোত বইয়ে দেওয়া হয়। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ গোত্রের প্রধান বলে দাগিয়ে দেন। তার প্রশাসনে আমেরিকান নৌবাহিনী ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়া শুধু মাদক পাচারে জড়িত থাকার সন্দেহের বশে আমেরিকানদের কাছে প্রাণ হারিয়েছে এ নাবিকরা। বেআইনিভাবে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা দখল করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধরত অবস্থা’ ঘোষণা করেন ট্রাম্প।

বাস্তবতা হলো, ২০১৮ সালে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের ক্ষমতা-পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা লালন করে আসছেন তিনি। এখন তিনি নিজেই স্বীকার করছেন, এ অপারেশনের মূল লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার নয়; লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার জনগণকে ‘উদ্ধার’ করা বা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও নয়। লক্ষ্য একটাই—তেল। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে সাক্ষাতে সম্মত হন। ট্রাম্প নির্লজ্জ ও নির্মমভাবে দেশটির সম্পদ লুণ্ঠন করছেন। একই সঙ্গে হুমকি দিচ্ছেন মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াকে।

সম্প্রতি ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেনেজুয়েলাকে অনির্দিষ্টকাল শাসন করার জন্য তার একটি ‘পরিকল্পনা’ আছে। এটিও আরেকটি নিরেট মিথ্যা। ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী ও মিলিশিয়া এখনো অক্ষত অবস্থায় আছে। মাদুরো নিজে ভেনেজুয়েলায় না থাকলেও তার স্বৈরতান্ত্রিক সরকার এখনো দেশটিতে টিকে আছে। আর ক্ষমতা দখলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক সাহসী গণতান্ত্রিক বিরোধী জোটের মুখে দেশটি অনিবার্য সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ব্যতীত ওয়াশিংটন ডিসি থেকে এ বিশৃঙ্খলার ঢাল থামানো সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ইউক্রেনের কথা ভুলে গেলেও চলবে না। এটি তৃতীয় একটি সংঘাতক্ষেত্র, যাকে ঘিরে ট্রাম্পের সত্য-মিথ্যার খেলা রয়েছে চলমান। বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে কোন পদক্ষেপটি সঠিক ও ন্যায় এবং কোনটি বেঠিক ও অন্যায়—ট্রাম্পের পক্ষে সেটা চিহ্নিত করতে পারার অক্ষমতা ইউরোপের ক্ষতি ডেকে আনছে। নির্বাচনী প্রচারণার দরুন তিনি মিথ্যা বলেছিলেন যে, ক্ষমতায় এলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন। সে ব্যাপারে ব্যর্থ হয়ে তিনি বারবার ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু পুতিন বিদ্রূপাত্মক হাসি হেসে তাকে সাময়িকভাবে তুষ্ট করে বরাবরই বোমাবর্ষণ চালিয়ে গেছেন। আর প্রতিবারই ট্রাম্প দুর্বলভাবে পিছু হটেছেন, দোষ চাপিয়েছেন ইউক্রেনীয় নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর।

ট্রাম্পের এ দ্বিচারিতা কিয়েভকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের মিত্রদের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিয়েছে। একদিন তিনি ন্যাটো নেতাদের তেলচিটে প্রশংসা সগর্বে গ্রহণ করেন, তো পরদিনই জোটটিকে উপহাস এবং অবজ্ঞা করে বলেন, ইউরোপ সভ্যতার বিলুপ্তির মুখে পৌঁছে গেছে। গত সপ্তাহে তিনি দাবি করেন, সংকটের সময়ে ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করবে না। এটিও ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর এবং আফগানিস্তানে ২০ বছরের ব্যর্থ অভিযানের দরুন ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, ইউরোপীয় দেশগুলো এ চুক্তিকে সম্মান করতে জানে।

গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন সমসাময়িক সংকটগুলোর মধ্যে ট্রাম্পের অসততার বাইরেও আরও কিছু ব্যাপারে মিল রয়েছে। তিন ক্ষেত্রেই উদ্বেগজনকভাবে প্রকাশ পেয়েছে ইউরোপের নেতাদের দুর্বলতা, বিভাজন এবং একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অক্ষমতা। এখন নিশ্চয়ই ইউরোপকে মেনে নিতে হবে, এ প্রেসিডেন্টের ওপর তারা আর আস্থা রাখতে পারে না। আর এ ভীতিকর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে যে, ব্রেক্সিট ছিল চরম ভুল একটি সিদ্ধান্ত। যুক্তরাজ্যের পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জোট ত্যাগ করার সিদ্ধান্তটা আত্মঘাতী বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা, সার্বভৌম অধিকার ও ভৌগোলিক স্বাধীনতার প্রকাশ্য লঙ্ঘন ঘটিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। জাতিসংঘ-সমর্থিত নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার জায়গায় নব্য-সাম্রাজ্যবাদী প্রভাববলয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে বর্তমান প্রশাসন, যা এ তিন আন্তর্জাতিক সংকটেই স্পষ্ট। একই সঙ্গে স্পষ্ট সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা। অহংকারবশত ও বেআইনিভাবে ভেনেজুয়েলার সর্বশেষ নির্বাচনকে বাতিল ও অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে লেগেছে রাশিয়া। গ্রিনল্যান্ডবাসীরা বলছে, তারা তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার চায়। অথচ এসব ক্ষেত্রেই অন্যায়ভাবে জয়ী হচ্ছে অধিক ক্ষমতাধর পক্ষ।

এ প্রবণতাগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। তবে ২০২৫ সালে এগুলোকে নিঃসন্দেহে ত্বরান্বিত করেছে ট্রাম্পের অস্থিতিশীল, নীতিহীন, আইনবহির্ভূত, বিশৃঙ্খল এবং মৌলিকভাবে অনৈতিক আচরণ। এসব অনিষ্টের মধ্যে তার নৈতিক অবক্ষয়ই সবচেয়ে ভয়ংকর। এ নতুন যুগে দেখা দিচ্ছে ‘ট্রাম্পবাদ’ নামক এক বিধ্বংসী রোগ, যা বিশ্বমানবতার ওপর কলুষ ছড়ায়, তাকে বিপর্যস্ত করে, অন্ধকারে ঢেকে দেয় ও বিষাক্ত করে তোলে। এর শিকার শুধু আমেরিকান নাগরিকরা নয়, বরং বিশ্বব্যাপী সবাই।

মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, ‘মিথ্যা তিন প্রকার—সাধারণ মিথ্যা, অসাধারণ মিথ্যা আর পরিসংখ্যানগত মিথ্যা।’ আমি তার কথাটিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটু পরিবর্তন করে বলব যে, রাজনীতির প্রাঙ্গণে মিথ্যা তিন প্রকার—সাধারণ মিথ্যা, অসাধারণ মিথ্যা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিথ্যা। এখন সময় এসেছে, অন্যায় ক্ষমতা চর্চার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার। ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইউরোপের মিত্রশক্তিদের আরও দৃঢ় হতে হবে। নচেৎ, ইতিহাসের অদক্ষ, স্বার্থপর ও স্বেচ্ছাচারী রাজা-বাদশাহদের মতো ট্রাম্পও হয়তো এমন কিছু করে বসবেন, যা আর ফেরানো যাবে না।

লেখক: দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার সহকারী সম্পাদক, আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে নিয়োজিত স্থায়ী প্রতিবেদক। নিবন্ধটি ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের মতামত বিভাগ থেকে অনুবাদ করেছেন অ্যালেক্স শেখ

সরকারি হচ্ছে ফরিদপুরের নগরকান্দার আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪১ অপরাহ্ণ
সরকারি হচ্ছে ফরিদপুরের নগরকান্দার আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগে নতুন অগ্রগতি এসেছে। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ ও সদস্য সচিব (মাননীয় সংসদ সদস্যগণের প্রতিশ্রুত ও প্রত্যাশিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সমন্বয় সেল) মো. উজ্জল হোসেন স্বাক্ষরিত ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখের এক চিঠিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে আধা-সরকারি (ডিও) পত্রের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়টির জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, নারী শিক্ষার প্রসার এবং পিছিয়ে পড়া জনপদের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৮৮ সালে নগরকান্দায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টি এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ইউএনও রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনা এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করবে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে শিক্ষক সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন এবং দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের মেয়েদের জন্য উন্নত শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ উদ্যোগে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনা হবে।

ফরিদপুরে এক সপ্তাহ ধরে থানায় আটক হাতি, আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পুলিশ

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে এক সপ্তাহ ধরে থানায় আটক হাতি, আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পুলিশ

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় সড়কে হাতি নিয়ে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে ইজিবাইক দুর্ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যুর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও জব্দ করা হাতিটি এখনো সদরপুর থানা প্রাঙ্গণেই রয়েছে। হাতিটির মালিকানা ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হাতিটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, নাকি বন বিভাগের জিম্মায় হস্তান্তর করা হবে -তা নির্ধারণ হবে।

থানা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাতিটি সদরপুর থানা চত্বরে বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। হাতিটির দেখভাল ও পরিচর্যার জন্য মালিক পক্ষ থেকে দুইজন মাহুতকে থানায় পাঠানো হয়েছে। তারাই নিয়মিত হাতিটিকে গোসল করানো, খাওয়ানো ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে প্রতিদিন একটি হাতির জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন হয়। কলাগাছ, ঘাসসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার সংগ্রহ করতে প্রতিনিয়ত বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশ ও মাহুতদের। থানা প্রাঙ্গণে হাতির জন্য স্থায়ীভাবে খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় খাদ্যসংকটও দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও হাতির মালিকের সহযোগিতায় খাবারের ব্যবস্থা করা হলেও তা সবসময় পর্যাপ্ত হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

থানায় অবস্থানকালে হাতিটি প্রায়ই মাহুতদের সঙ্গে থানা চত্বরে হেঁটে বেড়ায়। বিশাল আকৃতির প্রাণীটিকে দেখতে প্রতিদিন উৎসুক মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও পরিবার-পরিজন নিয়ে থানায় এসে হাতিটিকে দেখছেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন অপ্রত্যাশিত এক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তবে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।

সদরপুর থানার পলিশ উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোকলেসুর রহমান জানান, আদালতের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত হাতিটি থানার হেফাজতেই থাকবে। আদালত যদি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, তাহলে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তা হস্তান্তর করা হবে। আর বন বিভাগের জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ বলেন, হাতিটি বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, পুলিশ সেটিই বাস্তবায়ন করবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ জুলাই দুপুরে সদরপুর উপজেলার আটরশি এলাকায় হাতি নিয়ে সড়কে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে মায়ের সঙ্গে থাকা ১০ মাস বয়সী আরিশা জান্নাত গুরুতর আহত হয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা হাতির মাহুত বকুল মিয়াকে গণপিটুনি দেয় এবং হাতিটিকে আটক করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাহুতকে আটক এবং হাতিটিকে জব্দ করে সদরপুর থানায় নিয়ে আসে। এরপর থেকে হাতিটি থানার হেফাজতেই রয়েছে।

সালথায় সাপের কামড়ে প্রাণ গেল দুই সন্তানের জননীর

সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ণ
সালথায় সাপের কামড়ে প্রাণ গেল দুই সন্তানের জননীর

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বল্লভদী ইউনিয়নের পিসনাইল গ্রামে টয়লেট থেকে ফেরার পথে সাপের কামড়ে সরস্বতী মণ্ডল (৪২) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। সরস্বতী মণ্ডল ওই গ্রামের প্রেমানন্দ মণ্ডলের স্ত্রী ও দুই সন্তানের জননী।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ছয়টার দিকে বাড়ির পাশের টয়লেট থেকে ফেরার সময় সরস্বতী মণ্ডল অসাবধানতাবশত একটি ইঁদুরের গর্তে পা দেন। এ সময় গর্তে থাকা একটি সাপ তাঁকে দংশন করে। পরে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাঁকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। সকাল আটটার দিকে তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে তাঁর মৃত্যু হয়।

স্থানীয়দের ধারণা, বিষধর গোখরা সাপের কামড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বল্লভদী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান খন্দকার সাইফুর রহমান শাহীন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, খবর পেয়ে তিনি নিহতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানিয়েছেন।

হঠাৎ এ মৃত্যুর ঘটনায় পিসনাইল গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।