খুঁজুন
, ,

নাব্যতা সংকটে তিন মাস ধরে বন্ধ ফরিদপুরের নৌ বন্দর, বেকার কয়েক হাজার শ্রমিক

সঞ্জিব দাস, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:৫৯ পূর্বাহ্ণ
নাব্যতা সংকটে তিন মাস ধরে বন্ধ ফরিদপুরের নৌ বন্দর, বেকার কয়েক হাজার শ্রমিক

ফরিদপুরের পদ্মা পাড়ের মানুষ এমন পদ্মা নদীর চিত্র এর আগে কোনদিন দেখতে হয়েছে বলে তারা মনে করতে পারছেন না। এবার তাদের দেখতে হচ্ছে পদ্মা নদীর পানি শূন্যতায় পুরো পদ্মা যেন হাহাকারের এক প্রতিধ্বনি। ফরিদপুরের পদ্মায় চর তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে এ যেন এক ধূসর মরুভূমির ছবি। অবলীলায় পায়ে হেঁটেই পদ্মা পার হয়ে যাওয়ার দৃশ্য এ অঞ্চলে যেন নতুন কোন গল্প।

কবিতার ভাষায় বলতে হয়, “চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা, একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা। কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক, রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।” কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতার এই চারটি লাইনের সাথে ফরিদপুরের পদ্মা নদীর মিল এখন অনেকটাই।

শীতের শুরুতেই ফরিদপুরের পদ্মা নদীতে নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। এরপর থেকে গত প্রায় তিন মাস যাবত বন্ধ রয়েছে নৌবন্দরের প্রায় সফল কার্যক্রম। ‌অচল হয়ে রয়েছে দক্ষিণ অঞ্চল সহ ফরিদপুর অঞ্চলের একমাত্র সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দরটি। নদীর মাঝে জেগে ওঠা ছোট-বড় অসংখ্য ডুবোচর ও পানি শূন্যতার কারণে পণ্যবাহী জাহাজ, কার্গো ও বড় ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। দূরদূরান্ত থেকে পণ্য নিয়ে আসা এসব পণ্যবাহী জাহাজ পদ্মা নদীর বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে যাচ্ছে। চরে আটকা পড়ে থাকার কারণে নৌবন্দরে ভিড়তে পারছে না। এতে অচল হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের একমাত্র নৌবন্দর হিসেবে পরিচিত ঘাটটি। আর এ কারণে হাজারের বেশি কুলি শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকা থমকে গেছে।

নৌ ঘাট সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সিঅ্যান্ডবি (C&B) ঘাট নৌবন্দরটি শত বছরের পুরোনো হলেও, এটি পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর হিসেবে ২০১৫ সালে সরকারিভাবে আত্মপ্রকাশ ও ঘোষিত হয়। পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত এই বন্দরটি দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম ব্যবসায়িক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত হয় বন্দরটি। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর এবং সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার সাথে সরাসরি বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপনের বন্দরটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি রপ্তানি হলেও শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় বছরের একটি বড় সময় ধরে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এই সংকট শুধু বন্দরের কর্মী ও ব্যবসায়ীদের জীবনেই প্রভাব ফেলছে না বরং জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফরিদপুরের বিখ্যাত সোনালী আঁশ খ্যাত পাট এই বন্দর হয়েই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রপ্তানি হয়। সিলেট থেকে কয়লা ও বালু, নারায়ণগঞ্জ থেকে সিমেন্টবাহী জাহাজ এই বন্দর থেকে খালাস করা হয়।

গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই নৌবন্দর থেকে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। কিন্তু ডুবো চর ও নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে, চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাড়ছে না রাজস্ব। এরপর থেকে বিআইডব্লিউটি নিজেই রাজস্ব আদায় করে থাকে ঘাট থেকে। এই অর্থবছরের ২০২৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নৌ বন্দরটি ইজারা দেয়া হয় দুই কোটি ৮৫ লক্ষ টাকায়।‌ বর্তমানে মো. মজিবুর রহমান নামে ইজারাদার প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হচ্ছেন। ‌তিনি গত তিন মাসে বিভিন্নভাবে ২৫টি চিঠি বিআইডব্লিউটিএ এর কাছে লিখলেও তার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ তারা করেননি। উল্টো একটি ড্রেজার মেশিন নদীর ভিতর রেখে নদীতে আসা-যাওয়ার সমস্যা করে রেখেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকদের কাছে।

পণ্যবাহী নৌযান ভিড়তে না পারায় নৌবন্দরের শুল্ক আদায়ও নেই। পণ্যবাহী নৌযানের মালিকরা ও পণ্য আমদানিকারকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। নৌবন্দরের শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়েছেন। এছাড়া দিনের পর দিন নৌ বন্দর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মাঝ পদ্মা নদীতে অরক্ষিত স্থানে জাহাজ, কার্গোগুলো থাকায় পড়তে হচ্ছে বিবিধ সমস্যায়। ঘাটে জাহাজ এবং কার্গো গুলো না আসতে পারায় বর্তমানে দূরবস্থা চরমে পৌঁছেছে। নাব্যতা সংকট সমাধানে কয়েকটি স্থানে বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজার মেশিন বসিয়ে খনন কাজ না করলে নৌবন্দরটি ব্যবসায়িকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়ে যাবে। ‌

ফরিদপুরের সোনালি আঁশ খ্যাত পাট এই বন্দর হয়েই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বহির্বিশ্বে রফতানি হয়। এছাড়াও সিলেট থেকে কয়লা ও বালু, ভারতের গরু ও চালসহ চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মিরকাদিম থেকে এই নৌপথেই চাল আমদানি হয়। নারায়ণগঞ্জ বন্দর থেকে প্রচুর সিমেন্টবাহী জাহাজ ও কার্গো এই বন্দর থেকে খালাস করা হয়।

এদিকে নৌবন্দরে ভিড়তে না পেরে নৌবন্দর থেকে নদীর মাঝ নদীতে পণ্যবাহী জাহাজ, কার্গো ও বড় ট্রলার ডুবো চরে আটকা পড়ে রয়েছে। সেখান থেকে ছোট ছোট ট্রলারে করে পণ্য নিয়ে আসায় খরচ বাড়ছে ব্যবসায়ীদের। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।

নৌ বন্দরের শ্রমিক লালন বলেন, ঘাটে জাহাজ ভিড়তে না পারায় বেকার হয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। আমার বাড়ি নওগাঁ, এখানে শ্রমিকের কাজ করি। প্রতিদিন কাজ না থাকায় নিজের খাওয়া দাওয়ার সমস্যা হয়, বাড়িতে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারি না। সরকার আমাদের দিক বিবেচনা করে অতি দ্রুত ড্রেজিং ব্যবস্থা চালু করুক এটাই এখন তার দাবি।

আরেক শ্রমিক নুরুল শেখ বলেন, এই কাজের ওপর সংসার চলে। জাহাজ না আসায় রোজগার কমে গেছে। দুই সন্তান পড়ালেখা করে। সংসারের খরচ তাদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক সময় বাড়ি থেকে টাকা এনে চলতে হয়। এখন তারা আর পেরে উঠছেন না বেকার থাকার কারণে।

রমজান নামে এক কুলি জানান, গত তিন মাস যাবৎ একদম বেকার হয়ে গিয়েছি। আমাদের অবস্থা দেখার কেউ নেই। ঘাট আমাদের আয় রোজগারের একমাত্র জায়গা। সেই জায়গাটি সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে এখন বন্ধ রয়েছে। সরকারের কাছে দাবী জানাই অতি দ্রুত ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

ঘাটের বড় ব্যবসায়ী আলম শেখ বলেন, দক্ষিণবঙ্গসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের ব্যবসায়িক পণ্য আনা নেওয়ার জন্য এই নৌবন্দরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নৌবন্ধটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়িক ক্ষতির মধ্যে রয়েছেন তারা। গত তিন মাসে আমাদের ব্যবসার ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শুধু আমার। ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করে অতি দ্রুত বিআইডব্লিউটিএ ডেজিং ব্যবস্থা চালু করে নদী পথকে স্বাভাবিক রাখার দাবি তার।

ব্যবসায়ী ও ঘাট ইজারাদার মুজিবর শেখ বলেন, নদীতে নাব্যতা সংকট এবং নদীতে চর পড়ে যাওয়ায় পণ্যবাহী নৌযান বন্দরে আসতে পারছে না। এই অর্থবছরের ২০২৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নৌ বন্দরটি ইজারা নেয়া হয়েছে দুই কোটি ৮৫ লক্ষ টাকায়।‌ বর্তমানে আমার প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হচ্ছি। ‌ গত তিন মাসে বিভিন্নভাবে ২৫টি চিঠি বিআইডব্লিউটিএ এর কাছে লিখেছি। বিআইডব্লিউটিএ থেকে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ তারা করেননি। উল্টো একটি ড্রেজার মেশিন নদীর ভিতর রেখে নদীতে আসা-যাওয়ার সমস্যা করে রেখেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। আমাদের ক্ষতিপূরণ দাবি এবং একই সাথে ড্রেজার বসিয়ে নদীর নাব্যতা সংকট দূর করার দাবি জানাচ্ছি।

ফরিদপুর সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দরের বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, নাব্যতা সংকটের কারণে ফরিদপুর নৌবন্দরের শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অতি দ্রুত ড্রেজিং এর দরকার বলে মনে করেন তারা।

এদিকে নাব্যতা বিষয়ে জানতে বিআইডব্লিউটিএ’র আরিচা নৌ বন্দরের উপ-পরিচালক সুব্রত কুমার রায় মোবাইল ফোনটি রিং বাজলেও না ধরে কেটে দেন।

এ বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা বলেন, নাব্যতা সংকটের কারণে চরম ক্ষতিতে পড়ছে নৌবন্দরটি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। দ্রুতই খননের কাজ শুরু হবে বলে আশা রাখি। নির্বাচনের সময় ব্যস্ততার কারণে বিষয়টি হয়তো পিছিয়ে গেছে। আশা করছি এখন যেসব জায়গায় চরের সৃষ্টি হয়েছে সে সব জায়গায় ড্রেজার বসিয়ে খনন করে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ঠিক করা হবে। আর এই বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএ দেখে তারা বিষয়টি দ্রুত করবে এমনটাই আমরা জানতে পেরেছি বলে তিনি জানান। ‌

ফরিদপুর সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দরের নাব্যতা সংকট উত্তরণে অতি দ্রুত ড্রেজিং সহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সরকার নেবে এমনটাই প্রত্যাশা ঘাট সংশ্লিষ্টদের।

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় দৈনিক রানারের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন

মো. ইকবাল হোসেন, আলফাডাঙ্গা:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় দৈনিক রানারের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘দৈনিক রানার’-এর ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় আলোচনা সভা ও কেক কাটা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

​মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টায় আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে দৈনিক রানারের আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি ও প্রেসক্লাবের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

​প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা খান আসাদুজ্জামান টুনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সদস্য সচিব হারুনুর রশীদ, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য কামরুল ইসলাম ও হারুন অর রশীদ, সাবেক সভাপতি আমিনুর রহমান আচ্চু ও সেকেন্দার আলম।

​এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আমাদের সময়ের প্রতিনিধি আজিজুর রহমান দুলাল, দৈনিক আমার দেশের প্রতিনিধি গোলাম আজম মনির, প্রেসক্লাবের সাবেক দপ্তর সম্পাদক রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ মুস্তাফিজ, সদস্য কমরুল হক ভূঁইয়া, আবুল বাশার ও শহিদুল ইসলামসহ প্রেসক্লাবের অন্যান্য সদস্যরা।

​আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ। বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে সংবাদপত্র মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ পথচলায় দৈনিক রানার পাঠকের আস্থা অর্জন ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে যে ভূমিকা রেখে চলেছে, তা সত্যি প্রশংসনীয়।

​বক্তারা পত্রিকাটির উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করেন এবং এর সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।

​আলোচনা সভা শেষে এক আনন্দ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটা হয়।

পদ্মার গ্রাসে বিলীন স্বপ্নের ভিটেমাটি: ফরিদপুরে খোলা আকাশের নিচে শত শত পরিবার

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩১ অপরাহ্ণ
পদ্মার গ্রাসে বিলীন স্বপ্নের ভিটেমাটি: ফরিদপুরে খোলা আকাশের নিচে শত শত পরিবার

পদ্মার নির্মম ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ও ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ৪টি দুর্গম চরের হাজার হাজার মানুষ। তীব্র স্রোতে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বহু সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো। এতে এলাকাটিতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। ভিটেমাটি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে শত শত পরিবার।

​সম্প্রতি এলাকাটিতে সাংবাদিকদের আসার খবর পেয়ে জীবন-জীবিকা রক্ষা ও মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের দাবিতে আশ্রয়ণের ঘরের সামনেই মানববন্ধন করেন ক্ষতিগ্রস্ত নারী-পুরুষরা।

​স্থানীয় সূত্র জানায়, নর্থচ্যানেল ও ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জীবনজুড়ে নিত্য সংগ্রাম। বর্ষায় বন্যা আর নদীভাঙন, আবার শুষ্ক মৌসুমে মাইল কে মাইল হেঁটে ট্রলার ঘাটে পৌঁছাতে হয় তাদের। তবে এবারের নদীভাঙন তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে।

​নর্থচ্যানেল ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মোস্তফা হোসেন জানান, পদ্মার তীব্র তোড়ে গত কিছুদিন ধরে অব্যাহত ভাঙনে নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডসহ আশপাশের এলাকায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফলদ ও বনজ গাছপালাসহ নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে প্রায় ৭০০ বিঘা উর্বর ফসলি জমি। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিআরডি) প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল, মক্তব, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক এমনকি ১০টি আশ্রয়ণের ঘরও পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক পরিবার অতীতেও একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন।

​এ বিষয়ে স্থানীয় মজিবর মোল্লা বলেন, “ইতিমধ্যেই তিন শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি পদ্মার পেটে চলে গেছে। ভাঙনের মুখে অনেক পরিবার তড়িঘড়ি করে বসতভিটা সরিয়ে নেওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি।”

​জয়নাল মাতুব্বর ডাঙ্গীর বাসিন্দা মো. হিরু শেখ বলেন, “নর্থচ্যানেল ইউপির জয়নাল মাতুব্বর ডাঙ্গী, কবিরপুর ব্রিজ সড়ক এবং কবিরপুর এলাকাসহ প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা ও কাঁচা সরকারি সড়ক সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ব্রিজ, কালভার্ট, একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ ও কমিউনিটি ক্লিনিক নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ায় শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা একেবারেই স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।”

​সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড়ে কেবলই ভিটেমাটি হারা মানুষের হাহাকার আর আর্তনাদ। গৃহহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলো বাঁধের ওপর ও খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল টাঙিয়ে দিন কাটাচ্ছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।

​আক্ষেপ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা চায়না বেগম বলেন, “চোখের সামনে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সংসার আর জমিজমা পদ্মায় তলিয়ে গেল। আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা বাঁচতে চাই। নদীভাঙন বন্ধে স্থায়ী বাঁধ না হলে মানচিত্র থেকেই আমাদের নাম মুছে যাবে।”

​ভাঙনের শিকার হায়দার আলী জানান, পরিস্থিতি দিন দিন আরও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। পদ্মার অব্যাহত আগ্রাসন থেকে বাকি গ্রামগুলো রক্ষা করতে অবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ দরকার। তারা সরকারের কাছে তিনটি প্রধান দাবি জানান— জরুরি ত্রাণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে জিও ব্যাগ ফেলা ও স্থায়ী গাইড বাঁধ নির্মাণ করা, এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য খাসজমি বরাদ্দসহ কৃষিঋণ মওকুফ ও আর্থিক অনুদান দেওয়া।

​ক্ষতির ভয়াবহতা তুলে ধরে নর্থচ্যানেল ইউপি চেয়ারম্যান হাজী মোফাজ্জল হোসেন এবং ডিক্রিরচর ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. হায়দার আলী খান বলেন, “হঠাৎ নদীভাঙনে বিঘা বিঘা জমি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হারিয়ে এই এলাকায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। নদীপাড়ের কৃষকদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে মানুষ এখন নিঃস্ব। ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে তারা অমানবিক দিন কাটাচ্ছে।”

​সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, “আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছি। পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙন প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিকল্পনা ভাবা হচ্ছে।”

​প্রকৃতির এই নির্মম তাণ্ডবে দিশেহারা ফরিদপুরের দুর্গম চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষগুলো এখন স্থায়ী সমাধান ও দ্রুত সরকারি সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

ফরিদপুরে সারের ডিলারশিপ নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, যুবদল কর্মীকে হাতুড়িপেটা

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে সারের ডিলারশিপ নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, যুবদল কর্মীকে হাতুড়িপেটা

ফরিদপুরের নগরকান্দায় সারের ডিলারশিপ নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তোলায় শেখ খোরশেদ আহমেদ দোলন (৫০) নামে এক যুবদল কর্মীকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে আরও তিনজন আহত হয়েছেন।

​সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাঙ্গাবাড়িয়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

​আহত দোলন রামনগর ইউনিয়নের দুলারডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা এবং জেলা যুবদলের সদস্য। আহত অন্য তিনজন হলেন— উত্তর গোপীনাথপুর গ্রামের সুমন তালুকদার (৩৬), গোপালপুর গ্রামের ওয়াজেদ মোল্যা (৫০) এবং বাড়ৈইডাঙ্গী গ্রামের মোস্তাক আহমেদ কলি মণ্ডল (৫০)।

​স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি রামনগর ইউনিয়নে সারের ডিলারশিপ নিয়োগের জন্য আবেদন করেন যুবদল সদস্য খোরশেদ আহমেদ দোলন এবং একই ইউনিয়নের বিএনপি নেতা মান্নান মণ্ডলের ছেলে শিবলী সাদিক ওরফে তুষার মণ্ডল (৩০)। এর মধ্যে মেসার্স এসএস এন্টারপ্রাইজের নামে চূড়ান্তভাবে ডিলারশিপ পান তুষার মণ্ডল। নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষে আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন দোলন।

​এরই ধারাবাহিকতায় গত রোববার (১১ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে নগরকান্দা প্রেসক্লাবে নিয়োগবঞ্চিতরা সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে দোলন ডিলারশিপ নিয়োগে অর্থের বিনিময়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানান।

​দোলনের বড় ভাই শেখ ফরিদ আহমেদ মিলনের অভিযোগ, ওই বক্তব্যের কারণে তুষার মণ্ডল ক্ষুব্ধ হন। এর জের ধরে সোমবার সন্ধ্যায় বাঙ্গাবাড়িয়া বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে থাকা দোলনের ওপর হামলা চালানো হয়।

​ফরিদ আহমেদ মিলন বলেন, “সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসেছিল দোলন। এ সময় তুষারের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল হাতুড়ি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ভাইকে বাঁচাতে গেলে অন্যদেরও পিটিয়ে আহত করা হয়। আমার ভাইয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক।”

​তিনি আরও বলেন, “সারা জীবন বিএনপি করেও আজ আমরা বঞ্চিত। টাকার বিনিময়ে ডিলারশিপ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভাই প্রতিবাদ করায় তাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

​ঘটনার বিষয়ে জানতে মেসার্স এসএস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তুষার মণ্ডলের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘ফোনে চার্জ নেই’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।

​নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ জানান, দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তবে হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।