বয়স এক হলেও সবাইকে কেন সমান তরুণ দেখায় না?
একই বয়সের দুজন মানুষের মধ্যে চেহারা, শারীরিক সক্ষমতা ও প্রাণশক্তিতে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। কাউকে দেখলে মনে হয় বয়স যেন তার ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলেনি।
আবার কারও চেহারায় বয়সের ছাপ পড়ে তুলনামূলক দ্রুত। এর পেছনে শুধু বংশগত বৈশিষ্ট্য বা ত্বকের যত্ন নয়, বরং জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক চাপ এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন প্রক্রিয়াও ভূমিকা রাখে।
জন্মতারিখ থেকে যে বয়স হিসাব করা হয়, তার সঙ্গে শরীরের জৈবিক অবস্থার সব সময় মিল থাকে না। তাই একই বয়সের মানুষের শরীরের বার্ধক্যও একই গতিতে এগোয় না।
শরীরের প্রকৃত বয়স বলতে কী বোঝায়?
জন্মের পর থেকে যত বছর পার হয়েছে, সেটি কালানুক্রমিক বয়স। অন্যদিকে শরীরের কোষ, টিস্যু ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত ধারণাটি হলো জৈব বয়স।
সহজভাবে বললে, শরীর কতটা সুস্থভাবে কাজ করছে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় জৈব বয়সের মাধ্যমে। তবে এটি নির্ধারণের কোনো একক ও সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি নেই।
জৈব বয়সের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বংশগত বৈশিষ্ট্য, দীর্ঘমেয়াদি রোগ, শারীরিক পরিশ্রম, পুষ্টি, ঘুম, ধূমপান এবং পরিবেশগত নানা বিষয়। এসবের সম্মিলিত প্রভাবেই একই বয়সের দুজন মানুষের শারীরিক সক্ষমতা ও বাহ্যিক চেহারায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
চেহারায় বয়সের ছাপ পড়ে কেন?
বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বকের কোলাজেন ও ইলাস্টিনের গঠনে পরিবর্তন আসে। ফলে ত্বক আগের মতো টানটান থাকে না, বলিরেখা দেখা দিতে পারে এবং ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব, ধূমপান, দূষণ ও বংশগত বৈশিষ্ট্য এসব পরিবর্তনের গতিকে প্রভাবিত করে।
শুধু ত্বক নয়, চুলের রং, পেশির শক্তি, শরীরের চর্বির বণ্টন এবং চলাফেরার সক্ষমতাতেও বয়সের প্রভাব পড়ে। তবে এসব পরিবর্তন সবার ক্ষেত্রে একই রকম হয় না।
যেসব অভ্যাস বার্ধক্যের গতিতে প্রভাব ফেলে
জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস শরীরের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। বিপরীতে, দীর্ঘদিন অনিয়মিত জীবনযাপন শরীরের বিভিন্ন ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নিয়মিত কম ঘুম হলে মনোযোগ, কর্মক্ষমতা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে। ঘুমের ঘাটতি চেহারায় ক্লান্তির ছাপও স্পষ্ট করে তুলতে পারে।
দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকলে ঘুম, খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন কাজের ছন্দ ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে।
অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারনির্ভর খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তে সুষম খাবার বেছে নেওয়া জরুরি। শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে সহায়তা করে।
দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা না করার ফলে পেশির শক্তি, সহনশীলতা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ধূমপান ত্বকের অকাল বার্ধক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। একইভাবে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ত্বকে বলিরেখা, দাগ ও অন্যান্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
কোন লক্ষণগুলো খেয়াল করবেন?
আগের তুলনায় বেশি ক্লান্ত লাগা, শরীরচর্চার সক্ষমতা কমে যাওয়া, ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়া কিংবা চুলের পরিবর্তন চোখে পড়তে পারে। তবে এসব লক্ষণ দেখেই জৈব বয়স বেড়ে গেছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
ক্লান্তি, চুল পড়া, ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা ত্বকের সমস্যার পেছনে ঘুমের ঘাটতি, পুষ্টির অভাব, থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কারণ থাকতে পারে। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কীভাবে সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকা যায়?
বয়স বাড়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটি থামানো সম্ভব না হলেও সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করা যায়।
হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কিংবা নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী অন্য কোনো ব্যায়াম বেছে নিতে পারেন। পাশাপাশি পেশির শক্তি ধরে রাখতে নিয়মিত শক্তিবর্ধক ব্যায়ামও উপকারী।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, পূর্ণশস্য, ডাল, বাদাম ও পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখুন। অতিরিক্ত চিনি ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর চেষ্টা করুন।
ঘুমের রুটিন ঠিক রাখুন: প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়া, নিয়মিত হাঁটা, প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
বাইরে গেলে উপযুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন, ত্বক পরিষ্কার রাখুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। ধূমপান এড়িয়ে চলাও ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের যথাযথ ব্যবস্থাপনা শরীর সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।
বয়স নয়, সুস্থতাই হোক অগ্রাধিকার
একই বয়সের সবাইকে একই রকম তরুণ দেখাবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। বাহ্যিক চেহারা দিয়ে শরীরের প্রকৃত জৈব বয়সও নির্ভুলভাবে বোঝা যায় না। তাই অন্যের সঙ্গে নিজের চেহারা বা বয়সের তুলনা না করে শরীরের সক্ষমতা, ঘুম, পুষ্টি ও সামগ্রিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সুস্থ জীবনযাপন বয়সের ছাপ পুরোপুরি মুছে দিতে পারে না। তবে নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস দীর্ঘদিন কর্মক্ষম ও প্রাণবন্ত থাকতে সাহায্য করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন