খুঁজুন
বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২২ মাঘ, ১৪৩২

ইতিহাসের পাতায় তৃতীয়বার—আওয়ামী লীগ ছাড়া সংসদ নির্বাচন

শামীম খান ও মহিউদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:৪৬ এএম
ইতিহাসের পাতায় তৃতীয়বার—আওয়ামী লীগ ছাড়া সংসদ নির্বাচন

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যার দায়ে কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকে তৃতীয়বার আওয়ামী লীগকে ছাড়াই হতে যাচ্ছে সংসদ নির্বাচন। এর আগের দুইবার অবশ্য আওয়ামী লীগ নিজে থেকে সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ।

প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। পরবর্তীতে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে দলটির নাম ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ রাখা হয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই প্রথম নির্বাচন করার সুযোগ পাচ্ছে না আওয়ামী লীগ। এর আগে ১৯৮৮ সালে স্বৈরাচার এরশাদের অধীনে এবং ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়ার অধীনে সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল দলটি।

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন:

প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ। ১৯৫৪ সালের ৮ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন অর্জন করে। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৪৩টি, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি ৪৮টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ১৯টি, গণতন্ত্রী দল ১৩টি এবং কমিউনিস্ট পার্টি ৪টি আসন পায়।

সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য ৭২টি আসন সংরক্ষিত ছিল।

এগুলোর মধ্যে কংগ্রেস ২৪টি, কমিউনিস্ট পার্টি ৪টি, শিডিউল্ড কাস্ট ফাউন্ডেশন ২৭টি, গণতন্ত্রী দল ৩টি এবং ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ পার্টি ১৩টি আসন লাভ করে। মোট আসন ছিল ৩০৯টি।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন (১৯৬৫):

১৯৬৫ সালের পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন জানিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তবে ওই নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহ জয়ী হতে পারেননি।

১৯৭০-এর নির্বাচন:

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তান সাধারণ নির্বাচন।এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে। পূর্ব পাকিস্তানের বাকি দুটি আসনের মধ্যে একটিতে জয়ী হন নুরুল আমিন এবং অপরটিতে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮১টি আসনে জয়লাভ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি।

সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় প্রাদেশিক নির্বাচন। এ নির্বাচনেও পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলির ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ।

স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচন:

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ১২টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি চারবার এবং জাতীয় পার্টি দুইবার সরকার গঠন করে।

প্রথম সংসদ নির্বাচন:

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় লীগের ১ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) ১ জন এবং পাঁচজন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর ছয় মাস।

দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন:

১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল তিন বছর।

এই নির্বাচনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে জয়ী হয়। অন্য দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি, জাসদ ৮টি, মুসলিম ডেমোক্রেটিক লীগ ২০টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ১৬টি আসনে জয়ী হয়।

তৃতীয় সংসদ নির্বাচন:

১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১৭ মাস।
এ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে জয়ী হয় স্বৈরাচার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি।

অন্য দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৭৬টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) পাঁচটি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ১০টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৩২টি আসনে জয়ী হন। বিএনপি এ নির্বাচন বয়কট করে।

চতুর্থ সংসদ নির্বাচন:

১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বর্জন করে। এটি ছিল আওয়ামী লীগের প্রথমবার কোনো নির্বাচনের বাইরে থাকা। এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। ১৯টি আসন পেয়ে সংসদে বিরোধী দল হয় সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ)।

পঞ্চম সংসদ নির্বাচন:

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম কোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশে সংসদ নির্বাচন হয়। পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে জয়ী হয়। অন্য দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়ী হয়। এই সংসদের মেয়াদ ছিল চার বছর আট মাস।

ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন:

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন।

তৎকালীন সরকারি দল বিএনপির অধীনে হওয়া এ নির্বাচন বয়কট করে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এটি ছিল আওয়ামী লীগের দ্বিতীয়বার নির্বাচনের বাইরে থাকা।

এ নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮টি আসনে জয়লাভ করে। এর মধ্যে ৪৯টি আসনে বিএনপি প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। ১টি আসনে ফ্রিডম পার্টি, ১০টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হন, ১০টি আসনের ফলাফল অসমাপ্ত ছিল এবং একটি আসনের নির্বাচন আদালতের আদেশে স্থগিত হয়।

সপ্তম সংসদ নির্বাচন:

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।

এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি এবং জামায়াতে ইসলামী তিনটি আসনে জয়ী হয়।

অষ্টম সংসদ নির্বাচন:

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।

এ নির্বাচনে ১৯৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। অন্য দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি এবং জাতীয় পার্টি ও ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি আসনে জয়ী হয়।

নবম সংসদ নির্বাচন:

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ভোট। এ সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।

এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি এবং জামায়াতে ইসলামী ২টি আসনে জয়ী হয়।

দশম সংসদ নির্বাচন:

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। এই নির্বাচন ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন’ নামে পরিচিত।

আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল।

এ নির্বাচনে মোট ১২টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। আওয়ামী লীগ একাই ২৩৪টি আসন পায়, যার মধ্যে ১৫৩টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

অন্য দলগুলোর মধ্যে জাতীয় পার্টি ৩৪টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ৬টি, জাসদ (ইনু) ৫টি, তরীকত ফেডারেশন ২টি, জাতীয় পার্টি (জেপি) ২টি, বিএনএফ ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৬টি আসনে জয়লাভ করে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন:

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। এই সংসদ নির্বাচনটি ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত।

এ নির্বাচনে নিবন্ধিত ৩৯টি দলের সবাই অংশ নেন। নিবন্ধন না থাকায় অংশ নিতে পারেনি জামায়াতে ইসলামী।

এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৫৮টি আসন পায়। জাতীয় পার্টি ২২টি এবং মহাজোটভুক্ত অন্য দলগুলো ৮টি আসনে জয়ী হয়। অপরদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত বিএনপি ৬টি, গণফোরাম ২টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৩টি আসনে জয়ী হন।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন:

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বয়কট করেছিল (জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ছিল না)।

২০১৪ সালের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা যাতে জয়ী না হয়, সে জন্য অভিনব কৌশল নেয় আওয়ামী লীগ। ডামি প্রার্থী হিসেবে নিজ দলের নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায় দলটি। এই নির্বাচনটি ‘ডামি নির্বাচন’ নামে পরিচিত।

এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২২টি আসন, জাতীয় পার্টি (জাপা) ১১টি আসন এবং জাসদ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি একটি করে আসন জয়ী হয়। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন ৬২ জন, যাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ নেতা।

এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র সাত মাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এরপর থেকে দেশ পরিচালনা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

সূত্র : বাংলানিউজ২৪

জামায়াতের বিরোধিতায় কেন হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধকে সামনে আনছে বিএনপি?

মরিয়ম সুলতানা
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:৫৮ এএম
জামায়াতের বিরোধিতায় কেন হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধকে সামনে আনছে বিএনপি?

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি, প্রচারণা চালানোর সময় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার প্রসঙ্গ টানছেন; করছেন সমালোচনা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত ভূমিকা বাংলাদেশে বহুল আলোচিত বিষয়। অপরদিকে, বিএনপি সবসময় বলে আসছে যে তারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল।

এদিকে, ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় জামায়াতে ইসলামী-ই হলো এবারের নির্বাচনে বিএনপি’র সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একটা দীর্ঘ সময় ধরে দুই দল জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে অবস্থান করার পরও বিএনপি এর আগে একাধিকবার জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধে নির্বাচন করেছে, আন্দোলন করেছে, সরকার গঠন করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের বিরোধিতা করার জন্য এখন মুক্তিযুদ্ধকে সামনে আনার পেছনে বিএনপি’র রাজনৈতিক কৌশল, ভোটের অঙ্ক ও বর্তমান বাস্তবতা – সবকিছুই কাজ করছে।

তবে এটি আদর্শগত পুনর্মূল্যায়ন, নাকি নির্বাচনের প্রয়োজনে অবস্থান বদল?

এর উত্তরে বিএনপি বলছে, একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা দলের “নীতিগত অবস্থান”। তবে জামায়াতের মতে, একটা “মীমাসিংত বিষয়” নিয়ে কথা বলাটা এখন অবান্তর।

নির্বাচনী প্রচারণায় মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে জোর

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত তিনটি রাজনৈতিক দল হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

এর মাঝে এনসিপি এবার জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোট থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি’র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এখন ভোটের মাঠে রয়ে যাচ্ছে দলটির এক সময়ের মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

কিন্তু নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দুই দলের মাঝে বাগযুদ্ধ ও তিক্ততা তত বেড়ে চলেছে। যদিও এর আগে দুই দলের নেতারা বলেছিলেন যে, তারা দোষারোপের রাজনীতি করবেন না।

একদিকে জামায়াত যেমন অতীতে বিএনপির আমলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার বিষয়টি সামনে আনছে।

গত ২২শে জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু হলে সেদিনই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেটের এক নির্বাচনী সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বলেছেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে “মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি।”

তিনি বলেছেন, “আরে ভাই, আপনাদেরকে তো মানুষ একাত্তরে দেখেছে; ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। একাত্তরে মানুষ দেখেছে আপনারা কীভাবে দেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।”

ওইদিনের আগে-পরে তারেক রহমান তার বিভিন্ন বক্তব্যে এ প্রসঙ্গে একই কথা বলেছেন।

শুধু তিনি নন, বিএনপি’র শীর্ষ নেতাও একাত্তর ও জামায়াত প্রসঙ্গে একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন।

বুধবার, ২৮শে জানুয়ারিও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “এই দলটা ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলো। এই দলটা সেই দল, যারা আমাদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে নাই।”

”যারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তাদের হাতে কি দেশ চালানোর দায়িত্ব দেওয়া যায়?” – ঠাকুরগাঁওয়ের ওই সভায় তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্যে এই প্রশ্ন করেন।

জামায়াত ও বিএনপি’র দীর্ঘদিনের পথচলা

২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের এই দীর্ঘ শাসনামলে রাজনীতির মাঠে বিএনপি ও জামায়াত, দুই দলই অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় ছিল। এই সময়ের মাঝে বিএনপি চেয়ারপার্সন প্রয়াত খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য বিএনপি নেতারাও হামলা, মামলা, কারাবরণের শিকার হয়েছেন।

অপরদিকে, মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গোলাম আযমসহ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বের অভিযুক্তদের তখন বিচার শুরু হয়। অনেক শীর্ষ জামায়াত নেতার মৃত্যুদণ্ডও হয়।

সুতরাং, সেই পরিস্থিতির কারণে এই পুরোটা সময়ে সরকার বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে দুই দলকে পাশাপাশি দেখা গেছে। কিন্তু তার আগেও তাদের বন্ধুত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো।

অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতে ইসলামীসহ যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো, তাদের পুনর্বাসন করেছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

বিশ্লেষকদের মতে, জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলে তখন স্বাধীনতাবিরোধীদের সুযোগ দিয়েছিলেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল, আওয়ামী লীগ বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, আওয়ামী লীগ বিরোধিতার দিক থেকে আদর্শিকভাবে এই দুই দল এক এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতকে পুনর্বাসন করার ক্ষেত্রে “প্রধান ক্রেডিট” বিএনপি’র।

মূলত, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৮ ধারা অনুযায়ী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। যেহেতু জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির মূল উপজীব্য ধর্ম; তাই বাংলাদেশে তখন তাদের অস্তিত্ব দৃশ্যত বিলীন হয়ে যায়।

কিন্তু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। তার মৃত্যুর পর ১৯৭৬ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

এরপর জামায়াতে ইসলামীর আত্মপ্রকাশ করা ছিল শুধুই সময়ের ব্যাপার। কিন্তু জামায়াত ইসলামী সাথে সাথে আত্মপ্রকাশ করেনি। তারা কিছুটা কৌশলী ভূমিকা অবলম্বন করে।

যেহেতু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধচারণ তখনো সবার মনে টাটকা ছিল, সেজন্য দলটি তাৎক্ষণিকভাবে জামায়াতে ইসলামী নামে আত্মপ্রকাশ করেনি।

এজন্য তারা ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দল বেছে নেয়। ১৯৭৬ সালের ২৪শে অগাস্ট জামায়াতে ইসলামী ও আরো কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল মিলে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আই.ডি.এল) নামের একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠন করে।

জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা এই দলটির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসেন। আই.ডি.এল’র ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ছয়টি আসনে জয়লাভ করেন।

সেবারই প্রথম জামায়াতে ইসলামীর নেতারা স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদে আসেন। এরপর থেকে জামায়াতে ইসলামী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশও করেছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক তৎপরতা প্রকাশ্যে ছিল।

সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, সেখানে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়লাভ করে।

সেই নির্বাচনে বিএনপি বেশি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের ছিল না। ফলে জামায়াতে ইসলামী’স সাথে জোট বেঁধে তখন সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর ২০০১ সালেও বিএনপি-জামায়াত জোট বেঁধে নির্বাচন করেছিল ও সরকার গঠন করেছিল।

সেই সময়ের চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন তৎকালীন জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।

এ দুজনকেই পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

‘জামায়াত সঙ্গে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে হয় জঙ্গী’

মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বিএনপি হঠাৎ করে যেভাবে সমালোচনা করছে, এটিকে জামায়াত বলছে – আর কোনোভাবে না পেরে বিএনপি এখন “ভোঁতা হাতিয়ার” ব্যবহার করছে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের ভাষায়, “জামায়াতে ইসলামীকে আদর্শিক, রাজনৈতিক, নৈতিক, চারিত্রিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে তারা এই ভোঁতা হাতিয়ারকে ব্যবহার করছে; যা এই জাতি এখন আর গ্রহণ করতে চায় না।”

তার মতে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাদের জীবদ্দশায় “যে বিষয়টি জাতীয় ঐক্যের আলোকে মীমাংসা করে গেছেন, সকলকে নিয়ে একসাথে দেশ গড়ার উদাহরণ তৈরি করেছেন”, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র উত্তরসূরীরা পরবর্তীতে সেই মীমাংসিত ইস্যুকে “দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে।”

১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াত যুগপৎভাবে আন্দোলন করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তারা জোট বেঁধেছিল ছিলো শুধু বিএনপি’র সাথেই।

বিএনপি’র সাথে জামায়াতের এই দীর্ঘ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, “প্রত্যেকের সঙ্গে জামায়াত যখন থাকে, তখন জামায়াত সঙ্গী হয়, আর যখন থাকে না, তখন জঙ্গী হয়। এটাই হলো তাদের ন্যারেটিভ। এটা ব্যাড পলিটিক্যাল মোটিফ।”

“১৯৯১ সালে বিএনপি কেন কেন জামায়াতের সাহায্য নিলো?” প্রশ্ন করে তিনি আরও জানতে চান, “তখন বেগম জিয়ার পক্ষে তার নেতৃবৃন্দ গোলাম আজমের কাছে সরকার গঠনে সাহায্যের জন্য লোক পাঠিয়েছিলেন…তখন কোন ব্যাখ্যায় তারা এলেন?”

এদিকে, এই জামায়াত নেতা যদিও বলছেন যে তাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা মীমাংসিত।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মফিদুল হক এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “মীমাংসিত হলে তো আর আলোচনা হতো না। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে তো এরকম আলোচনা নাই। এটাই প্রমাণ করে যে মীমাংসিত না, অমীমাংসিত ইস্যু।”

“এখানে গণহত্যার মতো বিষয় আছে। কিন্তু সেটা যদি কেউ ডিনায়ালের মাঝে থাকে আর বলে যে মীমাংসা হয়ে গেছে, সেখানে বিচার ও সত্যের বিষয় চলে আসে,” যোগ করেন তিনি।

‘কলঙ্ক মোছার দায়িত্ব তো আমরা নেই নাই তখন’

জামায়াতের সাথে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক আন্দোলন করা এবং দলটির সাথে মিলে জোট সরকার গঠনের পর হঠাৎ করে বিএনপি এখন মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে জামায়াতের সমালোচনা করছে কেন?

জানতে চাইলে বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিবিসি বাংলাকে বলেন, “সেসময় জামায়াত বাংলাদেশে লিগ্যাল পার্টি ছিল। জামায়াতকে নিয়ে আওয়ামী লীগও আন্দোলন করছে। আর আমরা একটা স্ট্র্যাটেজিক ইলেকশন পার্টনার তৈরি করেছি।”

তিনি বলেন, ওই জোট করা হয়েছিলো শুধুমাত্র “নির্বাচনে ভোটের সমীকরণের জন্য।”

“এর অর্থ এই না যে তাদের (জামায়াত) কলঙ্ক মুছে গেছে। কলঙ্ক মোছার দায়িত্ব তো আমরা নেই নাই তখন। আমরা স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার তৈরি করেছিলাম কেবল,” ফের বলেন তিনি।

নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বড় দল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “যারা দেশকেই বিশ্বাস করে নাই, তারা সেই দেশের শাসন ক্ষমতা হাতে নিবে? জাতিকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে তাদের ভূমিকা কী ছিল?”

তার ভাষ্য, বিএনপি মনে করে না ওই সময়ে নির্বাচনের প্রয়োজনে জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধেছিলো বলে বিএনপি এখন তাদেরকে কিছু বলতে পারবে না।

মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে জামায়াতের সমালোচনা করতে বিএনপিকে আগে কখনো দেখা যায়নি কেন?

জানতে চাইলে এই বিএনপি নেতা বলেন, “এখনও আসতো না। যদি না তারা আস্ফালন করতো, মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেশনকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করতো, যদি তারা ক্ষমা চাইতো। তারা এগুলোর কিছুই করেনি। বরং, জামায়াতের নেতারা মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেশনকে চেঞ্জ করতে চায়। তাই, প্রতিবাদটা সরব রাখতে হবে, যাতে তারা যেন-তেনভাবে এই প্রজন্মকে বোঝাতে না পারে।”

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করাটা বিএনপি’র এবং মুক্তিযোদ্ধাদের “নীতিগত অবস্থান” বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিএনপি’র উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক?

বিএনপি যদিও বলছে যে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তাদের সাথে জামায়াতের আদর্শিক ভিন্নতা আছে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি’র এই সমালোচনার মূল কারণ আসন্ন নির্বাচন। বিশেষ করে, বিএনপি চাইছে আওয়ামী লীগের ভোটগুলো যেন তাদের পক্ষে যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীনের ব্যাখ্যায়, “বাংলাদেশের অনেক মানুষের আবেগের জায়গা মুক্তিযুদ্ধ। বিএনপির অনেকেও মুক্তিযুদ্ধকে ধারণা করে। আর, জুলাই আন্দোলনের পক্ষের অনেকে এবং অনেক আওয়ামীলীগ বিরোধীও মুক্তিযুদ্ধকে ধারণা করে। সুতরাং, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতকে আক্রমণ করাটাকে একটা কৌশল হিসেবে নিয়েছে বিএনপি।”

“শুধুমাত্র জামায়াতকে কেন্দ্র করে বিএনপি কিছু করছে না এখানে। আওয়ামী লীগ যেহেতু নাই এবং প্রতিপক্ষ জামায়াত, তাই বিএনপি’র সাথে এখন দু’টো অস্ত্র। মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্ম। আর মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের তো বিতর্কিত ভূমিকা ছিল, তাই আওয়ামী লীগের ভোটার টানতে এটা করছে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক সাব্বির আহমেদও এই ভোটব্যাংক প্রসঙ্গে একই কথা বলেন।

তবে তিনি এও বলেন, “জামায়াত বিএনপি থেকে আলাদা হয়ে গেছে, এটা বিএনপি মানতে পারছে না। এটা তারা বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে। আর নির্বাচনকালীন সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সম্পর্ক হলো শত্রু-শত্রু। তখন এটা হবেই, কিছু করার নেই। প্রচারণায় জামায়াতের দুর্বলতা বিএনপি ব্যবহার করবে, আবার জামায়াত বিএনপির দুর্বলতাকে ব্যবহার করবে।”

যদিও বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে বিএনপি’র জামায়াতের সমালোচনা নির্বাচনী প্রচারণার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

কারণ “এটা ইউনিভার্সাল, এটা চিরকাল থাকবে। জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায় নাই, বাংলাদেশের মানুষকে হত্যা করেছে, এটা আমরা বারেবারে বলবো,” যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র প্রকল্পের একজন গবেষক ছিলেন আফসান চৌধুরী। একাত্তরের ঘটনাবলী নিয়ে অনেকগুলো বইও লিখেছেন তিনি।

মি. চৌধুরীর মতে, “আমাদের দেশে আমরা ইতিহাসকে রাজনীতি বানিয়ে ফেলেছি। এটা শুধু (জামায়াতের সমালোচনা) নির্বাচনের বিষয় না। এটা সকল কালে হয়ে গেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এটা (সমালোচনা করছে) এবং নির্বাচনের পরেও এটা করবে।”

তবে অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, এখন এক দল আরেক দলকে বিষেদগার করলেও শেষমেশ এদের “জোটে ফাটল ধরার সম্ভাবনা কম। কারণ আগের মতো এখনও বাংলাদেশে জামায়াতের শক্ত অবস্থানের পেছনে বিএনপি’র ভূমিকা রয়েছে।”

পাঁচই অগাস্টের পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের বেশ শক্ত প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে জামায়াতের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছাত্র শিবির বিশাল জয় পেয়েছে।

ফলে সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের অবর্তমানে জামায়াতকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখছে বিএনপি। এ কারণেই দুই দলই তাদের বক্তব্যে নানাভাবে একে অপরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

ত্বক ও চুল সুস্থ রাখতে নিমপাতার জাদুকরী ভূমিকা

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:৩২ এএম
ত্বক ও চুল সুস্থ রাখতে নিমপাতার জাদুকরী ভূমিকা

আমরা সবাই জানি, নিম একটি ওষুধি গাছ। যার ডাল, পাতা, রস সবই কাজে লাগে। নিম ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া নাশক হিসেবে খুবই কার্যকর। আর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও এর জুড়ি মেলা ভার।

নিমের উপকারিতাগুলো:

ত্বক: বহুদিন ধরে রূপচর্চায় নিমের ব্যবহার হয়ে আসছে। ত্বকের দাগ দূর করতে নিম খুব ভালো কাজ করে। এছাড়াও এটি ত্বকে ময়েশ্চারাইজার হিসেবেও কাজ করে। ব্রণ দূর করতে নিমপাতা বেটে লাগাতে পারেন।

মাথার ত্বকে অনেকেরই চুলকানি ভাব হয়। নিমপাতার রস মাথায় নিয়মিত লাগালে এ চুলকানি কমে। নিয়মিত নিমপাতার সঙ্গে কাঁচা হলুদ পেস্ট করে লাগালে ত্বকের উজ্জলতা বৃদ্ধি ও স্কিন টোন ঠিক হয়।

চুল: উজ্জ্বল, সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন চুল পেতে নিমপাতার ব্যবহার বেশ কার্যকর।

চুলের খুশকি দূর করতে শ্যাম্পু করার সময় নিমপাতা সিদ্ধ পানি দিয়ে চুল ম্যাসেজ করে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। খুশকি দূর হয়ে যাবে। চুলের জন্য নিমপাতার ব্যবহার অদ্বিতীয়। সপ্তাহে ১ দিন নিমপাতা ভালো করে বেটে চুলে লাগিয়ে ১ ঘণ্টার মতো রাখুন। এবার ১ ঘণ্টা পর ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।

দেখবেন চুল পড়া কমার সঙ্গে সঙ্গে চুল নরম ও কোমল হবে।

কৃমিনাশক: পেটে কৃমি হলে শিশুরা রোগা হয়ে যায়। পেট বড় হয়। চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বাচ্চাদের পেটের কৃমি নির্মূল করতে নিমপাতার জুড়ি নেই।

দাঁতের রোগ: দাঁতের সুস্থতায় নিমের ডাল দিয়ে মেসওয়াক করার প্রচলন রয়েছে, সেই প্রাচীনকাল থেকেই। নিমের পাতা ও ছালের গুড়া কিংবা নিমের ডাল দিয়ে নিয়মিত দাঁত মাজলে দাঁত হবে মজবুত, রক্ষা পাবেন দাঁতের রোগ থেকেও।

চিকিৎসক দেখিয়ে বেরোনোর পর এই ভুলটা কি আপনিও করেন?

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:২৮ এএম
চিকিৎসক দেখিয়ে বেরোনোর পর এই ভুলটা কি আপনিও করেন?

শরীর ভালো থাকলে আমরা সবাই যেন একটু বেশিই সাহসী হই। হালকা জ্বর, কাশি, পেটের গোলমাল—এসবকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজে নিজেই সামলে নেওয়ার চেষ্টা করি। অনেকের কাছেই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া মানে অযথা সময় নষ্ট, লম্বা সিরিয়াল, আর সঙ্গে হাজার একটা পরীক্ষা ও ওষুধের ঝামেলা। এই ভয়েই অনেক সময় ডাক্তারখানা এড়িয়ে চলেন অনেকে।

কিন্তু সমস্যা যখন গুরুতর হয়ে ওঠে, তখন আর উপায় থাকে না—চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতেই হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক যখন প্রেসক্রিপশন দেন, তখন আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। মনে হয়, এবার বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়েই আমরা এমন কিছু ভুল করি, যেগুলোর কারণে রোগ সারার বদলে আরও জটিল হয়ে ওঠে।

চলুন জেনে নেওয়া যাক, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর কোন কোন ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি করে বসেন মানুষ—

১. ওষুধ কেনার সময় পুরো ডোজ না নেওয়া

সবচেয়ে বড় ভুলটি করেন অনেকেই ওষুধ কেনার সময়। চিকিৎসক যদি ৩০ দিনের জন্য ওষুধ খেতে বলেন, তাহলে অনেকেই ১৫ দিনের ওষুধ কিনেই বাড়ি ফেরেন। ভাবেন, ‘দেখি আগে কেমন কাজ করে’। কিন্তু এতে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং রোগ পুরোপুরি সারে না।

২. নিজের মতো করে ওষুধ বা চিকিৎসা চালানো

অনেকেরই নিজের মতো করে চিকিৎসা করার প্রবণতা রয়েছে। চিকিৎসক যে ওষুধ বা পরীক্ষা পরামর্শ দিয়েছেন, তার বদলে আগের কোনো ওষুধ খাওয়া বা পরিচিত কারও পরামর্শে ওষুধ বদলে ফেলা—এসব অভ্যাস বিপদ ডেকে আনে। এতে রোগের জটিলতা আরও বেড়ে যেতে পারে।

৩. ওষুধ ঠিক সময়ে না খাওয়া

চিকিৎসকের দেওয়া সময় মেনে ওষুধ না খাওয়াও একটি সাধারণ কিন্তু গুরুতর ভুল। অনেকেই সময়ের ওষুধ সময়মতো খান না, কখনো ভুলে যান, কখনো আলসেমি করেন। অথচ নিয়ম না মেনে ওষুধ খেলে শারীরিক সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

৪. একটু ভালো লাগলেই ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া

পুরো ডোজ শেষ না করাটা একধরনের খারাপ অভ্যাস। অনেকেই সামান্য শরীর ভালো লাগলেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, ডোজ সম্পূর্ণ শেষ না হলে রোগ পুরোপুরি সারে না এবং ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই দ্রুত সুস্থ হওয়ার একমাত্র পথ। সামান্য অবহেলা বা নিজের মতো সিদ্ধান্তই বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস