খুঁজুন
শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৫ বৈশাখ, ১৪৩৩

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন ঘিরে তোলপাড়, আসল কারণ কী?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন ঘিরে তোলপাড়, আসল কারণ কী?

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব গভর্নর পদে আকস্মিক পরিবর্তন দেশটির অর্থনীতিতে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ নিয়েও নানা আলোচনা চলছে।

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, হঠাৎ কি কারণে মেয়াদ থাকার পরও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটির গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়া হলো।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কযেকদিনের মধ্যে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্ব এবং স্বায়ত্তশাসনের গতিপ্রকৃতি নিয়েও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলেই মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকে।

তারা বলছেন, নতুন সরকার এলে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু যেভাবে এটি করা হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।

সাবেক গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ভালো ইঙ্গিত নয় বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলছেন, “একজনকে সরিয়ে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হলো, তার মানে আগে থেকেই সব প্রস্তুত ছিল। রাখতে না চাইলে ওনাকে আগে থেকেই বলে দিলে হতো।”

এছাড়া মি. মনসুর গভর্নর থাকা অবস্থায় আর্থিক খাতের সংস্কারে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো চলমান থাকবে কিনা- এ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।

অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইন পরিবর্তনের যে কাজগুলো সাবেক গভর্নর করেছেন, সেগুলো সংসদে পাশ না হলে এটি ব্যবহার করে বিগত সরকার যেসব কাজ করেছে তার সবই বৈধতা হারাবে বলেও মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিবর্তন কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান বা আগমনের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার সাথে জড়িত।

গভর্নর হিসেবে নতুন নিয়োগ পাওয়া মোস্তাকুর রহমানকে নিয়েও নানা আলোচনা সামনে আসছে।

বিশেষ করে মি. রহমানের ব্যবসায়িক পরিচয়ের সঙ্গে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করে কিনা, এমন প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে।

তবে এ নিয়ে বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নতুন সরকারের যে কর্মসূচি বা অগ্রাধিকার রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের প্রয়োজনে আরও অনেক জায়গায় পরিবর্তন হবে। এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় বলেও মন্তব্য তার।

“একটা নতুন সরকার এসেছে। নতুন সরকারের অগ্রাধিকার আছে। পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকেই হয়নি। এটা অনেক জায়গায় হচ্ছে এবং হতেই থাকবে,” বলেও জানান মি. চৌধুরী।

পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নানা ইস্যুতে অস্থিরতা চলছিল বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যালয়ে। গভর্নরের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে কর্মসূচি পালন করছিলেন ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানান, সরকার বদলের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র কর্মকর্তাদের অনেকে গভর্নরের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানাচ্ছিলেন।

গত ২৩ ও ২৪শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতৃত্বে কয়েকশ কর্মকর্তা সাবেক গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচিও করেছেন বলে জানান তিনি।

বিক্ষুব্ধদের অভিযোগ ছিল, ড. আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসনে ‘স্বৈরাচারী’ মনোভাব কায়েম করেছিলেন এবং ব্যাংকের নিজস্ব বিধি লঙ্ঘন করে বিলাসবহুল গাড়ি কেনাসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মে জড়িয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে সদ্য সাবেক গভর্নরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার সাড়া মেলেনি।

অবশ্য তাকে দায়িত্ব থেকে সরানোর আগে একটি সংবাদ সম্মেলনে মি. মনসুর দাবি করেছিলেন, কোনো গোষ্ঠীর ইঙ্গিতে প্রতিষ্ঠানের বিধিবিধান না মেনে এখতিয়ার বহির্ভুত বিষয়ে মন্তব্য করায় কয়েকজন কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে।

“বাংলাদেশ ব্যাংকে যেটা ঘটছে সেটি অনভিপ্রেত। কোনো একটা বিশেষ মহল কিছু স্বল্প সংখ্যক কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা এবং অর্জনকে পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে কাজ করছে,” বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক ছিল না বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে যদি বিক্ষোভের মুখে বিদায় নিতে হয়, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।

দেশের ব্যাংক খাতের ভবিষ্যতের জন্য এই ঘটনা মোটেই স্বস্তির নয় বলেও মনে করেন তারা।

নিয়োগ বাতিল ও নতুন নিয়োগের পুরো বিষয়টি একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে যাওয়া উচিত ছিল বলেও মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি বলছেন, “অর্থনীতি নিয়ে সরকারের নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনা থাকতেই পারে কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এভাবে বিদায় জানাতে হবে। আগের গভর্নরকে কেন যেতে হলো, সেটার কারণই আমরা পর্যন্ত বুঝতে পারলাম না।”

সংস্কার কার্যক্রমের কি হবে?

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব বিদ্যমান রয়েছে।

অর্থনীতিবিদের অনেকেই বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে বেশ কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি কাঠামো সংস্কার এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের মতো বেশ কিছু আলোচিত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি।

এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এর পক্ষ থেকেও খেলাপি ঋণ কমানো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপরও কড়া শর্ত দেওয়া হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারির দাবির প্রেক্ষিতে তাকে সরিয়ে দেওয়ার হঠাৎ সিদ্ধান্ত সংস্কার কাজগুলোকে অনিশ্চয়তায় ফেলবে বলেই মনে করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি বলছেন, “রিফর্ম সব সময়ই জটিল। কারণ অনেক পক্ষ এটা পছন্দ করে না, এতে নাখোশ হয়। সেটাতে যদি সরকার প্রভাবিত হয়ে থাকে, সেটা দুঃখজনক।”

বিগত সরকারের সময় নেওয়া আর্থিক খাতের সংস্কার কার্যক্রমগুলোও বাঁধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলছেন, সাবেক গভর্নর অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে আইন পরিবর্তনের কিছু কাজ করেছেন যেগুলো সংসদের মাধ্যমে পাশ হতে হবে।

বিশেষ করে ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স যদি সরকার পাশ না করে, তাহলে এটি ব্যবহার করে বিগত সরকার যেসব কাজ করেছে তার সবই বৈধতা হারাবে।

“পাঁচটি ব্যাংক একিভূতকরণের যে কাজগুলো হয়েছে, যেখানে সরকার ৩২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে এটিও একটি জটিলতার মধ্যে পড়বে,” বলেও মত মি. হোসেনের।

নতুন গভর্নর এবং ‘স্বার্থের সংঘাত’ বিতর্ক

নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত মি. রহমান দেশের আর্থিক খাত সংস্কারে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন, এ নিয়েও নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চলছে।

জানা গেছে, দায়িত্ব পাওয়া নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান পোশাক, আবাসন ও ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, কাগজে কলমে যা আছে কেবল তার ভিত্তিতেই নতুন গভর্নরের যোগ্যতার বিচার করা ঠিক হবে না।

তার ডিগ্রি এবং বিজনেস ব্যাকগ্রাউন্ডের বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার জন্য অপ্রাসঙ্গিক নয় বলেও মনে করেন তিনি।

তবে “কনফ্লিকট অব ইন্টারেস্টের বিষয়গুলো সামনে আসলেই একটু থমকে যেতে হয় যে, এগুলো ঠিকমতো রিসল্ভ হয়েছে কিনা- এটিই প্রশ্ন,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. মোয়াজ্জেম।

সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে অর্থনীতিবিদ বা পেশাদার আমলাদেরই অতীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো এমন একজনকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলো যিনি পোশাক ও রিয়েল এস্টেট খাতের একজন ব্যবসায়ী।

এছাড়া দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকে তার নামে থাকা একটি লোন পুনঃতফসিল করার বিষয়টি নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে।

এক্ষেত্রে ঋণ খেলাপিদের শাস্তি দেওয়া বা ব্যাংক তদারকি করার ক্ষেত্রে তিনি কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন অনেকে।

“তিনি হয়তো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থেকে সরলেন কিন্তু মালিকানা তো তারই। এছাড়া লোন পুনঃতফসিলের বিষয়টিও তো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের জায়গা,” বলেন মি. মোয়াজ্জেম।

এছাড়া এই পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে।

মূলত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত হয় ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অনুযায়ী। যেখানে কিছু নির্দেশনা থাকলেও গভর্নর নিয়োগে নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।

এমনকি ব্যবসায়ী বা অন্য কোনো পেশার মানুষ গভর্নর হতে পারবেন না, এমন কিছুও সেখানে উল্লেখ নেই।

দেশের আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই পদটিতে নিয়োগের সিদ্ধান্ত সরকারের। এক্ষেত্রে চার বছর মেয়াদে নিয়োগের কথা বলা হলেও সরকার চাইলে মেয়াদ বাড়াতে পারবে।

গভর্নর নিয়োগ এবং বাতিলের একটি প্রক্রিয়া থাকা উচিত বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলছেন, “যোগ্য ব্যক্তিদের শর্টলিস্ট করে, তাদেরকে ডাকা হবে, তার মধ্য থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।” এটি না হলে নিয়োগ এবং বাতিলের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

ফোনের নীল আলোই কি আপনার ঘুমের বারোটা বাজাচ্ছে?

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:১১ পূর্বাহ্ণ
ফোনের নীল আলোই কি আপনার ঘুমের বারোটা বাজাচ্ছে?

দশকের পর দশক ধরে আমাদের সতর্ক করা হচ্ছে যে, শোবার আগে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের পর্দার নীল আলো আমাদের ঘুমের চরম শত্রু। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, আসল অপরাধী হয়তো এই আলো নয়, বরং অন্য কিছু।

গত ১০ বছর ধরে আমরা শুনে আসছি, ডিজিটাল ডিভাইসের নীল আলো শরীরের প্রাকৃতিক ঘড়ি বা ‘বডি ক্লক’-এর ছন্দ নষ্ট করে দেয়। এই ভয়ের সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৪ সালের একটি গবেষণার মাধ্যমে, যেখানে দেখা গিয়েছিল ঘুমানোর আগে আইপ্যাড ব্যবহারকারীদের ঘুম আসতে দেরি হয় এবং তাদের শরীরে মেলাটোনিন (নিদ্রা হরমোন) কম তৈরি হয়।

তবে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেমি জেইটজার এই গবেষণাকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ল্যাবরেটরির কৃত্রিম পরিবেশে যা দেখা যায়, বাস্তব জীবনে মানুষের অভিজ্ঞতা তার চেয়ে অনেক আলাদা।

কেন নীল আলোই একমাত্র কারণ নয়?

বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের চোখের ‘মেলানোপসিন’ নামক একটি প্রোটিন নীল আলোর প্রতি সংবেদনশীল এবং এটি ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে ঠিকই, কিন্তু ফোনের স্ক্রিন থেকে যে পরিমাণ আলো নির্গত হয়, তা ঘুমের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট নয়।

১১টি গবেষণার এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফোনের আলো বড়জোর আপনার ঘুমকে মাত্র ৯ মিনিট দেরি করিয়ে দিতে পারে, যা জীবন বদলে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা রোদে মাত্র এক মিনিট থাকলে যে পরিমাণ নীল আলোর সংস্পর্শে আসি, ডিজিটাল ডিভাইস থেকে সেই পরিমাণ আলো পেতে টানা ২৪ ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। এমনকি মেঘলা দিনেও বাইরের আলোর তীব্রতা থাকে ১০,০০০ লাক্স, যেখানে আপনার ফোনের সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতা মাত্র ৫০ থেকে ৮০ লাক্স।

আসল সমস্যা কোথায়?

গবেষকরা বলছেন, নীল আলোর চেয়েও বড় সমস্যা হলো আপনি শোবার আগে ফোনে কী দেখছেন বা করছেন। অধ্যাপক জেইটজারের মতে, পর্দার আলোর চেয়ে ফোনের ‘কনটেন্ট’ বা বিষয়বস্তু মানুষকে বেশি জাগিয়ে রাখে। সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করা বা উত্তেজনাপূর্ণ কোনো ভিডিও দেখার ফলে মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে ওঠে, যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়।

ভালো ঘুমের আসল দাওয়াই

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের মান উন্নত করতে নীল আলোর ফিল্টার বা বিশেষ চশমা ব্যবহারের চেয়ে ‘টোটাল লাইট এক্সপোজার’ বা সারাদিনে আপনি কতটা আলো পাচ্ছেন তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

১. দিনের শুরুতে পর্যাপ্ত আলো:*সকালে ঘুম থেকে উঠে যত বেশি সম্ভব উজ্জ্বল আলোর সংস্পর্শে থাকুন। এটি আপনার বডি ক্লককে সজাগ করে তোলে এবং রাতে দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে।

২. বিকেলে বাইরে হাঁটা: বিকেল ৩টার পর অন্তত ৩০ মিনিট বাইরে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। এটি আপনার শরীরকে রাতের আলোর প্রতি কম সংবেদনশীল করে তুলবে।

৩. আলোর বৈপরীত্য (Contrast): দিনের বেলা ঘর উজ্জ্বল রাখুন এবং রাত বাড়ার সাথে সাথে আলো কমিয়ে দিন। এই বৈপরীত্য শরীরকে বুঝতে সাহায্য করে যে এখন ঘুমের সময়।

মোমবাতির আলো ও মনস্তাত্ত্বিক সংকেত

ফিচারের লেখক থমাস জার্মেইন তার ব্যক্তিগত পরীক্ষায় দেখেছেন যে, নীল আলো আটকানো বিশেষ চশমা খুব একটা আরামদায়ক নয়। তবে রাতে মোমবাতি বা মৃদু আলো ব্যবহার করা একটি কার্যকর ‘সাইকোলজিক্যাল কিউ’ বা মনস্তাত্ত্বিক সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে। যখন আমরা স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা কমাই বা ঘরের আলো নিভিয়ে দিই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক প্যাভলভিয়ান কন্ডিশনিংয়ের মাধ্যমে বুঝে নেয় যে ঘুমের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, ফোনের নীল আলোকে পুরোপুরি দোষ না দিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং শোবার আগের অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়াই হবে সুনিদ্রার আসল চাবিকাঠি।

তথ্যসূত্র : বিবিসি

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের বড় দরপতন, দেশে দাম কমছে কবে?

আমিনুল মজলিশ
প্রকাশিত: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের বড় দরপতন, দেশে দাম কমছে কবে?

দীর্ঘ উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে ইরান সরকার ‘হরমুজ প্রণালী’ সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। আর এই একটি ঘোষণাতেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন আর সরকারের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই, বরং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়ামে করপোরেশনের (বিপিসি) নিয়ম অনুযায়ী লিটারপ্রতি দাম ৫ থেকে ৮ টাকা কমতে পারে।

তারা বলছেন, এ ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক কমবে এবং প্যানিক বায়িং কমবে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে বলেও জানান তারা।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। অথচ দিনের শুরুতেও এর দাম ছিল ৯৮ ডলারের ওপরে।

বিশ্ববাজারের চিত্র বলছে, শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ দশমিক ৫৯ ডলার কমে ৮৮ দশমিক ৮০ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে মার্কিন ডব্লিউটিআই তেলের দাম প্রায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৩ দশমিক ৮৯ ডলারে অবস্থান করছে।

এ প্রসঙ্গে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, এরই মধ্যে পেট্রোল পাম্প মালিকরা বিপিসির সঙ্গে বৈঠকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। সে অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে আভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন বিশ্ববাজারে দাম কমার ফলে সে সুযোগ আর থাকছে না। কারণ বিপিসির স্বয়ংক্রিয় ফরমুলা অনুযায়ী ১৫ দিন বা এক মাসের আন্তর্জাতিক গড় দামের ওপর ভিত্তি করে দেশীয় মূল্য নির্ধারিত হয়। সে হিসাবে বিশ্ববাজারের এই ১৩ শতাংশ পতন দেশের ভোক্তাদের জন্য অন্তত ৫ থেকে ৮ টাকা (লিটারপ্রতি) দাম কমার সুযোগ তৈরি করতে পারে। আমরা সেটাই প্রত্যাশা করি।

আইইইর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় এবং মার্কিন-ইরান সম্ভাব্য চুক্তির খবরে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কমেছে, এর প্রতিফলন ঘটেছে এই দরপতনে। দেশের বাজারে নিঃসন্দেহে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে সরকারের মনিটরিংয়ে কোনো শিথিলতা আনা যাবে না।

এ প্রসঙ্গে বিপিসির সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তেলের দামের এই বড় পতন যদি চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বজায় থাকে, আগামী মে মাসের শুরুতেই, অর্থাৎ পহেলা মে থেকে সরকার বড় ধরনের দাম কমানোর ঘোষণা দিতে পারে।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মীর আহসান পারভেজ বলেন, গত কয়েক দিনে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনার কারণে দেশে যে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা এখন কেটে যাবে। আমাদের কাছে যেটুকু তথ্য রয়েছে, তা হচ্ছে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং নতুন শিপমেন্টগুলোও এখন নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ফরিদ আহমেদ পাঠান বলেন, বিশ্ববাজারে দাম কমার সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে সরকারকে দ্রুত সমন্বয় করতে হবে। তেলের দাম কমলে শুধু পকেটের সাশ্রয় হবে না, বরং পরিবহন ভাড়া এবং কৃষি সেচের খরচ কমার মাধ্যমে নিত্যপণ্যের বাজারেও বড় ধরনের স্বস্তি আসবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত হওয়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় ‘টার্নিং পয়েন্ট’। এখন সাধারণ মানুষের চোখ মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে। সরকার যদি বিশ্ববাজারের এই সুফল দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চায়, তবে ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সঠিক নজরদারি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। তবেই জনমনে আস্থা ফিরে আসবে।

ফরিদপুরে ছাত্রদলের বিক্ষোভ: ‘আপত্তিকর ফেসবুক পোস্টের’ প্রতিবাদে আসিফের গ্রেপ্তার দাবি

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৫৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ছাত্রদলের বিক্ষোভ: ‘আপত্তিকর ফেসবুক পোস্টের’ প্রতিবাদে আসিফের গ্রেপ্তার দাবি

ফরিদপুরে জেলা ছাত্রদলের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বিকেলে শহরের জনতা ব্যাংক মোড়ে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ.কে.এম কিবরিয়া স্বপনকে নিয়ে ফরিদপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মোরশেদুল ইসলাম আসিফের ফেসবুক পোস্টের প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। একইসঙ্গে তার গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান নেতাকর্মীরা।

সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, মোরশেদুল ইসলাম আসিফ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেলা বিএনপির সদস্য সচিবসহ দলটির বিভিন্ন নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর, মানহানিকর ও আপত্তিকর মন্তব্য করে আসছেন। এসব কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করছে বলেও দাবি করেন তারা।

বক্তারা আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের সম্মানহানি করা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ফরিদপুর জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি অনিক খান জিতুর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক মাইদুল ইসলাম সরুনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মামুনুর রহমান।

সমাবেশ থেকে বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। একইসঙ্গে তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে।

সমাবেশ শেষে একটি সংক্ষিপ্ত বিক্ষোভ মিছিল জনতা ব্যাংক মোড়ের আশপাশের সড়ক প্রদক্ষিণ করে শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হয়।