খুঁজুন
, ,

গণঅভ্যুত্থানের পর কতটা স্বাধীন বাংলাদেশের গণমাধ্যম?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ
গণঅভ্যুত্থানের পর কতটা স্বাধীন বাংলাদেশের গণমাধ্যম?

২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারকে উৎখাত করেনি—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং তথ্যপ্রবাহের কাঠামোকেও আমূল পরিবর্তন করেছে।

ছাত্র, শ্রমিক ও নাগরিক সমাজের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার যেমন রাজনৈতিক সংস্কারের সূচনা করেছে, তেমনি সংবাদমাধ্যমও এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে—যেখানে ভয়, নীরবতা ও প্রচারযন্ত্রের জায়গা নিচ্ছে প্রশ্ন, সমালোচনা ও বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি।

এই প্রতিবেদনে আমরা তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করেছি অভ্যুত্থানের আগে ও পরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বয়ান, টোন, কাভারেজ ও সেন্সরশিপের ধরন, এবং অনুসন্ধান করেছি—স্বাধীনতার পরিধি কতটা বেড়েছে, আবার কোন কোন সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

১. অভ্যুত্থানের আগে: ভয়, নিয়ন্ত্রণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের যুগ

জুলাই ২০২৪-এর পূর্ববর্তী সময় ছিল বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি।

আইনি নিপীড়ন: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) এবং পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করা হতো সাংবাদিক, লেখক ও নাগরিকদের দমন করতে।

সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ: বড় মিডিয়া হাউসগুলো রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে ছিল, ফলে সরকারবিরোধী বক্তব্য বা দুর্নীতির খবর প্রায় অনুপস্থিত ছিল।

ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণ: অসংখ্য সাংবাদিক হয়রানি, গ্রেফতার বা মামলার মুখোমুখি হন; এর ফলে স্বতঃস্ফূর্ত আত্মনিয়ন্ত্রণই হয়ে ওঠে নিরাপত্তার একমাত্র কৌশল।

ফলে সংবাদমাধ্যম হয়ে পড়ে এক রঙের বয়ানমাধ্যম—যেখানে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা ছিল অপরাধের শামিল, আর নাগরিক প্রতিবাদগুলোকে উপস্থাপন করা হতো ‘অরাজকতা’ হিসেবে।

২. বাঁকবদল: জুলাই অভ্যুত্থান ও তথ্যনিয়ন্ত্রণের পতন

২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন ছাত্র-জনতার ঢেউ রাস্তায় নেমে এলো, তখন রাষ্ট্রীয় মিডিয়া কাঠামো প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

ফেসবুক, ইউটিউব, ও টেলিগ্রাম হয়ে ওঠে নাগরিক সংবাদমাধ্যমের মূল মঞ্চ

মেইনস্ট্রিম টিভি ও পত্রিকা যখন নীরব, তখন হাজারো তরুণ সরাসরি সম্প্রচার করছিলেন রাজপথ থেকে।

#StudentRevolution এবং #BangladeshUprising হ্যাশট্যাগে মিলিয়ন মানুষের ডিজিটাল উপস্থিতি রাষ্ট্রীয় প্রচারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

এই সময়েই শুরু হয় তথ্যের গণতন্ত্রীকরণ—যেখানে রাষ্ট্রের চেয়ে নাগরিকরাই হয়ে ওঠে তথ্যের মূল উৎস। তবে এর সাথে ছড়িয়ে পড়ে গুজব, বিভ্রান্তি ও একাধিক সত্যের সংঘাত, যা আজও বিদ্যমান।

৩. অভ্যুত্থানের পরের প্রেক্ষাপট: স্বাধীনতা ফিরে এসেছে, তবে ভঙ্গুর

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিশ্রুতি দেয় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের।
এর ফলে কিছু বাস্তব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে—

ক. প্রত্যক্ষ সেন্সরশিপের হ্রাস

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি আইনি চাপ অনেক কমে গেছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বাড়ছে, বিশেষ করে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে।

খ. সম্পাদকীয় সাহসের প্রত্যাবর্তন

টকশো, সম্পাদকীয় ও মতামত কলামগুলোতে এখন মতের বৈচিত্র্য বেড়েছে। প্রধান সংবাদপত্রগুলো সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনাও প্রকাশ করছে উন্মুক্তভাবে।

গ. বিকল্প মিডিয়ার উত্থান

বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক নাগরিক সংবাদ উদ্যোগ, ইউটিউব টকশো ও স্বাধীন ডিজিটাল ম্যাগাজিন এখন নতুন আস্থার জায়গা তৈরি করছে।

তবে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও নীতিগত অস্পষ্টতা এখনো মিডিয়ার টেকসই স্বাধীনতার পথে প্রধান বাধা।

৪. স্থায়ী চ্যালেঞ্জ: অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ও কাঠামোগত দুর্বলতা

নতুন স্বাধীনতার ভেতরেও কিছু গভীর সমস্যা রয়ে গেছে—

অর্থনৈতিক নির্ভরতা: অধিকাংশ মিডিয়া এখনো রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল।

আইনি সংস্কারের অভাব: কার্যকর তথ্য অধিকার আইন ও হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা না থাকায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সীমিত।

মেরুকৃত বয়ান: রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব মিডিয়া ন্যারেটিভ গড়ে ওঠায় যৌথ বাস্তবতা দুর্বল হচ্ছে।

ডিজিটাল হয়রানি: বিশেষত নারী সাংবাদিকরা এখনো অনলাইন হুমকি ও অপপ্রচারের মুখোমুখি।

অর্থাৎ, ভয় কমেছে ঠিকই, কিন্তু স্বাধীনতার মূল্য এখনো অনেক বেশি।

৫. প্রতিবাদ ও নাগরিক কণ্ঠের উপস্থাপন: আগে ও পরে

১২টি প্রধান বাংলা ও ইংরেজি মিডিয়ার (এপ্রিল–সেপ্টেম্বর ২০২৪ বনাম আগস্ট–অক্টোবর ২০২৫) কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে—

সূচকঅভ্যুত্থানের আগেঅভ্যুত্থানের পরেপ্রতিবাদের খবরের হার৬%১৯%নাগরিক আন্দোলনের ইতিবাচক উপস্থাপন১৪%৬৩%সরকারি প্রেস রিলিজকে মূল উৎস হিসেবে ব্যবহার৪৮%২৩%স্বাধীন বিশেষজ্ঞ/একাডেমিক সূত্র ব্যবহার১২%৩৭%

এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে, বয়ানের বৈচিত্র্য বেড়েছে, যদিও তা এখনো প্রধানত শহরকেন্দ্রিক ও অভিজাতমুখী।

৬. ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ: মুক্তির পর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ

গণঅভ্যুত্থানের পর সংবাদমাধ্যম একটি পুনর্গঠনের সময় অতিক্রম করছে।
এই স্বাধীনতাকে স্থায়ী করতে হলে প্রয়োজন—

একটি স্বাধীন প্রেস ফ্রিডম কমিশন, যা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করবে।

মিডিয়া মালিকানার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

জনস্বার্থ তহবিল গঠন করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা উৎসাহিত করা।

ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি, যাতে ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তি মোকাবিলা করা যায়।

এভাবেই গণমাধ্যম স্বাধীনতা একক ঘটনা থেকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নিতে পারে।

গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে—
ভয় থেকে মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু টেকসই হওয়ার জন্য এখনো সংগ্রাম করছে।

যেখানে আগে ছিল নীরবতা, এখন সেখানে প্রশ্ন আছে।
কিন্তু প্রশ্ন টিকে থাকার জন্য দরকার স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান, আর্থিক স্বচ্ছতা, এবং পেশাদার নৈতিকতার সংস্কৃতি।

স্বাধীনভাবে কথা বলাই যথেষ্ট নয় — এখন প্রয়োজন এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সত্য টিকে থাকতে পারে।

সূত্র : মিডিয়া ওয়াচ বাংলাদেশ

ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও আবু নাসের হোসাইন, সালথা:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। প্রচলিত ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের গণ্ডি পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ শুরু হয়েছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায়। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির ৮ বিঘা জমিতে আনারসের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফরিদপুর অঞ্চলে এ ধরনের বৃহৎ পরিসরের আনারস চাষ আগে দেখা যায়নি। ফলে মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প ও লাভজনক ফলচাষের পথ উন্মুক্ত হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যদুনন্দী গ্রামের দুটি পৃথক প্লটে বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত বাগানজুড়ে চলছে নিয়মিত পরিচর্যা। দূর থেকে দেখলে সবুজের সমারোহে ভরা বাগানটি যে কারও দৃষ্টি কাড়ে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কৃষকরা বাগান পরিদর্শনে আসছেন এবং আনারস চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

জানা গেছে, মিলন ফকির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিপণ্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে তিনি বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারস গাছ লাগান। আশাতীত ফলন ও সফলতা তাকে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি পরিকল্পিতভাবে আনারস চাষের জন্য জমি নির্বাচন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

চলতি বছরে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের প্রায় ৮০ হাজার আনারসের চারা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ৮ বিঘা জমিতে এসব চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে বাগানের গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং আগামী বছর থেকে ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির বলেন, “প্রথমে শখের বসে বাড়ির ছাদে কয়েকটি আনারস গাছ লাগিয়েছিলাম। গাছে ভালো ফল আসার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তখন মনে হলো, বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই এবার বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, সেচ ব্যবস্থা, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী বছর ফল সংগ্রহ করা যাবে। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

মিলন ফকির জানান, শুধু ফল বিক্রিই নয়, ভবিষ্যতে আনারসের উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রিরও পরিকল্পনা রয়েছে তার। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত আয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরাও সহজে মানসম্পন্ন চারা সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, “আমার এই উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করবো।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সালথা এলাকায় এর আগে কখনো এভাবে বাণিজ্যিক আকারে আনারস চাষ হতে দেখা যায়নি। ফলে বাগানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা সাধারণত ধান, পাট ও সবজি চাষ করি। আনারস চাষের কথা কখনো ভাবিনি। মিলন ফকিরের বাগান দেখে মনে হচ্ছে এটি লাভজনক হতে পারে। ফলন ভালো হলে আমরাও এ ধরনের ফলচাষে আগ্রহী হবো।”

আরেক কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাগানটি দেখতে খুব সুন্দর। প্রতিদিন অনেক মানুষ দেখতে আসছে। সফল হলে এটি এলাকার কৃষকদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত হবে।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস একটি লাভজনক ফল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আনারসের চাষ হয়। বর্তমানে বাজারে আনারসের চাহিদা বাড়ছে এবং ফলটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হজম সহায়ক উপাদান। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে আনারসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “সালথা উপজেলায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে কৃষিতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাভজনক ফল ও ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. রইচ উদ্দিন বলেন, “ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের জেলায় সাধারণত ধান, পাট, গম ও বিভিন্ন সবজি চাষের প্রচলন বেশি থাকলেও কৃষিতে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নতুন নতুন ফল ও ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। মিলন ফকিরের মতো উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা বাগানের অবস্থা সন্তোষজনক দেখেছি এবং কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। যদি ফলন ও বাজারজাতকরণ সফল হয়, তাহলে ফরিদপুরের অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। এতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় ফরিদপুর অঞ্চলেও আনারস চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে মিলন ফকিরের এই সাহসী পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার স্বপ্ন সফল হলে শুধু একজন উদ্যোক্তার আর্থিক উন্নয়নই নয়, বরং ফরিদপুরে আনারস চাষের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন সম্ভাবনা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত হবে আয়ের নতুন দিগন্ত।

কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

সুস্থ থাকতে ফলের কোনো বিকল্প নেই। তবে যখন প্রশ্ন আসে রক্তে শর্করার বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের, তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান যে কোন ফলটি বেছে নেবেন। বিশেষ করে জনপ্রিয় দুটি ফল কমলা এবং কলার মধ্যে কোনটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বা যারা চিনি নিয়ে সচেতন তাদের জন্য বেশি উপকারী, তা নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের।

যদিও উভয় ফলেই প্রাকৃতিক চিনি থাকে, কিন্তু পুষ্টিগত গঠন এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের (জিআই) পার্থক্যের কারণে শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রায় এদের প্রভাব ভিন্ন হয়।

আজকের ফিচারে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজে দেখব, আপনার শরীরের জন্য এই দুটি ফলের মধ্যে কোনটি বেশি নিরাপদ এবং কীভাবে খেলে আপনার শর্করা থাকবে নিয়ন্ত্রণে।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সে কে এগিয়ে?

রক্তে শর্করার ব্যবস্থাপনায় কমলার পাল্লা কিছুটা ভারী বলে মনে করা হয়। কারণ কমলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাত্র ৩৫, যা বেশ কম। অন্যদিকে, একটি পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাধারণত ৪৮ এর কাছাকাছি থাকে। যেহেতু কমলার জিআই কম, তাই এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কলার তুলনায় ধীরে বৃদ্ধি করে।

পুষ্টির তুলনা: একনজরে

একটি মাঝারি আকারের কলা (১১৮ গ্রাম) এবং একটি মাঝারি কমলার (১৩১ গ্রাম) পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

ক্যালরি: কলায় থাকে ১০৫ ক্যালরি, যেখানে কমলায় থাকে মাত্র ৬১.৬ ক্যালরি।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা: কলায় শর্করার পরিমাণ ২৬.৯ গ্রাম, অন্যদিকে কমলায় তা ১৫.৫ গ্রাম।

ভিটামিন সি: কমলায় প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে (দৈনিক চাহিদার ৭৭%), যা কলার (১০.৩ মিলিগ্রাম) তুলনায় অনেক বেশি। শর্করার পরিমাণ কম এবং ভিটামিন সি-এর আধিক্যের কারণে কমলা রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় কিছুটা বেশি সুবিধাজনক।

কলার গুণাগুণ: পাকা নাকি আধাপাকা?

কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে এর পরিপক্কতা বা কতটা পেকেছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কম পাকা বা কিছুটা সবুজ কলায় ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ নামক এক ধরণের কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা সহজে হজম হয় না এবং রক্তে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরণের স্টার্চ ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। তবে কলা যত বেশি পাকে, তার জিআই তত বাড়তে থাকে এবং তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে।

কমলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য

কমলায় থাকা সাইট্রাস পেকটিন নামক দ্রবণীয় ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার শোষণ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা হেস্পেরিডিন এবং নারিঞ্জিনের মতো ফ্ল্যাভোনয়েডগুলি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রেখে ফল খাওয়ার কিছু কৌশল

আপনি কলা বা কমলা যা-ই পছন্দ করুন না কেন, রক্তে শর্করার প্রভাব কমাতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:

১. আস্ত ফল খান, রস নয়: ফলের রস করলে এর প্রয়োজনীয় ফাইবার নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দেয়। তাই সব সময় আস্ত ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।

২. প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সাথে খান: ফলের সাথে কিছু বাদাম, গ্রিক ইয়োগার্ট বা পনির মিশিয়ে খেলে হজম ধীর হয় এবং সুগার স্পাইক বা শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমে।

৩. পরিমিত মাত্রা: ফল যত উপকারীই হোক না কেন, পরিমাণে বেশি খেলে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই সব সময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

৪. কলা কিনুন কিছুটা কাঁচা: ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে খুব বেশি পাকা কলার চেয়ে কিছুটা কম পাকা বা শক্ত কলা বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষকথা

কমলা এবং কলা উভয়ই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হতে পারে। তবে যাদের রক্তে শর্করার সমস্যা আছে, তাদের জন্য কম শর্করার কারণে কমলা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়াও সম্পূর্ণ নিরাপদ।

তথ্যসূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ

 

ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১০:২৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় বিষাক্ত সাপের কামড়ে সেক আব্দুল্লাহ (৫) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

শনিবার (২০ জুন) দুপুর ১২টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত আব্দুল্লাহ উপজেলার গাজিরটেক ইউনিয়নের চর অমরাপুর গ্রামের সেক শাহেদের ছেলে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল পরিবারের সবার ছোট এবং অত্যন্ত আদরের সন্তান।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে বাড়ির পেছনে খেলাধুলা করছিল আব্দুল্লাহ। এ সময় একটি কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে থাকা বিষাক্ত সাপ তার পায়ে কামড় দেয়। কামড় খাওয়ার পর শিশুটি বাড়িতে এসে মাকে জানায়, তাকে ‘ব্যাঙে কামড় দিয়েছে’। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়ায় পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে নিয়ে যান, যিনি নিজেকে ঝাড়ফুঁক ও চিকিৎসাজ্ঞানসম্পন্ন বলে পরিচয় দেন।

শিশুটির চাচি আখি আক্তার জানান, স্থানীয় শহীদ ফকির নামে এক ব্যক্তির কাছে নেওয়ার পর তিনি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, এটি সাপের কামড় নয়। তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে কিছু সময় সেখানে কাটানো হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আব্দুল্লাহর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে।

পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও দুপুরের দিকে শিশুটি মারা যায়।

গাজিরটেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “প্রথমে শিশুটিকে স্থানীয় এক ফকিরের কাছে নেওয়া হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

আব্দুল্লাহর অকাল মৃত্যুতে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো চর অমরাপুর গ্রাম। প্রতিবেশীরাও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।