ভাঙেনি সততা, হার মানেনি বিবেক: এক গ্রামীণ সাংবাদিকের জীবনগাথা
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার চেয়ে নিজের কাজটিকে নিভৃতে করে যেতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। প্রচার-প্রচারণা, আত্মপ্রচার কিংবা নিজের অর্জন নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হওয়া—এসব যেন তার স্বভাবের সঙ্গে যায় না। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরতে, মানুষের কষ্টের কথা তুলে ধরতে এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়াতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন। তিনি ফরিদপুরের নগরকান্দার পরিচিত সাংবাদিক মিজানুর রহমান বাবু, যিনি সবার কাছে মিজান বাবু নামেই অধিক পরিচিত।
১৯৭৫ সালের ১ আগস্ট ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের কুমারপট্টি গ্রামে জন্ম তার। বাবা ছিলেন একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু জীবনের শুরুতেই নেমে আসে বড় এক দুঃখ। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে, ১৯৮০ সালে বাবাকে হারান তিনি। বাবার স্নেহ হারিয়ে ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম যেন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
অভাব-অনটনের মধ্যেও থেমে থাকেননি। শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিয়েছেন নিজের চেষ্টায়। ১৯৯১ সালে নগরকান্দার এম.এন. একাডেমি থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৯৩ সালে ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে একই কলেজে বাংলা বিভাগে অনার্সে ভর্তি হলেও নানা বাস্তবতার কারণে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। এরপর প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার আগেই মানুষের কথা বলার এক অদম্য ইচ্ছা তাকে টেনে আনে সাংবাদিকতায়। ২০১০ সালে ফরিদপুরের স্থানীয় দৈনিক কুমার পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু করেন। একই বছর জাতীয় দৈনিক ভোরের ডাক-এর নগরকান্দা উপজেলা সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর একে একে কাজ করেন দৈনিক সংবাদ, সকালের খবর, আলোকিত বাংলাদেশ এবং মানবকণ্ঠ পত্রিকায়। ২০১৬ সাল থেকে তিনি জাতীয় দৈনিক যুগান্তর-এর নগরকান্দা উপজেলা সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ এই পথচলায় সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জনই ছিল তার সবচেয়ে বড় অর্জন।
গ্রামীণ সাংবাদিকতার বাস্তবতা সহজ নয়। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, নানা ধরনের চাপ ও ঝুঁকির মধ্য দিয়েই কাজ করতে হয়। তবু মিজান বাবু বিশ্বাস করেন, সাংবাদিকতার মূল শক্তি সত্যনিষ্ঠা। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি বহুবার ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে কলম ধরেছেন।
এই পথচলায় তাকে নানা প্রতিকূলতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে হামলা, মামলা, হুমকি—সবকিছুরই শিকার হয়েছেন। অনেক সময় সামাজিক ও পেশাগতভাবে একঘরে করার চেষ্টাও হয়েছে। তবু তিনি থেমে যাননি। কারণ তার বিশ্বাস, সাংবাদিকতা যদি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার না হয়, তবে সেই সাংবাদিকতার মূল্য অনেকটাই কমে যায়।
তার সহকর্মীদের অনেকেই বলেন, মিজান বাবুর সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্পষ্টবাদিতা। তিনি যেটিকে সত্য মনে করেন, সেটিই বলতে চেষ্টা করেন। এই স্বভাবের কারণে যেমন অনেকের শ্রদ্ধা পেয়েছেন, তেমনি অনেকের বিরাগভাজনও হয়েছেন। কিন্তু জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকাকেই তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
আর্থিক দিক থেকেও তার জীবন খুব স্বচ্ছল নয়। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেও বিলাসী জীবন তার ভাগ্যে জোটেনি। কিন্তু অর্থকষ্ট কখনোই তাকে নীতির সঙ্গে আপস করতে শেখাতে পারেনি। পরিচিতজনদের ভাষ্য, তিনি কখনো কাউকে ভয় দেখিয়ে, ব্ল্যাকমেইল করে কিংবা কারও দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেননি। সংবাদকে কখনো ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম বানানোর চেয়ে মানুষের আস্থাকে বেশি মূল্য দিয়েছেন।
অপ-সাংবাদিকতার বিরুদ্ধেও তিনি বরাবরই সোচ্চার। সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল কিংবা সংবাদকে বাণিজ্যের হাতিয়ার বানানোর প্রবণতার সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, একটি সমাজে সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে সাংবাদিকদের নিজেদেরও জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে।
পেশাগত ব্যস্ততার বাইরেও তার রয়েছে কিছু ভিন্ন আগ্রহ। তিনি ছবি আঁকতে ভালোবাসেন, কবিতা আবৃত্তি করতে পছন্দ করেন এবং সুযোগ পেলেই নতুন নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। প্রকৃতি, গ্রামবাংলার জীবন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকতেই যেন তিনি সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে। চাকচিক্যপূর্ণ পোশাক বা বিলাসী জীবন তাকে আকর্ষণ করে না। একটি সাধারণ টি-শার্ট ও ট্রাউজার পরেই তাকে অধিকাংশ সময় দেখা যায়। স্ত্রী রাকিবা আক্তারী পরিবার পরিকল্পনা সহকারী হিসেবে কর্মরত। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে চলেছেন তিনি।
মজার বিষয় হলো, নিজের সম্পর্কে লেখা বা প্রচার তিনি একেবারেই পছন্দ করেন না। পরিচিতদের ভাষ্য, নিজের কাজের চেয়ে কাজের ফলাফলকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। এমনকি তাকে নিয়ে এই ধরনের লেখা প্রস্তুতের সময়ও তিনি বারবার লেখকের ফোন সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যাতে নিজের বিষয়ে কিছু লেখা না হয়। নিজের ছবি তুলতেও অনীহা প্রকাশ করেন। অনেক অনুরোধের পর একটি ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে।
এই অনীহা হয়তো তার ব্যক্তিত্বেরই একটি অংশ। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, একজন সাংবাদিকের কাজ নিজেকে নয়, সমাজকে সামনে নিয়ে আসা। সংবাদে যেন মানুষ থাকে, সাংবাদিক নয়—এমন একটি দর্শন তিনি ধারণ করেন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সাংবাদিকতার ইতিহাসে অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা আলোচনার বাইরে থেকেও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। মিজান বাবুও সেই সারির একজন। জাতীয় পর্যায়ে খুব বেশি পরিচিত না হলেও স্থানীয় মানুষের সুখ-দুঃখ, অন্যায়-অনিয়ম, সম্ভাবনা ও সংকটের গল্প বছরের পর বছর ধরে তুলে ধরেছেন তিনি।
সাংবাদিকতার পেশায় সাফল্যকে অনেকেই পদ-পদবি, খ্যাতি কিংবা আর্থিক অবস্থান দিয়ে মাপেন। কিন্তু আরেক ধরনের সাফল্যও আছে—যেখানে একজন মানুষ নিজের নীতি, সততা ও বিবেককে অক্ষুণ্ন রেখে পথ চলেন। সেই পথ হয়তো সহজ নয়, অনেক সময় নিঃসঙ্গও। তবু সেই পথই সমাজে কিছু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে।
মিজান বাবুর জীবনগল্প হয়তো কোনো রূপকথা নয়। এতে নেই বড় কোনো ক্ষমতার গল্প কিংবা বিত্তের ঝলকানি। আছে সংগ্রাম, সততা, দায়িত্ববোধ এবং সত্যের প্রতি এক ধরনের অবিচল আস্থা। সেই কারণেই তিনি হয়তো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নন, কিন্তু নীরবে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া একজন গ্রামীণ সাংবাদিক হিসেবে অনেকের কাছে সম্মানের নাম।
লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

আপনার মতামত লিখুন
Array