ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের প্রধান সহকারী (হেড ক্লার্ক) মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে বদলি-পদায়ন বাণিজ্য, ঘুষ-দুর্নীতি, ঠিকাদারি কাজে কমিশন গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য ও নারী সহকর্মীদের হয়রানিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতির কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) ফরিদপুর জেলার ঠিকাদার ও সর্বসাধারণের পক্ষে ইউসুফ মিয়া স্বাক্ষরিত আবেদনটি জমা দেওয়া হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থেকে মহিউদ্দিন জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। দাপ্তরিক নিয়মকানুন ও গোপনীয়তা উপেক্ষা করে তিনি বদলি-পদায়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব খাটাচ্ছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন থানা, তদন্ত কেন্দ্র, ট্রাফিক বিভাগ ও পুলিশ ফাঁড়িতে কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) পর্যায়ের সদস্যদের পছন্দমতো পদায়নের জন্য নির্ধারিত হারে অবৈধ অর্থ লেনদেন করা হয়। চাহিদামতো অর্থ না দিলে দুর্গম, প্রশাসনিকভাবে জটিল কিংবা অপছন্দনীয় স্থানে বদলি করার ভয় দেখানো হয়।
আবেদনপত্রে আরও অভিযোগ করা হয়, সাধারণ পুলিশ সদস্যদের নৈমিত্তিক ছুটি, অর্জিত ছুটি ও চিকিৎসাজনিত ছুটির ফাইল প্রক্রিয়াকরণে অযাচিত বিলম্ব করা হয়। অর্থ ছাড়া এসব ফাইল পুলিশ সুপারের কাছে উপস্থাপন করা হয় না বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য এবং মৃত্যুবরণকারী সদস্যদের পরিবারের পেনশন ও গ্র্যাচুইটির ফাইল আটকে রেখে হয়রানি এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) অনুকূলে লেখা, ইতিবাচক মন্তব্য প্রদান, সার্ভিস বুক সংরক্ষণ এবং বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সদস্যদের পদোন্নতির ফাইল প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রেও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন আবেদনকারী।
জেলা পুলিশের বার্ষিক কেনাকাটা, স্টেশনারি মালামাল সরবরাহ, দাপ্তরিক মেরামত ও অন্যান্য ব্যয়ের ভাউচার তৈরিতে অস্বাভাবিক বাজেট দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জেলা পুলিশের বিভিন্ন টেন্ডারের বিজ্ঞাপন প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের পরিবর্তে তিনি নিজেই ঢাকার পত্রিকা অফিসে যোগাযোগ করেন। এ প্রক্রিয়ায় কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া অন্তত পাঁচ বছর ধরে মানিকগঞ্জের ঊষা এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্স ব্যবহার করে মহিউদ্দিন নিজেই জেলা পুলিশের বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ নিয়ে কমিশন গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্য ঠিকাদারদের কাজের বিপরীতে কৌশলে ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়া এবং জেলা পুলিশে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আবেদনকারীর দাবি, এসব কারণে ফরিদপুরের স্থানীয় ঠিকাদাররা গত পাঁচ বছর ধরে জেলা পুলিশের বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মহিউদ্দিন ও তার পরিবারের নামে অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের সঙ্গে বৈধ আয়ের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।
এতে উল্লেখ করা হয়, তার নিজ জেলা মানিকগঞ্জ শহরের কালীবাড়ী সড়কে আটতলা একটি বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া নাম-বেনামে জমি, ব্যাংক হিসাবে অর্থ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, রেশন স্টোরের ওজনদার হিসেবে পুলিশ বিভাগের সিভিল স্টাফের চাকরি শুরু করেন মহিউদ্দিন। পরে বিক্রয় সহকারী থেকে ধাপে ধাপে প্রধান সহকারী বা হেড ক্লার্কের পদে আসেন। এ ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সনদ জালিয়াতির অভিযোগও তোলা হয়েছে।
আবেদনপত্রে মহিউদ্দিনকে আওয়ামী লীগের দোসর উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে থেকেই তিনি প্রায় চার বছর ধরে একই চেয়ারে রয়েছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি হলেও অদৃশ্য কারণে তিনি একই পদে বহাল রয়েছেন।
নতুন পুলিশ সুপার যোগদান করলে তাকে কৌশলে প্রভাবিত করে নিজের অবস্থান ধরে রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া নারী সহকর্মীদের নিজের আশপাশে পদায়ন করিয়ে বিভিন্ন কৌশলে তাদের হয়রানি ও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আবেদনপত্রে। এসব অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়েছে।
আবেদনকারীর দাবি, মহিউদ্দিনের এসব কর্মকাণ্ডে ফরিদপুর জেলা পুলিশের সাধারণ কর্মচারী ও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভুল বুঝিয়ে তিনি একটি ক্ষমতার বলয় তৈরি করেছেন। ফলে ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে চান না।
এ অবস্থায় নিরপেক্ষ গোয়েন্দা সংস্থা অথবা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে গোপনীয়ভাবে তদন্ত পরিচালনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী।
এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে মহিউদ্দিন বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল ও আমাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে একটি মহল এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, বদলি-পদায়ন, ছুটি, পেনশন, পদোন্নতি কিংবা ঠিকাদারি কাজে ঘুষ বা কমিশন গ্রহণের সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। আমার নামে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সনদ জালিয়াতির অভিযোগও সম্পূর্ণ অসত্য। আমি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। তদন্তে আমি সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।”
আপনার মতামত লিখুন