খুঁজুন
বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১০ বৈশাখ, ১৪৩৩

ফরিদপুর-১ : আ.লীগ ইস্যুতে বক্তব্য দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী শাহ জাফর

মো. নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ৭:৫৭ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুর-১ : আ.লীগ ইস্যুতে বক্তব্য দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী শাহ জাফর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফরিদপুর জেলার চারটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও কৌতূহলোদ্দীপক আসনে পরিণত হয়েছে ফরিদপুর-১ (আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী)। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার দলটির কোনো প্রার্থী না থাকায় ভোটের মাঠে তৈরি হয়েছে ভিন্নমাত্রার রাজনৈতিক সমীকরণ।

বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট (জেপি) ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কৌশল, ভোট বিভাজন এবং নীরব ভোটের হিসাব-নিকাশে নির্বাচনটি হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক। তবে সাংগঠনিক শক্তি ও তরুণ ভোটারদের সমর্থনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এগিয়ে থাকার সম্ভাবনার কথাও বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

এই জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ৮১ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ রাজনীতিক শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন ফিল্ড কমান্ডার। স্বাধীনতার আগে ফরিদপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন এবং ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিজয়ী পতাকা উত্তোলনের ইতিহাসও তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায় পেরিয়ে এবার তিনি ১১তম বারের মতো সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট (জেপি) প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন।

গত সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেলে বোয়ালমারী প্রেসক্লাবের একাংশের সঙ্গে স্থানীয় পত্রিকা আল-হেলাল স্কয়ারে এবং রাতে আরেক অংশের সঙ্গে বোয়ালমারী বার্তা টাওয়ারে পৃথক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন শাহ জাফর।

সেখানে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করে যে ভুল করেছিল, এবার আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করাও একই ভুল। এই ভুলের ফল যারা সরকারে যাবে, তাদেরও ভোগ করতে হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করা উচিত হয়নি। “দেশে এখনো আওয়ামী লীগের একটি বড় সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে, যারা কোনো অপরাধ করেনি। যদি তারা ভোট দিতে পারে, তবে প্রার্থী হতে পারবে না কেন? অপরাধীদের বিচার হোক, কিন্তু আওয়ামী লীগকে নিয়েই নির্বাচন হলে জনগণই ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত দিত,”—মন্তব্য করেন তিনি।

বারবার দল বদলের বিষয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে শাহ জাফর বলেন, রাজনীতিতে দল বদল করলেও এতে এলাকার মানুষের কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং এরশাদ সরকারের সময় তিনটি উপজেলায় নজিরবিহীন উন্নয়ন হয়েছে। “আমার দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, কারো জমিজমি দখল করিনি—এ কথা আমার এলাকার মানুষই বলতে পারবে,” বলেন তিনি।

নির্বাচনী মাঠে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলে প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, তাঁকে ও তাঁর সমর্থকদের মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হচ্ছে। “আমি রাজপথের মানুষ। ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। নির্বাচনে আছি, থাকব,”—দৃঢ় কণ্ঠে বলেন তিনি।

একাত্তরের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের পর ১০ মার্চ ফরিদপুর অম্বিকা ময়দানে পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তিনি। “মৃত্যুকে মেনে নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম সেদিন,” বলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

চারবার সংসদ সদস্য হয়েও অর্থসম্পদ গড়তে পারেননি দাবি করে শাহ জাফর বলেন, তিনি রাজনীতি করেছেন মানুষের জন্য, ব্যবসার জন্য নয়। নির্বাচনে পাওয়া অনুদান ও পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করেই রাজনীতি চালিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

নির্বাচনী মাঠের সমীকরণ:

প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাহ জাফর একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায় বিএনপির প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলাম, জামায়াতের প্রার্থী মো. ইলিয়াস মোল্লার নীরব ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাকে পুঁজি করে শাহ জাফর মাঠে টিকে আছেন। তবে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া রয়েছে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের পক্ষে।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, ফরিদপুর-১ আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ১৫ জন প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ৭ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়। বর্তমানে ৭ জন প্রার্থী বৈধ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর বাইসাইকেল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা:

১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগ (মালেক) থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বাকশাল, জাতীয় পার্টি ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দল ও জোটের প্রার্থী হিসেবে মোট ১০টি নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি চারবার বিজয়ী হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনএম থেকে অংশ নিয়ে প্রায় ২০ হাজারের বেশি ভোট পান।

ভিন্নমতও রয়েছে:

শাহ জাফরের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফরিদপুর জেলা শাখার সাবেক সদস্য সচিব সোহেল রানা বলেন, “গণহত্যাকারী কোনো দলের সাফাই গাওয়া গণতন্ত্রবিরোধী। একটি দল ছাড়া সরকার টিকবে না—এই ধারণা জনগণকে ছোট করে দেখার শামিল।”

জানা গেছে, ফরিদপুর-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১০ হাজার ৫৫৬ জন। এর মধ্যে একজন হিজড়া ভোটারও রয়েছেন। ১৯৭টি ভোটকেন্দ্রের ১ হাজার ৬টি কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

“আধুনিকতার দূরত্ব মুছে ফিরে আসুক বিদ্যুৎহীন সন্ধ্যার উঠোনের আড্ডা”

শরিফুল ইসলাম
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:৪৬ অপরাহ্ণ
“আধুনিকতার দূরত্ব মুছে ফিরে আসুক বিদ্যুৎহীন সন্ধ্যার উঠোনের আড্ডা”

একসময় গ্রামবাংলার সন্ধ্যা ছিলো অন্যরকম এক পরিবেশ। বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকার নেমে এলে মানুষ একে একে জড়ো হতো কারও বাড়ির উঠোনে। শুরু হতো গানের আসর – কখনও ভাটিয়ালি, কখনও পালাগান, আবার কখনও মুর্শিদী গানে। আপন মুর্শিদের প্রতি আবেগে ঝড়তো চোখের জল।

সেই আসর ছিল না শুধু বিনোদনের জায়গা, বরং ছিল ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সংযোগস্থল। দিনভর ক্লান্তি, দুঃখ-কষ্ট, অভিমান – সব কিছু মিলিয়ে যেত একসাথে বসার আনন্দে।

আজ প্রযুক্তির যুগে আমরা অনেক এগিয়েছি, কিন্তু সেই উঠোনভরা সম্প্রীতি যেন হারিয়ে গেছে। বিদ্যুতের আলো আমাদের ঘর আলোকিত করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মন যান্ত্রিক ও স্বার্থের আখরা বানিয়েছে । এখন প্রত্যেকে নিজ নিজ মোবাইল বা টেলিভিশনের পর্দায় ডুবে থাকে; পাশের মানুষের সাথে কথা বলার সময়ও যেন কমে গেছে।

গ্রামের সেই সন্ধ্যার গান আমাদের শিখিয়েছে – সম্পর্ক গড়তে বড় আয়োজন লাগে না, দরকার শুধু আন্তরিকতা আর একসাথে থাকার ইচ্ছা। সমাজে ভেদাভেদ, হিংসা, দূরত্ব কমাতে আবারও দরকার এমন ছোট ছোট উদ্যোগ।

হয়তো আমরা পুরোপুরি সেই দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে পারব না, কিন্তু চেষ্টা করলে অন্তত মানুষের মাঝে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা আর ভ্রাতৃত্ববোধকে জাগিয়ে তুলতে পারি।

লেখক: সাংবাদিক, ফরিদপুর

‘ফেলো’ সম্মাননা পেলেন ফরিদপুর-৩ আসনের এমপি নায়াব ইউসুফ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৩০ অপরাহ্ণ
‘ফেলো’ সম্মাননা পেলেন ফরিদপুর-৩ আসনের এমপি নায়াব ইউসুফ

ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ দেশের সর্বোচ্চ কৌশলগত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি) থেকে ‘ক্যাপস্টোন কোর্স ২০২৬/১’ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। কোর্সটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে তিনি ‘ফেলো অব দ্য ক্যাপস্টোন কোর্স’ হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন, যা দেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।

রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গত ৫ এপ্রিল শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সমাপ্ত হয়। সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। অনুষ্ঠানে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন, যা কোর্সটির গুরুত্ব ও মর্যাদাকে আরও স্পষ্ট করে।

এনডিসির কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল এমডি ফয়জুর রহমান স্বাক্ষরিত সনদপত্রে উল্লেখ করা হয়, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নায়াব ইউসুফ জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত নেতৃত্ব, নীতি প্রণয়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই কোর্সে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিরাই বেশি থাকেন, ফলে এখানে অর্জিত অভিজ্ঞতা বাস্তব নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ক্যাপস্টোন কোর্সটি মূলত দেশের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক, সামরিক কর্মকর্তা, বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জন্য বিশেষভাবে পরিকল্পিত একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।

এতে অংশগ্রহণকারীদের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

কোর্স চলাকালে বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা, গ্রুপ আলোচনা, কেস স্টাডি এবং বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে গভীরভাবে কাজ করার সুযোগ পান। এছাড়া নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমন্বিত নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নায়াব ইউসুফ এই প্রশিক্ষণে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার নেতৃত্বগুণ, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং নীতি নির্ধারণের সক্ষমতা আরও সমৃদ্ধ করেছেন। সহপাঠী ও প্রশিক্ষকদের মূল্যায়নেও তিনি একজন মনোযোগী ও দক্ষ অংশগ্রহণকারী হিসেবে প্রশংসিত হন।

ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নায়াব ইউসুফ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও জনসেবামূলক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তার এই নতুন অর্জন ভবিষ্যতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

ফরিদপুরে তেল সংকটে চাষাবাদে চরম ভোগান্তি, সেচ বন্ধের শঙ্কায় ধান-পাট উৎপাদন

নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:৩৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে তেল সংকটে চাষাবাদে চরম ভোগান্তি, সেচ বন্ধের শঙ্কায় ধান-পাট উৎপাদন

বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাব এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে। জেলায় তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় চাষাবাদে নেমেছে স্থবিরতা। ডিজেল সংকটে সময়মতো সেচ দিতে না পারায় ধান ও পাটসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে চাহিদামতো ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষক, পরিবহন চালক ও সাধারণ ভোক্তারা। অধিকাংশ পাম্পে অনিয়মিত সরবরাহ, কোথাও ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড, আবার কোথাও দীর্ঘ সারি, সব মিলিয়ে অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কৃষক কার্ড নিয়েও অনেকে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়াও পাম্পে এসে লাইনে দাড়িয়ে ডিজেল নিচ্ছেন। তবে অধিকাংশ মানুষের কাছে কৃষক কার্ড দেখা যায়নি। কৃষক কার্ড ছাড়াও ডিজেল নিচ্ছেন পুরুষদের পাশাপাশি নারী কৃষাণীরাও।

ফরিদপুর দেশের অন্যতম প্রধান পাট উৎপাদনকারী জেলা। বর্তমানে পাট আবাদের মৌসুম চলমান থাকলেও জ্বালানি সংকটে মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষি অফিসের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত তেলের স্লিপেও চাহিদা পূরণ হচ্ছে না বলে অভিযোগ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পারলে ধান ও পাটের চারা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে পুরো মৌসুমের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সালথা উপজেলার সোনাপুর গ্রামের কৃষক তারা শেখ বলেন, কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেও তেল পাচ্ছি না। একদিন সামান্য ডিজেল পেলেও তা দিয়ে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি। সময়মতো পানি দিতে না পারলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি দীর্ঘদিনের হতাশা ও বঞ্চনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সতেরো বছর পর আবার ধান লাগিয়েছি, কিন্তু এখন তেলের অভাবে জমিতে পানি দিতে পারছি না।’ ফসল বাঁচাতে পারবো কি না জানি না। আমরা এখন দিশেহারা।

বোয়ালমারী উপজেলার ময়েনদিয়া গ্রামের কৃষক কবির শেখ বলেন, বোয়ালমারী নাহার ফিলিং স্টেশনে ডিজেল নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নিশ্চিত হতে পারছি না তেল পাব কি না। টোকেন নিয়েও অনেক সময় তেল পাওয়া যায় না। এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদ চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।

শুধু কৃষকরাই নয়, ট্রাক্টর চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরাও পড়েছেন বিপাকে। ট্রাক্টর চালকদের অভিযোগ, একেকজনকে মাত্র ১০ লিটার করে ডিজেল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে দীর্ঘ সময় জমি চাষ করা সম্ভব নয়। পরিবহন চালকরাও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে গাড়ি চালাতে পারছেন না। এতে যাত্রী পরিবহনেও বিঘ্ন ঘটছে।

জেলার বিভিন্ন পাম্পে তেল সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় কোথাও কোথাও টোকেন পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নির্দিষ্ট কিছু পাম্প থেকে তেল নেওয়ার জন্য পরিবহন মালিকদের চাপ প্রয়োগ করা হয়। এজন্য অনেক পাম্প মালিক হতাশায় ভুগছে।

জেলা পেট্রোল পাম্প মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, জেলায় প্রায় ৪০টি পাম্পে প্রতিদিন আড়াই লাখ লিটার জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ডিপো থেকে নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

ফরিদপুর জেলা পেট্রোল পাম্প মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার বদিউজ্জামান পলাশ বলেন, জেলায় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক নেই। ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল না আসায় পাম্পগুলো চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছে না। আমরা পাম্পগুলোকে সীমিত তেল হলেও নিয়ম মেনে দেওয়ার অনুরোধ করেছি।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, ফরিদপুরে কার্যত পাম্প মালিকদের মধ্যে সমন্বয় নেই। বাস মালিক সমিতির প্রভাবে মাত্র দুইটি নির্দিষ্ট পাম্প থেকে তেল নিতে অনেককে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে অন্য পাম্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি নির্ধারিত পাম্প থেকে তেল নেওয়ার টোকেন না দেখাতে পারলে পরের দিন বাস চলাচলেও সমস্যা করা হচ্ছে, যা দেশের অন্য কোথাও সাধারণত দেখা যায় না।

কৃষকদের দাবি, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে চলতি মৌসুমে ধান ও পাট উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। তারা জরুরি ভিত্তিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।