খুঁজুন
শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ২২ ফাল্গুন, ১৪৩২

ইতিকাফে ভুল করলে নষ্ট হতে পারে আমল—যেসব কাজ নিষিদ্ধ?

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬, ৭:২৬ এএম
ইতিকাফে ভুল করলে নষ্ট হতে পারে আমল—যেসব কাজ নিষিদ্ধ?

আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হলো ইতিকাফ। ইতিকাফ তিন প্রকার। এর মধ্যে রমজানের শেষ দশদিন ইতেকাফ করা সুন্নতে মুআক্কাদা কেফায়া। কোনো মহল্লা বা এলাকা থেকে একজন ইতেকাফ করলে পুরো মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে এটি আদায় হয়ে যাবে। আর কেউ ইতেকাফ না করলে সবাই গোনাহগার হবে।

ইতেকাফ করার সময় কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। কিছু কাজ আছে যেগুলো ইতেকাফ অবস্থায় নিষিদ্ধ এবং ইতেকাফকারী ওই কাজগুলো করলে ইতেকাফ ভেঙে যাবে।

চলুন জেনে নিই, ইতিকাফে কী কী কাজ নিষিদ্ধ

১. ইতেকাফ অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। রমজানে দিনের বেলা রোজা অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস নিষিদ্ধ হলেও রাতে সহবাসের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু ইতেকাফ অবস্থায় রাতেও সহবাসের নিষিদ্ধ। ইতেকাফরত ব্যক্তি স্ত্রী সহবাস করলে ইতেকাফ ভেঙে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা মাসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না। এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। (সুরা বাকারা: ১৮৭)

২. ইতেকাফকালে রোজা রাখা জরুরি। কেউ যদি কোনো প্রয়োজনে রোজা ভেঙে ফেলে বা কোনোভাবে রোজা ভেঙে যায়, তাহলে তার ইতেকাফও ভেঙে যাবে। যেমন কেউ যদি অসুস্থতার কারণে রোজা ভেঙে ফেলে, তাহলে তার ইতেকাফও ভেঙে যাবে। একইভাবে ইচ্ছাকৃত পানাহার, সহবাস বা জাগ্রত অবস্থায় ইচ্ছাকৃত বীর্যস্খলন ঘটানোর কারণে কারো রোজা ভেঙে গেলে তার ইতেকাফও ভেঙে যাবে। ( মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক : ৪/৩৫৪, হিদায়া : ১/২২৯, ফাতাওয়া সিরাজিয়া : পৃ. ৩১, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ২/৪১০-৪১৩, আলবাহরুল রায়েক : ২/২৯৯, আদ্দুররুল মুখতার : ২/৪৪২)

৩. একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হলে ইতেকাফ ভেঙে যাবে। ইতেকাফরত অবস্থায় অজু, ফরজ-গোসল ও প্রাকৃতিক প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে। কিন্তু রোগী দেখতে যাওয়া, জানাজার নামাজের মতো ফজিলতপূর্ণ কাজের জন্য বা অপ্রয়োজনীয় গোসল, বেচাকেনা, মোবাইলে কথা বলা ইত্যাদি কাজের জন্যও মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। (আবু দাউদ : ২৪৭৩)

প্রসঙ্গত, ইতেকাফ অবস্থায় নারীদের পিরিয়ড বা মাসিক শুরু হলে তাদের ইতেকাফ ভেঙে যাবে। পরে শুধু এক দিনের ইতিকাফ রোজাসহ কাজা করতে হবে। এই এক দিন কাজা করার নিয়ম হলো, রমজান মাসের পর কোনো একদিন সূর্যাস্তের আগে ইতিকাফ শুরু করতে হবে এবং পরের দিন রোজা থাকতে হবে। সেদিন সূর্যাস্তের পর ইতিকাফ শেষ হবে।

এভাবে একদিন রোজাসহ ইতিকাফ করলেই কাজা আদায় হয়ে যাবে। পুরো দশ দিনের ইতিকাফ কাজা করতে হবে না। তবে কারও রমজানের শেষ দশকে ঋতুস্রাব হওয়ার নিয়ম থাকলে তিনি ঋতুস্রাব শুরু হওয়া পর্যন্ত নফল ইতিকাফ করতে পারবেন। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/২০৭, বাদায়েউস সানায়ে : ২/২৭৪, আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৫০২)

সূত্র : কালবেলা

‘গ্রামের সেই বন্ধুরা আজ আর নেই’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৮:৪০ এএম
‘গ্রামের সেই বন্ধুরা আজ আর নেই’

অনেক বছর পর আজ আবার গ্রামে ফিরেছি। বাস থেকে নামতেই কাঁচা রাস্তার ধুলো, বাতাসে ধানের গন্ধ আর দূরে বাঁশবাগানের মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে মনে হলো যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সময় কখনও থামে না। শুধু মানুষ বদলে যায়, দৃশ্যপট বদলে যায়, আর একসময় বুঝতে পারি—যাদের সঙ্গে জীবনটা শুরু হয়েছিল, তারা কেউ আর পাশে নেই।

আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম সেই পুরোনো রাস্তা ধরে। রাস্তার পাশে সেই পুকুরটা এখনও আছে। তবে আগের মতো কচুরিপানায় ভরা নয়। পাড়ে এখন ইট বসানো হয়েছে। পুকুরের দিকে তাকাতেই মনে পড়ে গেল সেই বিকেলগুলোর কথা—যখন আমরা পাঁচজন বন্ধু এখানে এসে ঝাঁপ দিতাম।

আমি, রফিক, জাহিদ, বাবলু আর শামীম।
আমাদের বন্ধুত্বটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু তাতে ছিল অদ্ভুত এক শক্তি। তখন মোবাইল ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না। ছিল শুধু মাঠ, নদী, কাদামাটি আর একে অপরের সঙ্গ।

স্কুল ছুটির পর আমরা দৌড়ে চলে যেতাম মাঠে। কেউ বল নিয়ে আসত, কেউ ব্যাট। কখনও ফুটবল, কখনও ক্রিকেট—যেটা পাওয়া যেত সেটাই খেলতাম। খেলার শেষে সবাই মিলে পুকুরে ঝাঁপ দিতাম। কারও মা দূর থেকে চিৎকার করে ডাকত—
“এই রফিক! বাড়ি আয়, সন্ধ্যা হয়ে গেছে!”
রফিক তখন হেসে বলত,
“আর পাঁচ মিনিট!”

সেই পাঁচ মিনিট কখনও পাঁচ মিনিটে শেষ হতো না।
একদিন বর্ষার বিকেলে আমরা সবাই মিলে নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়েছিলাম। নদীটা তখন বেশ ফুলে উঠেছিল। জাহিদ একটু ভয় পেয়েছিল। সে বলেছিল,
“দোস্ত, আজ না যাই?”
কিন্তু বাবলু বলেছিল,
“আরে ভয় কিসের? আমরা তো আছিই!”
আমরা সবাই হেসেছিলাম। সেই হাসির শব্দ এখনও যেন বাতাসে ভেসে আসে।

গ্রামের জীবন ছিল সহজ। বিকেলে তালগাছের ছায়ায় বসে গল্প করা, মেলা এলে সবাই মিলে ঘুরতে যাওয়া, ঈদের দিন নতুন জামা পরে একে অপরের বাড়িতে বেড়ানো—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের আনন্দ।

কিন্তু সময় ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।
প্রথমে জাহিদ চলে গেল শহরে পড়তে। সে বলেছিল,
“ভালো রেজাল্ট করলে ঢাকায় কলেজে পড়ব।”
আমরা সবাই তাকে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল কয়েকদিনের জন্যই যাচ্ছে। কিন্তু সেই কয়েকদিন ধীরে ধীরে কয়েক বছরে বদলে গেল।

তারপর রফিকও কাজের জন্য চলে গেল চট্টগ্রামে। বাবলু বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত। একদিন সত্যিই সে মালয়েশিয়া চলে গেল। শামীম গ্রামের বাজারে একটা দোকান দিল।
আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শহরে চলে গেছি।

প্রথম দিকে আমরা ফোনে কথা বলতাম। মাঝে মাঝে ঈদের সময় দেখা হতো। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল, ততই যোগাযোগ কমে গেল।
একদিন খবর পেলাম—রফিক আর নেই।
কারখানায় কাজ করার সময় একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল। খবরটা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। বিশ্বাসই হচ্ছিল না।
তারপর কয়েক বছর পর শুনলাম শামীম অসুস্থ হয়ে মারা গেছে।

বাবলু এখনও বিদেশেই আছে, কিন্তু বহু বছর তার কোনো খবর নেই। জাহিদ নাকি ঢাকায় বড় চাকরি করে, কিন্তু তার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল প্রায় দশ বছর আগে।

আজ এত বছর পর গ্রামে ফিরে বুঝতে পারছি—আমাদের সেই ছোট্ট পৃথিবীটা আর নেই।
আমি হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরোনো স্কুলের সামনে এসে দাঁড়ালাম। স্কুলের দেয়াল নতুন করে রং করা হয়েছে। মাঠটাও আগের চেয়ে ছোট মনে হচ্ছে।
এক কোণে কয়েকটা ছোট ছেলে ক্রিকেট খেলছে। তাদের হাসির শব্দ শুনে হঠাৎ মনে হলো—আমরাও তো একদিন এমনই ছিলাম।

হয়তো তারা এখন বুঝতে পারছে না, কিন্তু একদিন তারাও বড় হবে। কেউ শহরে যাবে, কেউ বিদেশে। কেউ হয়তো আর ফিরেও আসবে না।
আমি মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাদের খেলা দেখলাম।
হঠাৎ মনে হলো, যদি এখন রফিক এসে বলে—
“এই দোস্ত, খেলবি?”
যদি জাহিদ এসে বলে—
“আজ নদীতে যাবি?”

যদি বাবলু সেই আগের মতো হেসে ওঠে।
কিন্তু জানি, সেটা আর কখনও হবে না।
বিকেলের সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। বাতাসে আবার সেই পুরোনো গ্রামের গন্ধ। কিন্তু এই গন্ধের ভেতরেও একটা শূন্যতা আছে।
আমি পুকুরের পাড়ে গিয়ে বসে পড়লাম। পানিতে সূর্যের আলো ঝিলমিল করছে।

মনে হলো, আমাদের শৈশবটা ঠিক এই পানির ঢেউয়ের মতো—একসময় ছিল, খুব কাছেই ছিল। কিন্তু এখন শুধু স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।
হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বললাম—
“বন্ধুরা, তোমরা যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।
এই গ্রামটা এখনও আছে, এই পুকুরটা এখনও আছে…
শুধু তোমরা আর নেই।”

সন্ধ্যার আজানের ধ্বনি ভেসে এলো দূরের মসজিদ থেকে।
আর আমি বুঝলাম—জীবন সামনে এগিয়ে যায়, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর কোথাও না কোথাও সেই গ্রামের বন্ধুরা চিরকাল বেঁচে থাকে।

লেখক: হারুন-অর-রশীদ, সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

বসন্তে বাড়ে নানা রোগ, সুস্থ থাকতে খান যেসব মৌসুমি খাবার?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৮:০৩ এএম
বসন্তে বাড়ে নানা রোগ, সুস্থ থাকতে খান যেসব মৌসুমি খাবার?

ঋতু পরিবর্তনের সময়, বিশেষ করে বসন্তকালে বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখের প্রকোপ বাড়ে। তবে প্রকৃতিতে যেমন রোগ আছে, তেমনি রয়েছে তার সমাধানও। বিশেষজ্ঞদের মতে, যে ঋতুর যে রোগ, সেই ঋতুর শাক-সবজি ও ফলেই লুকিয়ে থাকে তার প্রতিকার। তাই বাজারি খাবারের বদলে মৌসুমি খাবার খেলে শরীর সুস্থ থাকে।

ছেলেবেলায় অনেকের সকাল শুরু হতো নিমপাতা ও কাঁচা হলুদ খেয়ে। খালি পেটে ৪-৫টি নিমপাতা চিবিয়ে খাওয়ার পর মুখের তেতো কাটাতে খাওয়া হতো কাঁচা হলুদ, গোলমরিচ ও আখের গুড়। এসব উপাদান জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে। এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে হাঁচি-কাশি, জ্বর ও পেটের সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

নিমপাতায় থাকা নিম্বিন ও নিম্বোলাইডসহ প্রায় ১৩০টি উপাদান, হলুদের কারকিউমিন এবং গোলমরিচের পিপারিন শরীরকে বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি জোগায়।

কাঁচা নিমপাতা খেতে না পারলে ভাতের সঙ্গে নিম-বেগুনের তরকারি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে একদিকে জীবাণুনাশক গুণ পাওয়া যায়, অন্যদিকে বেগুনের পুষ্টিগুণও শরীরকে সমৃদ্ধ করে। এতে প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান পাওয়া যায়।

কম ক্যালোরি ও বেশি ফাইবার থাকায় ওজন নিয়ন্ত্রণেও এটি সহায়ক।

এ সময় সজনে ডাঁটা ও ফুল খাওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে শরীর প্রোটিন, ভিটামিন, ক্যালশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট পায়। এটি শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হাঁপানির প্রকোপ কমাতেও সজনে উপকারী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বসন্তকালে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি খাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। পালং শাক, মেথি শাক, মুলা শাক, ধনেপাতা, পেঁয়াজকলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলা, মটরশুঁটি, বিট, গাজর, ব্রোকোলি, ক্যাপসিকাম, টমেটো, নতুন আলু, শিম, বিনস, কুমড়ো ও পটল, এসব সবজি বিভিন্নভাবে খাওয়া যেতে পারে। সেদ্ধ, তরকারি, স্যুপ বা সালাদ হিসেবে এসব খেলে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও ফাইটোকেমিক্যাল পায়। এতে ঋতু পরিবর্তনের সময় অসুখ-বিসুখের ঝুঁকি কমে।

ভাতের সঙ্গে লেবু খাওয়াও উপকারী। ডাল, সালাদ বা ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে লেবু খেলে শরীর কিছুটা ভিটামিন সি পায়।

রাতে নয়, দিনে ফল

ফল দিনে খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে প্রাকৃতিক চিনি থাকায় রাতে ফল খেলে ওজন বাড়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। দিনের বেলায় ফল খেলে শরীরের বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে সেই চিনি খরচ হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের সময় সুস্থ থাকতে বেশি দাম দিয়ে অসময়ের ফল-সবজি না কিনে মরসুমি শাক-সবজি ও ফল খাওয়াই সবচেয়ে ভালো। এতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে।

আপনার ওপর কত জাকাত ফরজ? হিসাব করবেন যেভাবে

আবু সাঈদ
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৭:৫২ এএম
আপনার ওপর কত জাকাত ফরজ? হিসাব করবেন যেভাবে

সামর্থবান প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জাকাত দেওয়া ফরজ। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেক এমন ব্যক্তি সামর্থ্যবান, যার কাছে সাড়ে বাহান্ন তোলা রুপা বা তার সমপরিমাণ মূল্যের নির্দিষ্ট সম্পদ রয়েছে। (রদ্দুল মুহতার : ২/২৫৯) সুতরাং যার কাছে এই পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার উপর জাকাত ফরজ। নির্দিষ্ট সময় তাকে জাকাত আদায় করতে হবে।

সব সম্পদে জাকাত আসে না। কেবলমাত্র পাঁচ ধরনের সম্পদে জাকাত আদায় করতে হয়। তা হলো স্বর্ণ, রুপা, নগদ ক্যাশ, ব্যবসায়ী পণ্য এবং গবাদি পশু (যদি গবাদি পশুর জন্য বছরের অধিকাংশ সময় খাবারের ব্যবস্থা করা না লাগে এবং মাঠের ঘাসেই তার পেট চলে, তাহলে জাকাত আসবে। অন্যথায় আসবে না।) এই পাঁচ জিনিসের মধ্য থেকে যেসব জিনিস আছে, তার মোট মূল্য যদি সাড়ে বাহান্ন তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ হয়, তাহলে জাকাত দিতে হবে। এগুলোর বাইরে অন্যান্য সম্পদে -হোক তা হীরা, জাওহার বা এজাতীয় কোনো মূল্যবান জিনিস- জাকাত আসবে না। (ফিকহি মাকালাত : ৩/১৪৮; আল বাহরুর রায়েক : ২/৩৬১; বাদায়েউস সানায়ে : ২/৯১; রদ্দুল মুহতার : ২/২৬৩)

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তি যেদিন সামর্থ্যবান হয়, সেদিনটি তার বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হয়। কারণ, এমন সামর্থ্যবান অবস্থায় থেকে এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ঠিক ওই দিনটিতেই জাকাত ফরজ হয়। ওই দিনের জাকাতযোগ্য সম্পদ অনুযায়ীই জাকাত আদায়ের পরিমাণ নির্ধারিত হয়। যেমন কেউ মুহাররমের ৫ তারিখে সামর্থ্যবান হলো, এরপর আগামী বছর মুহাররমের ৫ তারিখেও যদি তার কাছে নেসাব পরিমাণ জাকাতযোগ্য সম্পদ থাকে, তাহলে নতুন বছরের ৫ মুহাররম তার ওপর জাকাত ফরজ হবে এবং সেদিন যে পরিমাণ সম্পদ থাকে, তার আলোকে জাকাত আদায়ের পরিমাণ নির্ধারিত হবে। (ফিকহি মাকালাত : ৩/১৬৩-১৭০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/১৭৫; আল বাহরুর রায়েক : ২/৩৫৬; রদ্দুল মুহতার : ২/২৯৪)।

যে দিন জাকাত ফরজ হবে (যেমন উপরোক্ত উদাহরণে নতুন বছরের ৫ মুহাররম), ওই দিন ব্যক্তির কাছে থাকা জাকাতযোগ্য সম্পদের একটি তালিকা করতে হবে। এরপর এসব সম্পদের সর্বমোট মূল্য হিসাব করে বের করতে হবে। অতঃপর জাকাতযোগ্য সম্পদের মূল্য থেকে ঋণের টাকা -যদি থেকে থাকে- বাদ দিতে হবে। তারপর যে টাকাটা অবশিষ্ট থাকে, তার আড়াই শতাংশ হিসাব করে জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।

বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিত বলা যাক। জাকাতের হিসাব বের করতে আমাদের চার ধাপে কাজ করতে হবে। প্রথম কাজ হলো, জাকাতযোগ্য সম্পদের একটি তালিকা তৈরি করা। আমরা প্রথমেই বলেছি, জাকাতযোগ্য সম্পদ পাঁচটি- স্বর্ণ, রুপা, নগদ ক্যাশ, ব্যবসায়ী পণ্য এবং গবাদি পশু। এর মধ্যে স্বর্ণ-রুপার স্থিতি সহজেই নিরুপণ করা যায়। গবাদি পশুরু বিষয়টিও স্পষ্ট। কিন্তু নগদ ক্যাশ ও ব্যবসায়ী পণ্য বিভিন্ন পন্থায় সংরক্ষিত থাকে। সেজন্য অনেক ক্ষেত্রে তা নির্ধারণে বিভ্রম ঘটতে পারে। হিসাবের সুবিধার্তে আমরা একটি তালিকা নমুনা হিসেবে পেশ করছি-

যেমন থাকতে পারে স্বর্ণ, রুপা, নগদ অর্থ, প্রাপ্য ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রা, ব্যাংকে রক্ষিত অর্থ, ফেরতযোগ্য বীমা পলিসিতে জমাকৃত অর্থ, শেয়ার, বন্ডের ক্রয়মূল্য, ঐচ্ছিক প্রভিডেন্ট ফান্ডের মূল টাকা, বিক্রিত পণ্যের বাকি মূল্য, বিক্রির উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত বস্তু, ব্যবসার কাঁচামাল এবং অংশীদারিত্ব ব্যবসায় বিনিয়োগকৃত মূল পূঁজি ইত্যাদি।

এভাবে বিভিন্ন রূপে নগদ ক্যাশ এবং ব্যবসায়ী পণ্য থাকতে পারে। এসবের হিসাব বের করতে হবে। এটি জাকাত হিসাবের ক্ষেত্রে প্রথম কাজ।

দ্বিতীয় কাজ হলো, এসব সম্পদের মূল্য বের করতে হবে। মূল্য বের করার ক্ষেত্রে উত্তম হলো, এসব পণ্যের বাজারদর হিসাব করা। অর্থাৎ আপনি যদি এখন বাজার থেকে পণ্যটি ক্রয় করেন, কত টাকা দিয়ে কিনতে হবে, ওই পরিমাণ টাকা মূল্য ধরতে হবে। এভাবে প্রত্যেকটি পণ্যের বাজারদর খোঁজ করে মূল্য হিসাব করা। তারপর সবগুলো মূল্য যোগ করে দেখতে হবে আপনার কাছে কত টাকা আছে।

অবশ্য পণ্যটির বিক্রয় মূল্যের আলোকেও হিসাব করা যায়। অর্থাৎ আপনি পণ্যটি এখন বিক্রি করতে গেলে বাজারে কত টাকায় বিক্রি করতে পারবেন, সেটাকে মূল্য হিসেবে হিসাব করা। তবে ক্রয়মূল্য ধরা হলে যেহেতু দরিদ্রদের উপকার বেশি হয়, সেজন্য ক্রয়মূল্য ধরাটাই উত্তম। (ফাতাওয়া উসমানী : ২/৬৬)।

তৃতীয় কাজ হলো আপনার যদি কোনো ঋণ থেকে থাকে, ওই ঋণের টাকা জাকাতযোগ্য সম্পদের সর্বমোট মূল্য থেকে বাদ দিতে হবে। তবে এই ঋণের মধ্যে ব্যবসার ঋণ উদ্দেশ্য নয়। ঋণের একটি সম্ভাব্য তালিকা এমন হতে পারে-

ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নেওয়া ঋণ; বাকিতে ক্রয়কৃত পণ্যের অপরিশোধিত ঋণ, যা জাকাতবর্ষের মধ্যেই আদায় করতে হবে; স্ত্রীর মোহর, যা চলতি বছরই দেওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা রয়েছে; ফ্ল্যাট, দোকান, বাড়ি ইত্যাদি ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সিকিউরিটি হিসেবে নেওয়া অর্থ। ভাড়াটিয়া এর জাকাত আদায় করবে। তবে বাড়ি বা দোকানের মালিক যদি এর জাকাত আদায় করে ফেলে, তাহলে ওই টাকা হস্তগত হওয়ার আগে ভাড়াটিয়াকে এর জাকাত দিতে হবে না। যেন একই সম্পদে দুবার জাকাত না দিতে হয়। আর বাড়ি বা দোকানের মালিক প্রতি বছর এর জাকাত আদায় করে থাকলে, যে বছর সে উক্ত টাকা ফেরত দেবে, কেবল সেই বছর তা বাদ দিয়ে জাকাত হিসাব করবে; কর্মচারীদের অনাদায়ী বেতন-ভাতা; অনাদায়ী বাড়ি বা দোকান ভাড়া; ট্যাক্স ও বিদ্যুৎ ইত্যাদির বিল, যা আগে শোধ করা হয়নি এবং জাকাতবর্ষের মধ্যেই শোধ করতে হবে; অতীতের জাকাত যা এখনও আদায় করা হয়নি; ব্যবসার উদ্দেশ্যে নেওয়া ঋণ, যা দিয়ে জাকাতযোগ্য সম্পদ ক্রয় করা হয়েছে। যেমন, পণ্য বা কাঁচা মাল ইত্যাদি।

এগুলো হলো ঋণের সম্ভাব্য তালিকা। তৃতীয় কাজ হলো এসব ঋণ খুঁজে বের করা। তারপর তার মূল্য যোগ করে যত টাকা হয়, তা জাকাতের নেসাব থেকে বাদ দেওয়া। (আল বাহরুর রায়েক : ২/৩৫৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/১৭২; রদ্দুল মুখতার : ২/২৬০)।

চতুর্থ কাজ হলো, জাকাতের নেসাবে অবশিষ্ট যে টাকা আছে, তার থেকে আড়াই শতাংশ টাকা জাকাত হিসেবে আদায় করা।

এভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জাকাতযোগ্য সম্পদের হিসাব করে জাকাত আদায় করতে হয়। তবে এক্ষেত্রে উত্তম হলো, কোনো শরীয়াহ বিশেষজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে জাকাতের হিসাব সম্পন্ন করা। নিজে নিজে জাকাতের হিসাব করা সমুচিত নয়। কারণ, হতে পারে আপনার সম্পদের এমন কোনো দিক আছে, যেটাকে আপনি জাকাতযোগ্য মনে করছেন না। অথচ শরীয়তের দৃষ্টিতে তাতেও জাকাত আসে। বর্তমানে নগদ ক্যাশ ও ব্যবসায়ী পণ্য নানা উপায়ে গচ্ছিত থাকে। তাই এমন ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সেজন্য শরীয়াহ বিশেষজ্ঞ কোনো আলেমের মাধ্যমে জাকাতের হিসাব করিয়ে নেওয়াটা নিরাপদ।

মনে রাখতে হবে, জাকাত রমজানের সাথে সম্পৃক্ত কোনো ইবাদত নয়। বরং যেদিন ব্যক্তি সামর্থ্যবান হবে, তার ঠিক এক বছর পরে একই দিন তার ওপর জাকাত ফরজ হয়। ঠিক এক বছর পরেই জাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ বের করে জাকাত আদায়ের পরিমাণ নির্ধারণ করে নিতে হবে। এরপর ইচ্ছে হলে একসঙ্গে জাকাতের হকদারদের মাঝে ওই টাকা বিতরণ করে দিতে পারে। আবার অল্প অল্প করে বিভিন্ন সময় তা আদায় করা যেতে পারে।

কারো যদি রজমানে জাকাত আদায় করার ইচ্ছে থাকে, তাহলে তার উচিৎ হলো যেদিন জাকাত ফরজ হবে, সেদিন জাকাতের হিসাব করে টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করা। এরপর রমজানের সময় ওই টাকা জাকাতের হকদারদের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া। তবে উত্তম হবে- যেদিন জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করা হলো, সেদিন থেকে অল্প অল্প করে জাকাত দিতে শুরু করা। এরপর যখন রমজান মাস আসে, তখন বাকিটুকু হকদারদের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া।