খুঁজুন
, ,

হজভূমি: পৃথিবীর প্রথম ঘর কাবা

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ
হজভূমি: পৃথিবীর প্রথম ঘর কাবা

পবিত্র কাবা আল্লাহ তাআলার ঘর। এটি মসজিদুল হারামের মাঝখানে অবস্থিত।

এটি একটি ছাদযুক্ত, চতুর্ভুজ আকৃতির ঘর। এর দরজার দিকের দেয়ালের প্রস্থ ১১.৬৮ মিটার, হিজরের দিকের দেয়াল ৯.৯০ মিটার, শামি রুকন ও ইয়ামানি রুকনের মাঝখানে ১২.০৪ মিটার, হাজরে আসওয়াদ ও ইয়ামানি রুকনের মাঝখানে ১০.১৮ মিটার।

এর উচ্চতা ১৪ মিটার এবং ভিত্তির ক্ষেত্রফল ১৪৫ বর্গমিটার।
পবিত্র কোরআনে কাবা শব্দ দুইবার ব্যবহৃত হয়েছে (দেখুন—সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৯৫ ও ৯৭)।

‘কাবা’ নামকরণের বিষয়ে দুটি মত আছে—

প্রথম মত : উঁচু হয়ে থাকা ও উত্থিত হওয়ার কারণে একে কাবা বলা হয়েছে। আরবি ভাষায় প্রত্যেক উঁচু জিনিসকেই ‘কাব’ বলা হয়।

দ্বিতীয় মত : এর নির্মাণ চতুর্ভুজ আকৃতির হওয়ার কারণে একে কাবা বলা হয়েছে। আরবদের কাছে প্রতিটি চতুর্ভুজ ঘরই কাবা নামে পরিচিত।

কাবা শরিফের চারটি প্রসিদ্ধ রুকন আছে, যা মূল চার দিকের সামান্য কৌণিকভাবে অবস্থান করে—

উত্তরে : ইরাকি রুকন

দক্ষিণে : ইয়ামানি রুকন

পূর্বে : হাজরে আসওয়াদ

পশ্চিমে : শামি রুকন।

আল-বাকরি তাঁর ‘আল-মাসালিক ওয়াল-মামালিক’ গ্রন্থে কাবার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘কাবার উচ্চতা আকাশের দিকে ২৭ হাত।

এর সম্মুখভাগে হাজরে আসওয়াদ থেকে শামি রুকন পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ২৫ হাত, হাজরে আসওয়াদ থেকে ইয়ামানি রুকন পর্যন্ত ২০ হাত। এর পশ্চাত্ভাগে ইয়ামানি রুকন থেকে পশ্চিম রুকন পর্যন্ত ২৫ হাত এবং শামি রুকন থেকে পশ্চিম রুকন পর্যন্ত ২১ হাত। এর দেয়ালের পুরুত্ব দুই হাত।’

মিনায় হজের আনুষ্ঠানিকতা

মিনা ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থান। এখানে ইবরাহিম (আ.) নিজ পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি দেওয়ার জন্য এনেছিলেন।

মিনায় বেশি পরিমাণে পশু জবাই করা হয়। তাই এ স্থানকে মিনা বলা হয়। কারো কারো মতে, আরবরা কোনো স্থানে বেশি মানুষের সমাগম হলে সেটিকে ‘মিনা’ বলে অভিহিত করে। যেহেতু এই স্থানে অধিক সংখ্যায় জন্তু জবাই হয় এবং লাখ লাখ হজযাত্রী এখানে অবস্থান করেন, তাই এটি ‘মিনা’ নামে পরিচিত।
মিনা হজের গুরুত্বপূর্ণ বিধি-বিধান পালনের স্থান হিসেবে সুপরিচিত। হজের কার্যক্রম মূলত মিনা থেকেই শুরু। গোসল করে ইহরাম পরিধান করে জোহরের আগেই হজযাত্রীরা মিনায় আসতে থাকেন। সেখানেই তাঁরা রাত যাপন করেন। ১০ তারিখ ঈদুল আজহার দিন হজযাত্রীরা মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় আসেন। সেদিন বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করে হজযাত্রীরা ‘হাদি’ কোরবানি করেন। মাথা মুণ্ডন করে বা চুল ছোট করে প্রাথমিকভাবে হালাল হন। অতঃপর হারামে ‘তাওয়াফে ইজাফা’ আদায় করে আইয়ামুত তাশরিকের (১০, ১১, ১২ তারিখ) দিনগুলোতে মিনায় থাকতে হয়।

স্মৃতির স্মারক সাফা-মারওয়া

পবিত্র কাবার সন্নিকটে অবস্থিত দুটি পাহাড়ের নাম সাফা ও মারওয়া। কাবার উত্তর-পূর্ব কোণে কাবা চত্বর ঘেঁষেই সাফা পাহাড়ের অবস্থান। প্রাক-ইসলামী যুগে পৌত্তলিকরা এই পাহাড় দুটির ওপর দুটি মূর্তি স্থাপন করে সেগুলোর পূজা করত। ইসলামের আবির্ভাবের পর সাফা ও মারওয়া সাঈ (প্রদক্ষিণ) করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম। অতএব, যে কাবায় হজ অথবা ওমরাহ করে, তার জন্য উভয় স্থানের তাওয়াফ করায় কোনো দোষ নেই…। (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৫৮)

ইবরাহিম (আ.) বিবি হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশে মক্কার সাফা-মারওয়া পাহাড়ের সন্নিকটে রেখে যান। এই জনমানবহীন মরুভূমিতে মা ও শিশুর পানাহারসামগ্রী ফুরিয়ে যায়। তখন ইসমাইল (আ.)-এর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ে। সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে মা হাজেরা শিশুসন্তান ইসমাইলের জন্য পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে ছোটাছুটি করেন। তার পরই আল্লাহর কুদরতে শিশু নবী ইসমাইল (আ.)-এর পদাঘাতে, অন্য বর্ণনা মতে, জিবরাঈল (আ.)-এর পায়ের আঘাতে পানির ঝরনা প্রবাহিত হয়। মা হাজেরার পুণ্যময় স্মৃতির স্মারক হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত হজযাত্রীদের জন্য সাফা-মারওয়া সাঈ করা বা দৌড়ানো আল্লাহ তাআলা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। হজ ও ওমরাহর ফরজ তাওয়াফের পর সাফা-মারওয়া সাঈ করা সব হজযাত্রীর জন্য ওয়াজিব।

সাফা পাহাড় কাবাঘর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ১৩০ মিটার দূরে অবস্থিত। সাফা একটি ছোট পাহাড়, যার ওপর বর্তমানে গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে; এবং এই পাহাড়ের একাংশ এখনো উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, আর বাকি অংশ পাকা করে দেওয়া হয়েছে। সমতল থেকে উঁচুতে এই পাকা অংশের ওপরে গেলে সাফায় উঠেছেন বলে ধরে নেওয়া হবে। সাফা পাহাড়ের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে এখনো পবিত্র কাবা দেখা যায়।

মারওয়া শক্ত সাদা পাথরের ছোট্ট একটি পাহাড়। পবিত্র কাবা থেকে ৩০০ মিটার দূরে পূর্ব-উত্তর দিকে অবস্থিত। বর্তমানে মারওয়া থেকে কাবাঘর দেখা যায় না। মারওয়ার সামান্য অংশ খোলা রাখা হয়েছে, বাকি অংশ পাকা করে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

রহমতের আশায় আরাফার ময়দানে

আরাফা শব্দের অর্থ চেনা, জানা ও পরিচয় লাভ করা। আরাফা মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। মক্কা থেকে এর দূরত্ব ২২ কিলোমিটার, মিনা থেকে ১০ কিলোমিটার এবং মুজদালিফা থেকে ছয় কিলোমিটার। ঐতিহাসিক এই ময়দান তিন দিকে পাহাড়বেষ্টিত।

মক্কার মোয়াল্লা থেকে আরাফার মক্কাসংলগ্ন পশ্চিম সীমান্তের দূরত্ব সাড়ে ২১ কিলোমিটার।

আরাফার ময়দান একমাত্র হজভূমি, যা হারাম শরিফের চৌহদ্দির বাইরে অবস্থিত।

হজের মৌসুম ছাড়া আরাফায় মানুষ বসবাস করে না। তবে রাষ্ট্রীয় রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম চালু থাকে।

আরাফার ময়দানে অবস্থিত পাহাড়ের নাম ‘জাবালু আরাফা’। এটাকে ‘জাবালে রহমত’ও বলা হয়। তবে আরাফা মানেই পাহাড় নয়। আরাফার ময়দান ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত। হজের জন্য ওই পাহাড়ে ওঠা জরুরি নয়, তবে তা মুস্তাহাব। জাবালে রহমতের দৈর্ঘ্য ৩০০ মিটার।

একটি রাত মুজদালিফায়

মুজদালিফা মিনা ও আরাফার মাঝখানে অবস্থিত একটি স্থানের নাম। এটি মাদিক ও মুহাসসার উপত্যকার মাঝামাঝি অবস্থিত। জায়গাটি চার হাজার ৩৭০ মিটার দীর্ঘ।

মুজদালিফা শব্দটি আরবি ইজদিলাম থেকে এসেছে। এর অর্থ নিকটবর্তী হওয়া। সব হজযাত্রী এই জায়গায় মিলিত হন বলে এর নামকরণ হয়েছে মুজদালিফা।

হজযাত্রীরা ৯ জিলহজ সূর্যাস্তের পর মিনার উদ্দেশে রওনা দিয়ে এখানেই রাত যাপন করেন। এখানে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে পড়তে হয়। মুজদালিফায় রাত যাপন করা ওয়াজিব। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত সময়ে মুজদালিফায় অবস্থান করা শরিয়তের বিধান। মুজদালিফায় রাত যাপন না করেও কেউ ওই সময়ে উপস্থিত থাকলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে মুজদালিফায় রাত যাপন করা সুন্নত। অন্যদিকে মুজদালিফায় রাত যাপন করেও সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয়ের আগ পর্যন্ত কেউ সেখানে অবস্থান না করলে তাঁকে দম দিতে হবে।

জামারাত

আইয়ামুত তাশরিকের (১০, ১১, ১২ তারিখ) দিনগুলোতে মিনায় অবস্থান করে ধারাবাহিকভাবে জামারায়ে সুগরা, উসতা ও কুবরায় সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করতে হয়। মিনা থেকে মক্কায় যাওয়ার পথে মসজিদে খাইফের কাছে পাথর নিক্ষেপের প্রথম স্থানকে ছোট শয়তান বা জামারায়ে সুগরা বলা হয়। পাথর নিক্ষেপের দ্বিতীয় স্থানকে মেজো শয়তান বা জামারায়ে উসতা বলা হয়। মিনার পশ্চিম প্রান্তে পাথর নিক্ষেপের সর্বশেষ স্থানকে বড় শয়তান বা জামারায়ে কুবরা/আকাবাহ বলা হয়। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/২৫৮)

ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ১:৩৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন

ফরিদপুরের সালথায় ৯ বছর বয়সী ৩য় শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে শওকত মিয়া (৩৮) নামে এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে তাকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

​বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফরিদপুরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আবুল বাসার আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর কড়া পুলিশ পাহারায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

​দণ্ডপ্রাপ্ত শওকত মিয়া ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বড় বাংরাইল গ্রামের সিরাজ মিয়ার ছেলে।

মামলার বিবরণ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২২ মে বিকেলে সালথা উপজেলার বড় বাংরাইল গ্রামের ৩য় শ্রেণিতে পড়ুয়া ৯ বছরের ওই শিশুটি বাড়ির পাশে নিজেদের শাক-সবজির (ডাটা) ক্ষেত দেখতে গিয়েছিল। এসময় আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা প্রতিবেশী শওকত মিয়া শিশুটিকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে পাশের একটি নির্জন পাটক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করে।

​শিশুটির রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থা দেখে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ‘ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ (ওসিএসি)-এ ভর্তি করায়। ঘটনার পরদিনই নির্যাতিতা শিশুটির বাবা বাদী হয়ে সালথা থানায় শওকত মিয়াকে একমাত্র আসামি করে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।

​ঘটনা তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর সালথা থানা পুলিশ আসামি শওকত মিয়াকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় সাক্ষী গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে দীর্ঘ ৬ বছর পর আদালত আজ এ রায় প্রদান করেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) অ্যাডভোকেট অর্চনা দাস বলেন, “একটি অবুঝ শিশুকে নির্যাতন করে যে নৃশংসতা চালানো হয়েছিল, আজকের এই রায়ের মাধ্যমে তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। এই শাস্তি সমাজে অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করবে এবং শিশু সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা এ রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট।”

ফরিদপুরের নদী-খালজুড়ে ‘চায়না দুয়ারি’, নিশ্চিহ্নের পথে দেশীয় মাছ

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৯ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরের নদী-খালজুড়ে ‘চায়না দুয়ারি’, নিশ্চিহ্নের পথে দেশীয় মাছ

ফরিদপুরের বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’র অবাধ ব্যবহার দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। জেলার সদর, সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, সদরপুর, চরভদ্রাসন, ভাঙ্গা ও আলফাডাঙ্গাসহ প্রায় সব উপজেলায় বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ ধরার এই নিষিদ্ধ ফাঁদের বিস্তার ঘটেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে এসব চায়না দুয়ারি বসিয়ে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ নির্বিচারে শিকার করা হলেও মৎস্য বিভাগের দৃশ্যমান অভিযান খুব একটা চোখে পড়ে না। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন খাল, বিল ও নদীর শাখা-প্রশাখায় বাঁশ, জাল ও প্লাস্টিকের জাল দিয়ে তৈরি চায়না দুয়ারি বসানো হয়েছে। পানির প্রবাহের মুখে এসব ফাঁদ স্থাপন করায় ছোট পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা মাছ পর্যন্ত আটকা পড়ছে। এতে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা হৃদয় মোল্যা বলেন, “এ বছর মৎস্য বিভাগকে চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে কোনো অভিযান চালাতে দেখিনি। নদী-খালে অসংখ্য চায়না দুয়ারি বসানো হয়েছে। এগুলো না সরালে কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় মাছ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।”

সালথা উপজেলার রহিম শেখ বলেন, “আগে বর্ষা মৌসুমে খাল-বিলে জাল ফেললেই নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারির কারণে মাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।”

নগরকান্দা উপজেলার আব্দুল জলিলের ভাষ্য, “অনেক সময় প্রকাশ্যেই চায়না দুয়ারি বসানো হয়। স্থানীয় লোকজন জানালেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। নিয়মিত অভিযান হলে এভাবে কেউ নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করতে সাহস পেত না।”

বোয়ালমারী উপজেলার হায়দার মাতুব্বর বলেন, “চায়না দুয়ারি শুধু বড় মাছ নয়, ছোট পোনা পর্যন্ত ধরে ফেলে। এতে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

ভাঙ্গা উপজেলার কায়সার খাঁন বলেন, “সরকার প্রতি বছর মাছের উৎপাদন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেয়। কিন্তু চায়না দুয়ারির মতো নিষিদ্ধ ফাঁদ বন্ধ করা না গেলে সেই উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।”

আলফাডাঙ্গা উপজেলার কেরামত আলী বলেন, “মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে হলে শুধু অভিযান চালালেই হবে না, যারা বারবার এই ফাঁদ ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।”

চরভদ্রাসন উপজেলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকর্মী আবদুস সবুর কাজল বলেন, “চায়না দুয়ারি এখন ফরিদপুরের নদী-নালা ও খাল-বিলের জন্য নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এই অবৈধ ফাঁদে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, এমনকি রেণুপোনা ও ডিমওয়ালা মা মাছও ধরা পড়ছে। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে নয়, নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এ অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় আগামী প্রজন্ম দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি শুধু বইয়ের পাতাতেই দেখতে পাবে।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়না দুয়ারি এমন একটি স্থায়ী ফাঁদ, যা পানির প্রবাহের মুখে বসানো হয়। এতে বড় মাছের পাশাপাশি রেণুপোনা, কিশোর মাছ এবং ডিমওয়ালা মা মাছও আটকা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের ফাঁদ ব্যবহার নিষিদ্ধ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মৎস্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ জাল ও ফাঁদ ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা, জেল অথবা উভয় ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। তারপরও সহজে বেশি মাছ ধরার আশায় অনেকেই এই অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “শুধু অভিযান চালিয়ে চায়না দুয়ারি নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রথমেই এসব চায়না দুয়ারি কোথায় তৈরি ও সরবরাহ হচ্ছে, সেই উৎস চিহ্নিত করে উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু দুয়ারি জব্দ বা ধ্বংস করলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। গত পাঁচ বছরে ফরিদপুরে চায়না দুয়ারির ব্যবহার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। দেশীয় মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগকে আরও কঠোর ও নিয়মিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”*

ফরিদপুরের সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সাংবাদিক হাসানউজ্জামান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মৎস্যজীবী সংগঠন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ফাঁদের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতাও গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে নিয়মিত ও দৃশ্যমান অভিযান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে ফরিদপুরের নদী-নালা ও খাল-বিলে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তাইতো, জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদকে রক্ষায় সরকারকে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “আমরা চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ফাঁদ অপসারণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। কেউ নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সদরপুরে মাদক সেবনের দায়ে দুই যুবকের কারাদণ্ড

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
সদরপুরে মাদক সেবনের দায়ে দুই যুবকের কারাদণ্ড

ফরিদপুরের সদরপুরে মাদক সেবন করে এলাকাবাসীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করায় আমিনুল কাজী (৩১) ও আজিজুল শেখ (২৮) নামে দুই তরুণকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

বুধবার (২২ জুলাই) রাত ৮ টার দিকে উপজেলার ঢেউখালি ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া এলাকার রাজার চর ওয়াজ হাওলাদার কান্দি এলাকায় সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত আমিনুল কাজী উপজেলার ঢেউখালি ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া গ্রামের মো. আশরাফ কাজী ছেলে ও আজিজুল শেখ একই গ্রামের খলিল শেখের ছেলে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, আমিনুল কাজী (৩১) ও আজিজুল শেখ (২৮) প্রায়ই মাদক সেবন করে পরিবারসহ এলাকার আশপাশের লোকজনের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল ও অপ্রীতিকর আচরণ করেন। এরই প্রেক্ষিতে বুধবারও তারা মাদক ক্রয় করার সময় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের দুজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। এসময় তল্লাশীকালে দুজনের কাছ থেকে ৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়।

স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী তাদের প্রত্যেককে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। জব্দকৃত ৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সহযোগিতা করেন সদরপুর থানার একদল পুলিশ সদস্য ।

সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া বলেন, সমাজে মাদকের বিস্তার রোধে এ ধরনের বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।