শিশু অস্থির? মা-বাবা যা করবেন
শৈশব মানেই শুধু খেলাধুলা আর আনন্দ নয়, এই সময় থেকেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় শিশুদের। স্কুলের পড়া শেষ করা, সময়মতো ক্লাসে পৌঁছানো, বাড়ির কাজ সামলানো কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল করার চাপ, সব মিলিয়ে ছোটদের মনেও তৈরি হতে পারে উদ্বেগ।অনেক সময় তারা নিজের অস্বস্তি মুখে প্রকাশ করতে পারে না। রাগ, কান্না, অস্থিরতা কিংবা হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সেই অনুভূতি প্রকাশ পায়।এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবা অনেক সময় সন্তানকে বকাঝকা করেন বা দ্রুত সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিতে থাকেন। কিন্তু উদ্বিগ্ন শিশুর প্রথম প্রয়োজন হলো নিরাপত্তা, বোঝাপড়া ও ধৈর্য।
তাকে নিজের অনুভূতি চিনতে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করাই বেশি কার্যকর হতে পারে। শিশুর উদ্বেগের মুহূর্তে মা-বাবা কীভাবে পাশে থাকবেন, সে বিষয়ে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা যেতে পারে।
* সব সময় পরামর্শ না দিয়ে শিশুকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন
সন্তান কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত হলে মা-বাবা স্বাভাবিকভাবেই তাকে সমাধানের পথ দেখাতে চান। তবে প্রতিটি সমস্যায় সরাসরি নির্দেশনা না দিয়ে শিশুকে নিজের মতো করে ভাবার সুযোগ দেওয়া জরুরি।
ইউনাইটেড উই কেয়ারের ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ডা. ভাসুধা আগরওয়াল টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিশুর অনুভূতি বোঝা এবং বয়স অনুযায়ী নিজে সমস্যা মোকাবিলার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ধরা যাক, পরীক্ষার আগে সন্তান খুব নার্ভাস। এ সময় বারবার ‘এটা পড়েছ?’, ‘ওটা মুখস্থ হয়েছে?’ বলে চাপ বাড়ানোর বদলে তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন, ‘কোন বিষয়টা নিয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছে?’ এরপর তার কথা শুনে কীভাবে প্রস্তুতি নেবে, সে বিষয়ে নিজে পরিকল্পনা করতে উৎসাহ দিন। প্রয়োজনে পাশে থেকে সহায়তা করুন, তবে সব সিদ্ধান্ত তার হয়ে নেবেন না।
* কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে আগেই পরিকল্পনা করুন
কোনো বিষয় নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ তৈরি হলে শিশুর সঙ্গে বসে একটি সহজ পরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে। যেমন, পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পড়ার সময় ভাগ করে দেওয়া, মাঝেমধ্যে বিরতি রাখা কিংবা কঠিন অধ্যায়গুলো ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নেওয়া।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু না হলে শিশুকে ব্যর্থ মনে করানো যাবে না। বরং কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা বুঝে নতুনভাবে চেষ্টা করতে উৎসাহ দিন। খেলাধুলার ছলে বিভিন্ন পরিস্থিতি অনুশীলন করানোও কাজে আসতে পারে। এতে কঠিন বিষয়কে শিশুর কাছে কিছুটা সহজ ও পরিচিত করে তোলা সম্ভব।
* আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এমন কথা বলুন
শিশু উদ্বেগের কথা জানালে তাকে দুর্বল বা ভীতু বলে আখ্যা দেবেন না। ‘এত ভয় পাওয়ার কী আছে?’ কিংবা ‘এতটুকু পারছ না কেন?’ এ ধরনের কথা তার অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এর পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘তোমার চিন্তা হচ্ছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি’, ‘চলো, আমরা একসঙ্গে উপায় খুঁজি’ কিংবা ‘একবারে সব করতে হবে না, ধীরে ধীরে চেষ্টা করো।’ এ ধরনের কথায় শিশু বুঝতে পারে, তার অনুভূতি গুরুত্ব পাচ্ছে এবং সমস্যা সামলাতে সে একা নয়। একইসঙ্গে তাকে মনে করিয়ে দিন, ভুল করা শেখারই একটি অংশ।
* শরীর ও মন শান্ত করার অভ্যাস গড়ে তুলুন
উদ্বেগের সময় শিশুর হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যেতে পারে, শ্বাস দ্রুত হতে পারে কিংবা শরীর শক্ত হয়ে আসতে পারে। তাই নিজের শরীরের এসব পরিবর্তন চিনতে শেখানো উপকারী। শিশুকে আরাম করে বসতে বলুন। তারপর ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার অনুশীলন করাতে পারেন। বয়স উপযোগী হলে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শান্তভাবে বসা, পছন্দের গান শোনা কিংবা অল্প সময় হাঁটাহাঁটিও তাকে স্বস্তি দিতে পারে। শিশু খুব বেশি অস্থির থাকলে জোর করে কোনো অনুশীলন করাবেন না। তার প্রয়োজন অনুযায়ী সময় দিন এবং কোন পদ্ধতিতে সে স্বস্তি বোধ করে, তা বুঝতে চেষ্টা করুন।
* আলিঙ্গন ও স্নেহের মাধ্যমে পাশে থাকুন
সন্তান উদ্বিগ্ন বা ভীত হলে মা-বাবার স্নেহপূর্ণ উপস্থিতি তাকে নিরাপত্তার অনুভূতি দিতে পারে। শিশু স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে তাকে আলিঙ্গন করা, হাত ধরে রাখা কিংবা পাশে বসে থাকা প্রশান্তি দিতে সাহায্য করতে পারে। সব শিশু একইভাবে স্নেহ প্রকাশ পছন্দ করে না। কেউ আলিঙ্গন চাইতে পারে, আবার কেউ কিছুটা ব্যক্তিগত জায়গা পছন্দ করতে পারে। তাই শিশুর ইচ্ছা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিন। সে কথা বলতে না চাইলে জোর না করে তাকে বুঝিয়ে দিন, প্রয়োজন হলে আপনি তার পাশে আছেন।
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন?
শিশুর মধ্যে মাঝেমধ্যে উদ্বেগ দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। উদ্বেগ যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা, ঘুম, খাওয়াদাওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশায় বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন এমন পেশাদারের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
শিশুকে উদ্বেগ থেকে দূরে রাখার অর্থ তার জীবনের সব চ্যালেঞ্জ সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং তাকে অনুভূতি বুঝতে, সমস্যা নিয়ে কথা বলতে এবং ধীরে ধীরে নিজের মতো করে পরিস্থিতি সামলাতে শেখানোই গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবার ধৈর্য, সহমর্মিতা ও নিরাপদ আশ্রয় শিশুকে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন