খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা কেন সমাজের জন্য সত্যিকারের মঙ্গল?

মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা কেন সমাজের জন্য সত্যিকারের মঙ্গল?

জাতীয় বিনির্মাণের নামে যদি শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান দেখানো হয়; অথচ ক্ষমতার ভুল, অপচয় ও ব্যর্থতাকে প্রশ্ন করা বন্ধ থাকে, তাহলে তা প্রকৃত উন্নয়ন নয়, একটি সাজানো ভাস্কর্য মাত্র। এই বাস্তবতায় স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো বিলাসী আদর্শ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

যখন রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের সম্পর্ক ধীরে ধীরে শাসক অধীনতার নিঃশব্দ বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে, তখন সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা আর শুধু খবর পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এ সময়েই সাংবাদিকতাকে ক্ষমতার দরবারে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলতে হয়, তাকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হয়। আজ সেই দায়িত্ব সততা ও সাহসের সঙ্গে বহন করাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের সংবাদ পরিবেশ ছিল গভীর সংকটে। ভয়, স্বার্থ বা অনিচ্ছার কারণে বহু সংবাদমাধ্যম ক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করে চলেছে। এর ফল ছিল একপাক্ষিক সংবাদচর্চা, যা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিজ বাসভবন থেকে উচ্ছেদ, কারাবাস, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না দেওয়া, কিংবা তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার না করার মতো মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট গুরুতর বিষয়গুলো জাতীয় গণমাধ্যমে তখন নিরপেক্ষ ও বিচারসাপেক্ষ আলোচনার সুযোগ পায়নি। বাস্তবতা হলো, অনেক সংবাদকক্ষ সত্য অনুসন্ধানের বদলে নিরাপদ নীরবতাকেই বেছে নিয়েছিল। অথচ স্বাধীন সাংবাদিকতার ভিত্তি হলো সত্য বলা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশ। এ দায় এড়ালে সাংবাদিকতা তার নৈতিক বৈধতা হারায়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে কিছুটা মতপ্রকাশের সুযোগ তৈরি হলেও আরেকটি সমস্যার উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ এখন পছন্দের রাজনৈতিক দলের নিয়মিত প্রশংসামূলক লেখা প্রকাশ করছে। এটি ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হতে পারে, কিন্তু একে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বলা যায় না। নিরপেক্ষতার অর্থ কোনো পক্ষের প্রশংসা বা বিরোধিতা নয়; বরং তথ্য যাচাই, প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ এবং যে কোনো ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন রাখা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা সবসময়ই ক্ষমতার মুখোমুখি প্রশ্ন তোলে, সে ক্ষমতা রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকুক, বিরোধী রাজনীতিতে থাকুক কিংবা কোনো দল, সংগঠন বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হোক। ক্ষমতার উৎস যেখানেই হোক, তাকে যাচাই ও জবাবদিহির আওতায় আনাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। শক্তিশালী ও কার্যকর গণতন্ত্র গড়ে তুলতে এ দৃষ্টিভঙ্গির কোনো বিকল্প নেই।

অনেকেই মনে করেন, সরকারের সমালোচনা করলেই সাংবাদিকতা স্বাধীন হয়। এটি ভুল ধারণা। স্বাধীন সাংবাদিকতা মানে হলো যে কোনো ক্ষমতার মুখোমুখি সত্য বলার সাহস। সরকার বা বিরোধী দল যখন বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত দাবি জনগণের সামনে তোলে, তখন সাংবাদিকতার দায়িত্ব সেটিকে যাচাই ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভেঙে দেওয়া। কারণ, জাতীয় বিনির্মাণের ভিত্তি হলো তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, ন্যায্যতা ও জবাবদিহি। এ ভিত্তি দুর্বল হলে গণমাধ্যমই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি।

বর্তমান সংবাদপরিবেশ একটি স্পষ্ট চাপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, মব জাস্টিস, নির্বাচনকেন্দ্রিক মেরূকরণ সংবাদপ্রবাহকে ক্রমশ সংকুচিত করে তুলছে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা, সাংবাদিক গ্রেপ্তার, সংবাদ প্রত্যাহার কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখে নীতিমালার পরিবর্তন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না; এগুলো একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। এ পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে সংবাদকক্ষে সতর্কতা ও আত্মসংযম বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশের সক্ষমতাকে সীমিত করে দেয়।

এর ক্ষতি শুধু গণমাধ্যমের নয়, পুরো সমাজের। তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকলে দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবিক অবহেলা আড়ালেই থেকে যায়। তখন উন্নয়ন হয় কাগজে, বাস্তবে নয়। আর জাতির আস্থার ভিত্তি ভেঙে পড়ে। এখানেই স্বাধীন সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দায়বদ্ধতা ছাড়া স্বাধীনতা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত হলো তথ্য যাচাই। গুজব ও অপপ্রচারের এ সময়ে যাচাইহীন সংবাদ শুধু বিভ্রান্তি বাড়ায় এবং সামাজিক বিভাজনকে তীব্র করে।

এ প্রেক্ষাপটে হলুদ সাংবাদিকতার ঝুঁকি আরও প্রকট। ক্লিক ও দর্শক বাড়ানোর প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অতিরঞ্জনের প্রবণতা অনেক সংবাদমাধ্যমকে নাটকীয় শিরোনাম ও অর্ধসত্যে ঠেলে দিচ্ছে। এটি শুধু পেশাগত অবক্ষয় নয়; এটি একটি সামাজিক বিপর্যয়। কারণ হলুদ সাংবাদিকতা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার শক্তিকে দুর্বল করে এবং সমাজে ভয়, ঘৃণা ও বিভাজন ছড়ায়।

তবে এ সংকটের দায় এককভাবে সাংবাদিকদের ওপর চাপানো যায় না। মালিকানার রাজনৈতিক সংযোগ, আর্থিক চাপ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা একটি কাঠামোগত সমস্যা তৈরি করেছে। চাকরি হারানো বা মামলার ভয়ে অনেকেই সত্য বলার ঝুঁকি নিতে পারেন না। ফলে সংবাদকক্ষগুলো সত্যের বদলে সুবিধাজনক ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়।

জাতীয় বিনির্মাণের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এমন সমাজ গড়া, যেখানে সত্যের মূল্য আছে। যেখানে ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন তোলা যায়, ভুল হলে সংশোধন সম্ভব এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ গুরুত্ব পায়। এ দায়িত্ববোধ ছাড়া উন্নয়ন শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা কখনোই শুধু বিরোধীপক্ষের হাতিয়ার নয়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছিল। ব্রিটেনে বিবিসি সরকার ও বিরোধী উভয়ের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, এটাই তার নিরপেক্ষতার প্রমাণ। এসব উদাহরণ দেখায়, স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনোপক্ষের শত্রু নয়; এটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলিত করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সরকার ও বিরোধী উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। কারণ, সত্য কোনো পক্ষের সম্পত্তি নয়। সত্যই গণতন্ত্রের আসল শক্তি। সত্য, নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতা—এ তিনের সমন্বয়েই স্বাধীন সাংবাদিকতা জাতীয় বিনির্মাণের দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে। এ ভিত্তি না থাকলে রাষ্ট্র শুধু শাসনের কাঠামো হয়ে ওঠে, গণতন্ত্র নয়।

লেখক: দুবাই প্রতিনিধি, কালবেলা

 

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা