খুঁজুন
, ,

মাদকের আগ্রাসনে বিপন্ন পরিবার ও সমাজ : রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়

রেহেনা ফেরদৌসী
প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ
মাদকের আগ্রাসনে বিপন্ন পরিবার ও সমাজ : রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়

একজন বাবা নিজের সন্তানকে হত্যা করেছেন। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষ থেকে পৌঁছে গেছেন পুনর্বাসন কেন্দ্রে। একজন মা শেষ সম্বল জমি বিক্রি করেও ছেলেকে নেশার অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায়, আদালতের নথিতে, হাসপাতালের বেডে কিংবা অসংখ্য পরিবারের নিভৃত কান্নায় ফিরে ফিরে আসে একই শব্দ মাদক।

২৬ জুন, আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়েছে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শুধু সেমিনার, ব্যানার আর র‍্যালি কি এই ভয়াবহ সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট? কারণ মাদক এখন আর কেবল একজন ব্যক্তির নেশা নয়; এটি একটি সামাজিক মহামারি, যা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি এবং জাতির ভবিষ্যৎ।

মাদক নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই আমরা সংখ্যা শুনি লাখ লাখ আসক্ত, কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য, শত শত মামলা কিংবা অসংখ্য উদ্ধার অভিযান। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি মানুষের গল্প, একটি পরিবারের বেদনা, একটি অপূর্ণ স্বপ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো তরুণদের সম্পৃক্ততা।

কিশোর, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী তরুণ, এমনকি বিদ্যালয়গামী অনেক শিক্ষার্থীও মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। যে প্রজন্ম দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ হওয়ার কথা, সেই প্রজন্মের একটি অংশ ধীরে ধীরে নেশার জালে আটকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে আলোচিত মাদক হলো ইয়াবা, যা মূলত মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি। অল্প সময়ের জন্য এটি কৃত্রিম উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ক ও শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে। এর পাশাপাশি ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), কোকেইন, এলএসডি, বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট এবং নতুন প্রজন্মের কিছু সিনথেটিক মাদকও দেশে প্রবেশ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক ব্যবসায়ীরা সময়ের সঙ্গে কৌশল বদলাচ্ছে। আগে যেখানে সীমান্তভিত্তিক সরবরাহ বেশি ছিল, এখন অনলাইন যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গোপন ডেলিভারি নেটওয়ার্কও ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে যেমন বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীদের কাছেও এটি একটি সংবেদনশীল অঞ্চল। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলকে বহুবার মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারত সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা এবং অন্যান্য মাদক প্রবেশের ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উঠে এসেছে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক মাদক চক্র বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, কনটেইনার পরিবহন, কুরিয়ার সার্ভিস এবং ট্রানজিট ব্যবস্থাকেও ব্যবহার করার চেষ্টা করে। ফলে মাদক সমস্যাকে শুধুমাত্র একটি অপরাধ হিসেবে নয়, বরং সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র এবং অর্থনৈতিক অপরাধের সমন্বিত চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখতে হবে।

কেন তরুণরা মাদকের দিকে ঝুঁকছে? এ প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়। বন্ধুমহলের চাপ, কৌতূহল, হতাশা, বেকারত্ব, সম্পর্কের ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সবকিছু মিলেই একজন তরুণকে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অনেকেই প্রথমে মনে করে, “একবার চেষ্টা করলে ক্ষতি কী?” কিন্তু নেশার জগতের সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো এটি শুরু করা সহজ, কিন্তু বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন।

চিকিৎসকদের মতে, মাদক মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। দীর্ঘদিন ইয়াবা বা অন্যান্য উত্তেজক মাদক গ্রহণের ফলে দেখা দিতে পারে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোকের ঝুঁকি, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, স্নায়বিক সমস্যা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ইত্যাদি। মানসিকভাবে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। একজন আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে বিষণ্নতা, সন্দেহপ্রবণতা, হ্যালুসিনেশন, অনিদ্রা এবং আক্রমণাত্মক আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি বাস্তবতা ও কল্পনার পার্থক্য হারিয়ে ফেলেন।

মাদকের সবচেয়ে বড় ট্র‍্যাজেডি ঘটে পরিবারের ভেতরে। যে বাবা একদিন সন্তানের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই বাবাই নেশার ঘোরে পরিবারকে আতঙ্কের মধ্যে ফেলছেন। যে সন্তান একদিন বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল, সে-ই হয়ে উঠছে পরিবারের দুঃস্বপ্ন। সংসারের অর্থ চলে যাচ্ছে নেশার পেছনে। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে জমি, গয়না, সঞ্চয়। বাড়ছে কলহ, নির্যাতন ও বিচ্ছেদ। দেশে বিভিন্ন সময়ে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তির হাতে সন্তান, স্ত্রী কিংবা পরিবারের সদস্য নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনা শুধু অপরাধ নয়; এগুলো মানবিক মূল্যবোধের ভাঙনের নির্মম প্রতিচ্ছবি।

একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির কারণে শুধু একজন মানুষ নয়, পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। মাদকাসক্তি ও অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। নেশার অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকেই জড়িয়ে পড়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, প্রতারণা ও সহিংসতায়। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি, এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাস এবং নানা অপরাধ কর্মকান্ডের পেছনেও মাদকের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যখন সমাজের একটি অংশ মাদকের প্রভাবে নৈতিক বোধ হারিয়ে ফেলে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামাজিক আস্থা, নিরাপত্তা এবং মানবিক সম্পর্ক।

মাদকের কারণে একজন কর্মক্ষম মানুষ ধীরে ধীরে উৎপাদনশীলতা হারায়। কর্মস্থলে অনুপস্থিতি বাড়ে, দক্ষতা কমে যায়, কর্মজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে চিকিৎসা, পুনর্বাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, বিচারিক কার্যক্রম এবং অপরাধ দমনে রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, মাদকের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তার বড় অংশই সরাসরি হিসাবের বাইরে থেকে যায়। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর।

এ অবস্থায় মাদকবিরোধী অভিযান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু গ্রেপ্তার ও উদ্ধার অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক সচেতনতা কার্যক্রম, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে তরুণদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, সহজলভ্য পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা, পরিবারে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে নয়, চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে এমন একজন মানুষ হিসেবেও দেখতে হবে।

এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার…মাদক একটি মানুষকে ধ্বংস করে। একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়। একটি সমাজকে দুর্বল করে। একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত আমরা কি শুধু দিবস পালন করব, নাকি সত্যিই মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য কাজ করব? কারণ মাদক একটি টান দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায় স্বপ্ন, সম্পর্ক, সম্মান, সম্ভাবনা এবং জীবনকে। আসুন, মাদককে না বলি। জীবনকে হ্যাঁ বলি। প্রজন্মকে বাঁচাই, পরিবারকে বাঁচাই, দেশকে বাঁচাই। মাদকমুক্ত বাংলাদেশই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার। মাদকমুক্ত দেশ গড়তে চাই সামাজিক প্রতিরোধের জাগরণ এবং প্রতিরোধেই মুক্তির পথ।

লেখক: সহ-সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, কেন্দ্রীয় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

আন্তর্জাতিক শান্তিপদক পেলেন সালথার নবকাম পল্লী কলেজের অধ্যক্ষ ওবায়দুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০১ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক শান্তিপদক পেলেন সালথার নবকাম পল্লী কলেজের অধ্যক্ষ ওবায়দুর রহমান

শিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা ‘ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যাওয়ার্ড’ (International Peace Award) অর্জন করেছেন ফরিদপুরের সালথা উপজেলার যদুনন্দীতে অবস্থিত নবকাম পল্লী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. ওবায়দুর রহমান। বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস সোসাইটি’ (International Human Rights Society) তাঁকে এই পদকে ভূষিত করে। সম্প্রতি এক সুধী আয়োজনের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এ সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করেন।

​শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সুদৃঢ় নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রফেসর ওবায়দুর রহমান জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক মূল্যায়নে একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। তিনি সালথা উপজেলায় একাধিকবার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান নির্বাচিত হওয়া ছাড়াও সামগ্রিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, ঝরে পড়া রোধ এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকার জন্য ফরিদপুর জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কলেজ প্রধান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

​অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাঁর মেধা, নিষ্ঠা ও নিরলস প্রচেষ্টায় গ্রামভিত্তিক এই কলেজটির শিক্ষার পরিবেশ ও অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। তাঁর এমন বৈশ্বিক ও জাতীয় স্বীকৃতিতে কলেজের শিক্ষকমণ্ডলী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের মাঝে আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন তাঁকে শুভকামনা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।

​সম্মাননা প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে প্রফেসর মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, “যেকোনো স্বীকৃতিই কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এ আন্তর্জাতিক সম্মাননা আমার একার নয়; এটি আমার প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নবকাম পল্লী কলেজ, সহকর্মী শিক্ষকবৃন্দ এবং পুরো সালথাবাসীর ভালোবাসার ফসল। শিক্ষার আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সমাজসেবামূলক এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আমি সকলের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি।”

​স্থানীয় গুণীজনদের মতে, তাঁর এই সম্মাননা কেবল ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং পুরো ফরিদপুর জেলার শিক্ষা ও সামাজিক অঙ্গনের জন্য এক অনন্য গর্ব এবং অনুপ্রেরণা।

সদরপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্প জনশূন্য, ৫২ ঘরে এখন ১৫ পরিবারের বসবাস

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
সদরপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্প জনশূন্য, ৫২ ঘরে এখন ১৫ পরিবারের বসবাস

উপরে জমে থাকা কালো পানি, নিচে হাঁটুসমান কাদা আর চারপাশ ঘিরে ঝোপঝাড়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অগ্রাধিকারভিত্তিক আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘরগুলো যেখানে গৃহহীন মানুষের নিরাপদ ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল, ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের সেই নতুন বাজার সংলগ্ন প্রকল্পটির অবস্থা এখন পুরোপুরি উল্টো।

চলাচলের রাস্তার বেহাল দশা, নিচু জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও মাদকসেবীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়ায় দুর্ভোগের চরম সীমায় পৌঁছেছেন সেখানকার বাসিন্দারা। ফলে নিরুপায় হয়ে সিংহভাগ পরিবারই আশ্রয়ণ প্রকল্প ছেড়ে চলে গেছে।

​বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সদরপুরের ঢেউখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পে মোট ৫২টি ঘর রয়েছে। তবে দুর্ভোগের কারণে মাত্র ১৫টি পরিবার কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে তাদের বসতি। ফাঁকা পড়ে থাকা বাকি ৩৭টি ঘর পড়ে আছে পুরোপুরি পরিত্যক্ত অবস্থায়। দেখভাল না থাকায় এসব ঘরের চারপাশ ঢেকে গেছে লতাপাতা আর ঝোপঝাড়ে। জঙ্গলকীর্ণ এ পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে দিন-রাতে বসছে মাদকসেবীদের আখড়া, যা অবশিষ্ট বাসিন্দাদের নিরাপত্তাঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

​বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় এক দিনের বৃষ্টিতেই টানা এক সপ্তাহ জলজট থাকে প্রকল্প এলাকায়। নিচু জায়গায় পানি আটকে অনেকে ঘরেই ঢুকে পড়ছে পানি। বাথরুম ও আঙিনায় একই অবস্থা তৈরি হওয়ায় বাসিন্দাদের মানবেতর দিন কাটাতে হচ্ছে।

​প্রকল্পের বাসিন্দা মিনু আক্তার (৪০) ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “বৃষ্টির পানি বের হওয়ার কোনো পথ নাই। একদিন বৃষ্টি হলেই সাতদিন ধরে পানি জমে থাকে। থাকার ঘরে পানি ঢুকে যায়, বারান্দায়ও পানি আটকে থাকে। বাথরুমে পর্যন্ত যাওয়া যায় না, বাধ্য হয়ে বাইরে যেতে হয়। প্রতিদিন ঘর থেকে পানি সেচতে সেচতে আমার হাতে ঘা হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের তো যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই, তাই স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে বাধ্য হয়ে এই কষ্ট সহ্য করছি।”

​অন্য বাসিন্দা জিয়াসমিন আক্তার (৩০) জানান জীবনের ঝুঁকি আর অসুবিধার কথা। তিনি বলেন, “কয়েকদিন আগে আমার আট মাসের শিশুসন্তান উঠানে জমে থাকা পানিতে পড়ে গিয়েছিল। কোনোমতে উদ্ধার করেছি। পানি একটু কমলে চারপাশের দুর্গন্ধ আর মশা-মাছির উপদ্রবে টেকা যায় না। রাস্তায় হাঁটু কাদা। এই কষ্টের কথা সহ্য করতে না পেরে অধিকাংশ পরিবার প্রকল্প ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে। আমরা গরিব মানুষ, যাওয়ার জায়গা নাই বলেই পড়ে আছি। তার ওপর ফাঁকা ঘরগুলোতে বখাটে আর মাদকসেবীরা আড্ডা দেয়, রাতে খুব ভয় লাগে।”

​স্থানীয়দের অভিযোগ, আশ্রয়হীনদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে গিয়ে পরিকল্পনাহীনভাবে নিচু জমিতে প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় এটি এখন নতুন দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। তারা অনতিবিলম্বে জলজট নিরসনে ড্রেন নির্মাণ, পরিত্যক্ত ঘর সংস্কার এবং নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশি টহলের দাবি জানান।

​সার্বিক বিষয়ে ঢেউখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বয়াতি স্বীকার করেন বাসিন্দাদের এই মানবিক বিপর্যয়ের কথা। তিনি বলেন, “আমি নিজে গিয়ে তাদের দুর্দশা দেখে এসেছি। সত্যিই সেখানে মানুষ থাকার মতো কোনো পরিবেশ নেই। জমি নিচু হওয়ায় মাটি ভরাটের কথা ভাবা হলেও তাতে জলাবদ্ধতা আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। তাই চারপাশ ঘুরে পাকা ড্রেন নির্মাণই একমাত্র বিকল্প সমাধান। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।”

​যোগাযোগ করা হলে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। নিচু জমি ও পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় সেখানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকৌশলী পাঠিয়ে স্থানটি পরিদর্শন করে একটি ড্রেনেজ প্ল্যান তৈরি করব। বর্ষার পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হলে জলাবদ্ধতা দূর হবে। পাশাপাশি ফাঁকা ঘরগুলোর সংস্কার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”

মানচিত্রের ওপারে কান্না: বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র জনপদে উন্নয়নের আলো কতটা পৌঁছেছে?

রেহেনা ফেরদৌসী
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ
মানচিত্রের ওপারে কান্না: বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র জনপদে  উন্নয়নের আলো কতটা পৌঁছেছে?

বাংলাদেশের মানচিত্রে প্রতিটি জেলা একই রাষ্ট্রের অংশ, প্রতিটি মানুষ একই দেশের নাগরিক। তবু জীবনযাত্রার বাস্তবতায় এই মানচিত্রেরভেতরেই রয়েছে গভীর বৈষম্য। কোথাও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি দ্রুত, কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক বেশি, নাগরিক সুবিধা সহজলভ্য; আবার কোথাও মানুষের প্রতিদিনের জীবন এখনো আবর্তিত হয় অন্ন, কাজ, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের মৌলিক চাহিদাকে ঘিরে।

একটি জেলার দারিদ্র্যের হার যখন জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়, তখন তার অভিঘাত শুধু পরিবারের আয়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষার সুযোগ, চিকিৎসা গ্রহণ, বাসস্থানের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর। অর্থাৎ দারিদ্র্য একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সামর্থ্য কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তার সামনে থাকা সম্ভাবনার পরিধিও সংকুচিত করে। একজন নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে মাসের শুরু ও শেষের ব্যবধানও অনেক সময় গভীর। আয় হাতে আসার পর তাকে একসঙ্গে সামলাতে হয় খাবার, বাসা ভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, পোশাক, যাতায়াত এবং চিকিৎসার খরচ। হঠাৎ কোনো অসুস্থতা, কর্মহীনতা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সেই সীমিত হিসাবকে সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় তখন, যখন আয় থাকলেও তা অনিয়মিত। কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বহু মানুষের জীবনে কাজের নিশ্চয়তা নেই। কোনো মৌসুমে কাজ আছে, অন্য সময়ে নেই; কোনো দিন আয় হয়, কোনো দিন হয় না। কিন্তু পরিবারের প্রয়োজন প্রতিদিনই থাকে। ফলেআয়-ব্যয়ের সামান্য ভারসাম্যহীনতাও অনেক পরিবারকে ধার বা ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।

একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন শিশুর শিক্ষা জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে। স্কুলে যাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বই, পোশাক, পরিবহন, শিক্ষা উপকরণ কিংবা অতিরিক্ত সহায়তার ব্যয় বহন করাও কোনো কোনো পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে শিশুকে পড়াশোনার পাশাপাশি আয়মূলক কাজে যুক্ত করার চাপ তৈরি হতে পারে। এখানেই দারিদ্র্য একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সঞ্চারিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। যে শিশু পর্যাপ্ত শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগ থেকে পিছিয়ে যায়, ভবিষ্যতে তার স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাওসীমিত হতে পারে। ফলে আজকের দারিদ্র্য আগামী দিনের আয়ও জীবনমানকেও প্রভাবিত করে।

স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। একটি সচ্ছল পরিবারের কাছে অসুস্থতা হয়তো সাময়িক আর্থিক চাপ; কিন্তু দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠতে পারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট। চিকিৎসার খরচ জোগাতে সঞ্চয় শেষ হওয়া, ধার করা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিলম্বিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ অসুস্থতা তখন শুধু শরীরের সমস্যা থাকে না—পরিবারের অর্থনীতিতেও আঘাত হানে।

বাসস্থানের নিরাপত্তাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নদীভাঙন, বন্যা, জলাবদ্ধতা কিংবা অন্যান্য দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে দরিদ্র মানুষের ক্ষতির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। একটি ঘরনষ্ট হওয়া তাদের কাছে শুধু একটি স্থাপনা হারানো নয়; এর সঙ্গেহারিয়ে যেতে পারে আসবাব, প্রয়োজনীয় সামগ্রী, গবাদিপশুকিংবা জীবিকা নির্বাহের উপকরণ। সামান্য সম্পদ হারিয়েই একটিপরিবার আবারও শূন্য থেকে শুরু করতে বাধ্য হতে পারে।এ কারণেই কোনো জেলার দারিদ্র্যের হারকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে বাস্তব সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। সংখ্যার পেছনে আছে মানুষের মুখ, পরিবারের অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং প্রতিদিনের সংগ্রাম। অথচ একই সময়ে আমরা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং নতুন নতুন সুযোগের কথা বলছি। সেতু, মহাসড়ক, মেট্রোরেল কিংবা শিল্পায়ন—সবই উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু উন্নয়নের আরেকটি প্রশ্নও জরুরি: এই অগ্রগতির সুফল দেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষটির জীবনে কতটা পৌঁছেছে?

উন্নয়নের অর্থ শুধু জাতীয় আয় বৃদ্ধি নয়। একজন কৃষক যদি উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পান, একজন শ্রমিক যদি স্থিতিশীল কাজ পান, একজন মা যদি সন্তানের চিকিৎসা নিয়ে আতঙ্কিত না হন, একটি শিশু যদি পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে না ফেলে—তবেই উন্নয়নের অর্থ মানুষের জীবনে আরও গভীর হয়ে ওঠে। তাই দারিদ্র্য মোকাবিলায় শুধু সহায়তা বিতরণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানো এবং দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা আরও স্থিতিশীল করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সহায়তার পাশাপাশি মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা।

বাংলাদেশের দরিদ্রতম জনপদগুলোর দিকে তাকানো মানে দেশেরব্যর্থতার তালিকা তৈরি করা নয়। বরং এটি উন্নয়নের অসমাপ্ত কাজগুলো চিহ্নিত করার একটি প্রয়োজনীয় আয়না। কারণ একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি শুধু রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, নতুন স্থাপনা কিংবা অর্থনীতির বড় সংখ্যায় ধরা পড়ে না। তার প্রকৃত প্রতিফলন দেখা যায় সেই ঘরে, যেখানে একজন বাবা হিসাব করেন আগামী সপ্তাহের বাজার কীভাবে চলবে; সেই মায়ের উৎকণ্ঠায়, যিনি সন্তানের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে ভাবেন; সেই শিশুর চোখে, যার স্বপ্ন আছে কিন্তু সুযোগ সীমিত।

বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার মানুষের মর্যাদা সমান। তাই মানচিত্রের কোনো প্রান্তে জন্ম নেওয়া একজন মানুষের সম্ভাবনা যেন তার জন্মস্থানের দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত না হয়।উন্নয়নের আলো তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জনপদের মানুষও সেই আলোর উষ্ণতা অনুভব করবেন।

একই মানচিত্র, একই পতাকা, একই দেশের মানুষ—তবু জীবনের ব্যবধান যেন দুই বাংলাদেশের গল্প না হয়ে ওঠে।

লেখক: সহ-সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, কেন্দ্রীয় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।