আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন তারেক রহমান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সদস্যরা শপথ নিচ্ছেন আজ মঙ্গলবার সকালে। বিকেলেই অনুষ্ঠিত হবে মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান। এর মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটি নির্বাচিত সরকার গঠন এবং এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বে এ যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ হবে পর্যায়ক্রমে। এরপর বিকেল চারটায় মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ হবে।
ঐতিহ্যগতভাবে নতুন মন্ত্রিসভার শপথের আনুষ্ঠানিকতা হতো বঙ্গভবনের দরবার হলে। এবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে ব্যতিক্রম এবং ‘প্রতীকী’ ঘটনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকার এ দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সংবিধান অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভার শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন দেশি ও বিদেশি অতিথি অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে, যার মধ্যে ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি রয়েছেন।
সবার দৃষ্টি মন্ত্রিসভায়
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এককভাবে ২০৯টিতে জয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। এখন সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রে নতুন মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমগুলোতে কয়েক দিন ধরে নানা রকম সংবাদ ছাপা হচ্ছে। প্রথম আলোও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে, কিন্তু কেউ সুনির্দিষ্ট করে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি। বিএনপির প্রধান তারেক রহমান নিজেই মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে কাজ করছেন। তাঁকে দলের স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য সহায়তা করছেন বলে জানা গেছে।বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার মন্ত্রিসভা খুব ভেবেচিন্তে করা হচ্ছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকসহ আরও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রীর নামও আলোচনায় আছে।পাশাপাশি তরুণ অনেক নেতাকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ও হুমায়ুন কবির, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, খন্দকার আবদুল মুক্তাদির (সিলেট-১), অনিন্দ্য ইসলাম (যশোর-৩), জাকারিয়া তাহের (কুমিল্লা-৮) ও ফারজানা শারমিন (নাটোর-১) মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন, এমন আলোচনা রয়েছে।
বিএনপির জোটের শরিকদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ও গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হকের নামও আলোচনায় আছে।এ ছাড়া সুষ্ঠু ও দক্ষতার সঙ্গে সরকার পরিচালনার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি টিম কাজ করবে, যাঁরা মন্ত্রিপরিষদসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এ ক্ষেত্রে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের সহায়তা নেওয়া হবে।
একটি নতুন যাত্রার প্রত্যাশা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে স্বৈরাচারী সরকারের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয় বিএনপি। সরকারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়। এরপর দায়িত্ব নেয় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের অধীন গত বৃহস্পতিবার একটি উৎসবমুখর সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি।
ইতিমধ্যে তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বিভেদ ঘুচিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। এতে সর্বস্তরে একটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে তাঁদের বিশেষ দৃষ্টি থাকবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য বিএনপির সামনে এটি একটি বড় সুযোগ এসেছে। এ জন্য মন্ত্রিসভায় সৎ, দক্ষ ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের প্রাধান্য কতটা থাকছে, সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা তপন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবে নতুন সরকারের কাছে আমার প্রথম প্রত্যাশা—দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারা এমন কিছু উদ্যোগ বা ব্যবস্থা নেবে, যাতে উদ্যোক্তাদের হারানো আস্থা ফিরে আসে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, মর্নিং শোজ দ্য ডে। সেটির প্রতিফলন সরকারকে শুরুতে দেখাতে হবে।’
নতুন সরকারের যাত্রার প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদ নেতা, সংসদ উপনেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েও নানা আলোচনা-গুঞ্জন চলছে।
নানা হিসাব-নিকাশে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনায় রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। তবে বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আরও সময় আছে। জাতীয় সংসদে স্পিকার হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের নাম আলোচনায় রয়েছে।
স্মৃতিতে ফিরছে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সাল
আজ ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি; তারেক রহমান যখন প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন, তখন অনেকের স্মৃতিতে ফিরে আসছে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সাল। ৪৬ বছর আগে ১৯৭৯ সালের ১৬ এপ্রিল তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ধারায় প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন ৪২ জন। আর এখন থেকে ৩৪ বছর আগে ১৯৯১ সালে তাঁর মা খালেদা জিয়া প্রথম বাংলাদেশের নারী প্রধানমন্ত্রী হন। সেটি ছিল ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ। তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁকে শপথ পড়ান। সে মন্ত্রিসভা ছিল ৩১ সদস্যের। খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০০১ সালে যখন তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন, সে মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন ৬০ জন।
জাতীয় সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ইস্যু করা হচ্ছে। তাঁদের কাছে শপথের আমন্ত্রণপত্র কোনো কারণবশত হাতে না পৌঁছালে সংসদ ভবনের টানেলের অভ্যন্তরের মূল প্রবেশপথে অবস্থিত ‘ফ্রন্ট ডেস্ক’ থেকে তাঁরা সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে সংসদ সচিবালয় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সঙ্গে রাখার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা আর প্রত্যাশার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, দীর্ঘ অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার একটি দল কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে, তার প্রতিচ্ছবি অনেকটাই স্পষ্ট হবে নতুন মন্ত্রিসভার চেহারায়।
সূত্র : প্রথম আলো

আপনার মতামত লিখুন
Array