খুঁজুন
, ,

আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন তারেক রহমান

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ
আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন তারেক রহমান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সদস্যরা শপথ নিচ্ছেন আজ মঙ্গলবার সকালে। বিকেলেই অনুষ্ঠিত হবে মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান। এর মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী একটি নির্বাচিত সরকার গঠন এবং এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বে এ যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।

জাতীয় সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ হবে পর্যায়ক্রমে। এরপর বিকেল চারটায় মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ হবে।

ঐতিহ্যগতভাবে নতুন মন্ত্রিসভার শপথের আনুষ্ঠানিকতা হতো বঙ্গভবনের দরবার হলে। এবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে ব্যতিক্রম এবং ‘প্রতীকী’ ঘটনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকার এ দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সংবিধান অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভার শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন দেশি ও বিদেশি অতিথি অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে, যার মধ্যে ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি রয়েছেন।

সবার দৃষ্টি মন্ত্রিসভায়

১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এককভাবে ২০৯টিতে জয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। এখন সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রে নতুন মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমগুলোতে কয়েক দিন ধরে নানা রকম সংবাদ ছাপা হচ্ছে। প্রথম আলোও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে, কিন্তু কেউ সুনির্দিষ্ট করে কোনো তথ্য জানাতে পারেননি। বিএনপির প্রধান তারেক রহমান নিজেই মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে কাজ করছেন। তাঁকে দলের স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য সহায়তা করছেন বলে জানা গেছে।বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার মন্ত্রিসভা খুব ভেবেচিন্তে করা হচ্ছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকসহ আরও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রীর নামও আলোচনায় আছে।পাশাপাশি তরুণ অনেক নেতাকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ও হুমায়ুন কবির, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, খন্দকার আবদুল মুক্তাদির (সিলেট-১), অনিন্দ্য ইসলাম (যশোর-৩), জাকারিয়া তাহের (কুমিল্লা-৮) ও ফারজানা শারমিন (নাটোর-১) মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন, এমন আলোচনা রয়েছে।

বিএনপির জোটের শরিকদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ও গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হকের নামও আলোচনায় আছে।এ ছাড়া সুষ্ঠু ও দক্ষতার সঙ্গে সরকার পরিচালনার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি টিম কাজ করবে, যাঁরা মন্ত্রিপরিষদসহ সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এ ক্ষেত্রে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের সহায়তা নেওয়া হবে।

একটি নতুন যাত্রার প্রত্যাশা

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে স্বৈরাচারী সরকারের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয় বিএনপি। সরকারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়। এরপর দায়িত্ব নেয় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের অধীন গত বৃহস্পতিবার একটি উৎসবমুখর সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি।

ইতিমধ্যে তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বিভেদ ঘুচিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। এতে সর্বস্তরে একটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে তাঁদের বিশেষ দৃষ্টি থাকবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য বিএনপির সামনে এটি একটি বড় সুযোগ এসেছে। এ জন্য মন্ত্রিসভায় সৎ, দক্ষ ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের প্রাধান্য কতটা থাকছে, সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা তপন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবে নতুন সরকারের কাছে আমার প্রথম প্রত্যাশা—দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারা এমন কিছু উদ্যোগ বা ব্যবস্থা নেবে, যাতে উদ্যোক্তাদের হারানো আস্থা ফিরে আসে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, মর্নিং শোজ দ্য ডে। সেটির প্রতিফলন সরকারকে শুরুতে দেখাতে হবে।’

নতুন সরকারের যাত্রার প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদ নেতা, সংসদ উপনেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েও নানা আলোচনা-গুঞ্জন চলছে।

নানা হিসাব-নিকাশে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনায় রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। তবে বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আরও সময় আছে। জাতীয় সংসদে স্পিকার হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের নাম আলোচনায় রয়েছে।

স্মৃতিতে ফিরছে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সাল

আজ ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি; তারেক রহমান যখন প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন, তখন অনেকের স্মৃতিতে ফিরে আসছে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সাল। ৪৬ বছর আগে ১৯৭৯ সালের ১৬ এপ্রিল তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ধারায় প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন ৪২ জন। আর এখন থেকে ৩৪ বছর আগে ১৯৯১ সালে তাঁর মা খালেদা জিয়া প্রথম বাংলাদেশের নারী প্রধানমন্ত্রী হন। সেটি ছিল ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ। তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁকে শপথ পড়ান। সে মন্ত্রিসভা ছিল ৩১ সদস্যের। খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০০১ সালে যখন তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন, সে মন্ত্রিসভায় সদস্য ছিলেন ৬০ জন।

জাতীয় সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ইস্যু করা হচ্ছে। তাঁদের কাছে শপথের আমন্ত্রণপত্র কোনো কারণবশত হাতে না পৌঁছালে সংসদ ভবনের টানেলের অভ্যন্তরের মূল প্রবেশপথে অবস্থিত ‘ফ্রন্ট ডেস্ক’ থেকে তাঁরা সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে সংসদ সচিবালয় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সঙ্গে রাখার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা আর প্রত্যাশার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, দীর্ঘ অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার একটি দল কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে, তার প্রতিচ্ছবি অনেকটাই স্পষ্ট হবে নতুন মন্ত্রিসভার চেহারায়।

সূত্র : প্রথম আলো

‘সেই দুরন্ত শৈশবের দিনগুলি’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ
‘সেই দুরন্ত শৈশবের দিনগুলি’

মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় থাকে, যেগুলো পেরিয়ে যাওয়ার পরও কখনো সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যায় না। বয়স বাড়ে, চুলে পাক ধরে, কাঁধে দায়িত্ব জমে, জীবনের হিসাব-নিকাশ জটিল হয়ে ওঠে—তবুও হঠাৎ কোনো বৃষ্টিভেজা দুপুর, কাঁচা আমের টক গন্ধ কিংবা দূরের কোনো মাঠে শিশুদের হৈচৈ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় বহু বছর আগের সেই দুরন্ত দিনগুলোতে। তখন মনে হয়, আহা! যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেত সেই শৈশব!

আমাদের শৈশব ছিল না মোবাইলের পর্দায় বন্দি। ছিল না সারাদিনের ব্যস্ততার অজুহাত। আমাদের পৃথিবী ছিল বিশাল—যদিও সেই পৃথিবীটা ছিল একটি ছোট্ট গ্রাম, কয়েকটি মাটির রাস্তা, সবুজ ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, পুকুর আর বিকেলের খেলার মাঠ নিয়ে।

সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙত। কখনো মা রাগ করে বলতেন, “আর কত ঘুমাবি? স্কুলে যাবি না?” চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানা থেকে উঠতাম। তাড়াহুড়ো করে মুখ ধুয়ে, কখনো অর্ধেক ভাত খেয়ে, বই-খাতা বগলে নিয়ে ছুটতাম স্কুলের দিকে। পথে দেখা হতো বন্ধুদের সঙ্গে। তারপর শুরু হতো দৌড় প্রতিযোগিতা—কে আগে স্কুলে পৌঁছাতে পারে!

কিন্তু স্কুলে যাওয়ার পথটা কখনোই শুধু স্কুলে যাওয়ার পথ ছিল না। রাস্তার পাশের গাছ থেকে কাঁচা আম পাড়ার পরিকল্পনা, কার পুকুরে আজ মাছ ধরতে নামা যাবে, বিকেলে কোথায় ক্রিকেট খেলা হবে—সব সিদ্ধান্ত হয়ে যেত সেই পথেই। কোনোদিন শিক্ষক দেখলে ভয়ে দৌড়ে ক্লাসে ঢুকতাম, আবার কোনোদিন বৃষ্টির কারণে স্কুল ছুটি হলে আনন্দে মনে হতো, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ আজ আমাদের হাতে এসে ধরা দিয়েছে।

বর্ষার দিনগুলো ছিল আরও অন্যরকম। আকাশ কালো হয়ে এলেই মন নেচে উঠত। বৃষ্টি নামলেই বই-খাতা ফেলে ছুটে যেতাম উঠানে। মা যতই বকুন, “বৃষ্টিতে ভিজিস না, জ্বর হবে”—আমাদের কে শোনে কার কথা! টিনের চাল থেকে ঝরে পড়া পানির নিচে দাঁড়িয়ে গোসল করা, কাদার মধ্যে ফুটবল খেলা, রাস্তার জমে থাকা পানিতে কাগজের নৌকা ভাসানো—এসবের মধ্যে যে আনন্দ ছিল, আজকের দামী বিনোদনেও তা খুঁজে পাওয়া যায় না।

শীতের সকালেও ছিল অন্যরকম উন্মাদনা। কুয়াশা ভেদ করে স্কুলে যাওয়া, খেজুরের রস খাওয়া, মাঠে শিশিরভেজা ঘাসের ওপর খালি পায়ে দৌড়ানো—সবকিছুই ছিল এক অদ্ভুত সুখে ভরা। কখনো কারও বাড়ির গাছ থেকে বরই পেড়ে পালিয়েছি, আবার ধরা পড়ে কান মলে ক্ষমাও চেয়েছি। সেই সময় অপরাধও ছিল নিষ্পাপ। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনি খেয়ে একটু কেঁদেছি, তারপর আবার ভাত খেয়ে সব ভুলে গেছি।

বিকেল ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সময়। স্কুল থেকে ফিরে কোনোমতে বইখাতা ছুড়ে রেখে মাঠের দিকে ছুটতাম। কেউ ফুটবল নিয়ে আসত, কেউ ক্রিকেটের ব্যাট। বল না থাকলে মোজা গুটিয়ে বল বানানো হতো। ব্যাট না থাকলে গাছের ডালই যথেষ্ট ছিল। খেলার নিয়ম নিয়ে ঝগড়া হতো, কেউ আউট মানতে চাইত না, কেউ রাগ করে বাড়ি চলে যেত। কিন্তু একটু পরেই আবার তাকে ডাকতে যেতাম—“আয় রে, তুই না খেললে খেলা জমে না।”

সন্ধ্যা নামলে বাড়ি ফেরার সময় হতো। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত, পাখিরা গাছে ফিরত, আর মায়েদের ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত—“কোথায় গেলি? বাড়ি আয়!” তবুও আমরা আরও পাঁচ মিনিট খেলার জন্য অনুরোধ করতাম। সেই পাঁচ মিনিট কখনো শেষ হতো না।

রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে আনন্দ যেন আরও বেড়ে যেত। উঠানে বসে গল্প, ভূতের ভয়, দাদী-নানীর মুখে রাজা-রানীর গল্প—সবকিছু মিলে অন্য এক পৃথিবী। কখনো জোনাকি পোকা ধরে হাতের মুঠোয় রাখতাম। তারপর আবার ছেড়ে দিতাম অন্ধকারে। জোনাকির ছোট্ট আলো দেখে মনে হতো, রাতের আকাশের তারাগুলো বুঝি মাটিতে নেমে এসেছে।

আজ অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। সেই গ্রামের পথ হয়তো বদলে গেছে। কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে, খেলার মাঠে উঠেছে বাড়ি, পুকুর ভরাট হয়েছে। সেই বন্ধুরা কেউ চাকরি নিয়ে শহরে, কেউ বিদেশে, কেউ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা না হলে মন খারাপ হতো, আজ তাদের সঙ্গে দেখা হয় বছরের পর বছর পর।

কখনো পুরোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে আমরা হাসতে হাসতে বলি, “মনে আছে, সেদিন তুই গাছে উঠে আটকে গিয়েছিলি?” কিংবা “মনে আছে, বৃষ্টির মধ্যে খেলতে গিয়ে কাদায় পড়ে কী অবস্থা হয়েছিল?”

তারপর হঠাৎ করেই হাসির আড়ালে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে।

কারণ আমরা দুজনেই জানি—সেই দিনগুলো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

শৈশব আসলে জীবনের এমন এক ঋতু, যেখানে হারানোর ভয় ছিল না, ভবিষ্যতের চিন্তা ছিল না, পকেটে টাকা না থাকলেও আনন্দের অভাব ছিল না। একটি বিকেল, কয়েকজন বন্ধু আর একটু খোলা মাঠ—এই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আজ আমরা বড় হয়েছি। হাতে স্মার্টফোন, সামনে অসংখ্য সুযোগ, জীবনে অনেক দায়িত্ব। তবুও কখনো কখনো মন চায় সবকিছু ফেলে আবার সেই মাটির রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটতে। বৃষ্টিতে ভিজতে। বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করতে। মায়ের বকুনি খেতে। সন্ধ্যা না হওয়া পর্যন্ত মাঠে খেলতে।

কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। সে কাউকে ফিরে যেতে দেয় না।

তবুও সেই দুরন্ত শৈশব আমাদের ভেতরে কোথাও রয়ে গেছে। পুরোনো কোনো গানের সুরে, বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে, কাঁচা আমের গন্ধে কিংবা গ্রামের পথের ধুলোর মধ্যে সে হঠাৎ জেগে ওঠে।

আর তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে।

মনে হয়, দূরে কোথাও ছোট্ট একটি ছেলে এখনও দৌড়ে যাচ্ছে—খালি পায়ে, ধুলো উড়িয়ে, বন্ধুদের ডাকতে ডাকতে।

সেই ছেলেটি হয়তো আর কেউ নয়।

সেই ছেলেটি—আমি।

আর তার পেছনে পড়ে আছে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে নির্ভার, সবচেয়ে দুরন্ত সময়–সেই শৈশব।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

‘নদীর পাড়ে শেষ অপেক্ষা’

শরীফ খান
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
‘নদীর পাড়ে শেষ অপেক্ষা’

বৃদ্ধ লোকটি প্রতিদিন বিকেলে নদীর পাড়ে এসে বসতেন। হাতে থাকত একটি পুরোনো চিঠি। নদীর স্রোত বয়ে যেত, নৌকা আসত-যেত, পাখিরা ঘরে ফিরত—শুধু তিনি ফিরতেন না।

একদিন গ্রামের এক চা-ওয়ালা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“চাচা, প্রতিদিন এখানে একা বসে থাকেন কেন?”

বৃদ্ধ লোকটি নদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“ছেলের অপেক্ষায়।”

“সে কি দূরে থাকে?”

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

“অনেক দূরে। একদিন চিঠি লিখেছিল—‘বাবা, একদিন তোমার কাছে ফিরব।’ সেই দিনটার অপেক্ষায় আছি।”
চা-ওয়ালা আর কিছু বলল না।

দিন যায়, মাস যায়, বছর পেরিয়ে যায়। নদীর পানি বদলায়, পাড়ের গাছ বড় হয়, গ্রামের কত মানুষ আসে-যায়—শুধু বৃদ্ধ লোকটির অপেক্ষা বদলায় না।

এক শীতের সকালে নদীর পাড়ের বেঞ্চটি খালি পড়ে ছিল।

চা-ওয়ালা বৃদ্ধের ঘরে গিয়ে দেখল, টেবিলের ওপর সেই পুরোনো চিঠি। তার পাশে আরেকটি নতুন চিঠি—

“বাবা, ফিরতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে। তুমি যদি আর অপেক্ষা করো না, আমাকে ক্ষমা কোরো।”

চা-ওয়ালা চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

বিকেলে সে নদীর পাড়ে গিয়ে দেখল, সূর্যটা ধীরে ধীরে নদীর বুকে ডুবে যাচ্ছে। বাতাসে কাশফুল দুলছে, দূরে একটি নৌকা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

বেঞ্চটি তখনও সেখানে।
শুধু মানুষটি নেই।

কখনো কখনো মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার অপেক্ষা থেকে যায়—নদীর স্রোতের মতো, নীরবে, অনন্তকাল।

লেখক: ফরিদপুর।

পানি নেই, তবু থামেনি ২০০ বছরের ঐতিহ্য: এক নৌকায় খেজুরতলার বাইচ

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০১ পূর্বাহ্ণ
পানি নেই, তবু থামেনি ২০০ বছরের ঐতিহ্য: এক নৌকায় খেজুরতলার বাইচ

খালে পর্যাপ্ত পানি নেই, নেই প্রতিযোগিতার উত্তেজনায় সারি সারি নৌকা। তবুও থেমে যায়নি প্রায় দুইশত বছরের ঐতিহ্য। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার খেজুরতলা খালে দীর্ঘদিনের নৌকা বাইচের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবার মাত্র একটি নৌকা নিয়েই আয়োজন করা হয়েছে বাইচের।

বুধবার (২০ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নের খেজুরতলা খালে অনুষ্ঠিত হয় এই ব্যতিক্রমী আয়োজন। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুইশত বছর ধরে প্রতি বছর ১ ভাদ্র এ খালে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এ আয়োজন এখনো স্থানীয় মানুষের আবেগ ও উৎসবের অংশ।

স্থানীয়রা জানান, একসময় নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে খেজুরতলা খাল ও আশপাশের এলাকায় বসত উৎসবের আমেজ। দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন ধরনের বড় বড় নৌকা নিয়ে আসতেন মাঝি ও প্রতিযোগীরা। বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের হুঙ্কার আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠত পুরো খালপাড়। দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ উপভোগ করতেন নৌকার পাল্লা।

তবে এবার খালে পানির তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে একাধিক নৌকা নিয়ে বাইচ আয়োজন সম্ভব হয়নি। তারপরও দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়, সে জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নৌকা দিয়ে বাইচের আয়োজন করেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিযোগিতা না থাকলেও মানুষের আগ্রহে কোনো কমতি ছিল না। অনুষ্ঠানস্থলের প্রায় ৫০০ মিটার এলাকাজুড়ে নানা বয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। নারী, পুরুষ ও শিশুরা খালের দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকার চলাচল উপভোগ করেন। কেউ কেউ আবার ছোট নৌকায় চড়ে খালের পানিতে ভেসে ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনের সাক্ষী হন।

নৌকা বাইচকে ঘিরে খালের দুই পাড়ে বসে শত শত অস্থায়ী দোকান। খেলনা, মিষ্টি, ঝালমুড়ি, চটপটি, খাবার ও কাপড়সহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাইচ না হলেও মানুষের উপস্থিতি ও কেনাকাটায় জমজমাট হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

খেজুরতলা গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ূন কবির (৬৫) বলেন, “খেজুরতলার নৌকা বাইচ এ অঞ্চলের প্রায় দুইশত বছরের ঐতিহ্য। একসময় দূর-দূরান্ত থেকে বড় বড় নৌকা আসত। বাদ্যযন্ত্রের তালে মাঝিদের বৈঠার ছন্দ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে খালপাড় মুখর থাকত। সময়ের সঙ্গে সেই জৌলুস কিছুটা কমেছে।”

আয়োজক কমিটির সভাপতি ও চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, খালে পানি কম থাকায় এবার প্রতিযোগিতামূলক নৌকা বাইচ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তবে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে একটি নৌকা দিয়ে হলেও আয়োজনটি করা হয়েছে। আগামীতে খালে পর্যাপ্ত পানি থাকলে আরও বড় পরিসরে আয়োজনের চেষ্টা করা হবে।

আয়োজক কমিটির সদস্য মাওলানা রাশেদ হোসেন বলেন, “এবার একটি নৌকা থাকলেও মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মানুষের এই ভালোবাসাই আমাদের আশা জোগাচ্ছে যে, ভবিষ্যতে আবারও আগের মতো জাঁকজমকপূর্ণ নৌকা বাইচ আয়োজন করা সম্ভব হবে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, খেজুরতলার দুইশত বছরের এই ঐতিহ্য রক্ষায় খালটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নেবে।