খুঁজুন
, ,

আন্দােলন মোকাবিলায় শক্তি প্রয়োগ চলতেই থাকবে?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৫, ৩:১২ অপরাহ্ণ
আন্দােলন মোকাবিলায় শক্তি প্রয়োগ চলতেই থাকবে?

বিগত প্রতিটি সরকারের সময় এবং প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের আন্দোলন করতে হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে সব সরকারই কঠোর ছিল। এটা খুবই হতাশাজনক; বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারল না। বাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে রোববার ‘লাগাতার অবস্থান’ কর্মসূচি পালন করছিলেন। পুলিশ লাঠিপেটা ও জলকামান ব্যবহার করে সে কর্মসূচি পণ্ড করে দেয় । 

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন পান। তারা মূল বেতনের সঙ্গে মাসে ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। বাড়ি ভাড়া ভাতা পান এক হাজার টাকা। বছরে দুটি উৎসব ভাতা পান মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে। শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে গত ১৩ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। পরে শিক্ষকদের ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দল সচিবালয়ে গিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরারের সঙ্গে দেখা করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের কমপক্ষে ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু ৫ অক্টোবর জানা গেল, সরকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া মাত্র ৫০০ টাকা বাড়িয়েছে। এর ফলে শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ভাতা দাঁড়ায় মাত্র দেড় হাজার টাকা। এই টাকায় কোথায় ভাড়া পাওয়া যায় বাড়ি? একটা ছাপরা ঘরের ভাড়াও তো এখন এর চেয়ে অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক-কর্মচারীরা এ বাড়ি ভাড়া ভাতা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সে অনুসারে রোববার তারা রাজধানীতে সমবেত হয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালায়।

শিক্ষা একটি ব্যবস্থাপনা, যার সঙ্গে জড়িত শিক্ষার দর্শন, শিক্ষক, শিক্ষা বরাদ্দ, কারিকুলাম, সিলেবাস, পাঠ্যপুস্তক, পাঠ পদ্ধতি, শিক্ষা উপকরণ, বিদ্যালয়ের পরিবেশ; সর্বোপরি শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত বাজেট। কয়েক দশকজুড়ে এগুলো নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা চললেও অগ্রগতি তেমন কিছুই হয়নি। আশা জেগেছিল, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের আমূল সংস্কার ও বৈষম্য নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার উল্লেখযোগ্য কিছু করবে। কিন্তু তারাও আগের ধারায় লাঠিপেটা ও জলকামান ব্যবহার করে শিক্ষকদের আন্দোলনকে অভ্যর্থনা জানাল। অবশ্য গত এক বছরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বয়কট, মব সন্ত্রাস ইত্যাদির মাধ্যমে যেভাবে প্রায় বিনা বাধায় ডজন ডজন শিক্ষককে হেনস্তা ও পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, তাতেই শিক্ষকদের আন্দোলন সম্পর্কে এ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা গিয়েছিল। এ রাষ্ট্র কখনও শিক্ষকদের আন্দোলনকে শিক্ষা আন্দোলনের পাঠ হিসেবে গ্রহণ করেনি। সবাইকে ‘ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করা’র ওষুধ প্রয়োগে তাই কোনো সরকারেরই হাত কাঁপেনি।
পাঠ্যপুস্তক নিয়ে যা হচ্ছে, তাতেও এর প্রমাণ মেলে। গত এক বছরে আওয়ামী ভূত তাড়ানোর নামে পাঠ্যপুস্তকের ‘টেক্সট’ পরিবর্তনের নানা আয়োজন দেখা গেছে, যেখানে অতীতের মতোই রাজনীতির রং ছিল স্পষ্ট। প্রথম দফায় টেক্সট বুক সংশোধনের দায়িত্ব একটি কমিটিকে দেওয়া হয়। হেফাজতে ইসলাম কমিটির কিছু সদস্যের ব্যাপারে আপত্তি করলে সে সময়ের শিক্ষা উপদেষ্টা সেই কমিটির ‘অফিসিয়াল’ অস্তিত্বই অস্বীকার করেছিলেন। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই ভুঁইফোঁড় সংগঠন ‘স্টুডেন্ট ফর সভরেন্টি’র ঝটিকা আন্দোলনের মুখে পাঠ্যপুস্তক থেকে তুলে নেওয়া হয় গ্রাফিতি। অথচ এ গ্রাফিতি ছিল গণঅভ্যুত্থানের স্মারক; সরকারেরই বহুল উচ্চারিত দায়, দরদ ও বহুত্ববাদের প্রকাশ। সম্প্রতি ঘটেছে আরও অদ্ভুত এক ঘটনা। সরকার প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পরিবর্তে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে মুদ্রণ ও বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। যেখানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হলো সময়ের দাবি, সেখানে ক্ষমতাকে আরও কেন্দ্রীভূত করা হলো। কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণগুলো সামনে না এলে ব্যর্থতা-অনিয়ম-দুর্নীতির ছিদ্র কখনোই বন্ধ হবে না। তাই সেগুলোকে জিইয়ে রেখে এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব অর্পণ আদতে হাতের পরিবর্তনের বাইরে আর কিছুই নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও কি এখন ঠিকঠাক চলছে? কয়েকদিন আগে উপদেষ্টা মাহফুজ আলম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা যখন দায়িত্ব নিলাম তখন বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা এসে বলল, সব ফেয়ার হতে হবে– ভিসি নিয়োগ হলো দশজন বিএনপির, তিনজন জামায়াতের, অ্যাডমিন কে নেবে সেটা নিয়ে কাড়াকাড়ি হলো। এগুলো আমার চোখের সামনেই হয়েছে।’ উপদেষ্টার এ বক্তব্যের মধ্য দিয়েই আমরা আসলে বুঝতে পারি, এই সময়েও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা কীভাবে কাজ করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদ এখন অনেকটাই রাজনৈতিক দলগুলোর ইজারা। আগের সরকারের নাম-গন্ধ থেকে নিজেদের দূরত্বে রাখলেও প্রতিষ্ঠান চালানোর পন্থা হিসেবে পছন্দ আগের সরকারের ‘পরিচালনা পদ্ধতি’। অথচ বলা হয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অতীতের দলীয় নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার ধারা থেকে বেরিয়ে আসবে। আর সব ক্ষেত্রের মতো শিক্ষাঙ্গনেও এক দল যাবে, আরেক দল আসবে– এটিই যেন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষককে এখনও একাডেমিক কার্যক্রম থেকে স্থগিত রাখা হয়েছে। প্রতিশোধের রাজনীতির চাকায় ঘুরছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।
শিক্ষকদের মেরে-ধরে, লাঠিচার্জ করে, জলকামান ব্যবহার করে আদতে ক্ষতি করা হচ্ছে শিক্ষার। এ বিষয়ে কারও মনোযোগ নেই। পাড়ার মোড়ে মোড়ে বিদ্যালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলেই শিক্ষার প্রসার ঘটে না। উপযুক্ত বেতন-ভাতা না দিলে যোগ্য শিক্ষক সেখানে আসবেন না। ফলে ইট-কাঠ-পাথরের মূল্যবান ভবন হয়তো গড়া যাবে; সেখানে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীও ভর্তি করা যাবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা মিলবে না।

শিক্ষকদের আন্দোলনের দাবিকে অগ্রাহ্য না করে কান পেতে শুনুন– কোথায় সমস্যা হচ্ছে, কেন হচ্ছে। সেগুলো নিয়ে কথা বলুন। আগের সরকারের জুতা পরে ‘ফ্যাসিস্ট ফ্যাসিস্ট’ বলে লাভ হবে না। ফ্যাসিজম কোনো বস্তু বা ব্যক্তি নয়; এটি আদর্শ, কর্মপদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা, কৌশল। সেগুলোকে বদলানো না গেলে বদল হবে না কিছুই।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় zobaidanasreen@gmail.com

ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও আবু নাসের হোসাইন, সালথা:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। প্রচলিত ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের গণ্ডি পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ শুরু হয়েছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায়। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির ৮ বিঘা জমিতে আনারসের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফরিদপুর অঞ্চলে এ ধরনের বৃহৎ পরিসরের আনারস চাষ আগে দেখা যায়নি। ফলে মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প ও লাভজনক ফলচাষের পথ উন্মুক্ত হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যদুনন্দী গ্রামের দুটি পৃথক প্লটে বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত বাগানজুড়ে চলছে নিয়মিত পরিচর্যা। দূর থেকে দেখলে সবুজের সমারোহে ভরা বাগানটি যে কারও দৃষ্টি কাড়ে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কৃষকরা বাগান পরিদর্শনে আসছেন এবং আনারস চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

জানা গেছে, মিলন ফকির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিপণ্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে তিনি বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারস গাছ লাগান। আশাতীত ফলন ও সফলতা তাকে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি পরিকল্পিতভাবে আনারস চাষের জন্য জমি নির্বাচন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

চলতি বছরে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের প্রায় ৮০ হাজার আনারসের চারা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ৮ বিঘা জমিতে এসব চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে বাগানের গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং আগামী বছর থেকে ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির বলেন, “প্রথমে শখের বসে বাড়ির ছাদে কয়েকটি আনারস গাছ লাগিয়েছিলাম। গাছে ভালো ফল আসার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তখন মনে হলো, বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই এবার বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, সেচ ব্যবস্থা, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী বছর ফল সংগ্রহ করা যাবে। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

মিলন ফকির জানান, শুধু ফল বিক্রিই নয়, ভবিষ্যতে আনারসের উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রিরও পরিকল্পনা রয়েছে তার। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত আয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরাও সহজে মানসম্পন্ন চারা সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, “আমার এই উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করবো।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সালথা এলাকায় এর আগে কখনো এভাবে বাণিজ্যিক আকারে আনারস চাষ হতে দেখা যায়নি। ফলে বাগানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা সাধারণত ধান, পাট ও সবজি চাষ করি। আনারস চাষের কথা কখনো ভাবিনি। মিলন ফকিরের বাগান দেখে মনে হচ্ছে এটি লাভজনক হতে পারে। ফলন ভালো হলে আমরাও এ ধরনের ফলচাষে আগ্রহী হবো।”

আরেক কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাগানটি দেখতে খুব সুন্দর। প্রতিদিন অনেক মানুষ দেখতে আসছে। সফল হলে এটি এলাকার কৃষকদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত হবে।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস একটি লাভজনক ফল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আনারসের চাষ হয়। বর্তমানে বাজারে আনারসের চাহিদা বাড়ছে এবং ফলটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হজম সহায়ক উপাদান। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে আনারসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “সালথা উপজেলায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে কৃষিতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাভজনক ফল ও ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. রইচ উদ্দিন বলেন, “ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের জেলায় সাধারণত ধান, পাট, গম ও বিভিন্ন সবজি চাষের প্রচলন বেশি থাকলেও কৃষিতে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নতুন নতুন ফল ও ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। মিলন ফকিরের মতো উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা বাগানের অবস্থা সন্তোষজনক দেখেছি এবং কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। যদি ফলন ও বাজারজাতকরণ সফল হয়, তাহলে ফরিদপুরের অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। এতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় ফরিদপুর অঞ্চলেও আনারস চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে মিলন ফকিরের এই সাহসী পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার স্বপ্ন সফল হলে শুধু একজন উদ্যোক্তার আর্থিক উন্নয়নই নয়, বরং ফরিদপুরে আনারস চাষের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন সম্ভাবনা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত হবে আয়ের নতুন দিগন্ত।

কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

সুস্থ থাকতে ফলের কোনো বিকল্প নেই। তবে যখন প্রশ্ন আসে রক্তে শর্করার বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের, তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান যে কোন ফলটি বেছে নেবেন। বিশেষ করে জনপ্রিয় দুটি ফল কমলা এবং কলার মধ্যে কোনটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বা যারা চিনি নিয়ে সচেতন তাদের জন্য বেশি উপকারী, তা নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের।

যদিও উভয় ফলেই প্রাকৃতিক চিনি থাকে, কিন্তু পুষ্টিগত গঠন এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের (জিআই) পার্থক্যের কারণে শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রায় এদের প্রভাব ভিন্ন হয়।

আজকের ফিচারে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজে দেখব, আপনার শরীরের জন্য এই দুটি ফলের মধ্যে কোনটি বেশি নিরাপদ এবং কীভাবে খেলে আপনার শর্করা থাকবে নিয়ন্ত্রণে।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সে কে এগিয়ে?

রক্তে শর্করার ব্যবস্থাপনায় কমলার পাল্লা কিছুটা ভারী বলে মনে করা হয়। কারণ কমলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাত্র ৩৫, যা বেশ কম। অন্যদিকে, একটি পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাধারণত ৪৮ এর কাছাকাছি থাকে। যেহেতু কমলার জিআই কম, তাই এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কলার তুলনায় ধীরে বৃদ্ধি করে।

পুষ্টির তুলনা: একনজরে

একটি মাঝারি আকারের কলা (১১৮ গ্রাম) এবং একটি মাঝারি কমলার (১৩১ গ্রাম) পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

ক্যালরি: কলায় থাকে ১০৫ ক্যালরি, যেখানে কমলায় থাকে মাত্র ৬১.৬ ক্যালরি।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা: কলায় শর্করার পরিমাণ ২৬.৯ গ্রাম, অন্যদিকে কমলায় তা ১৫.৫ গ্রাম।

ভিটামিন সি: কমলায় প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে (দৈনিক চাহিদার ৭৭%), যা কলার (১০.৩ মিলিগ্রাম) তুলনায় অনেক বেশি। শর্করার পরিমাণ কম এবং ভিটামিন সি-এর আধিক্যের কারণে কমলা রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় কিছুটা বেশি সুবিধাজনক।

কলার গুণাগুণ: পাকা নাকি আধাপাকা?

কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে এর পরিপক্কতা বা কতটা পেকেছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কম পাকা বা কিছুটা সবুজ কলায় ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ নামক এক ধরণের কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা সহজে হজম হয় না এবং রক্তে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরণের স্টার্চ ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। তবে কলা যত বেশি পাকে, তার জিআই তত বাড়তে থাকে এবং তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে।

কমলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য

কমলায় থাকা সাইট্রাস পেকটিন নামক দ্রবণীয় ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার শোষণ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা হেস্পেরিডিন এবং নারিঞ্জিনের মতো ফ্ল্যাভোনয়েডগুলি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রেখে ফল খাওয়ার কিছু কৌশল

আপনি কলা বা কমলা যা-ই পছন্দ করুন না কেন, রক্তে শর্করার প্রভাব কমাতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:

১. আস্ত ফল খান, রস নয়: ফলের রস করলে এর প্রয়োজনীয় ফাইবার নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দেয়। তাই সব সময় আস্ত ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।

২. প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সাথে খান: ফলের সাথে কিছু বাদাম, গ্রিক ইয়োগার্ট বা পনির মিশিয়ে খেলে হজম ধীর হয় এবং সুগার স্পাইক বা শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমে।

৩. পরিমিত মাত্রা: ফল যত উপকারীই হোক না কেন, পরিমাণে বেশি খেলে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই সব সময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

৪. কলা কিনুন কিছুটা কাঁচা: ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে খুব বেশি পাকা কলার চেয়ে কিছুটা কম পাকা বা শক্ত কলা বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষকথা

কমলা এবং কলা উভয়ই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হতে পারে। তবে যাদের রক্তে শর্করার সমস্যা আছে, তাদের জন্য কম শর্করার কারণে কমলা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়াও সম্পূর্ণ নিরাপদ।

তথ্যসূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ

 

ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১০:২৭ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সাপের কামড়ে ছটফট করছিল শিশু আব্দুল্লাহ, ফকিরের আশ্বাসেই হারিয়ে গেল প্রাণ

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় বিষাক্ত সাপের কামড়ে সেক আব্দুল্লাহ (৫) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

শনিবার (২০ জুন) দুপুর ১২টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত আব্দুল্লাহ উপজেলার গাজিরটেক ইউনিয়নের চর অমরাপুর গ্রামের সেক শাহেদের ছেলে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল পরিবারের সবার ছোট এবং অত্যন্ত আদরের সন্তান।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে বাড়ির পেছনে খেলাধুলা করছিল আব্দুল্লাহ। এ সময় একটি কংক্রিটের স্ল্যাবের নিচে থাকা বিষাক্ত সাপ তার পায়ে কামড় দেয়। কামড় খাওয়ার পর শিশুটি বাড়িতে এসে মাকে জানায়, তাকে ‘ব্যাঙে কামড় দিয়েছে’। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়ায় পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছে নিয়ে যান, যিনি নিজেকে ঝাড়ফুঁক ও চিকিৎসাজ্ঞানসম্পন্ন বলে পরিচয় দেন।

শিশুটির চাচি আখি আক্তার জানান, স্থানীয় শহীদ ফকির নামে এক ব্যক্তির কাছে নেওয়ার পর তিনি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, এটি সাপের কামড় নয়। তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে কিছু সময় সেখানে কাটানো হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আব্দুল্লাহর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে।

পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও দুপুরের দিকে শিশুটি মারা যায়।

গাজিরটেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “প্রথমে শিশুটিকে স্থানীয় এক ফকিরের কাছে নেওয়া হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

আব্দুল্লাহর অকাল মৃত্যুতে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো চর অমরাপুর গ্রাম। প্রতিবেশীরাও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।