খুঁজুন
, ,

আমলাতন্ত্র কি বিফলতার ঢাল, না-কি রাষ্ট্রের অপরিহার্য রক্ষাকবচ?

শামীম আল মামুন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ
আমলাতন্ত্র কি বিফলতার ঢাল, না-কি রাষ্ট্রের অপরিহার্য রক্ষাকবচ?

বাংলাদেশে পণ্ডিতের অভাব নেই। তবে সংখ‍্যার দিক দিয়ে সব চেয়ে বেশি বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত দেখা যায় প্রশাসন বিষয়ে। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিক থেকে শুরু করে ফুটপাথে বসে অলস আড্ডা দেয়া অক্ষম ব্যক্তিটিও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে, নিদেন পক্ষে তাঁর অক্ষমতার জন্য প্রশাসনকে দায়ী করেন।

আমি কোনো পণ্ডিত নই বা কখনো তা হবার চেষ্টাও করিনি। নিজের অজ্ঞতা নিয়ে আমি সবসময় সংকুচিত থাকি। তথাপি আমার শিক্ষকগণ, দেশী-বিদেশী বন্ধুবান্ধব, সহকর্মীদের এক বিরাট অংশ মনে করেন আমি জনপ্রশাসন বিষয়টা খুব ভালো বুঝি। জনপ্রশাসন বুঝার জন‍্য লোকপ্রশাসন পাঠই যথেষ্ট নয়। প্রশাসন বুঝার জন্য দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, লোকাচার, সামাজিক মনোবিজ্ঞান, সমাজের ক্ষমতা-কাঠামো সমন্ধে স্বচ্ছ জ্ঞান থাকার সাথে সাথে গভীর অন্তর্দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, আমি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা বুঝি। দায়িত্ব নিয়েই বলছি যে, এর উত্থান-পতনের উপলক্ষ‍্য এবং উপাদান ব‍্যাখ‍্যা করতে পারি। বন্ধুমহলের আড্ডায় অনেকবার প্রশাসন ও রাজনীতি নিয়ে যা বলেছি তা পরবর্তীতে সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

পৃথিবীর সকল দেশেই আমলারা কখনো রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কোনো কথার প্রতিবাদ করে না বা করতে পারে না। তারা হলো ফুটবলের মত। ২২ জন খেলোয়াড় একটি সীমাবদ্ধ মাঠে লাথি দিতে থাকে এবং বল বিনা প্রতিবাদে সেই লাথি সহ্য করে। বলের মত আমলাদেরও সকল দোষ অপবাদ মাথায় নিয়ে নীরবে কাজ বা অকাজ করে যেতে হয়।

গত কয়েক দিন যাবৎ সরকারের উপদেষ্টাগণ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা, পরিযায়ী পণ্ডিতগণসহ অনেকেই সকল ব‍্যর্থতার দায় আমলাদের ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতার দায়ভার থেকে মুক্তির চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন হতো না, যদি না কিছুদিন আগে একজন উপদেষ্টা মাইলস্টোন স্কুলের পরিবর্তে সচিবালয়ে মধ্যে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার বাসনা প্রকাশ না করতেন। তাঁর হতাশা এবং আমলাতন্ত্রের প্রতি শত্রুভাবাপণ‍্যতা কত প্রবল তা পত্রিকায় প্রকাশিত বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। তাঁর ব‍্যক্তিগত অনুভূতি গণমাধ্যমে প্রকাশ করে তিনি আমলাতন্ত্রকে জনগণের শত্রু হিসাবে উপস্থাপনের প্রয়াস নিয়েছেন – যা মেনে নিতে না পেরে আমি এই লেখা লিখছি।

আমলাতন্ত্রের সমালোচনা নতুন কিছু নয়, কিন্তু যখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে একে ধ্বংস করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা গভীর সংকটে আছি।

আসলে আমলাতন্ত্র কী এবং কেন এটি এমন—তা বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি।

১. ম্যাক্স ওয়েবার এবং যৌক্তিক কাঠামো:

আমলাতন্ত্রের জনক বলা হয় ম্যাক্স ওয়েবারকে (Max Weber)। তিনি বলেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আমলাতন্ত্র হলো ‘সবচেয়ে যৌক্তিক এবং কার্যকর উপায়’। তার মতে, আমলারা আবেগ বা রাজনৈতিক হুজুগে নয়, বরং নির্দিষ্ট নিয়মের (Rule of Law) অধীনে কাজ করে। এই যে আমরা ‘ধীরগতি’র কথা বলি, ওয়েবারের দৃষ্টিতে এটি আসলে একটি ‘নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত’ পদ্ধতি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া।

২. কার্ল মার্ক্স ও আমলাতন্ত্রের দ্বান্দ্বিক অবস্থান:

কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) আমলাতন্ত্রকে শাসক শ্রেণির হাতিয়ার হিসেবে দেখলেও তিনি একে রাষ্ট্রের একটি ‘অপরিহার্য অঙ্গ’ হিসেবে স্বীকার করেছেন। মার্ক্সীয় বিশ্লেষণে আমলাতন্ত্র হলো রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষার একটি মাধ্যম। যখন কোনো সংকট তৈরি হয়, তখন রাজনীতিবিদরা দায় এড়াতে আমলাতন্ত্রকে ‘বলির পাঁঠা’ বানান, যা বর্তমানে আমরা বাংলাদেশেও দেখতে পাচ্ছি। অথচ এই কাঠামোটিই রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।

৩. ঐতিহাসিক সত্য: কেন আমলাতন্ত্র ধীর?

পৃথিবীর কোনো সফল রাষ্ট্রই হুটহাট সিদ্ধান্তে চলেনি। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যন্ত সর্বত্র আমলাতন্ত্র একটি ‘ফিল্টার’ হিসেবে কাজ করে। উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson) তার ‘The Study of Administration’-এ স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনীতি এবং প্রশাসন দুটি ভিন্ন মেরু। রাজনীতি স্বপ্ন দেখায়, আর প্রশাসন সেই স্বপ্নকে বাস্তবতার কঠিন আইন ও বাজেটের নিক্তিতে বিচার করে। এই বিচার করতে গিয়ে যে সময় ব্যয় হয়, তাকে ‘অদক্ষতা’ বলা ভুল।

যারা খোঁজ খবর রাখেন তাঁরা জানেন পৃথিবীর সকল দেশের আমলাতন্ত্রই ধীরগতিতে চলে। যে রাষ্ট্র যত উন্নত সে রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র তত শক্তিশালী। আমাদের ধারণাগত সীমাবদ্ধতা এবং তথ‍্যের অপ্রতুলতার কারণে সফল রাষ্ট্রগুলোর আমলাতন্ত্র সম্পর্কে না জেনে আমরা অনেক মন্তব্য এবং আমাদের আমলাতন্ত্র তুলনা করে থাকি। উন্নত রাষ্ট্রসমূহের সেবাখাত বেসরকারি ব‍্যবস্থাপনায় ছেড়ে দিয়ে তারা প্রতিযোগিতামূলক অবকাঠামো তৈরি করে দেয়াতে ঐসব দেশে সেবা প্রদানের মান ও দক্ষতা বাণিজ‍্যিক কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের সেবাখাত পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকায় এখানে অদক্ষতা ও দুর্নীতি বেশী এবং সেবার মান হতাশাজনক। সেবাখাতের প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ – আমলাতন্ত্র নয়। আমেরিকা, ইউকে, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, জাপান, রাশিয়া সিংগাপুর, ইন্ডিয়াসহ পৃথিবীর যে কোনো স্থিতিশীল দেশের আমলাতন্ত্র আমাদের দেশের আমলাতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাধর এবং মজবুত। পিরামিড থেকে তাজমহল পৃথিবীর সকল অত‍্যাশ্চর্য স্থাপনা নির্মাণের পিছনে আছে সুসংগঠিত এবং সুদক্ষ এক আমলাতন্ত্র।

আমরা অনেকেই আইনের শাসন (rule of law) নিয়ে কথা বলি। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক তা আমরা চাই। কিন্তু আমরা একবারও ভাবি না যে আইনের শাসন মানেই দল নিরপেক্ষ এক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান। আমলাগণ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সকলকে এক দৃষ্টিতে দেখবেন। তখন আমলাগণ এখনকার চেয়ে শক্তিশালী হবেন।

এবার অন্য প্রসঙ্গে কথা বলি। আমলাদের যতটা ক্ষমতাবান হিসেবে বিবেচনা করা হয় আসলে তাঁরা তা নন। গত তিন দশক যাবৎ মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নির্বাহী প্রধান হচ্ছেন মন্ত্রী/উপদেষ্টা। তাই সকল মন্ত্রণালয়ের ভালো মন্দ যাই হোক না কেন তাতে দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী/উপদেষ্টার বিশাল ভূমিকা বা দায় আছে।

বাংলাদেশের বর্তমান আমলাতন্ত্র অত্যন্ত দুর্বল এবং disoriented। জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে এটাকে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ নিজেদের স্বার্থে ধীরে ধীরে দুর্বল করে ফেলেছে। ফলে আইনের শাসন থেকে দেশ যোজন যোজন মাইল দূরে ছিটকে পড়েছে। গত ১৭/১৮ ধরে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ সততা ও দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে দেশের আমলাতন্ত্রই প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছে। আর দূর্বল আমলাতন্ত্রের কারণে দেশে এমন কোনো অপরাধ নেই যা ঘটেনি। লক্ষকোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। বৈদেশিক ঋণ সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড স্পর্শ করেছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে অদক্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ এরকম একটি দুর্বল ভঙ্গুর আমলাতন্ত্রকে যদি পরিচালনা করতে না পারে তাহলে জনগণের গণতান্ত্রিক প্রত‍্যাশা পূরণ করবে কিভাবে!

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর আকাঙ্ক্ষা এই জনপদের দীর্ঘ দিনের। এমন কোনো পরীক্ষা নেই যা এদেশের মানুষ দেয়নি। সাধারণ মানুষের ত‍্যাগ বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে অনেক বেশি। অন‍্যান‍্য প্রতিষ্ঠান সচল করার সাথে সাথে একটি শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ছাড়া সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুফল পেতে সৎ-দক্ষ-দলনিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রের কোন বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনদের সাধারণ প্রবণতা হলো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন ঘটানো। কিন্তু এটা সবসময় ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনা। অনেক সময় আমলাগণ সেটা ধরিয়ে দিতে গেলেই রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ তা পছন্দ করেন না। বাস্তবে আমলাগণ ad hoc wisdom এর ভিত্তিতে চলতে পারেন না – তাকে আইন কানুন বিধিবিধান অনুসরণ করে যৌক্তিক পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একটা দেশও কখোনো ad hoc wisdom দ্বারা চলতে পারে না – চলা উচিত না।

শেষাংশ:

যারা আমলাতন্ত্রের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন, তারা আসলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শনই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। একজন প্রাক্তন আমলা যখন সচিবালয়ে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার প্রত্যাশা করেন, তখন বুঝতে হবে তিনি নিজের পেশাগত অতীত এবং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর প্রতি অশ্রদ্ধাশীল। আমলাতন্ত্র কোনো ত্রুটিমুক্ত ব্যবস্থা নয়, তবে এটি পরিবর্তনের পথ ‘ধ্বংস’ নয়, বরং ‘সংস্কার’। আমলাতন্ত্রকে তার কাজের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। যে কোনো বিচ‍্যুতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার হওয়া উচিৎ। মাথা ব্যাথার চিকিৎসা দরকার তবে তা মাথা কেটে নয়।

জনপ্রিয়তা পাওয়ার সস্তা আশায় রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে জনশত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর এই অপচেষ্টা দেশের স্বার্থে সকল পক্ষ থেকে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

লেখক : প্রশাসনের অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা

ফরিদপুর বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের ঘোষণা আসছে, বিশ্ববিদ্যালয়ও হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৮:৩০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের ঘোষণা আসছে, বিশ্ববিদ্যালয়ও হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণা, পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীতকরণ, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ, কৃষকদের জন্য পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

শনিবার (০৪ জুলাই) বিকেলে ফরিদপুর শহরের থানা রোডের ব্যাংক এশিয়া মোড়ে ফরিদপুরের নাগরিক কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত ‘নাগরিক আলোচনা ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, “পদ্মা ব্যারেজ হবে। এটি একনেকে পাস হয়েছে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। দেশের পানির সমস্যা সমাধানে পদ্মা ব্যারেজের পাশাপাশি তিস্তা ব্যারেজও বাস্তবায়ন করা হবে।”

তিনি বলেন, দেশের পানি সংকট মোকাবিলায় খাল খননের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচির কথা বলেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফরিদপুরের উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ফরিদপুরবাসীর ভাগ্য উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণা এবং ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে ফরিদপুরের জনসভায় এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইনশাআল্লাহ, আপনাদের সহযোগিতায় ফরিদপুর বিভাগ হবে এবং সিটি করপোরেশনও হবে।”

নিজের নির্বাচনী এলাকা সালথা ও নগরকান্দার কৃষকদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক কৃষক উৎপাদিত পেঁয়াজ ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ সমস্যা সমাধানে কৃষি মন্ত্রণালয় পেঁয়াজ সংরক্ষণের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, “খুব শিগগিরই পেঁয়াজ চাষিদের জন্য আধুনিক স্টোরেজ বা সংরক্ষণাগারের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তারা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারেন।”

ফরিদপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, “ফরিদপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে। এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে। ফরিদপুরের চারজন সংসদ সদস্যই এ দাবি তুলেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। অবশ্যই ফরিদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় হবে।”

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. রফিকুল ইসলাম।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. মো. ইলিয়াস মোল্লা, ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ এবং জেলা বিএনপির সভাপতি মোদাররেস আলী ইছাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিবীদ ও ব্যবসায়ীক নেতৃবৃন্দ।

অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ফরিদপুর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও রাজবাড়ী সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. শওকত আলী মোল্লা।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ফরিদপুরে ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৩:০৭ অপরাহ্ণ
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ফরিদপুরে ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদ দ্রুত কার্যকরের দাবিতে ফরিদপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ১১ দলীয় ঐক্য জোট। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা অংশ নেন। তারা দাবি করেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

শনিবার (৪ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জনতা ব্যাংক মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ।

সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক মাওলানা মো. বদরুদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং দলীয় মুখপাত্র মুফতি আবু নাসির আইয়ুবী ও অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের যৌথ সঞ্চালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য প্রফেসর আবদুত তাওয়াব।

এ সময় আরও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ফরিদপুর জেলা সভাপতি মাওলানা আমজাদ হোসাইন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক ডা. বায়েজিদ আহমাদ শাহেদ, খেলাফত আন্দোলন ফরিদপুর জেলা সভাপতি মাওলানা মিজানুর রহমান, এলডিপি সভাপতি মো. কামরুল ইসলামসহ ১১ দলীয় ঐক্য জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

বক্তারা বলেন, গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের মতামত এবং জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।

নেতারা আরও বলেন, দাবি বাস্তবায়নে গড়িমসি করা হলে সারাদেশে আরও বৃহত্তর ও কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। গণতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও তারা ঘোষণা দেন।

সমাবেশে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ১১ দলীয় ঐক্য জোটের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচি চলাকালে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল এবং বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দাবিসংবলিত স্লোগান দেন।

ভাঙ্গায় গুলিতে যুবক নিহত: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে মামলা, কমিটি বিলুপ্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১:২৯ অপরাহ্ণ
ভাঙ্গায় গুলিতে যুবক নিহত: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে মামলা, কমিটি বিলুপ্ত

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে গুলিতে সুমন শেখ নামে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিবকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ মামলার একদিন পরই ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল।

শনিবার (৪ জুলাই) সকালে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান হত্যা মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

জানা যায়, গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পূর্বশত্রুতার জেরে ভাঙ্গা পৌরসভার হাসামদিয়া ও কাপুড়িয়া সদরদী মহল্লার বাসিন্দাদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হন কাপুড়িয়া সদরদী গ্রামের মিলন শেখের ছেলে সুমন শেখ (২৩)। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নিহতের বাবা মিলন শেখ গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ভাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছে ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব ও পূর্ব হাসামদিয়া মহল্লার বাসিন্দা সজীব মাতুব্বরকে (২৮)।

পুলিশ জানায়, মামলার পর থেকে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামলার প্রধান আসামি সজীব মাতুব্বর এখনও পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, ঘটনার পর শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে নিহত সুমন শেখের বাড়িতে যান ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন) আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল। তিনি নিহতের কবর জিয়ারত করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান।

সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সংসদ সদস্য বলেন, “মামলা তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। এই মামলায় কেউ কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যারা অভিযুক্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আজই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দলীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।”

সংসদ সদস্যের ওই বক্তব্যের প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যেই জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোজাম্মেল হোসেন ও সদস্যসচিব শাহরিয়ার শিথিল স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “অনিবার্য কারণবশত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, ভাঙ্গা উপজেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটি ৩ জুলাই থেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো।”

কমিটি বিলুপ্তির বিষয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব শাহরিয়ার শিথিল বলেন, ভাঙ্গা উপজেলা কমিটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। সর্বশেষ কমিটির এক শীর্ষ নেতা হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি হওয়ায় এবং মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সুপারিশে উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব যেন তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব সজীব মাতুব্বরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তিনি পলাতক থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।