খুঁজুন
, ,

জলবায়ু পরিবর্তন: বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য ও মানবিক ঝুঁকি

নিকোলাস বিশ্বাস
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০১ পূর্বাহ্ণ
জলবায়ু পরিবর্তন: বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য ও মানবিক ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু পরিচিত দৃশ্য – ভয়াবহ দাবানল, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ কিংবা খরায় ফেটে যাওয়া মাটি। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিভিশনের পর্দায় এসব দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি স্থান পায়। কারণ এগুলো তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান এবং উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এগুলো জলবায়ু সংকটের কেবল দৃশ্যমান অংশ। যেমনি হিমশৈলের (Iceberg) সবচেয়ে বড় এবং গভীর অংশ লুকিয়ে থাকে পানির নিচে তেমনি জলবায়ূ পরিবর্তনের গভীর প্রভাব ও ক্ষত মিশে থাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মাঝে যা উপর থেকে দেখা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ফসলহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এই সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দৃশ্যমান দুর্যোগের বাইরে গিয়ে এর অন্তর্নিহিত কারণ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

দৃশ্যমান দুর্যোগ: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকাশ্য রূপ

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা ক্রমাগত বাড়ছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এবং দাবানল পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করছে। এসব দুর্যোগ তাৎক্ষণিক প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সরকার ও মানবিক সংস্থাগুলো ত্রাণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের মনোযোগ সীমাবদ্ধ থাকে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই, অথচ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো অনেক বেশি গভীর এবং জটিল যা আমাদের জীবনকে দূর্বীসহ করে তোলে।

দুর্যোগের আড়ালে শুরু হয় আরেকটি সংকট

প্রতিটি জলবায়ুজনিত দুর্যোগ একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার সূচনা করে। যখন খরায় ফসল নষ্ট হয়, তখন শুধু কৃষকের উৎপাদনই কমে না; খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয়, বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও বেশি খাদ্য অনিরাপত্তার মুখোমুখি হয়। কৃষক তার আয়ের উৎস হারান, পরিবারগুলো ঋণের বোঝা বহন করতে বাধ্য হয় এবং অনেক মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

একইভাবে নদী, খাল ও জলাধার শুকিয়ে গেলে শুধু পানির সংকটই সৃষ্টি হয় না; কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপদ পানির জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, যা তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগকেও সীমিত করে।

খাদ্য নিরাপত্তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুতর কিন্তু কম আলোচিত প্রভাবগুলোর একটি হলো খাদ্য নিরাপত্তা। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন্যা ও খরার কারণে কৃষি উৎপাদন দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের ক্ষুদ্র কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ফসলের উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। দরিদ্র পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে কম এবং নিম্নমানের খাদ্য গ্রহণ করে। এর ফলে অপুষ্টি বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে। ক্ষুধা তখন শুধু একটি মানবিক সংকট নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা ও টেকসই খাদ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব হুমকি

জলবায়ু পরিবর্তন এখন জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং তাপজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যার কারণে নিরাপদ পানির উৎস দূষিত হয়ে কলেরা, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বিস্তার নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অনেক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে জরুরি চিকিৎসা প্রদান ব্যাহত হয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে স্বাস্থ্যখাতকে আরও শক্তিশালী ও সহনশীল করে গড়ে তোলা জরুরি।

অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বৈষম্যের বিস্তার

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিটি দুর্যোগের পর সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্গঠনে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। তারা সঞ্চয় হারায়, ঋণগ্রস্ত হয়, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যেসব জনগোষ্ঠীর দায় সবচেয়ে কম, তারাই এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।

বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতা

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা, বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বহু এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। ফলে জলবায়ুজনিত অভিবাসন দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে সীমিত ভূমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক অঞ্চলে সামাজিক উত্তেজনা, সংঘাত এবং নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত নয়, সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ নতুন অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। ভবিষ্যতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ এবং বৈশ্বিক অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু বা পরিবেশগত অভিবাসীর সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১০০ কোটিরও বেশি হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হতে পারে। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই প্রায় ২ কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারে। Internal Displacement Monitoring Centre (IDMC) -এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে (২০১৪–২০২৩) জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ২১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে যা বিভিন্ন দেশে অমানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।

জলবায়ু সংকট: উন্নয়নেরও বড় চ্যালেঞ্জ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্পর্শ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষা ব্যাহত হয়। স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে ব্যয় করতে হয়। ফলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন অনেক দেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এজন্য পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই জরুরী।

দুর্যোগের আগে বিনিয়োগই সর্বোত্তম সমাধান

জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা, বন ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে এমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা দুর্যোগ ঘটার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে এবং তাদের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরে তাকানোর সময় এখনই

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় চোখে দেখা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটিই মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ করে। তাই শুধু বন্যা, খরা কিংবা দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করলেই চলবে না। আমাদের দেখতে হবে খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বাস্তুচ্যুতি এবং উন্নয়নের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এই সামগ্রিক চিত্রটি উপলব্ধি করলেই আমরা এমন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সহনশীল, নিরাপদ এবং টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

উপসংহার: সংকটের আড়ালে গভীর সংকট

জলবায়ু পরিবর্তন কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। অতএব, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আমাদের শুধু দৃশ্যমান দুর্যোগ নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলোর প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ প্রকৃত সমাধান তখনই সম্ভব, যখন আমরা কেবল লক্ষণ নয়, সংকটের মূল কারণ এবং এর বহুমাত্রিক প্রভাব মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করব। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সহনশীল এবং টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রীল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com

ফরিদপুর জেলা জিওপির আংশিক কমিটির অনুমোদন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর জেলা জিওপির আংশিক কমিটির অনুমোদন

গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) ফরিদপুর জেলা শাখার আংশিক কমিটি আগামী এক বছরের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

অনুমোদিত কমিটিতে সভাপতি—ফরহাদ হোসেন এবং সহ-সভাপতি—ফিরোজ শেখ, মমিন চৌধুরী, জিয়া খান, আলমগীর শিকদার, আনিসুজ্জামান বাবুল শরীফ, দেলোয়ার হোসেন ও তারেক আজিজ।

সাধারণ সম্পাদক—রুবেল শেখ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক—মো. ফরহাদ মিয়া, আলমগীর শেখ, জিয়া শেখ, শিমুল মোল্যা, মিন্টু হোসেন ও সাইদুল ইসলাম।

সাংগঠনিক সম্পাদক—শেখ জাহিদ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক—মোহাম্মদ মতিয়ার, মো. ওমর ফারুক, সুমন ইসলাম নীরব, ইমদাদুল ইসলাম (বিন্দু) ও মো. শহিদ মোল্লা টুকু।

এ ছাড়া দপ্তর সম্পাদক—আলআমিন হোসেন লিখন; অর্থ সম্পাদক—মো. শহিদুল্লাহ; প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক—মো. জনি বিশ্বাস; সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক—নূরু মিয়া ও খলিলুর রহমান।

আইন সম্পাদক—অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম; মানবাধিকার সম্পাদক—আলমগীর হোসেন; ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মর্যাদা বিষয়ক সম্পাদক—মাওলানা শাওন আলী মীর; মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয়স্বার্থ বিষয়ক সম্পাদক—কামরুল হাসান; প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্পাদক—আফজাল আকাম।

যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক—বক্কার হাওলাদার; ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক—রাসেল খান; শ্রম ও কর্মসংস্থান সম্পাদক—মো. মিরাজ শিকদার মিন্টু এবং কার্যকরী সদস্য—সাইদুল ইসলাম।

দলীয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অনুমোদিত এ আংশিক কমিটি এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে।

শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ: কতটা প্রস্তুত আমাদের সমাজ?

নিকোলাস বিশ্বাস
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ণ
শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ: কতটা প্রস্তুত আমাদের সমাজ?

একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু সন্তানকেই হারায় না; হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানের ছবি হাতে থানায় জিডি করছেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো – একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই বা কার?

সংখ্যা শুধু গল্পের একটি অংশ

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩,৬৭৯ শিশু উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২,০৩৮ শিশু তথনো নিখোঁজ রয়েছে। তবে জিডির সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনাই তুলে ধরে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে, কারণ কিছু ঘটনা হালনাগাদ হয় না, আবার অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না।

সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এক ধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যায় বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে; আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন নিখোঁজ হলো তা জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর।

ইউনিসেফসহ (UNICEF) আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়া, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

নিখোঁজ শিশু কোনো সাধারণ নিখোঁজ ব্যক্তির মামলা নয়

শিশু নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সবসময় রাখে না; তাকে সহজেই প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দরিদ্র শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুকে সরিয়ে নিতে বা পাচারের সুযোগ পেতে পারে।

জিডি করাই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও ঝুঁকির বিষয় দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন।

পরিবারের অসহায়ত্ব যেন একটি ফাইলে আটকে না থাকে

সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা পুলিশের কাছে গেলে উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক।

প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। অসহায় মা-বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো – কেউ তাদের কথা শুনছে এবং সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

শিশু ফিরে এলেই দায়িত্ব শেষ নয়

নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়, কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? তাকে কি নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে; শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা দায়ী করা যাবে না। তার প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকি চিহ্নিত না করে শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদে পড়তে পারে।

সুরক্ষা শুরু হোক পরিবার ও বিদ্যালয় থেকে

যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক বা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না; কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়।

এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে – তাদের ভয় দেখানো বা অস্বস্তিতে ফেলার অধিকার কারোর নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা গোপন কিছু রাখতে বললে শিশুকে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।

স্কুল ও মাদ্রাসা হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি (Child Safeguarding Policy) থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া ও শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষাও জরুরি।

তথ্য-প্রযুক্তি ঝুঁকি তৈরি করে, আবার সহায়তাও করতে পারে

একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজও সহায়ক হতে পারে।

ঢাকার কোনো থানায় শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; শিশুকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানাতে হবে।

হেলফ লাইন-১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে

Child Helpline 1098 শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক ও শিশু এই নম্বরটি জানে? স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের কাছে বার্তা হোক সহজ – বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও।

শিশু সুরক্ষা সবার দায়িত্ব

শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম – সবারই ভূমিকা রয়েছে।

স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত ও পরিবারকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।

গণমাধ্যমকে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে; এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরোধ

একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়।

এমন সমাজ চাই, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানবে এবং নির্যাতনের কথা ভয় ছাড়াই বলতে পারবে। আর শিশু যখন মুখ খুলবে, তাকে দোষী নয় – সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে।

শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন এই বাণী সত্যিকার অর্থে অনুধাবনপূর্বক বাস্তবায়ন করে।

শিশু নিরাপত্তা; শিশুর একটি অধিকার

শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয় – “শিশুটি কোথায়?” আরও জিজ্ঞেস করতে হবে – “কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?”

আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়, কারণ শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ – তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।

নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddzam@gmail.com

‘ভারী থলে ও পথের পাহাড়’

মো. আবু সাঈদ বিশ্বাস
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৫ অপরাহ্ণ
‘ভারী থলে ও পথের পাহাড়’

বিকেলের শেষ আলো পাহাড়ের ঢালে এসে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা লালচে হয়ে নিচে নামছে। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটছিল রাশেদ। পায়ের নিচে পাতাগুলো মড়মড় করে উঠছিল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল ছিল না।

তার মনটা আজকাল এমনিতেই ভারী।

জীবনের বয়স মাত্র ছাব্বিশ। অথচ মাঝে মাঝে তার মনে হয়, এই বয়সেই যেন অনেকগুলো বছর বয়ে ফেলেছে সে। একসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল! নিজের একটা ব্যবসা করবে, ভালোভাবে দাঁড়াবে, পরিবারকে স্বচ্ছন্দে রাখবে—সবই ভেবেছিল।

কিন্তু কয়েক বছর আগে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু নাবিল ব্যবসার টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল। রাশেদের নিজের জমানো টাকা তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল ধার করা টাকাও। এক মুহূর্তে সব এলোমেলো হয়ে গেল।

টাকা হারানোর কষ্টের চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছিল মানুষের কথা।

“ব্যবসা করার আগে একটু বুদ্ধি থাকা দরকার ছিল।”

“বন্ধুকে এত বিশ্বাস করলে এমনই হয়।”

“তোমার দ্বারা এসব হবে না।”

কথাগুলো কেউ হয়তো মুহূর্তের রাগে বলেছিল, কেউ হয়তো মজা করে। কিন্তু রাশেদ সেগুলো ভুলতে পারেনি।

এরপর যতবার নতুন করে কিছু শুরু করতে চেয়েছে, ততবারই পুরোনো ব্যর্থতা তাকে পেছন থেকে টেনে ধরেছে। ধীরে ধীরে সে নিজেকেই বিশ্বাস করা বন্ধ করে দিল।

রাতে ঘুমাতে গেলেই পুরোনো ঘটনাগুলো মনে পড়ত। কখনো বন্ধুর প্রতারণা, কখনো আত্মীয়ের কথা, কখনো নিজের ব্যর্থতা।

“সেদিন যদি এমনটা না হতো…”

“আমি যদি তখন ওকে বিশ্বাস না করতাম…”

“আরেকটু সুযোগ পেলে হয়তো…”

এই ‘যদি’ আর ‘হয়তো’র ভেতরেই কেটে যাচ্ছিল তার দিন।

শেষ পর্যন্ত একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধের কথা মনে পড়ল—সুলেমান শেখ।

পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট একটা ঘরে একা থাকেন তিনি। বয়স অনেক। জীবনে কম কষ্ট পাননি। তবু মানুষটার মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি আছে। গ্রামের কেউ বিপদে পড়লে তার কাছে যায়। তিনি বেশি কথা বলেন না, কিন্তু তার দু-একটি কথাই অনেক সময় মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।

আজ বিকেলে রাশেদ তাই তার কাছে এসেছে।

সুলেমান শেখ রাশেদের কথা মন দিয়ে শুনলেন। কোথাও বাধা দিলেন না। সব কথা শেষ হলে কিছুক্ষণ চুপ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ঘরের এক কোণ থেকে একটা খালি চটের থলে এনে রাশেদের হাতে দিলেন।

—আমার সঙ্গে চলো।

রাশেদ কিছুটা অবাক হলো।

—কোথায়?

—চললেই দেখবে।

বৃদ্ধ সামনে হাঁটতে শুরু করলেন। রাশেদও পেছনে পেছনে চলল।

কিছুদূর গিয়ে তারা পাহাড়ি টিলার গোড়ায় এসে দাঁড়াল।

সুলেমান শেখ মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন,

—আজ চূড়ায় উঠব।

রাশেদ পাহাড়ের দিকে তাকাল। পথটা বেশ খাড়া।

বৃদ্ধ বললেন,

—পথে যত পাথর দেখবে, সব কুড়িয়ে এই থলেতে ভরবে।

রাশেদ অবাক হয়ে বলল,

—সব পাথর?

—হ্যাঁ। যত পারো।

রাশেদ কিছু বুঝতে না পেরে থলেটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল।

পথের শুরুতেই একটা লালচে পাথর চোখে পড়ল। সেটা হাতে নিতেই তার মনে পড়ে গেল এক আত্মীয়ের কথা—

“তোমার দ্বারা কিছু হবে না।”

সে পাথরটা থলেতে রেখে দিল।

আরও কিছুদূর গিয়ে একটা কালো পাথর পেল। সেটি হাতে নিতেই মনে পড়ল নাবিলের কথা। সেই বিশ্বাসঘাতকতার রাত।

পাথরটাও থলেতে গেল।

তারপর আরও পাথর।

কোনো পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে গেল অপমানের স্মৃতি, কোনোটা ব্যর্থতার, কোনোটা হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের। রাশেদের মনে হচ্ছিল, সে যেন পথ থেকে পাথর নয়, নিজের জীবনের পুরোনো ঘটনাগুলোই তুলে তুলে থলেতে ভরছে।

পাহাড় যত ওপরে উঠছিল, থলেটা তত ভারী হচ্ছিল।

একসময় রাশেদের কাঁধে ব্যথা শুরু হলো। চটের ফিতেটা চামড়ায় ঘষা খেয়ে জ্বালা করছিল। হাঁপাতে হাঁপাতে সে একসময় থেমে গেল।

—আমি আর পারছি না।

সুলেমান শেখও থামলেন।

—কী হলো?

রাশেদ থলেটা মাটিতে নামিয়ে বলল,

—এটা অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে। এত পাথর নিয়ে আর ওঠা যাচ্ছে না।

বৃদ্ধ থলেটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—কী, খুব ভারী হয়ে গেছে?

—আর বলবেন না! কাঁধে ব্যথা হয়ে গেছে।

—তাহলে নামিয়ে রাখছ না কেন?

রাশেদ অবাক হয়ে তাকাল।

—আপনিই তো তুলতে বলেছিলেন!

সুলেমান শেখ হেসে বললেন,

—বলেছিলাম। তাই বলে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে নাকি?

রাশেদ চুপ করে গেল।

বৃদ্ধ থলেটার দিকে ইশারা করলেন।

—আচ্ছা বলো তো, এই পাথরগুলো কি তোমার কোনো কাজে লাগবে?

—না। শুধু কষ্টই হচ্ছে।

—তাহলে ফেলে দাও। পথ চলতে গেলে সবকিছু সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হয় না।

কথাটা শুনে রাশেদ স্থির হয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ বললেন,

—জীবনেও এমন হয়, বাবা। কেউ একটা কথা বলে কষ্ট দিল, কোথাও ব্যর্থ হলে, কেউ ঠকাল—আমরা সেসব ভুলতে পারি না। বারবার মনে করি। তারপর নিজের মনটাই ভারী করে ফেলি।

রাশেদ মাথা নিচু করে শুনছিল।

—যা হয়েছে, তা তো আর বদলাতে পারবে না। তবে সেখান থেকে কিছু শিখে সামনে যেতে পারবে। পুরোনো কথা মনে পড়তেই পারে। কিন্তু প্রতিদিন সেগুলোকে কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটার দরকার কী?

বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।

রাশেদ ধীরে ধীরে থলেটা কাঁধ থেকে নামাল।

একবার মুখ খুলে ভেতরের পাথরগুলোর দিকে তাকাল।

এতগুলো পাথর—এতগুলো স্মৃতি!

কত বছর ধরে সে এগুলো বুকের ভেতর বয়ে বেড়াচ্ছে!

সে থলেটা উল্টে দিল।

পাথরগুলো একে একে গড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। কোনোটা ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেল, কোনোটা আরও নিচে গিয়ে থেমে রইল।

রাশেদ অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল।

তার বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি হলো। কিন্তু সেই শূন্যতার মধ্যে ভয় ছিল না। বরং ছিল স্বস্তি।

সে গভীর করে শ্বাস নিল।

সুলেমান শেখ উঠে দাঁড়ালেন।

—চলো।

রাশেদও উঠে দাঁড়াল।

পাহাড়ের চূড়া তখনও অনেকটা দূরে। পথও আগের মতোই খাড়া, পাথুরে আর দুর্গম। কিন্তু রাশেদের কাছে এবার পথটাকে অন্যরকম লাগছিল।

কিছুদূর উঠে সে একবার পেছনে তাকাল।

নিচে পড়ে থাকা পাথরগুলো আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না।

তার মনে হলো—মানুষের জীবনের সব বোঝা বাইরের কেউ কাঁধে তুলে দেয় না। কিছু বোঝা সে নিজেই কুড়িয়ে নেয়। তারপর অভ্যাসের বশে সেগুলো বয়ে বেড়ায়।

পাহাড়ের চূড়ার কাছে পৌঁছাতেই বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে এল। দূরের গ্রাম, গাছপালা আর আঁকাবাঁকা পথগুলো ওপর থেকে ছোট হয়ে দেখা গেল।

রাশেদ থেমে দাঁড়াল।

তার জীবনের সমস্যা আজও শেষ হয়নি। হারানো টাকা ফিরে আসেনি। যে মানুষ তাকে ঠকিয়েছে, সে ক্ষমাও চায়নি। পুরোনো কথাগুলোও পৃথিবী থেকে মুছে যায়নি।

কিন্তু আজ একটা জিনিস বদলে গেছে।

রাশেদ আর সেগুলোকে নিজের সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে না।

সে সামনে তাকাল।

পাহাড়ের ওপারে বিশাল আকাশ।

রাশেদ ধীরে ধীরে চূড়ার দিকে হাঁটতে শুরু করল।

এবার তার কাঁধে কোনো থলে নেই।

শুধু সামনে খোলা পথ।