খুঁজুন
, ,

ইসরায়েলে টানা বেজে চলছে সাইরেন, একের পর এক শোনা যাচ্ছে বিস্ফোরণের শব্দ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ জুন, ২০২৫, ৩:৪২ অপরাহ্ণ
ইসরায়েলে টানা বেজে চলছে সাইরেন, একের পর এক শোনা যাচ্ছে বিস্ফোরণের শব্দ

ইসরায়েলে টানা বেজে চলছে সাইরেন। আর একের পর এক শোনা যাচ্ছে বিস্ফোরণের শব্দ। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।

এর জেরে সেন্ট্রাল ও দক্ষিণ ইসরায়েলের অনেক এলাকায় বিমান হামলার সতর্কতা হিসেবে সাইরেন বেজে উঠেছে। বিশেষ করে আসদোদ ও লাচিস শহরে এবং পশ্চিম জেরুজালেমের কাছাকাছি কয়েকটি জায়গায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, জেরুজালেমে সাইরেন বাজা মাত্রই ইসরায়েলি সংসদ (নেসেট)-এর সদস্যরা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।

ইসরায়েল ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে সোমবার (২৩ জুন) সাংবাদিকদের রিপোর্ট করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই অনেকে পাশের দেশ জর্ডান থেকে খবর সংগ্রহ করছেন। এসব তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। এ হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৪৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তারা। এর মধ্যে অন্তত ৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত হেনেছে।

সেখানকার মানুষজন জানিয়েছেন, টানা ৩৫ মিনিট ধরে সাইরেনের আওয়াজ শোনা যায় এবং সেই সঙ্গে প্রবল বিস্ফোরণের শব্দ।

তবে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। কারণ, ইসরায়েলের সেনাবাহিনী কোনো ভিডিও বা তথ্য প্রকাশে কড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাই বাইরের দুনিয়া সঠিকভাবে জানতে পারছে না আসলে কী ঘটছে।

গত ১০ দিনে ইরানের হামলায় ইসরায়েল বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সেন্ট্রাল ইসরায়েলে। তবে হাইফার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরেও বারবার হামলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গতকাল ইরান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে এক হামলা চালায়। সেই সময় কোনো সাইরেন বাজেনি। পরে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী নিশ্চিত করে যে এটি একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ছিল—এটি ভুল করে ছোড়া নিজের প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছিল না।

১৩ জুন ইসরায়েল ইরানে একটি বড় ধরনের হামলা চালায়। এতে দেশটির পরমাণু স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও আবাসিক এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মারা যান ৪০০-র বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, পরমাণু বিজ্ঞানী এবং সাধারণ নাগরিকও রয়েছেন।

এই হামলার পর ইরান দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় নামে। ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস থ্রি’ নামে এক অভিযানের অধীনে ২৩ জুন পর্যন্ত তারা ইসরায়েলের ওপর ২১ দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত।

আন্তর্জাতিক শান্তিপদক পেলেন সালথার নবকাম পল্লী কলেজের অধ্যক্ষ ওবায়দুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০১ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক শান্তিপদক পেলেন সালথার নবকাম পল্লী কলেজের অধ্যক্ষ ওবায়দুর রহমান

শিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা ‘ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যাওয়ার্ড’ (International Peace Award) অর্জন করেছেন ফরিদপুরের সালথা উপজেলার যদুনন্দীতে অবস্থিত নবকাম পল্লী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. ওবায়দুর রহমান। বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস সোসাইটি’ (International Human Rights Society) তাঁকে এই পদকে ভূষিত করে। সম্প্রতি এক সুধী আয়োজনের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এ সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করেন।

​শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সুদৃঢ় নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রফেসর ওবায়দুর রহমান জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক মূল্যায়নে একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। তিনি সালথা উপজেলায় একাধিকবার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান নির্বাচিত হওয়া ছাড়াও সামগ্রিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, ঝরে পড়া রোধ এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকার জন্য ফরিদপুর জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কলেজ প্রধান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

​অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাঁর মেধা, নিষ্ঠা ও নিরলস প্রচেষ্টায় গ্রামভিত্তিক এই কলেজটির শিক্ষার পরিবেশ ও অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। তাঁর এমন বৈশ্বিক ও জাতীয় স্বীকৃতিতে কলেজের শিক্ষকমণ্ডলী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের মাঝে আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন তাঁকে শুভকামনা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।

​সম্মাননা প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে প্রফেসর মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, “যেকোনো স্বীকৃতিই কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এ আন্তর্জাতিক সম্মাননা আমার একার নয়; এটি আমার প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নবকাম পল্লী কলেজ, সহকর্মী শিক্ষকবৃন্দ এবং পুরো সালথাবাসীর ভালোবাসার ফসল। শিক্ষার আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সমাজসেবামূলক এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আমি সকলের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি।”

​স্থানীয় গুণীজনদের মতে, তাঁর এই সম্মাননা কেবল ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং পুরো ফরিদপুর জেলার শিক্ষা ও সামাজিক অঙ্গনের জন্য এক অনন্য গর্ব এবং অনুপ্রেরণা।

সদরপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্প জনশূন্য, ৫২ ঘরে এখন ১৫ পরিবারের বসবাস

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
সদরপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্প জনশূন্য, ৫২ ঘরে এখন ১৫ পরিবারের বসবাস

উপরে জমে থাকা কালো পানি, নিচে হাঁটুসমান কাদা আর চারপাশ ঘিরে ঝোপঝাড়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অগ্রাধিকারভিত্তিক আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘরগুলো যেখানে গৃহহীন মানুষের নিরাপদ ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল, ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের সেই নতুন বাজার সংলগ্ন প্রকল্পটির অবস্থা এখন পুরোপুরি উল্টো।

চলাচলের রাস্তার বেহাল দশা, নিচু জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও মাদকসেবীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়ায় দুর্ভোগের চরম সীমায় পৌঁছেছেন সেখানকার বাসিন্দারা। ফলে নিরুপায় হয়ে সিংহভাগ পরিবারই আশ্রয়ণ প্রকল্প ছেড়ে চলে গেছে।

​বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সদরপুরের ঢেউখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পে মোট ৫২টি ঘর রয়েছে। তবে দুর্ভোগের কারণে মাত্র ১৫টি পরিবার কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে তাদের বসতি। ফাঁকা পড়ে থাকা বাকি ৩৭টি ঘর পড়ে আছে পুরোপুরি পরিত্যক্ত অবস্থায়। দেখভাল না থাকায় এসব ঘরের চারপাশ ঢেকে গেছে লতাপাতা আর ঝোপঝাড়ে। জঙ্গলকীর্ণ এ পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে দিন-রাতে বসছে মাদকসেবীদের আখড়া, যা অবশিষ্ট বাসিন্দাদের নিরাপত্তাঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

​বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় এক দিনের বৃষ্টিতেই টানা এক সপ্তাহ জলজট থাকে প্রকল্প এলাকায়। নিচু জায়গায় পানি আটকে অনেকে ঘরেই ঢুকে পড়ছে পানি। বাথরুম ও আঙিনায় একই অবস্থা তৈরি হওয়ায় বাসিন্দাদের মানবেতর দিন কাটাতে হচ্ছে।

​প্রকল্পের বাসিন্দা মিনু আক্তার (৪০) ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “বৃষ্টির পানি বের হওয়ার কোনো পথ নাই। একদিন বৃষ্টি হলেই সাতদিন ধরে পানি জমে থাকে। থাকার ঘরে পানি ঢুকে যায়, বারান্দায়ও পানি আটকে থাকে। বাথরুমে পর্যন্ত যাওয়া যায় না, বাধ্য হয়ে বাইরে যেতে হয়। প্রতিদিন ঘর থেকে পানি সেচতে সেচতে আমার হাতে ঘা হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের তো যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই, তাই স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে বাধ্য হয়ে এই কষ্ট সহ্য করছি।”

​অন্য বাসিন্দা জিয়াসমিন আক্তার (৩০) জানান জীবনের ঝুঁকি আর অসুবিধার কথা। তিনি বলেন, “কয়েকদিন আগে আমার আট মাসের শিশুসন্তান উঠানে জমে থাকা পানিতে পড়ে গিয়েছিল। কোনোমতে উদ্ধার করেছি। পানি একটু কমলে চারপাশের দুর্গন্ধ আর মশা-মাছির উপদ্রবে টেকা যায় না। রাস্তায় হাঁটু কাদা। এই কষ্টের কথা সহ্য করতে না পেরে অধিকাংশ পরিবার প্রকল্প ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গেছে। আমরা গরিব মানুষ, যাওয়ার জায়গা নাই বলেই পড়ে আছি। তার ওপর ফাঁকা ঘরগুলোতে বখাটে আর মাদকসেবীরা আড্ডা দেয়, রাতে খুব ভয় লাগে।”

​স্থানীয়দের অভিযোগ, আশ্রয়হীনদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে গিয়ে পরিকল্পনাহীনভাবে নিচু জমিতে প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় এটি এখন নতুন দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। তারা অনতিবিলম্বে জলজট নিরসনে ড্রেন নির্মাণ, পরিত্যক্ত ঘর সংস্কার এবং নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশি টহলের দাবি জানান।

​সার্বিক বিষয়ে ঢেউখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বয়াতি স্বীকার করেন বাসিন্দাদের এই মানবিক বিপর্যয়ের কথা। তিনি বলেন, “আমি নিজে গিয়ে তাদের দুর্দশা দেখে এসেছি। সত্যিই সেখানে মানুষ থাকার মতো কোনো পরিবেশ নেই। জমি নিচু হওয়ায় মাটি ভরাটের কথা ভাবা হলেও তাতে জলাবদ্ধতা আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। তাই চারপাশ ঘুরে পাকা ড্রেন নির্মাণই একমাত্র বিকল্প সমাধান। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।”

​যোগাযোগ করা হলে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। নিচু জমি ও পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় সেখানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকৌশলী পাঠিয়ে স্থানটি পরিদর্শন করে একটি ড্রেনেজ প্ল্যান তৈরি করব। বর্ষার পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হলে জলাবদ্ধতা দূর হবে। পাশাপাশি ফাঁকা ঘরগুলোর সংস্কার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”

মানচিত্রের ওপারে কান্না: বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র জনপদে উন্নয়নের আলো কতটা পৌঁছেছে?

রেহেনা ফেরদৌসী
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ
মানচিত্রের ওপারে কান্না: বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র জনপদে  উন্নয়নের আলো কতটা পৌঁছেছে?

বাংলাদেশের মানচিত্রে প্রতিটি জেলা একই রাষ্ট্রের অংশ, প্রতিটি মানুষ একই দেশের নাগরিক। তবু জীবনযাত্রার বাস্তবতায় এই মানচিত্রেরভেতরেই রয়েছে গভীর বৈষম্য। কোথাও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি দ্রুত, কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক বেশি, নাগরিক সুবিধা সহজলভ্য; আবার কোথাও মানুষের প্রতিদিনের জীবন এখনো আবর্তিত হয় অন্ন, কাজ, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের মৌলিক চাহিদাকে ঘিরে।

একটি জেলার দারিদ্র্যের হার যখন জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়, তখন তার অভিঘাত শুধু পরিবারের আয়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষার সুযোগ, চিকিৎসা গ্রহণ, বাসস্থানের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর। অর্থাৎ দারিদ্র্য একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সামর্থ্য কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তার সামনে থাকা সম্ভাবনার পরিধিও সংকুচিত করে। একজন নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে মাসের শুরু ও শেষের ব্যবধানও অনেক সময় গভীর। আয় হাতে আসার পর তাকে একসঙ্গে সামলাতে হয় খাবার, বাসা ভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, পোশাক, যাতায়াত এবং চিকিৎসার খরচ। হঠাৎ কোনো অসুস্থতা, কর্মহীনতা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সেই সীমিত হিসাবকে সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় তখন, যখন আয় থাকলেও তা অনিয়মিত। কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বহু মানুষের জীবনে কাজের নিশ্চয়তা নেই। কোনো মৌসুমে কাজ আছে, অন্য সময়ে নেই; কোনো দিন আয় হয়, কোনো দিন হয় না। কিন্তু পরিবারের প্রয়োজন প্রতিদিনই থাকে। ফলেআয়-ব্যয়ের সামান্য ভারসাম্যহীনতাও অনেক পরিবারকে ধার বা ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।

একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন শিশুর শিক্ষা জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে। স্কুলে যাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বই, পোশাক, পরিবহন, শিক্ষা উপকরণ কিংবা অতিরিক্ত সহায়তার ব্যয় বহন করাও কোনো কোনো পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে শিশুকে পড়াশোনার পাশাপাশি আয়মূলক কাজে যুক্ত করার চাপ তৈরি হতে পারে। এখানেই দারিদ্র্য একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সঞ্চারিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। যে শিশু পর্যাপ্ত শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগ থেকে পিছিয়ে যায়, ভবিষ্যতে তার স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাওসীমিত হতে পারে। ফলে আজকের দারিদ্র্য আগামী দিনের আয়ও জীবনমানকেও প্রভাবিত করে।

স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। একটি সচ্ছল পরিবারের কাছে অসুস্থতা হয়তো সাময়িক আর্থিক চাপ; কিন্তু দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠতে পারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট। চিকিৎসার খরচ জোগাতে সঞ্চয় শেষ হওয়া, ধার করা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিলম্বিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ অসুস্থতা তখন শুধু শরীরের সমস্যা থাকে না—পরিবারের অর্থনীতিতেও আঘাত হানে।

বাসস্থানের নিরাপত্তাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নদীভাঙন, বন্যা, জলাবদ্ধতা কিংবা অন্যান্য দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে দরিদ্র মানুষের ক্ষতির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। একটি ঘরনষ্ট হওয়া তাদের কাছে শুধু একটি স্থাপনা হারানো নয়; এর সঙ্গেহারিয়ে যেতে পারে আসবাব, প্রয়োজনীয় সামগ্রী, গবাদিপশুকিংবা জীবিকা নির্বাহের উপকরণ। সামান্য সম্পদ হারিয়েই একটিপরিবার আবারও শূন্য থেকে শুরু করতে বাধ্য হতে পারে।এ কারণেই কোনো জেলার দারিদ্র্যের হারকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে বাস্তব সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। সংখ্যার পেছনে আছে মানুষের মুখ, পরিবারের অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং প্রতিদিনের সংগ্রাম। অথচ একই সময়ে আমরা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং নতুন নতুন সুযোগের কথা বলছি। সেতু, মহাসড়ক, মেট্রোরেল কিংবা শিল্পায়ন—সবই উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু উন্নয়নের আরেকটি প্রশ্নও জরুরি: এই অগ্রগতির সুফল দেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষটির জীবনে কতটা পৌঁছেছে?

উন্নয়নের অর্থ শুধু জাতীয় আয় বৃদ্ধি নয়। একজন কৃষক যদি উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পান, একজন শ্রমিক যদি স্থিতিশীল কাজ পান, একজন মা যদি সন্তানের চিকিৎসা নিয়ে আতঙ্কিত না হন, একটি শিশু যদি পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে না ফেলে—তবেই উন্নয়নের অর্থ মানুষের জীবনে আরও গভীর হয়ে ওঠে। তাই দারিদ্র্য মোকাবিলায় শুধু সহায়তা বিতরণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানো এবং দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা আরও স্থিতিশীল করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সহায়তার পাশাপাশি মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা।

বাংলাদেশের দরিদ্রতম জনপদগুলোর দিকে তাকানো মানে দেশেরব্যর্থতার তালিকা তৈরি করা নয়। বরং এটি উন্নয়নের অসমাপ্ত কাজগুলো চিহ্নিত করার একটি প্রয়োজনীয় আয়না। কারণ একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি শুধু রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, নতুন স্থাপনা কিংবা অর্থনীতির বড় সংখ্যায় ধরা পড়ে না। তার প্রকৃত প্রতিফলন দেখা যায় সেই ঘরে, যেখানে একজন বাবা হিসাব করেন আগামী সপ্তাহের বাজার কীভাবে চলবে; সেই মায়ের উৎকণ্ঠায়, যিনি সন্তানের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে ভাবেন; সেই শিশুর চোখে, যার স্বপ্ন আছে কিন্তু সুযোগ সীমিত।

বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার মানুষের মর্যাদা সমান। তাই মানচিত্রের কোনো প্রান্তে জন্ম নেওয়া একজন মানুষের সম্ভাবনা যেন তার জন্মস্থানের দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত না হয়।উন্নয়নের আলো তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জনপদের মানুষও সেই আলোর উষ্ণতা অনুভব করবেন।

একই মানচিত্র, একই পতাকা, একই দেশের মানুষ—তবু জীবনের ব্যবধান যেন দুই বাংলাদেশের গল্প না হয়ে ওঠে।

লেখক: সহ-সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, কেন্দ্রীয় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।