খুঁজুন
শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১২ বৈশাখ, ১৪৩৩

শনিবারের দুপুরটা

ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০২৫, ১২:১৯ অপরাহ্ণ
শনিবারের দুপুরটা

শনিবারের দুপুরটা ভারী পাথরের মতো বুকে চেপে বসে থাকে। শুক্র, শনি ছুটি বলে এই দুটি দিন আনন্দে ভরে ওঠার কথা, অথচ তা হয় না। পায়েল ব্যস্ত হয়ে থাকে প্রণীলকে নিয়ে। প্রদীপ আর পায়েলের একমাত্র সন্তান নীল – প্রণীলকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে ওর মা।

পায়েল খুব কর্তব্যপরায়ণ। সংসারের কাজকর্ম করে মেশিনের মতো। ভোর থেকে ওর কাজ শুরু হয়। ঘড়ির সময় ধরে প্রতিটি কাজ করে যায়।

প্রদীপের খাবার ঢাকা রয়েছে টেবিলে। ওভেনে গরম করে এখনই খেয়ে নেওয়া যায়। তারপরও বিছানায় শুয়ে থাকে প্রদীপ।

বই পড়তে আগের মতো আর ভালো লাগে না। কেন যেন আজকাল আর মনঃসংযোগ থাকে না, টিভি চলছে, স্ক্রলিংয়ে মৃত্যুসংবাদ দেখে দেখে বুকের ভেতর কাঁপুনি জাগে। স্মার্টফোন হাতে নিয়ে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবে ডুবে থাকতেও ভালো লাগে না। এই ভার্চুয়াল জগৎটাকে কেন যেন সে আপন করতে পারেনি।

ফেসবুকে নিজের একান্ত ভাবনাকে প্রচার করতে তার কেমন যেন দ্বিধা জাগে। নিজের দুঃখ-সুখ অগুনতি মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে তার একেবারেই ইচ্ছে করে না। আমি গাড়ি কিনেছি, ফ্ল্যাট কিনেছি, গাজীপুরে ভাওয়াল রাজবাড়ি দেখে ছুটির দিনটা ভরিয়ে তুলেছি – কথাগুলো সবাইকে জানিয়ে কী লাভ?

তার এই ছুটির দিনের একাকিত্ব, বিষাদ-বিধুর সময় যে বুকের গভীরে বরফের চাঁইয়ের মতো বসে আছে – এ-কথা সবাইকে জানিয়ে কী হবে? কেউ তো তাকে সঙ্গ দিতে আসবে না। তার সুখ-দুঃখ নিজের হয়েই থাকুক।

হইহই করা কোনোদিন তার স্বভাবে নেই, মাথার ওপর মা-বাবা ছিলেন। সে-কারণেই হয়তো পারিবারিক জীবনে স্নিগ্ধ আবহ ছিল। বাবা প্রলয়কান্তি বাংলার অধ্যাপক ছিলেন। তার পড়াশোনার অভ্যাস ছিল ভীষণ রকমের। কত কিছু জানতেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের কবিতার পঙ্ক্তি কণ্ঠস্থ ছিল তাঁর। শামসুর রাহমানের কবিতা ভীষণ পছন্দ করতেন। বাবা-মা থাকার কারণেই হয়তো তিন বেডরুমের ফ্ল্যাটবাড়িটা নন্দনকাননের মতো হয়ে থাকত।

কালের নিয়মে অবসর হলো প্রলয়কান্তির। সে-সময় বাড়িটি আরো ভরা ভরা লাগত। নানা ধরনের পত্রপত্রিকা, বই পড়ে সময় কাটাতেন তিনি।

মাঝে মাঝে ডাকতেন নাতিকে।

– মিস্টার নীল, নীলবাবু – কোথায় তুমি? এসো গল্প করি।

দাদু-নাতির এই গল্প করার সময়টুকু ছিল ভারি মিষ্টি-মধুর। গল্পের মাঝখানে নীল বারবার প্রশ্ন করত। দাদু খুব এনজয় করতেন ব্যাপারটি। ইনকুইজিটিভ না হলে ওরা তো কিছু জানতেই পারবে না।

কালের নিয়মে বয়স বাড়তে থাকল। সুস্থ-সবল মানুষটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকেন। শরীরে ভাঙচুর, দাঁতে ব্যথা, হাঁটুতে মাঝে মাঝে যন্ত্রণা। অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে গিয়ে মনে পড়ত, বয়স হয়ে গেছে, জীবনে করার আর তেমন কিছুই নেই। চারপাশে শুধুই হতাশা। গুটি গুটি পায়ে আসা

মৃত্যুচেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন তিনি।

তবুও তো মাথার ওপরে প্রলয়কান্তি ও দীপমালা ছিলেন। বিষাদ প্রদীপকে এমনভাবে গ্রাস করতে পারেনি। শরীর খারাপ হলে বাবা-মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে, ক্লিনিকেও ভর্তি করাতে হয়েছে। বাড়ির কাজেকর্মে কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে। নীলকে নিয়ে যাবে স্কুলে, ছোটাছুটির মাঝে ওর স্কুলও বাদ গেছে।

কিন্তু তারপরও স্বস্তি ফিরে এসেছে। সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন প্রলয়কান্তি।

মেসেঞ্জারে ফোন এলো পায়েলের।

– খেয়েছ?

– এখনো খাইনি।

– তার মানে? সোয়া তিনটে বাজে। কী, ঘুমিয়ে পড়েছিলে? এবার ওঠো। উঠেছ? কী যে করো না।

– উঠেছি, এক্ষুনি খাব।

– খাব বললে হবে না। ওভেনে

ভাত-তরকারি গরম করো, এরপর খেও। ঠান্ডা ভাত খেও না, ঠিক আছে?

গরম ভাত, তরকারি প্লেটে নিয়ে বসেই মনে পড়ে প্রতিটি মানুষ আসলেই একা, নিঃসঙ্গ। মা দীপমালা এত ভাবতেন ছেলেকে নিয়ে; কিন্তু চলে যাওয়ার পর কই একবারও তো আদুরে কণ্ঠ ভেসে এলো না মায়ের।

মা-বাবা দুজনেই অল্পদিনের ব্যবধানে চলে গেছেন।

মায়ের কণ্ঠ একবারও ভেসে এলো না, খেয়েছিস খোকন?

নাহ্, কেউ কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি। চলে গেলে কেউ আর ফিরে আসে না। বুকভরা স্নেহ-মমতা যতই থাকুক পার্থিব জগৎ থেকে চলে গেলে তাদের শুধু স্মৃতিটুকুই পড়ে থাকে প্রিয়জনের কাছে।

নীল মনমরা হয়ে থাকত অনেকটা সময়। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল প্রদীপ। বাড়িতে বেশ কিছুদিন বিষাদের আবহ ছিল। পরিবারের দুজন বয়স্ক সদস্য চলে গেলেন অল্পদিনের ব্যবধানে। সংসারের যে-কোনো সমস্যায় তাঁদের অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতা দিয়ে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। মা-বাবার এই ধরনের সহায়তায় নিজেকে বড় হালকা লাগত প্রদীপের।

এইমাত্র খাওয়া শেষ হলো। ফাঁকা বাড়িতে তার মনে হতে থাকে, পৃথিবী থেকে মানুষ চলে গেলে জাগতিক পৃথিবীতে কেউ আর তার দেখা পায় না – এই ভাবনা তার মনকে সব খোয়ানোর বেদনায় উদাস করে তোলে।

চোখ পড়ে দেয়ালে টানানো ছবির দিকে। মেঝেতে লুটানো ধুতির কুচি, গায়ে চাদর জড়ানো – বিদ্যাসাগরের বাঁধানো ছবিটি শিয়রের কাছে। এটা প্রলয়কান্তির শোবার ঘর ছিল। এখন এটা প্রণীলের পড়ার ঘর।

ছবি কথা বলতে পারে না। কোনো কালেই ছবি কথা বলে না, তবে উনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বাবা প্রলয়কান্তি। বাবার মুখে গল্প শুনে একটু একটু করে বড় হয়েছে প্রদীপ। খুব স্থিতধী ছিল পুরনো সে-সময়।
বাবা-মা দুজনেই বলতেন, ধীরেসুস্থে চারপাশ দেখেশুনে পথ চলো। ছুটে যেও না।

তখন প্রকৃতি ছিল অনাবিল। নীল আকাশে দেখা যেত ঝকঝকে চাঁদ। ফাঁকা জায়গায় প্রচুর গাছগাছালি ছিল। ছোটদের খেলার মাঠ ছিল। এখনকার মতো স্কাইস্ক্র্যাপার ছিল না। শুক্লপক্ষে বাটির মতো চাঁদ দেখতে খুব ভালোবাসত প্রদীপ।

– এই দীপ, পড় পড়। জোরে জোরে পড় – এমন কথা কেউ বলত না। কারণ শহরে-গাঁয়ে-গঞ্জে চেঁচিয়ে পড়ত ছেলেমেয়েরা। তখনকার রেওয়াজ তাই ছিল।

এখন আর উচ্চকণ্ঠে কেউ পড়ে না। কম্পিউটারের মাউস নাড়তে নাড়তে, কমেন্ট লিখতে লিখতে ছেলেমেয়েরা মনে মনে পড়ে। হেসে ওঠে প্রদীপ, কী যে অদ্ভুত সব ব্যাপার!

গল্প শোনার মধুর দিনগুলো কোথায় যে ফেরারি হয়ে গেল। তবে ছেলেবেলায় বাবার কাছ থেকে গল্প শোনার স্মৃতি এখনো তাকে তাড়িত করে। কত মহামনস্বীর জীবনকথা। প্রলয়কান্তি সেই মহামানবদের গল্প শোনাতে গিয়ে তাঁদের মোস্ট গ্লোরিয়াস পারসনস্ বলে সম্বোধন করতেন। তিনি বলতেন, তাঁরা প্রাতঃস্মরণীয়, ভার্চুয়াস।

দেয়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশ^রচন্দ্রের গল্প তার অস্থিমজ্জায় মিশে আছে। পুরনো হয়ে গেছে বলে ছবির রং গাঢ় থেকে কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে, তবু ছেলেবেলা থেকে তাঁর কথা শুনতে শুনতে যেন প্রদীপের চলার পথে অদৃশ্য সাথি হয়ে থেকেছেন তিনি। মানুষটি ছিলেন তার সদাসঙ্গী।

আহা কী আনন্দময় ছিল তার ছেলেবেলা। বাবা শোনাতেন মহামানবের গল্প, রাতে দুধ-ভাত-কলা মাখিয়ে খাইয়ে দিতে দিতে দীপমালা বলতেন রূপকথার গল্প। তাই তো কল্পনার জগৎ এত প্রসারিত হয়েছে তার। নানা বৈষম্য নিয়ে সে ভাবতে পারে, ভালো-মন্দ নিয়ে সূক্ষ্ম বিচার করার ক্ষমতা তার রয়েছে।

মনে মনে ফুঁসতে থাকে প্রদীপ। ছুটির দিনেও বাচ্চাদের কোনো ছুটি নেই। নীল রং পেনসিল দিয়ে খেয়ালখুশিমতো আঁকিবুকি কাটতে পারবে না, গোল্লাছুট, লুকোচুরি খেলতে পারবে না। ফুটবল খেলা নেই, ক্রিকেটের ব্যাট দিয়ে বল পেটানো নেই – এ কেমন ছেলেবেলা!

মলিন মুখে পড়তে বসেছে নীল। ছুটির সন্ধ্যায় একটুখানি পড়ে নিয়ে ছুটে যেত সে দাদুর কাছে। এখানেই ছিল ওর নিশ্চিন্ত নিরুদ্বেগ আশ্রয়।

বিরক্তি মিশিয়ে পায়েল ডাকত, এই নীল, কোথায় গেলি রে? রিনরিনে গলায় জবাব আসত, গল্প শুনছি মা।

– ভেরি ব্যাড নীল, এখন কি গল্প শোনার সময়?

গমগমে গলায় প্রলয়কান্তি বলতেন, এত পড়া কিসের বউমা! আজকে ছুটি দাও ওকে। এমন করলে তো পড়াশোনার প্রতি অনীহা চলে আসবে।

শ্বশুরমশাইকে কিছু বলত না পায়েল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেনে নিতে হতো এই নিয়ম। অস্থির নীল বলত, শুরু করো দাদু।

ইস্স কত যে আনন্দময় ছিল সেই দিন। পায়েল পড়ার টেবিলে এনে রাখে চিকেন স্যান্ডউইচ, পেয়ালায় হরলিকস।

মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে নীল বলে, আজ বাবির কাছে গল্প শুনি মম? ছুটির দিনের সন্ধ্যাবেলায় কি ছুটি দেবে না?

– শুয়ে শুয়ে এলেবেলে গল্প শুনলে কি হয় জানো?

– কী হয়?

– তোমার ভাগ্যও শুয়ে থাকবে।

– ভাগ্য শুয়ে থাকবে মানে?

বিরক্ত পায়েল বলে, তুমি বড্ড প্রশ্ন করো নীল। মানে হলো তোমার ক্লাসমেটরা এগিয়ে যাবে, তুমি এগোতে পারবে না, পিছিয়ে যাবে। তুমি হয়ে যাবে ব্যাকবেঞ্চার।

স্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে দেয়ালের দিকে তাকায় সে।

– বাহ্ জায়গাটা ফাঁকা কেন?

হ্যাঁ, জায়গাটা বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। ছবির রং ফিকে হয়ে গেছে বলে নির্জন দুপুরে প্রদীপ খুলে রেখেছে ছবিটা। বিদ্যাসাগর নেই, কিন্তু এই মহামানবের গল্পটি শোনার যে খুব দরকার ছিল ওর। দাদু শুরু করেছিলেন কিন্তু মমের তাড়ার কারণে শেষ করে যেতে পারেননি। এখন আর গল্প কে শোনাবে ওকে?

গল্পটি শুনতে বড় ইচ্ছে করছে। সন্ধ্যাবেলা ও পড়ার টেবিলে আসবে বলে খাবারের কত আয়োজন করে মম। অথচ বীরসিংহ গাঁ থেকে এতখানি পথ হেঁটে শহরে আসতেন ঈশ্বরচন্দ্র। রাস্তায় গ্যাসপোস্টের নিচে এসে দাঁড়াতেন তিনি, এই আলোতে গুছিয়ে বসে তাঁকে যে পড়া তৈরি করতে হবে।

প্রদীপ ভাবে, এ নীলের মায়েদের মতো এত যত্ন নেওয়ার সময় ছিল না সেই সময়ের মায়েদের। তাঁরা ব্যস্ত

থাকতেন হেঁসেলের রাঁধাবাড়া নিয়ে, আত্মীয়-পরিজনের দেখভাল আর সংসারের ঊনকোটি কাজ নিয়ে।

এখন একটি সন্তানকে অলরাউন্ডার হতে হয়। সেদিকে মায়েদের থাকে কড়া নজর। শুধু সব সাবজেক্টে নাইনটি ফাইভ পারসেন্ট মার্কস পেলে হবে না, তাকে গান-আবৃত্তির ক্লাস করতে হয়। এ-যুগে জুডো-কারাতে শিখতে হবে আত্মরক্ষার জন্য। আর ফ্লুয়েন্ট ইংরেজি না শিখলে তো কোথাও এগোতে পারবে না।

এইটুকুন নীলকে নিয়ে পায়েলের এই প্রাণপণ ছোটাছুটিতে প্রদীপ কম বিরক্ত নয়। কখনো তবলার ক্লাস, কখনো আবৃত্তির ক্লাস, কখনো বা ইয়োগার ক্লাস, রেসের ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে পায়েল ছেলেকে নিয়ে।

বয়স হলে মা-বাবারা ওল্ড ফুলিশ ফাদার অ্যান্ড মাদার হয়ে যায়। ওরা ব্যাকডেটেড। এরপরও দীপমালা মাঝে-মধ্যে বলেছেন, ও কি কথা বউমা? এইটুকুন ছেলে, কত আর পড়বে? আমাদের কাছে বসুক না একটু। কখনো বলতেন, পিঠে যা একখানা ঢাউস ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যায়, মেরুদণ্ড ভেঙে যায় কি না দ্যাখো।

পায়েলের তাৎক্ষণিক জবাব, যুগটা এমন হয়ে গেছে মা, শুধু পড়াশোনা করলেই হয় না, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসও থাকা চাই।

ছুটির দিনে নীলকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেও আগে কখনো এমন নিঃসঙ্গ মনে হয়নি। ভাত-তরকারি গরম করে ছেলেকে বেড়ে দিতেন দীপমালা। এখন মা-বাবা কেউ নেই। মাথার ওপর থেকে নিবিড় ঘন ছায়া সব সরে গেছে। চারপাশ এখন বড্ড ফাঁকা মনে হয়।

পায়েলের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণার সঙ্গে মোটেও মিল হয় না প্রদীপের। ছেলেটা মাঝে মাঝেই কবি বলে ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। নিজের মনের কথা, এলেবেলে প্রশ্ন, স্কুলের সব ঘটনা প্রদীপকে শোনায় ওর মতো করে। বাবির মতো একনিষ্ঠ শ্রোতা সে কোথায় পাবে?

বাবার কথা মনে পড়ে যায়। প্রলয়কান্তি বলতেন, ওর শৈশবটা নিয়মের কারাগারে বন্দি হয়ে গেছে। হাসি-গান আর খেলার আনন্দ থেকে বঞ্চিত ছেলেটা।

বাবার কথাগুলো মনে হতেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে তার। এই প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কেমন? ওরা কিসের স্বপ্ন দেখবে?

বাবা-ছেলের নিবিড় অন্তরঙ্গ মুহূর্তে পায়েল মাঝে মাঝে বলে ওঠে, আবার গল্প?

রুখুসুখু দুটি শব্দ শুনলেই প্রদীপের বুকের ভেতর ফেনিয়ে ওঠে ক্রোধের সাগর। যদি সে ফিরতি প্রশ্ন করে, তাহলে কি তোমার রুটিন ফলো করবে? এমন হলে তো গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে। ছোট পরিবারের স্নিগ্ধ হাওয়া বিষময় হয়ে উঠবে।

সংসারের দেখাশোনা, বাবা-মায়ের সেবাযত্ন মন দিয়ে করেছে পায়েল; কিন্তু ছেলের ব্যাপারে কারো সঙ্গে সে আপস করতে রাজি নয়। ছেলে ওর একার – এমন করেই আগলে রাখে সে।

দীপমালা প্রায়ই বলতেন, নীলের যা করতে ভালো লাগে তাই করতে দাও না পায়েল।

– আপনার নাতি সবকিছুতেই না না বলে মা। লেখাপড়া ভালোভাবে না করলে ওর ভবিষ্যৎ কী হবে মা ভেবে দেখেছেন?

অতএব পড়া, পড়া এবং পড়া। সর্ববিদ্যায় বিশারদ হয়ে ওঠা, গলায় সুর নেই বলে গানের ক্লাস থেকে ছেলেটা রেহাই পেয়েছে নয়তো গানও শিখতে হতো ওকে। কপালে ফেটি বেঁধে ওকে রকস্টার হতে হতো।

করোনাকালের সময়টা ছিল ভারি অদ্ভুত। স্কুল নেই, টিচারদের বকুনি নেই, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা নেই – খুব খারাপ সময় কেটেছে।

– ও মা, কী করব আমি?

এ শুধু নীলের নয়, ঘরে ঘরে ছোট বাচ্চাদের মন খারাপ।

মনে মনে অনেক খুশি হয়েছিল নীল। ছুটির দিনে

আবৃত্তি-তবলা-কুইজের ক্লাস নেই। আনন্দমাখা গলায় বলেছিল, এবার শুধু গল্প শুনব। উফ্ কি থ্রিলিং!

– খুব মজা তাই না। রাগি রাগি স্বরে পায়েল বলে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে নীলকে ভর্তি করার সময় ঠান্ডা যুদ্ধ পরিবারে। কত কথাকাটাকাটি, যুক্তি দিয়ে বোঝানো। প্রলয়কান্তি তখন বেঁচে ছিলেন। তিনি বললেন, নিজের ভাষায় পড়াশোনা করুক দাদুভাই। নিধুবাবু কি এমনই এমনই বলেছেন –

নানান দেশের নানান ভাষা

বিনে স্বদেশী ভাষা মিটে কি আশা –

ভুরু কুঁচকে পায়েল বলেছে, কবিতাটি কতকাল আগের বলুন তো বাবা?

প্রদীপ বলেছে, কিছু কিছু কথা চিরকালীন সত্য। টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার – এসব শিখতে তো বাবা মানা করেনি।

প্রলয়কান্তির এক গোঁ, নাহ্ নিজের ভাষাতে পড়বে নাতি। মাতৃভাষাতে পড়াশোনা করলে আত্মার বিকাশ ঘটে। পরিচিতজনরা সাধ্যের বাইরে গিয়েও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। আত্মতৃপ্তিতে তাদের মন ভরে আছে।

মর্নিংওয়াক করতে গিয়ে দেখা হয় গুটিকয়েক কলিগের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, তুমি বরাবর বড় একগুঁয়ে প্রলয়। বড্ড অ্যাডামেন্ট তুমি। যুগ পাল্টেছে, এ-কথা মনে রাখতে হবে তো। আমাদের নাতি-নাতনিরাও ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে।

প্রলয়কান্তি জবাব দিয়েছেন, যুগ পাল্টে দিচ্ছ তোমরা। জানো অনেক দেশে, এই যেমন জার্মানরা, ইংরেজি জানে; কিন্তু সহজে বলে না, নিজেদের ভাষাতেই ওরা কথা বলে। আমরা বিদেশি ভাষার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছি – কেন বলো তো? ঈশ^রচন্দ্রের কথাই ধরো, তিনি উনিশ শতকের একজন শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন।

– বাব্বা, তুমি পারোও বটে, প্রলয়। উনিশ শতকের মানুষকে নিয়ে পড়ে আছ এখনো?

ঘরে এসে বউমা পায়েলের কাছে হার মেনে নিতেই হলো প্রলয়কান্তিকে। প্রদীপও চেয়েছিল তার সন্তান মাতৃভাষায় পড়ালেখা করে এগিয়ে যাবে, কিন্তু তা আর হলো না।

প্রদীপের মনের বিষাদ ভেঙে এগিয়ে এলেন ঈশ্বরচন্দ্র। তিনি যেন বলছেন – এ আমি কোথায় এলাম প্রদীপ? বর্ণ পরিচয় – প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ কাদের জন্য লিখলাম আমি?

প্রদীপ বলে, ছেলেবেলায় আমি বইয়ে কি পড়েছি জানো? সদা সত্য কথা বলিবে, মিথ্যা কথা কখনো বলিও না। মাতৃবৎ পরদারেষু – পরের স্ত্রীকে মায়ের মতো মনে করবে, পরের দ্রব্যকেও লোষ্ট্রবৎ মনে করবে।

– বাব্বা, যা কঠিন শব্দ বাবি। আঁতকে উঠেছে নীল।

– লোষ্ট্র, মানে কি বাবি?

– লোষ্ট্র মানে ইট, পাথর, ঢিল। পরের জিনিসকে মনে করবে ঢিলের মতো। গাঁয়ের বাড়িতে গিয়ে পুকুরে তুমি ঢিল ছুড়তে, মনে নেই?

– এবার বলো বাবি রাস্তার পাশে বসে গ্যাসপোস্টের আলোয় ঈশ্চরচন্দ্র পড়তেন, উনার কি কোনো পড়ার টেবিল ছিল না? তাঁর রিডিং রুম ছিল না? অচেনা এই মানুষটির জন্য কষ্ট হতে থাকে নীলের।

সেই মুহূর্তে হঠাৎ করে বাতি নিভে যায়।

এ সময় থরথর করে কেঁপে ওঠে জেনারেটর। আলোকমালা জ¦লে ওঠে তক্ষুনি। বিদ্যুৎ নেই, কিছু সময়ের জন্য হলেও পড়াশোনা বন্ধ – তা হওয়ার জো নেই এখন। ঘরে ঘরে আইপিএস, প্রতিটি বিল্ডিংয়ে জেনারেটর রয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টার জন্য আরাম-আয়েশ মজুত রেখেছে এই আধুনিক সময়।

কলিগদের কথার জবাবে প্রলয়কান্তি কণ্ঠস্বরে ঝাঁঝ মিশিয়ে বলেছিলেন, উনি না হয় পুরনো দিনের মানুষ, কিন্তু বাহান্নর ভাষা-আন্দোলন আর শহিদ মিনারের কথাও তো তোমরা ভুলে গেছ, এত বিস্মরণ কী করে হয় তোমাদের?

বাবা প্রলয়কান্তির কথাগুলো আজকাল কানে এসে

যখন-তখন ঝাপটা দেয়।

– বলো বাবি, তুমি থেমে গেলে কেন?

দাদুর কাছ থেকে গল্প শোনার অভ্যাস হয়েছে নীলের। শুনতে চায় ও মহামানবদের গল্প। দেয়ালে ঝুলে থাকা মানুষটির গল্প শুনতে বেশ লাগে তার।

মহামানবের গল্প। হ্যাঁ – শুনতে খুব পছন্দ করে নীল। কী করে ওঁরা বড় হলেন, কত কষ্ট সয়ে মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়ালেন, মানুষ কীভাবে জানল ওঁদের।

বীরভূম জেলার বীরসিংহ গাঁয়ে জন্ম তাঁর। পায়ে হেঁটে শহরে এসেছিলেন তিনি।

কিচেনের কাজ সেরে টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে মুছতে পায়েল ফিরে এলো।

– গল্প শোনা হলো তো? এবার আবৃত্তি প্র্যাকটিস করো।

পায়েল মনে করিয়ে দেয়, সময় খুব ইম্পর্ট্যান্ট এখন। একে অপচয় করা কোনোমতেই চলে না। এ-যুগে টাইমকে টেম বানাতে হয়। এ-যুগে সময়কে পোষ না মানালে কি চলে? এ-যুগে ডিসিপ্লিনের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়, নয়তো প্রতিযোগিতায় জেতা যাবে না। স্বপ্ন পূরণ তো হবেই না।

প্রলয়কান্তির যুগ, প্রদীপের যুগ চলে গেছে, এখন এসেছে নতুন যুগ। নতুন চিন্তাভাবনা, নতুন স্বপ্ন নিয়ে এসেছে অন্যরকম সময়। ভোরের জেগে ওঠা সূর্যের মতো তোমাকে পাংচুয়াল হতে হবে।

বাবা নেই, কিন্তু প্রলয়কান্তির কণ্ঠ শুনতে পায় প্রদীপ।

– বীরভূমের নদীটির নাম অজয়। তোমাকে গল্পটি বলিনি দীপ?

এটা ছিল ছেলের সঙ্গে বাবার বলা কথা। অনেক অনেক গল্পের সঙ্গে এ-গল্পটিও নীলকে শোনাতেন প্রলয়কান্তি। পছন্দের এই মহামানবের গল্প নিজের মনে নাড়াচাড়া করতে বেশ লাগে।

মায়ের অসুখ, মা দেখতে চেয়েছেন ঈশ্বরকে। যেতেই হবে মায়ের কাছে। মাতৃআজ্ঞা পালন করতেই হবে।

মনে মনে হেসে ওঠে প্রদীপ। এখন তো সে-যুগের মতো মা-বাবারা সন্তানের কাছে আইডল নন।

তবু অজয় নদী আর মানুষটির কথা ভোলা যায় না। প্রলয়কান্তি নানা গল্প বলে ছেলের অস্থিমজ্জায় মিশিয়ে দিয়েছেন নামগুলো। প্রদীপও চেয়েছিল ওর উত্তরসূরি প্রণীলের মাঝেও প্রবাহিত করে দিতে তার স্বপ্নকথা।

সে নিজেও গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছে। ছেলেবেলায় অজানা গল্প শোনার আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। বিশাল এই পৃথিবীতে কত গল্প যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, সব গল্প শোনা বা জানা তো সম্ভব নয়। কিছু কিছু শিক্ষণীয় অজানা কথা জানা দরকার ছোটদের। প্রদীপের এ-কথা কিছুতেই মানে না দোয়েল।

বারবার সে ছেলেকে বলে, এই যে নীল, লুক অ্যাট মি, তাকাও আমার দিকে। কাল তোমার ক্লাস টেস্ট, ভুলে গেছ?

খেতে বসে পায়েল প্রদীপকে বলে, কী অতো ভাবো শুনি? শোনো ভেবে ভেবে কিছু হয় না। এই যে ছুটির দিনে নীলকে আবৃত্তির ক্লাসে নিয়ে গেলাম, এ-কাজটি তুমিও করতে পারতে। পারতে না বলো?

চিকেনের ঝোলে রুটি ডুবিয়ে মা আর ছেলের দিকে তাকায় প্রদীপ। মনে মনে বলে, আমি তোমার এই জয়যাত্রায় শামিল হতে চাই না পায়েল। তুমি কি কখনো ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছ নীল কী চায়? কী করলে সে আনন্দে মেতে উঠবে?

গোপন নিশ্বাস ফেলে প্রদীপ। নীলের শৈশবটা একেবারেই অন্যরকম হয়ে গেল। নিজের ছেলেবেলার প্রতিটি দিন ছিল উৎসবের মতো। যন্ত্রের মতো চলা নীলের কাছে দিন-রাতের প্রতিটি মুহূর্ত রঙিন তো নয়ই, বরং ভীষণ ফিকে হয়ে আসে।

হ্যাঁ – জন্মদিন আজ প্রণীলের। তার স্কুলের বন্ধু কজন এসেছে। সারাঘর জুড়ে রং-বেরঙের বেলুন। চারপাশে নানা রঙের আলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

টেবিলের একপাশ উপচে পড়ছে রকমারি গিফটে। উড়োজাহাজের ডিজাইনে তৈরি কেক। চারপাশে কিশোর বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আছে। ঝকঝকে ছুরিতে লাল ফিতে বাঁধা। নীল কেকে ছুরি ছোঁয়াতেই সুরে-বেসুরে গান গায় ছোটরা – হ্যাপি বার্থডে টু ইয়ার প্রণীল।

প্রদীপ এক পিস কেক খাইয়ে দেয় নীলকে। বন্ধুরা ছোটাছুটি করছে, একে অন্যের মুখে ক্রিম মাখিয়ে দিচ্ছে। হুল্লোড় করছে। এই নির্মল খুশিতে অনেকদিন পর মন ভালো হয়ে যায় তার।

খুব ব্যস্ত পায়েল। গুটিকয়েক বন্ধু মায়ের হাত ধরে এসেছে, ওরা ডিনার সেরে তবে বাড়িতে ফিরবে।

ঘরে এসে দাঁড়ায় প্রদীপ। ছবির চৌকো জায়গাটিতে চোখ পড়ে তার। বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। ড্রয়ার খুলে ফিকে রঙের বিদ্যাসাগরের ছবিটি ফের টানিয়ে রাখে। এবার সম্পূর্ণ হলো ঘরের অবয়ব। ধবধবে ধুতি পরা ঈশ্বরচন্দ্র সামনে এসে দাঁড়ান। তিনি উচ্চারণ করেন, কোথায় এলাম আমি?

এবার হাসে প্রদীপ।

– কেন, জন্মদিনের উৎসবে। আজ তো আমার ছেলে প্রণীলের জন্মদিন। আপনি আশীর্বাদ করবেন না?

যেন বিষাদমাখা স্বর তার।

– চামচ দিয়ে মা একটুখানি পায়েস ঠোঁটে ছোঁয়াল না? শুধু কেক খেল সবাই মিলে? তা কেকও সুস্বাদু খাবার। কেকের ক্রিম মেখে আনন্দ করছে ছেলেমেয়েরা, তাও দেখলাম। কিন্তু নিজের ঐতিহ্যকে ভুলে যাওয়া তো ঠিক নয়।

কই, ঘরে তো কেউ নেই। এই সন্ধ্যারাতেই কি প্রদীপ ঘোরের মাঝে রয়েছে? রং ফিকে হয়েছে বলে ছবিটি ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিল, শুধু দেয়ালের একটি চৌকো জায়গা ফাঁকা হয়ে আছে বলে ফের টানিয়ে দিয়েছে প্রদীপ। ড্রয়িংরুমে ডাইনিংয়ে ছোটদের হইচই শোনা যাচ্ছে। বুক মন্থন করা নিশ্বাস ফেলে প্রদীপ। দীপমালা বেঁচে থাকতে প্রতিবছর নীলের জন্মদিনে চিনিগুঁড়া চালের পায়েস তৈরি করতেন।

– প্রথমে দু-এক চামচ পায়েস খাও, এরপর

কেক-চকলেট, চিকেন উইংস, বাটার নান খেও।

ছোটদের খাওয়া শেষ, এবার বড়দের পালা। আজ বেশ আনন্দ হলো। সবাইকে বিদায় দিচ্ছে নীল।

ব্যালকনি থেকে রাস্তা দেখা যাচ্ছে। রিকশা, অটো, ট্যাক্সি ছুটছে। গাড়িগুলো টেল লাইট জ্বালিয়ে ছুটছে দ্রুতলয়ে। শুধু ছোটা আর ছোটা। এ কেমন পৃথিবী, কারো দাঁড়ানোর এতটুকু সময় নেই। গাড়ি ছুটছে, মানুষ ছুটছে, রিকশা, বাস ছুটেই চলেছে। প্রদীপ ভাবে, এ যেন এক গোল্লাছুটের পৃথিবী। দুরন্ত সময়।

পায়েল বলে, বেশ কাটল আজকে – তাই না গো! নীলকে জিজ্ঞেস করে প্রদীপ, ঝুমঝুম, ভিভান, টিটো ওরা তোমার ক্লোজ ফ্রেন্ড – তাই না নীল।

– নো নো বাবি, নট অ্যাট অল। দে অল আর মাই চামস। দে আর বাডি।

ছেলের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকায় প্রদীপ হ্যাঁ – ওরা সবাই অন্তরঙ্গ বন্ধু তো। এতক্ষণ খেলতে খেলতে ওরা বলছিল – কী রে ইয়ার, এদিকে আয়।

হ্যাঁ – বেস্ট ফ্রেন্ড, ক্লোজ ফ্রেন্ড তারা বলেছেন, ওগুলো চেনা শব্দ। কিন্তু বাডি আর চামস শব্দগুলো এই প্রথম শুনল প্রদীপ।

গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড। আহা কী মোহিনী মায়ার জগৎ। এমন স্মার্ট কথার তরঙ্গে ভেসে গেছে বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ। নতুন প্রজন্মের নওল কিশোরদের ছুটন্ত মিছিল দেখে তিনিও বুঝি ভাবনায় পড়ে গেছেন। ছবিটি দেখে প্রদীপ। দেখে, তাঁর মলিন আর বিষণ্ন মুখ।

সত্যিই তো, মন খারাপ হবে না তাঁর? তিনি যে শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারকও। সমাজের জন্য তিনি ভাববেন না তবে কে ভাববে? রাতের বাতাসে ভেসে আসছে হটডগ আর পিৎজার ঘ্রাণ।

– দেয়ালটা ফাঁকা লাগছিল কেন বাবি? ওই তুমি তো দাদুর গডফাদার বিদ্যাসাগরের ছবিটা সরিয়ে দিয়েছিলে। সত্যি উনি খুব সাফার করেছেন বাবি। তাঁর স্টাডিরুম ছিল না। কর্নফ্লেক্স, হরলিকস খেতেন না। ওসব তো নাট্রিসিয়াস বাবি।

পায়েল এসে ঘরে ঢোকে। সব কাজ সারা হয়ে গেছে। শুধু বর্ণালি বেলুন উড়ছে, ঘরে সুগন্ধি ফুল থেকে মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। মন আজ ভীষণ ভালো ওর।

প্রদীপকে বলে, আজ তোমার গল্প শুনব। বলো এবার।

– তাই? বলো বাবি আজ আমরা দুজনেই গল্প শুনব – তাই না মম, হাসির আভা খেলে যায় প্রদীপের মুখে। আজ ভার্চুয়াসদের গল্প শোনাবে সে।

– তাহলে শোনো, ঈশ^রচন্দ্র শুধু যে লেখাপড়ার জন্য কাজ করেছেন, তা কিন্তু নয় পায়েল, মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখলে তার প্রাণ কেঁদে উঠত। এজন্য তিনি কম কষ্ট পাননি। চেনাজানা সবাই বলত, কেন তুমি ওসব করে বেড়াও? এ তো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো ব্যাপার।

কথাটি শুনে হেসে ওঠে নীল।

– সত্যিই তো, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায় কেউ? প্রদীপ বলতে থাকে, শম্ভুনাথ বাচস্পতি নামে একজন অতিবৃদ্ধ কুলীন ব্রাহ্মণ বিয়ে করেছিলেন কিশোরী এক মেয়েকে। ওদের বাড়িতে একদিন গিয়ে বুড়ো লোকটির পাশে কচি মেয়েকে দেখে ঈশ্বরচন্দ্রের প্রাণ কেঁদে ওঠে। অবোধ এক কিশোরী মেয়ে।

স্বামীর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে পায়েল। সেই সমাজের কথা কিছুই তো জানে না সে। নীলের মা জানে শুধু এ-যুগের কথা। গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের চাকচিক্যে পায়েল বিভোর।

প্রদীপ আপনমনে বলতে থাকে, বিদ্যাসাগর ছিলেন সদ্বিবেচনার মানুষ। তিনি উপলব্ধি করলেন, অল্পদিনের মাঝেই বয়োবৃদ্ধ মানুষটি মারা যাবে। অবোধ বালিকাটি বিধবা হবে। মেয়েটি যে বুঝতেই পারবে না দাম্পত্য সুখ আর আনন্দের কথা।

পায়েলের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বলে, কী দুর্ভাগিনী বলো তো মেয়েটি। হতবাক পায়েল বলে, সত্যিই কি তিনি মানুষের জন্য এত ভাবতেন?

ওর কথাগুলো হাহাকারের মতো শোনায়।

– তাই তো বলি পায়েল, তিনি মহামানব। বালিকার কচি-কোমল মুখের দিকে তাকিয়ে সেদিন মানুষটি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এ-ভিটেতে কখনোই আমি জল স্পর্শ করব না। এ আমার নীরব প্রতিবাদ।

ঘরে করুণ নীরবতা ঘনিয়ে আসে। পায়েলের কাজলমাখা দু-চোখ ছলছল করে। প্রদীপের আবেগমাখা কথা শুনে এ-যুগের মেয়ের মনে বেদনায় ভরে যায়। পায়েল বলে, তুমি এত চমৎকার করে গল্প বলতে পারো? স্ত্রীর মুখে প্রশংসা শুনে উৎসাহিত হয়ে ওঠে সে।

– এমন মানুষকে নিয়েও ব্যঙ্গ করে কত কী বলেছে লোকজন।

এক যে ছিল বিদ্যাসাগর বুদ্ধিশুদ্ধি কই –

শিখেই চলে লিখেই চলে শিশুপাঠ্য বই।

বিছানায় গুটিশুটি হয়ে মা-বাবার কথা শুনছে নীল, ওর চোখে আজ ঘুম নেই।

বেশ রাত হয়েছে। গল্পে ডুবে থাকা দুটি মানুষ খাবার কথা ভুলে গেছে।

খাবার টেবিলে ভাত-তরকারি সাজিয়ে মা ডাকে, – শিগগির এসো নীল, খেতে এসো।

প্রদীপ খেতে বসেছে। চামচ-প্লেটের মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছে। হ্যাঁ – এবার খেতে যাবে। তবে তার আগে স্টাডিরুমে যাবে ও। দেয়ালে সটান দাঁড়িয়ে থাকা ঈশ্বরচন্দ্রের ছবির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে সে। ‘ভালোবাসি ভালোবাসি তোমাকে।’ মনে মনে নীল উচ্চারণ করে, হ্যালো বিদ্যাসাগর, তুমি সবার কথা ভেবেছ। কত বই লিখেছ তুমি। আমি তোমার বই পড়িনি জানো? এবার থেকে পড়ব। তোমার কাছে প্রমিস করলাম, তোমার বই আমাকে পড়তেই হবে। তুমি একদম মন খারাপ করবে না।

ভেজা ভেজা গলায় নীল বলতে থাকে, তোমার কথা বলতে বলতে বাবির মুখ গ্লুমি হয়ে গেছে। মমের চোখ ছলছল করছে। ‘টিয়ারফুল আইজ’ মায়ের। আমারও যে ভীষণ কান্না পাচ্ছে তোমার জন্য। বিলিভ মি।

ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ফিকে ছবিটির দিকে তাকিয়ে নীলের অশ্রুবিন্দু ঝরতেই থাকে।

ঈদুল আজহার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ
ঈদুল আজহার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা

পবিত্র ঈদুল আজহার সম্ভাব্য তারিখ জানিয়েছে শারজাহ স্পেস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রনোমি হাব (এসএসএএইচ)। শারজাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত এ সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ঈদুল আজহা ২৭ মে অনুষ্ঠিত হতে পারে। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবে সম্ভাব্য এ তারিখ জানানো হয়েছে।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ মে জিলহজ মাসের প্রথম দিন হতে পারে। সেক্ষেত্রে আরাফার দিন তথা ৯ জিলহজ হবে ২৬ মে। কেন্দ্রটির হিসাব অনুযায়ী, ১৭ মে রাত ১২ টা ১৭ মিনিটে চাঁদের সংযোগ ঘটবে। ফলে এ দিন ১৪৪৭ হিজরির জিলকদ মাসের ২৯ তারিখ হবে। ওইদিন সূর্যাস্তের সময় চাঁদের বয়স হবে প্রায় ১৮ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট। এছাড়া সূর্যাস্তের পর প্রায় ৫৭ মিনিট দিগন্তের ওপরে দৃশ্যমান থাকবে। কেন্দ্রটির মতে, অনুকূল আবহাওয়ায় খালি চোখে চাঁদ দেখার জন্য এই সময়সীমা যথেষ্ট।

এসএসএএইচের পরিচালক প্রফেসর হামিদ এম. কে. আল নাঈমি জানান, কেন্দ্রটি তাদের এই বৈজ্ঞানিক তথ্য ইতোমধ্যেই আমিরাতের ফতোয়া কাউন্সিলের কাছে জমা দিয়েছে। চাঁদ দেখার প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য ও ইসলামী শরিয়ার সমন্বয়ে ধর্মীয় সিদ্ধান্ত নিতে এমনটি করা হয়েছে।

এসএসএএইচ জানিয়েছে, এই তথ্য কেবল বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। হিজরি মাসের শুরু এবং ধর্মীয় উৎসবের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার একমাত্র ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট সরকারি ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে।

সূত্র : গালফ নিউজ

এই ১০ পাপের শাস্তি দুনিয়াতে না পেয়ে কারও মৃত্যু হবে না

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ
এই ১০ পাপের শাস্তি দুনিয়াতে না পেয়ে কারও মৃত্যু হবে না

মানুষের জীবনে এমন কিছু পাপ ও অন্যায় রয়েছে, যেগুলোর শাস্তি কেবল পরকালের জন্য স্থগিত থাকে না; বরং দুনিয়াতেই তার প্রতিফলন দেখা যায়। কখনো তা আসে পারিবারিক অশান্তি হিসেবে, কখনো সামাজিক অপমান, আবার কখনো জীবনের বরকত ও শান্তি হারানোর মধ্য দিয়ে।

সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতায় দেখা যায়, প্রযুক্তির বিস্তার ও ভোগবাদী জীবনের চাপে অনেকেই অজান্তে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে এসব গুরুতর পাপে জড়িয়ে পড়ছেন। কিন্তু এর ভয়াবহতা অনুধাবন করতে না পারায় তারা দুনিয়াতেই নানা ধরনের সংকট, অস্থিরতা ও বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। এ বাস্তবতাকে সামনে এনে জনপ্রিয় ইসলামি স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ ইউটিউবে এক আলোচনায় কোরআন-হাদিসের আলোকে এমন ১০টি পাপের কথা তুলে ধরেছেন, যেগুলোর শাস্তি দুনিয়াতে ভোগ করানো ছাড়া আল্লাহ কাউকে মৃত্যু দেবেন না।

নিচে ফরিদপুর প্রতিদিনের পাঠকদের জন্য সেই ১০টি ভয়াবহ পাপ তুলে ধরা হলো—

১. মা-বাবার অবাধ্যতা

মা-বাবার সাথে বেয়াদবি, তাদের অশ্রদ্ধা করা বা তাদের অধিকার খর্ব করা এমন এক অপরাধ, যার শাস্তি আল্লাহ দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন। হাদিস অনুযায়ী, মা-বাবার নাফরমান সন্তানের প্রায়শ্চিত্ত দুনিয়াতে ভোগ করা ছাড়া মৃত্যু হয় না। এই পাপ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো মা-বাবার কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়া এবং তাদের সন্তুষ্ট করা।

২. জুলুম বা অবিচার

কারো ওপর গায়ের জোর খাটানো বা মাস্তানি করা এমন এক জঘন্য পাপ, যার শাস্তি আল্লাহ দুনিয়াতে নগদ দেন। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো জালেমই জুলুম করে পার পায়নি। এমনকি পশুপাখিও যদি একে অন্যের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার বিচার করবেন। মাজলুম ব্যক্তি যদি অন্য ধর্মেরও হয়, তবুও আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন এবং জালেমকে পাকড়াও করেন।

৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা

রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা একটি ভয়াবহ অপরাধ। অনেক সময় মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘কাগুজে বন্ধু’দের নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও নিজের আপন ফুফু, চাচা বা ভাই-বোনের খবর রাখে না। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, আল্লাহ তার সাথে নিজের সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

৪. কথায় কথায় মিথ্যা বলা

মিথ্যা সব পাপের মূল। যারা কথায় কথায় মিথ্যা বলে, তাদের ওপর আল্লাহর লানত বা অভিশাপ বর্ষিত হয়। মিথ্যাবাদীদের জীবনে আল্লাহ কখনোই বরকত দান করেন না এবং দুনিয়াতেই তাদের লাঞ্ছিত হতে হয়।

৫. আমানতের খেয়ানত

কারো গচ্ছিত সম্পদ নষ্ট করা, গোপন কথা ফাঁস করা কিংবা অন্যের লেখা চুরি করা (প্লেজিয়ারিজম) আমানতের খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত। যারা মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ করে, আল্লাহ তাদের দুনিয়াতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করেন।

৬. মানুষকে অপমান ও অপদস্ত করা

আজকাল বন্ধু-বান্ধব মিলে কাউকে নিয়ে ট্রল করা বা ‘রেগিং’ করাকে বিনোদনের অংশ মনে করা হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি অন্যকে অপমান করে, সে নিজেও কোনো না কোনো পরিস্থিতিতে মানুষের কাছে অপমানিত হবেই—এটি আল্লাহর নিয়ম।

৭. লোকদেখানো ইবাদত

মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য বা ফেসবুকে লাইক-কমেন্ট পাওয়ার আশায় কোনো ভালো কাজ করা লৌকিকতা। যারা মানুষকে দেখানোর জন্য দান-সদকা বা ইবাদত করে, তাদের আমলের কোনো সওয়াব তো থাকেই না, উল্টো দুনিয়াতে তাদের জন্য লাঞ্ছনা অপেক্ষা করে।

৮. নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা

আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ভোগ করে যদি কেউ তার শোকর আদায় না করে কিংবা যে মানুষটি তার উপকার করেছে তার প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়, তবে আল্লাহ সেই নেয়ামত ছিনিয়ে নেন। অকৃতজ্ঞ ব্যক্তির জীবনে অভাব-অনটন ও ভয় গ্রাস করে।

৯. ব্যবসায় প্রতারণা ও ওজনে কম দেওয়া

মাপে কম দেওয়া বা ভালো মালের নিচে পচা মাল লুকিয়ে রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে বড় অপরাধ। কোনো বিক্রেতা যদি কাস্টমারের সাথে প্রতারণা করে, তবে সে রাসুলের (সা.) উম্মত হিসেবে দাবি করার যোগ্যতা হারায়। এই ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীরা পার্থিব সম্পদে বরকত পায় না এবং অশান্তিতে ভোগে।

১০. আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস ও অবাধ্যতা

যেকোনো ধরনের পাপ বা আল্লাহর বিধানের অবাধ্যতার একটি বড় শাস্তি হলো মানসিক অশান্তি ও ডিপ্রেশন। দেখা যায়, সব ধরনের ভোগ-বিলাসের উপকরণ থাকা সত্ত্বেও পাপিষ্ঠ ব্যক্তির মনে শান্তি থাকে না, যা অনেক সময় তাদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।

এই ‘সিক্রেট’ অনুসরণে স্ত্রীর সঙ্গে কোনো ঝগড়া হবে না

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
এই ‘সিক্রেট’ অনুসরণে স্ত্রীর সঙ্গে কোনো ঝগড়া হবে না

দাম্পত্যজীবন মানেই কি কেবল ঠুনকো ঝগড়া আর মনোমালিন্য? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো শান্তির মন্ত্র? বর্তমান সময়ে পারিবারিক অশান্তি ও কলহ যখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন সুখী দাম্পত্যজীবনের একটি অভিনব ও কার্যকরী ‘সিক্রেট’ বা গোপন সূত্রের কথা আলোচনা করেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।

সম্প্রতি তার ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেলে আলোচনাটি প্রকাশ হয়েছে। ফরিদপুর প্রতিদিনের পাঠকদের জন্য নিচে তা তুলে ধরা হলো।

শান্তির মূল মন্ত্র স্ত্রীর অনুগত থাকা

শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, দাম্পত্য জীবনের সুখের একটি বড় গোপন রহস্য হলো, যে ঘরে স্বামী তার স্ত্রীর কথা মতো চলে, সেখানে সাধারণত অশান্তি হয় না। তিনি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, সব জায়গায় নিজের পাণ্ডিত্য বা যুক্তি প্রদর্শন চলে না। বাইরের জগতে আপনি যতই প্রভাবশালী বা বিজ্ঞ হোন না কেন, ঘরের ভেতর এসে কিছুটা ‘বোকা’ সাজাই হলো শান্তির মূল কৌশল। যদি কোনো স্বামী সব সময় নিজের জেদ বা যুক্তি দিয়ে স্ত্রীকে হারানো চেষ্টা করেন, তবে সেখানে অশান্তি অনিবার্য।

বিড়ালের মতো শান্ত স্বভাব

সংসার জীবনে শান্তি বজায় রাখতে হলে পুরুষদের ধৈর্য ধারণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, সারা জগত আপনি শাসন করলেও ঘরের ভেতর এসে যথাসম্ভব শান্ত ও নমনীয় থাকতে হবে, অনেকটা ‘বিড়ালের মতো মেও মেও’ করে চলার মতো। এমনকি নববিবাহিতদের প্রতি তার নসিহত হলো, স্ত্রীর কথা শোনার মানসিকতা তৈরি করা এবং অযথা তর্কে না জড়ানো। যদি স্ত্রী কোনো কারণে ঝাড়ি দেয় বা রাগ করে, তবে সেখানে পালটা যুক্তি না দেখিয়ে ধৈর্য ধরে থাকাটাই একজন আদর্শ পুরুষের গুণ।

মা ও স্ত্রীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা

একজন পুরুষকে একই সাথে মা এবং স্ত্রীর অধিকারের ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। অনেক সময় মাকে বোঝাতে গিয়ে স্ত্রীর কাছে ঝাড়ি খেতে হয়, আবার স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে মায়ের বকুনি শুনতে হয়। এই দুই পক্ষ থেকে আসা চাপ সামলে নেওয়াই একজন সফল পুরুষের পরিচয়। শায়খ বলেন, স্ত্রীর কাছে যেমন নমনীয় থাকতে হবে, মায়ের কাছে তার চেয়েও বেশি নমনীয় থাকা আবশ্যক।

কৌশলী শাসন ও যুদ্ধবিরতি

তার মানে এই নয় যে, স্ত্রী কোনো অন্যায় করলে তা মুখ বুজে সহ্য করতে হবে। তবে শাসন করার পদ্ধতি হতে হবে অত্যন্ত কৌশলী এবং গোপন। ঝগড়ার চরম মুহূর্তে তর্কে না জড়িয়ে যদি কেউ নিজেকে কিছুটা ‘বেকুব’ সাজিয়ে শান্ত রাখতে পারে, তবে দিনশেষে সেই জয়ী হয়। কারণ যুদ্ধ যখন থেমে যায় বা ‘যুদ্ধবিরতি’ চলে, তখন শান্তভাবে নিজের যুক্তিটি উপস্থাপন করলে তা স্ত্রীর কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়।

আদর্শ মা-বাবা হওয়ার গুরুত্ব শান্তিময় দাম্পত্য জীবনের পাশাপাশি আদর্শ সন্তান গড়ে তোলাও একটি সুখী পরিবারের অংশ। ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানের অধিকার শুরু হয় তার জন্মের আগে থেকেই। একজন দ্বীনদার জীবনসঙ্গিনী নির্বাচন করা সন্তানের প্রথম হক। এরপর অর্থবহ নাম রাখা, সুন্দর লালন-পালন এবং সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ বা সমতা বজায় রাখা মা-বাবার অন্যতম দায়িত্ব। সন্তানদের কেবল পোশাক বা খাবার দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের মধ্যে ঈমান ও নৈতিকতা গড়ে তোলাও জরুরি।

উপসংহার

দাম্পত্য জীবনে সুখী হওয়ার জন্য খুব বড় কোনো তাত্ত্বিক জ্ঞানের প্রয়োজন নেই; বরং প্রয়োজন কিছুটা সহনশীলতা এবং ছাড় দেওয়ার মানসিকতা। ঝগড়ার সময় একটু ধৈর্য ধরা এবং স্ত্রীর আবেগ ও কথাকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমেই ঘরে জান্নাতি শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।