খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

নব্য ফ্যাসিবাদের শঙ্কা মুক্তির পথ কী

মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ জুন, ২০২৫, ১২:০৭ অপরাহ্ণ
নব্য ফ্যাসিবাদের শঙ্কা মুক্তির পথ কী

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত সংবাদ হচ্ছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপ যা আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধের যে কোনোদিনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। কেঊ কেউ বলছে, দ্রুত সাধারণ নির্বাচন দিয়ে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, আবার কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এবং দেশি-বিদেশি কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মনে করছেন, গত ১৫ বছরের সব জঞ্জাল দূর করতে ‘রাষ্ট্র সংস্কার’-এ হাত দিক, তাতে যদি ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগে তাতেও সমস্যা নেই।

তারা মনে করেন, গত ১৫ বছরে আওয়ামী স্বৈরাচারী এবং ফ্যাসিবাদী সরকার দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেমন বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে নির্বাহী বিভাগ, ব্যাংকিং বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, বিজিবি এবং আনসারসহ দেশের যেসব প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করে সাধারণ জনগণের কাছে বিতর্কিত করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করাসহ যতক্ষণ না পর্যন্ত দেশে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদ্যমান থাকা প্রয়োজন। সেই দাবি পূরণ করতে বর্তমান সরকার বেশকিছু সংস্কার কমিটিও গঠন করেছে, ওইসব সংস্কার কমিটির রিপোর্টও ইতোমধ্যে সরকারের হাতে এসে পৌঁছেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো তারা সব সংস্কার রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে এবং সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কারের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নির্ধারণ করবে যা জাতির কাছে উপস্থাপন করা হবে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, ‘রাষ্ট্র-সংস্কার’ শব্দটি ক্ষুদ্র হলেও এর ব্যাপকতা অনেক বেশি।

তাই দেশের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, লেখক, গবেষক এবং সুশীল সমাজসহ সব পর্যায়ের জ্ঞানী ব্যক্তিদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের অনেক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আছে, আছে ’৭২-এর সংবিধান, অনেক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, এসবের সংস্কারের জন্য প্রয়োজন বুদ্ধিভিত্তিক ইনপুট এবং পর্যাপ্ত সময়। এমন এমন সব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার সংস্কার ৬ মাসে সম্ভব, কোনোটা ১ বছর, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ১ বছরের অধিক সময়ও লাগতে পারে। এসব বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে সর্বাগ্রে দরকার সংস্কারের গুরুত্ব অনুযায়ী একটি প্রায়োরিটি লিস্ট করা। অতঃপর সেই প্রায়োরিটি অনুসারে সংস্কার কার্যক্রমে মনোনিবেশ করা। তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, ফ্যাসিবাদের পতনের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এই কাজের জন্য যে যে সংস্কার প্রয়োজন তা দ্রুত শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করা। তারা মনে করেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া যা নির্বাচিত সরকার পরবর্তী সময়েও চলমান রাখতে পারবে। এ প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের উচিত একটা রোডম্যাপ প্রস্তুত করে তা জনগণের কাছে উন্মুক্ত করা।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বরাতে জানা যায়, সংস্কারসহ জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালে সংঘটিত নৃশংস ও বর্বরিত হত্যাকাণ্ডের ওপর একটি দলিল যাকে ‘জুলাই সনদ ২০২৪’ নামে প্রস্তুত করে তা সব রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরের জন্য উপস্থাপন করা হবে যা ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এসব করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর্যাপ্ত সময়ের প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেবল পুরনো পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে নির্বাচন করলেই কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে না। নির্বাচন ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। প্রস্তাব এসেছে, স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সরকার গঠনের একটি নতুন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কাঠামোর আওতায় গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত পরিষদ গঠন করা হবে, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনের জন্য একটি ভিন্নধর্মী ভোটিং কাঠামো প্রস্তাব করা যেতে পারে, যেখানে সাধারণ ভোটারের ভোটের ওজন হবে ৭৫% এবং স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের ভোটের ওজন থাকবে ২৫%। এতে জনগণের চাওয়ার প্রতিফলন যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি স্থানীয় নেতৃত্বের অংশগ্রহণও সুনিশ্চিত হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ, নির্বাচনকালীন রোডম্যাপ ও কাঠামো নিয়ে চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে রাষ্ট্র সংস্কার, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই হতে পারে কার্যকর সমাধান। এর জন্য দরকার সময়সীমা নির্ধারণ, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং আন্তরিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সে পথে হাঁটতে দেখছি না। দেখছি না সেই বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা সংগ্রামী ছাত্রদের, যাদের প্রতিবাদী কণ্ঠে মানুষ দেখেছিল নতুন এক ভোরের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে ছিল মুক্তি, ছিল স্বাধীনতা, ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ছিল একটি ন্যায়ের সমাজ গঠনের প্রত্যাশা।

জাতীয় নির্বাচন, যা হওয়া উচিত ছিল জনগণের মতপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম, যার জন্য গত ১৫ বছর মানুষ সংগ্রাম করেছে, আজ তার দিন-তারিখ ঠিক করতেই অতিবাহিত হয়েছে ১০ মাস। কবে সেই কাক্সিক্ষত নির্বাচন? আদৌ হবে কী? এরই মধ্যে বিরোধী মতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, প্রশাসনিক পক্ষপাতÑ সব মিলিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া, অন্যদিকে সম্ভাব্য ক্ষমতাগ্রহী রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার স্বাদ পেতে সব আদর্শ বিসর্জন দিয়ে কেবল নির্বাচনের তাড়াহুড়া, পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের সাম্রাজ্যের দখল নেওয়ায় ব্যস্ত থাকা ইত্যাদি সব মিলিয়ে বর্তমান তরুণদের অনেকেই এখন রাজনীতিকে দেখছে আজ ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার এক বিশাল ক্ষেত্র হিসেবে। এতে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্রমেই কলুষিত হয়ে পড়ছে। দেশ একটি কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়Ñ এটি একটি নৈতিক সংকট, একটি চেতনার সংকট। সেজন্য প্রয়োজন আদর্শনিষ্ঠ এবং মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতি, যা হতে পারে ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। ইতিহাস বলে, যে জাতি অধিকার আদায়ে রক্ত দিতে জানে, তারা কখনও চিরকাল নিপীড়িত থাকে না। তাই আমাদের সামনে এখনও পথ আছে। সেই পথ সংগ্রামের, প্রশ্নের, আত্মজিজ্ঞাসার। স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে, তবে তাকে বাস্তব করতে হলে দরকার একটানা চেষ্টা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং সত্যিকারের সাহস। যদি আমরা সেই পথে হাঁটতে পারি, তবে নিশ্চিতভাবেই একদিন মুক্তি আসবে, গণতন্ত্র ফিরে আসবে এবং মানুষ আবার বিশ্বাস করতে পারবেÑ এই দেশটি সত্যিই আমার এবং আমাদের।

কর্নেল মো. ইলিয়াস হোসেন : প্রকৌশলী ও গবেষক

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা