খুঁজুন
শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ২৬ বৈশাখ, ১৪৩৩

স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা কেন সমাজের জন্য সত্যিকারের মঙ্গল?

মোহাম্মদ আনোয়ার
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা কেন সমাজের জন্য সত্যিকারের মঙ্গল?

জাতীয় বিনির্মাণের নামে যদি শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান দেখানো হয়; অথচ ক্ষমতার ভুল, অপচয় ও ব্যর্থতাকে প্রশ্ন করা বন্ধ থাকে, তাহলে তা প্রকৃত উন্নয়ন নয়, একটি সাজানো ভাস্কর্য মাত্র। এই বাস্তবতায় স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো বিলাসী আদর্শ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

যখন রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের সম্পর্ক ধীরে ধীরে শাসক অধীনতার নিঃশব্দ বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে, তখন সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা আর শুধু খবর পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এ সময়েই সাংবাদিকতাকে ক্ষমতার দরবারে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলতে হয়, তাকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হয়। আজ সেই দায়িত্ব সততা ও সাহসের সঙ্গে বহন করাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের সংবাদ পরিবেশ ছিল গভীর সংকটে। ভয়, স্বার্থ বা অনিচ্ছার কারণে বহু সংবাদমাধ্যম ক্ষমতার সঙ্গে সমন্বয় করে চলেছে। এর ফল ছিল একপাক্ষিক সংবাদচর্চা, যা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে নিজ বাসভবন থেকে উচ্ছেদ, কারাবাস, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না দেওয়া, কিংবা তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার না করার মতো মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট গুরুতর বিষয়গুলো জাতীয় গণমাধ্যমে তখন নিরপেক্ষ ও বিচারসাপেক্ষ আলোচনার সুযোগ পায়নি। বাস্তবতা হলো, অনেক সংবাদকক্ষ সত্য অনুসন্ধানের বদলে নিরাপদ নীরবতাকেই বেছে নিয়েছিল। অথচ স্বাধীন সাংবাদিকতার ভিত্তি হলো সত্য বলা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশ। এ দায় এড়ালে সাংবাদিকতা তার নৈতিক বৈধতা হারায়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে কিছুটা মতপ্রকাশের সুযোগ তৈরি হলেও আরেকটি সমস্যার উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ এখন পছন্দের রাজনৈতিক দলের নিয়মিত প্রশংসামূলক লেখা প্রকাশ করছে। এটি ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হতে পারে, কিন্তু একে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বলা যায় না। নিরপেক্ষতার অর্থ কোনো পক্ষের প্রশংসা বা বিরোধিতা নয়; বরং তথ্য যাচাই, প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ এবং যে কোনো ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন রাখা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা সবসময়ই ক্ষমতার মুখোমুখি প্রশ্ন তোলে, সে ক্ষমতা রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকুক, বিরোধী রাজনীতিতে থাকুক কিংবা কোনো দল, সংগঠন বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হোক। ক্ষমতার উৎস যেখানেই হোক, তাকে যাচাই ও জবাবদিহির আওতায় আনাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। শক্তিশালী ও কার্যকর গণতন্ত্র গড়ে তুলতে এ দৃষ্টিভঙ্গির কোনো বিকল্প নেই।

অনেকেই মনে করেন, সরকারের সমালোচনা করলেই সাংবাদিকতা স্বাধীন হয়। এটি ভুল ধারণা। স্বাধীন সাংবাদিকতা মানে হলো যে কোনো ক্ষমতার মুখোমুখি সত্য বলার সাহস। সরকার বা বিরোধী দল যখন বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত দাবি জনগণের সামনে তোলে, তখন সাংবাদিকতার দায়িত্ব সেটিকে যাচাই ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভেঙে দেওয়া। কারণ, জাতীয় বিনির্মাণের ভিত্তি হলো তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, ন্যায্যতা ও জবাবদিহি। এ ভিত্তি দুর্বল হলে গণমাধ্যমই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি।

বর্তমান সংবাদপরিবেশ একটি স্পষ্ট চাপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, মব জাস্টিস, নির্বাচনকেন্দ্রিক মেরূকরণ সংবাদপ্রবাহকে ক্রমশ সংকুচিত করে তুলছে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা, সাংবাদিক গ্রেপ্তার, সংবাদ প্রত্যাহার কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখে নীতিমালার পরিবর্তন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না; এগুলো একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। এ পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে সংবাদকক্ষে সতর্কতা ও আত্মসংযম বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশের সক্ষমতাকে সীমিত করে দেয়।

এর ক্ষতি শুধু গণমাধ্যমের নয়, পুরো সমাজের। তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকলে দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবিক অবহেলা আড়ালেই থেকে যায়। তখন উন্নয়ন হয় কাগজে, বাস্তবে নয়। আর জাতির আস্থার ভিত্তি ভেঙে পড়ে। এখানেই স্বাধীন সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দায়বদ্ধতা ছাড়া স্বাধীনতা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত হলো তথ্য যাচাই। গুজব ও অপপ্রচারের এ সময়ে যাচাইহীন সংবাদ শুধু বিভ্রান্তি বাড়ায় এবং সামাজিক বিভাজনকে তীব্র করে।

এ প্রেক্ষাপটে হলুদ সাংবাদিকতার ঝুঁকি আরও প্রকট। ক্লিক ও দর্শক বাড়ানোর প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অতিরঞ্জনের প্রবণতা অনেক সংবাদমাধ্যমকে নাটকীয় শিরোনাম ও অর্ধসত্যে ঠেলে দিচ্ছে। এটি শুধু পেশাগত অবক্ষয় নয়; এটি একটি সামাজিক বিপর্যয়। কারণ হলুদ সাংবাদিকতা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার শক্তিকে দুর্বল করে এবং সমাজে ভয়, ঘৃণা ও বিভাজন ছড়ায়।

তবে এ সংকটের দায় এককভাবে সাংবাদিকদের ওপর চাপানো যায় না। মালিকানার রাজনৈতিক সংযোগ, আর্থিক চাপ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা একটি কাঠামোগত সমস্যা তৈরি করেছে। চাকরি হারানো বা মামলার ভয়ে অনেকেই সত্য বলার ঝুঁকি নিতে পারেন না। ফলে সংবাদকক্ষগুলো সত্যের বদলে সুবিধাজনক ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়।

জাতীয় বিনির্মাণের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এমন সমাজ গড়া, যেখানে সত্যের মূল্য আছে। যেখানে ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন তোলা যায়, ভুল হলে সংশোধন সম্ভব এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ গুরুত্ব পায়। এ দায়িত্ববোধ ছাড়া উন্নয়ন শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা কখনোই শুধু বিরোধীপক্ষের হাতিয়ার নয়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছিল। ব্রিটেনে বিবিসি সরকার ও বিরোধী উভয়ের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, এটাই তার নিরপেক্ষতার প্রমাণ। এসব উদাহরণ দেখায়, স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনোপক্ষের শত্রু নয়; এটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলিত করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সরকার ও বিরোধী উভয়ের জন্যই কল্যাণকর। কারণ, সত্য কোনো পক্ষের সম্পত্তি নয়। সত্যই গণতন্ত্রের আসল শক্তি। সত্য, নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতা—এ তিনের সমন্বয়েই স্বাধীন সাংবাদিকতা জাতীয় বিনির্মাণের দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে। এ ভিত্তি না থাকলে রাষ্ট্র শুধু শাসনের কাঠামো হয়ে ওঠে, গণতন্ত্র নয়।

লেখক: দুবাই প্রতিনিধি, কালবেলা

 

ত্বকের জেল্লা বাড়তে যা খাবেন?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ
ত্বকের জেল্লা বাড়তে যা খাবেন?

ত্বকের জেল্লা ফিরিয়ে দেবে পানীয়! শুনে অবাক হওয়ার কথাই। ত্বক ভালো রাখতে, রোদ থেকে বাঁচাতে এত দিন সানস্ক্রিনের সুরক্ষাবর্মের কথা শুনেছেন, ত্বকের উজ্জ্বলতা ফেরাতে রকমারি রূপটানও রয়েছে।

কিন্তু তাই বলে পানীয় বদলে দেবে ত্বক! এমনটা কিন্তু হতেই পারে। তবে এজন্য তিতকুটে, স্বাদহীন কোনো পানীয় নয়, চুমুক দিতে হবে ঠান্ডা সুস্বাদু সবুজ পানীয়ে।

যার এক চুমুকে শরীর ও মন জুড়িয়ে যাবে। বাড়তি পাওনা ত্বকের সৌন্দর্য। তা হলে বরং খোলসা করা যাক। ত্বক ও চুলের সৌন্দর্য কিন্তু শুধু বাইরের রূপটানে ফেরে না।

এজন্য পেটও ভালো থাকা দরকার। হজমে সমস্যা, লিভারের গোলযোগ হলে তার প্রভাব পড়ে চোখেমুখে। কয়েক দিন পেট পরিষ্কার না হলে মুখে ব্রণ বের হয় অনেকেরই। লিভার ঠিক ভাবে কাজ না করলে মুখে ফুটে ওঠে কালচে ভাব। তার ওপর শরীরে পানির অভাব দেখা দিলে ত্বক রুক্ষ হয়ে যায়।

সেই সবুজ পানীয়ে এমন কী আছে?

শরীর আর্দ্র রাখতে ও সুস্থ রাখতে লেবু ও পুদিনা দিয়ে বানিয়ে ফেলুন শরবত। সবুজ রঙের এই শরবত নিয়মিত পান করলে রুক্ষ ত্বকেও আসবে প্রাণ।

কেন?

পুদিনার হরেক গুণ। হজমে সহায়ক। এর মধ্যে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা শরীর ঠান্ডা করে। প্রদাহজনিত কষ্ট কমায়। এতে আছে স্যালিসিলিক অ্যাসিড। ব্রণ বা পেট ভালো না থাকার জন্য কালচে ছোপ, পুদিনা নিয়মিত খেলে অনেক সমস্যারই সমাধান হতে পারে। পুদিনা দিয়ে গরমের দিনে মুখের মাস্কও তৈরি করা যায়।

লেবুর গুণও কম নয়। এতে থাকে ভিটামিন সি। রোগ প্রতিরোধে যা বিশেষ সহায়ক। এতে থাকে অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট। যা ত্বক ভালো রাখতে সাহায্য করে।

মধুও ব্যবহার করা হয় এই পানীয়। এতেও আছে অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট। যা ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে জরুরি। মধু ছাড়াও আরও যে সব উপাদান এতে ব্যবহার হয়, তার সব ক’টিই শরীরের জন্য উপকারী।

যেভাবে বানাবেন সবুজ পানীয়?

পুদিনা পাতা, লেবুর রস, বিট লবণ, মধু ও মৌরি বেল্ডার মেশিনে দিয়ে ব্লেন্ড করে নিন। কাচের গ্লাসে ঢেলে মিশিয়ে দিন কয়েক টুকরো বরফ। এখানেই শেষ নয়, পাতলা করে কাটা শসার টুকরো ও তুলসীর বীজ দিয়ে দিন। সবুজ এই পানীয় নিয়মিত পান করলে শরীর ভালো থাকবে। হজমশক্তি বাড়বে। বদল আসবে ত্বকেও। রুক্ষ, জেল্লাহীন ত্বক হয়ে উঠবে সজীব।

আবারও ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে শাকিরা

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ
আবারও ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে শাকিরা

দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে আবারও ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরছেন ল্যাটিন পপ সম্রাজ্ঞী শাকিরা। আসন্ন ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’-এর টিজার প্রকাশ করে বিশ্বজুড়ে ভক্তদের চমকে দিয়েছেন শাকিরা। শাকিরার এবারের গানে তার সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন নাইজেরিয়ান মিউজিক সেনসেশন বার্না বয়।

সম্প্রতি ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে ধারণ করা একটি টিজার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন শাকিরা। ভিডিওতে দেখা যায়, এবারের বিশ্বকাপের আয়োজক তিন দেশ মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার জাতীয় পতাকার রঙে সেজেছেন একদল নৃত্যশিল্পী।

তবে ভক্তদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে ২০০৬, ২০১০ এবং ২০১৪ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বলগুলোর উপস্থিতি, যা মূলত এই তিন আসরে শাকিরার কালজয়ী গানগুলোর স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এবারের ‘দাই দাই’ ট্র্যাকে ল্যাটিন পপের সঙ্গে আফ্রো-বিটের এক অনন্য ফিউশন দেখা যাবে বলে জানা গেছে।

শাকিরার জাদুকরী কণ্ঠ আর হিপস ডোন্ট লাইয়ের সেই চিরচেনা ছন্দ এবার বার্না বয়ের সুরের সঙ্গে মিশে নতুন এক উন্মাদনা তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী ১৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পাবে পূর্ণাঙ্গ এই থিম সং। এর পর থেকেই ফুটবল উন্মাদনা নতুন মাত্রা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে শাকিরা এক অবিচ্ছেদ্য নাম। ২০০৬ সালে জার্মানিতে ‘হিপস ডোন্ট লাই’, ২০১০-এ দক্ষিণ আফ্রিকায় কালজয়ী ‘ওয়াকা ওয়াকা’ এবং ২০১৪ সালে ব্রাজিলে ‘লা লা লা’ গেয়ে পুরো বিশ্বকে বুদ করে রেখেছিলেন তিনি। মাঝখানে বিরতি দিয়ে আবারও তার ফেরা ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা যোগ করেছে।

আগামী ১১ জুন থেকে উত্তর আমেরিকায় শুরু হতে যাচ্ছে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ, যা চলবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। ৪৮টি দলের এই লড়াকু আসরের আগে শাকিরার এ গানটিকেই ধরা হচ্ছে বিশ্বকাপের মূল কাউন্টডাউন।

ভাইরালে আক্রান্ত লোভী সমাজ, প্রতিরোধের উপায় কী?

ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশিত: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ
ভাইরালে আক্রান্ত লোভী সমাজ, প্রতিরোধের উপায় কী?

উগ্র শাসক আর অপশক্তির উত্থানে বিশ্বজুড়ে দিন দিন গণমাধ্যমের ঝুঁকি বাড়ছে। যুদ্ধবাজ নেতা, সুযোগসন্ধানী বণিক শ্রেণি ও অপরাধ সংগঠনের হোতাদের নিষ্ঠুর টার্গেট হচ্ছেন সংবাদকর্মীরা। প্যাশন থেকে যুক্ত হওয়া অনিশ্চিত এ পেশায় টিকে থাকা সবসময়ই চ্যালেঞ্জের।

তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতিতে মাধ্যমটি সহজলভ্য হওয়ায় দিন দিন আরও কঠিনের মুখোমুখি হচ্ছে মূলধারার গণমাধ্যম। একসময় দেশের জনপ্রিয় কয়েকটি গণমাধ্যম সভ্য দেশের অনুকরণে বাংলাদেশে ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বা ‘নাগরিক সাংবাদিকতা’ আমদানি করে। সেই উৎসাহ আর সহজলভ্য তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারে এখন ঘরে ঘরে সাংবাদিক আর হাতে হাতে গণমাধ্যম ঘুরছে।

এদের দৌরাত্ম্যে সাংবাদিককে ‘সাংঘাতিক’ আর গণমাধ্যমকে ‘ঘনমাধ্যম’ বলে ভয় পাচ্ছে ভুক্তভোগীরা। রাজনীতি, রাজনীতিবিদ ও দেশ-জনতার সংকট নিয়ে মনগড়া গল্প ফেঁদে সাংবাদিকতার নামে ডলারে অখাদ্য বিক্রি করছে।

‘অমুককে বোনের স্বীকৃতি দিলেন তমুক’, ‘মানবতার ফেরিওয়ালার একি হাল’, ‘প্রয়াত মন্ত্রীর গোপন প্রেমিকার সন্ধান’ ‘তার সঙ্গে চিপা গলিতে হাঁটলেন তিনি’—এরকম হাজারো বেখবর ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সাংবাদিকতার নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জনপ্রিয় ফেসবুককে ‘চটি বই’ বানিয়ে ফেলছে ভিউ শিকারিরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অসামাজিক করে তোলায় ভদ্রলোকদের বিব্রত হতে হচ্ছে। ইচ্ছা না থাকলেও সাধারণ মানুষ দেখতে বাধ্য হচ্ছে লগ্নি করা রিলস। নিজ নিজ ইউটিউব চ্যানেল বা ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রতিনিয়ত বিতর্কিত আইটেম তুলছে অতর্কিত ডলার আসার লোভে। অধুনা ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ নামের এ লোকগুলো বেশিরভাগই অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, বেপরোয়া ও আনস্মার্ট। ভুল বানান, অশুদ্ধ উচ্চারণ, আপত্তিকর ছবিতে সয়লাব তাদের পরিবেশনা।

ডলারের লোভে স্বামী-স্ত্রী-সন্তান নিয়েও অনেকে নেমেছ এ প্ল্যাটফর্মে। কুকুর-বেড়ালের প্রতি মায়া দেখানো থেকে পিতা-মাতার বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতার নাটকও করে তারা। এমনকি বৃদ্ধা শাশুড়ির একাশিতম জন্মদিন উদযাপনের নামে একসিরা রোগী শ্বশুরকে নিয়ে ‘কাটা লাগা’ গানের সঙ্গে উদ্দাম নৃত্য করে কনটেন্ট ক্রিয়েটর পুত্রবধূ।

এসব নিয়ন্ত্রণের কথা বললে তারা মূলধারার গণমাধ্যমের ভুল ধরে। সরকারের তোষামোদ, রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি ও মালিকদের স্বার্থসিদ্ধির অভিযোগে জাতীয় গণমাধ্যমগুলোও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথম শ্রেণির টিভি টকশোতে জ্ঞানগর্ভ, মার্জিত আলোচনায় ভিউ হচ্ছে না। ঘাড়ের রগ ফুলিয়ে অসংযত ভাষায় কিলিয়ে দিতে পারলে শো ভাইরাল হয়। তাতে ডলার আসে। কাজেই ঘোমটার আড়ালে ক্ষ্যামটা নাচে নাম লেখাচ্ছে প্রায় সবাই। জনরুচি তৈরির ঝুঁকি না নিয়ে গণস্রোতে গা ভাসাচ্ছে।

ভাইরাস থেকে ভাইরাল শব্দটি এসেছে। উইকিপিডিয়া বলছে, ভাইরাল (Viral) বলতে সাধারণত এমন সংক্রমণ বা তথ্যকে বোঝায়, যা খুব দ্রুত এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তি বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এটি কোনো ভাইরাসজনিত রোগ

(যেমন—ফ্লু, কভিড-১৯) বা ইন্টারনেটে জনপ্রিয় হওয়া কোনো কনটেন্ট (ভিডিও, পোস্ট) হতে পারে। ভাইরাল রোগ সাধারণত হাঁচি-কাশি, সরাসরি স্পর্শ, বা দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ভিডিও, ছবি বা পোস্ট যখন অল্প সময়ে প্রচুর মানুষ শেয়ার করে এবং মুহূর্তের মধ্যে তা হাজারো-লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তাকে ভাইরাল বলা হয়।

ভাইরাল রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়মিত সাবানপানি দিয়ে হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখা, অসুস্থ ব্যক্তি থেকে দূরত্ব বজায় রাখা ও জনাকীর্ণ স্থানে মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভাইরাল রোগের ঠিক উল্টো হচ্ছে ভাইরাল ভোগ। রোগে যা বর্জনীয়, ভোগে তাই অর্জনীয়।

সম্প্রতি এক কর্মশালায় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ‘আজকের তরুণ প্রজন্ম; এমনকি যারা ইউনিফর্ম পরে, তারাও তাদের শিক্ষক কিংবা মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের অশালীন মন্তব্য করতে দ্বিধা করে না।’ সেইসঙ্গে শিক্ষার্থীরা ভাইরাল হতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। সত্য প্রকাশের বদলে একটি চক্র সোশ্যাল মিডিয়াকে তাদের চাঁদাবাজি, মানুষের চরিত্রহনন, মিথ্যাচার, হিংস্রতা প্রচারের বড় কেন্দ্রে পরিণত করছে।

মিথ্যা ও ভিত্তিহীন গুজব ছড়িয়ে কেউ কেউ রাষ্ট্র ও সরকারকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। অনেকটাই যেন প্যারালাল সরকার হয়ে উঠছে এরা! যখন যাকে খুশি অপরাধী বানিয়ে দিচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণের আগেই তাদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য করা হচ্ছে। বিচারকও ‘ভিউ ব্যবসায়ীদের’ কুৎসিত নোংরা আক্রমণের ভয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিতে হিমশিম খাচ্ছেন। সরকারের ভালো কাজও ট্রল করা হচ্ছে।

এই গুজব ভাইরাল বাহিনী যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে! আরও ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, মানুষ বুঝে না বুঝে ভুয়া ফটোকার্ডসহ নানা রকম গুজব শেয়ার করে দিচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই ভাইরাল বাহিনীর রাজনীতি ও বাণিজ্যে সহযোগিতা করছে। ‘শেষে মজা আছে’, ‘চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না’, ‘জীবনে এমন দৃশ্য দেখিনি’—এ রকম চটকদার ও ইঙ্গিতপূর্ণ ক্যাপশন দিয়ে মানুষকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করছে।

বাংলাদেশে এটা এখন নিয়ন্ত্রণহীন মহামারির আকার ধারণ করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য সন্ত্রাস প্রতিরোধ করতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্বব্যাপী এ অপতথ্য বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া কাজকর্মের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। ইউটিউব দাবি করে, তাদের সাইটে কোনো আপত্তিকর কনটেন্ট তারা থাকতে দেয় না।

কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় ফেসবুক বা ইউটিউবের এ নজরদারি অনেক কম। এ রকম হাজারো কনটেন্ট আছে, যেগুলো হিংসাত্মক, ভুয়া। তবু ফেসবুক বা ইউটিউব সেগুলো বন্ধ করেনি। কোম্পানিগুলোকে বিচারের আওতায় আনার জন্য অনেক দেশ এখন আইন করেছে। সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকার নিয়ম ভঙ্গকারী সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের জরিমানা থেকে শুরু করে তাদের সেবা পুরোপুরি বন্ধ বা ব্লক করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে।

জার্মানিতে ২০১৮ সালের শুরু থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপারে এক নতুন আইন কার্যকর হয়। যেসব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ২০ লাখের বেশি ব্যবহারকারী আছে, তারা সবাই এ আইনের আওতায় পড়বে। কোনো কনটেন্ট সম্পর্কে অভিযোগ আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা তদন্ত ও পর্যালোচনা করতে হবে। আইনবিরোধী কোনো কনটেন্ট শেয়ার করলে ৫০ লাখ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। আর ওই কোম্পানিকে জরিমানা করা যাবে ৫ কোটি ইউরো পর্যন্ত।

এ আইনের ফলে সেখানে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ও উসকানিমূলক পোস্ট উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সোশ্যাল মিডিয়ায় আপত্তিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বিবেচনা করছে। বিশেষ করে জঙ্গিবাদে উৎসাহ জোগায় এমন ভিডিও দিলেই ব্যবস্থা। ইউরোপীয় ইউনিয়নে জেনারেল ডাটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (জিডিপিআর) নামে এক নতুন আইন ২০১৮ সালেই কার্যকর হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় এক কঠোর আইন চালু করা হয়েছে। যাতে সহিংস ও জঘন্য কোনো কিছু অনলাইনে শেয়ার করা না যায়। এ আইন লঙ্ঘন করলে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ এনে জেল-জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। জরিমানার অঙ্কটি বেশ বড়। অর্থাৎ, ওই কোম্পানির গ্লোবাল টার্নওভারের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে।

রাশিয়ায় ২০১৫ সালের ডাটা আইন অনুযায়ী, সব সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকেই রুশ নাগরিকদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য রাশিয়াতেই কোনো সার্ভারে সংরক্ষণ করতে হয়। টুইটার, গুগল বা হোয়াটসঅ্যাপ চীনে নিষিদ্ধ। তবে সেখানে একই ধরনের কিছু চীনা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আছে। যেমন—ওয়াইবো, বাইডু, উইচ্যাট। চীনে কিছু ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক আছে। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ সেগুলোর ব্যবহারও সীমিত করে দিতে সক্ষম হয়েছে।

তবে, বাংলাদেশের অনেক আইনপ্রণেতা, বুদ্ধিজীবী, সৃষ্টিশীল ব্যক্তি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও ভাইরাল বাণিজ্যে জড়িত। এমনকি, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার সময়ও কেউ কেউ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে লাইভে ছিলেন। নিজেদের পোস্টে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে নিজস্ব বৈষয়িক এবং পারিবারিক বিষয় তুলে দেন।

তাদের অনুসারীরা হাজার হাজার শেয়ার দিয়ে লাখ লাখ সম্মতি উৎপাদন করে। হুজুগে জাতি তা দেখে আনন্দে কাঁদে, ক্ষোভে হিংসা ছড়ায় এবং তর্কে মেতে ওঠে। দিন শেষে অ্যাকাউন্টওয়ালা ডলার গোনে। ভুয়া স্ট্যাটাস, ফটোকার্ড দেখে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। রাজনীতিতে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

ভাইরাল প্রবণতা দিন দিন অবক্ষয়ের নতুন অস্ত্র হিসেবে সমাজে আঘাত হানছে। অধিক রিচ অর্জনে কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না তারা। সর্বজন শ্রদ্ধেয় মৃত ব্যক্তিও রেহাই পাচ্ছে না নাদান ভিউ শিকারির হাত থেকে। ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত বিষয়কেও বিতর্কিত করছে ভিউ লোভে। অসংখ্য স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী ও বিশ্লেষক দেশপ্রেমিক মুখোশের আড়ালে মেরে কেটে খাচ্ছে। নিজেদের রক্ষায় এ ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে দায়িত্বশীলদের। কেননা, দায়িত্বে থাকার সময় এবং ছাড়ার পরও ভাইরাল আইটেম তারা।

লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি