খুঁজুন
, ,

তিতুমীর: স্বাধীনতার সংগ্রামে এক অনন্য অধ্যায়

মোহাম্মদ হাসান শরীফ
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
তিতুমীর: স্বাধীনতার সংগ্রামে এক অনন্য অধ্যায়

তিতুমীর নামেই তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত। তার পুরো নাম মীর নিসার আলী। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে প্রথম প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ১৮২৭ সালে শুরু হয়ে ১৮৩১ সালে শেষ হয় এ আন্দোলন। সময়ের হিসাবে খুব একটা বড় নয়। কিন্তু এ আন্দোলন যে প্রভাব রেখে গেছে, তা এখনো অনুভূত হয়। তিতুমীরের আন্দোলন এবং কাছাকাছি সময়ে গড়ে ওঠা ফরায়েজি আন্দোলন মিলে যে গণজাগরণের সৃষ্টি করেছিল, তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

তিনি ১৭৮২ সালে চব্বিশ পরগনার বারাসারের চাঁদপুর নামের গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ২৭ জানুয়ারি। আর ১৮৩১ সালে তিনি শাহাদতবরণ করেন। তিনি নারকেলবাড়িয়ায় বাঁশের কেল্লার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। কিন্তু তিনি যে ভালো কুস্তিগিরও ছিলেন, সেটা খুব বেশি প্রচার হয়নি। মনে রাখতে হবে, অনেক পরে ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী যুবকরা নানা প্রশিক্ষণে শরীর চর্চার ওপর যে গুরুত্বারোপ করত, সেটা কিন্তু তিতুমীরেরই দান।

গৌতম ভদ্র অভিমত প্রকাশ করেছেন, তিতুর মূল সামাজিক আবেদন ছিল গ্রামের নিম্নকোটির মানুষদের কাছে। যারা জাতিতে তারা যুগী, জোলা আর কৃষক। প্রায় সবাই গরিব। কলভিন বলেছেন, যাদের কিছু হারানোর আছে, তারা তিতুর দলে যোগ দিয়ে ঝুঁকি নিতে চায়নি। লক্ষণীয় হিন্দুদের পাশাপাশি তিতুর আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছে অত্যাচারী মুসলিম জমিদাররাও। সুতরাং এ আন্দোলন শুধু হিন্দুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল এ অতিশয়োক্তি। যারা গো-হত্যা ইত্যাদির মতো দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খুঁজে পান, তারা পুরোটা দেখছেন না বা দেখতে চাইছেন না। ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন, জমিদারদের শোষণ উৎপীড়নই তিতুমীরের ‘শান্তিপূর্ণ ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে ব্যাপক বিদ্রোহে রূপান্তরিত করেছিল। পরে বিদ্রোহ দমিত হলে যে ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছিল তাতে হিন্দু জমিদারদের সঙ্গে মুসলিম জোতদার, মহাজনরা শামিল হয়।

দাড়ি রাখা, লুঙ্গি পরার মাধ্যমে এ আন্দোলনের সদস্যরা তাদের স্বাতন্ত্র্য জাহির করত। তিতু যখন তার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন, তখন নিম্নবর্গীয় মুসলমান সমাজের ভেতরেও কাছা দিয়ে ধুতি পরাটাই ছিল সাধারণ দস্তুর। এভাবে ধুতি পরাতে নামাজ আদায়ে কিছু সমস্যা তৈরি হতো। তাই তিতু তহবন্দের আকারে তা পরার অভ্যাসটি চালু করেন। এমন আদেশ বাংলার কৃষক আন্দোলনের আরেক পথিকৃৎ হাজী শরিয়তউল্লাহও দিয়েছিলেন। স্বকীয়তা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দাড়িও ছিল একটি উপাদান। এ দাড়ি ঘিরে তিতুমীর এবং তার সহমর্মীদের ওপর ‘দাড়ি ট্যাক্স’ বসানো হয়েছিল। জমিদারি আইনকে ব্রিটিশ কেবল যে হিন্দু-মুসলমানের বিরুদ্ধে সংঘাত তৈরিতেই ব্যবহার করেছিল, তেমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। মুসলমানের বিরুদ্ধে মুসলমানকে, বিশেষ করে প্রাচীনপন্থিদের সঙ্গে আধুনিকচেতনা, মানসিকতাসম্পন্ন মানুষদের সংঘাত তৈরি করতেও এ জমিদারি আইনকে ব্রিটিশরা ব্যবহার করে।

তিতুমীর বা হাজী শরীয়তুল্লাহরা কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে ধর্মীয় বিষয়টি কেন জুড়ে দিয়েছিলেন? তিতুমীরের বিদ্রোহের নাম ছিল ‘তারিক-ই-মুহম্মদিয়া’ আর হাজী শরীয়তুল্লাহটির নাম ছিল ফরায়েজি আন্দোলন। নামকরণকে ব্যবহার করে আন্দোলন দুটিকে এমনভাবে প্রচার করা হয়, উভয়টিই ছিল নিছক ধর্মীয় শুদ্ধি আন্দোলন। ধর্ম অবশ্যই ছিল। তবে এ ব্যাপারে গৌতম ভদ্রের মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তার ইমান ও নিশানে দেখিয়েছেন, সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ চরম নির্যাতনের মধ্যে মসজিদ আর ইসলামের মধ্যেই তাদের অভয়ের জায়গা পেয়েছিল। আন্দোলনের নেতারাও এটাকে হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন।

অবশ্য মনে রাখতে হবে, ধর্মকে ব্রিটিশরাও ব্যবহার করত। তারা কিন্তু কেবল শোষণ, লুণ্ঠন করতেই এখানে আসেনি। তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল খ্রিষ্টধর্ম প্রচার ও প্রসার। সেই যে প্রথম ইউরোপিয়ান হিসাবে ভাস্কো ডা গামা উপমহাদেশের এসেছিলেন, তার সঙ্গেও ছিল বিপুলসংখ্যক খ্রিষ্ট প্রচারক। ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের প্রধান কারণই ছিল খ্রিষ্টধর্ম। মহাবিদ্রোহ নিয়ে ব্রিটিশদের প্রশ্নের জবাবে স্যার সৈয়দ আহমদ পর্যন্ত স্বীকার করেছিলেন, ভারতবর্ষের বিদ্রোহের মূলে ছিল ওই ব্যাপক জনবিশ্বাস যে, ব্রিটিশরা জনসাধারণকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করতে এবং তাদের ওপর ইউরোপীয় রীতিনীতি চাপিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। একইসঙ্গে গৌতম ভদ্রের মন্তব্যটির দিকেও নজর রাখতে হবে। তিনি তার ইমান ও নিশানে দেখিয়েছেন, তিতুমীর-সম্পর্কিত চালু বইগুলোতে প্রচলিত একটি ভুল ধারণার উল্লেখ করতে হয়। তা হলো, তিতুমীরকে ‘ওহাবি’ বলা। এ নামটি তিতুমীরের সময় বড় একটা চালু ছিল না। উনিশ শতকের অষ্টম দশকে উইলিয়াম হান্টারই এ নামটি ব্যাপকভাবে চালু করেন। যে কোনো ইংরেজবিরোধী মুসলিমের প্রতি শব্দটি প্রয়োগ করা হতো, গোঁড়া ধর্মান্ধ আর বিদ্রোহী মুসলমানের বদলি শব্দ হিসাবে গৃহীত হতো।

ব্রিটিশদের খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের আগ্রহ নিয়ে রেজা আসলান নো গড বাট গড গ্রন্থে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে প্রকৃতপক্ষে, ১৮৫৭ সালে যে বাঙালি সৈন্যরা ভারতবর্ষে বিদ্রোহের সূচনা করেছিল, তারা শুধু তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনকারী উপনিবেশিক নীতির কারণেই ক্ষুব্ধ ছিল না। বরং, তারা নিশ্চিত ছিল এবং তা যথার্থই ছিল, যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তাদের জোর করে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করছে। তাদের কমান্ডিং অফিসার সব সামরিক ক্লাসে প্রকাশ্যে সুসমাচার (গসপেল) প্রচার করতেন, যা ছিল উদ্বেগের একটি কারণ। কিন্তু, সিপাহিরা যখন জানতে পারল, তাদের রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি মাখানো হয়েছে, যা হিন্দু ও মুসলিম উভয়কেই অপবিত্র করে দেবে, তখন তাদের সেই চরম আশঙ্কা সত্যে পরিণত হলো। নাগরিক অবাধ্যতার নিদর্শন হিসাবে একদল সৈন্য ওই কার্তুজ ব্যবহার করতে অস্বীকার করে। এর জবাবে ব্রিটিশ কমান্ডাররা তাদের শিকলবন্দি করেন, সামরিক কারাগারে নিক্ষেপ করেন। ব্রিটিশরা যে ‘সভ্যকরণ মিশন’ চালু করেছিল বিশ্বজুড়ে, সেটাও কার্যত ছিল খ্রিষ্টকরণ মিশন। ডি বিয়ার্স ডায়মন্ড কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এবং এক সময়কার আধুনিক দক্ষিণ আফ্রিকার কার্যত একনায়ক সেসিল যেমনটি ঘোষণা করেছিলেন : ‘আমরা ব্রিটিশরা পৃথিবীর প্রথম জাতি এবং আমরা বিশ্বের যত বেশি অংশে বাস করব, মানবজাতির জন্য তা তত বেশি মঙ্গলজনক হবে।’

এই তথাকথিত ‘সভ্য করার মিশন’-এর অন্যতম প্রধান সমস্যা ছিল, এটি যতটা না সদিচ্ছা থেকে প্রণোদিত ছিল, তার চেয়েও বেশি এটি একটি ‘খ্রিষ্টান করার মিশন’ দিয়ে আচ্ছন্ন ছিল। মাদ্রাজের গভর্নর স্যার চার্লস ট্রেভেলিয়ানের ভাষায়, যার মূল লক্ষ ছিল ‘স্থানীয়দের খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা ছাড়া অন্য কিছু নয়।’ ভারতবর্ষে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকদের সরকারের সর্বোচ্চ পদগুলোতে বসানো হয়েছিল। এমনকি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রতিটি স্তরেও তাদের উপস্থিতি ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালক চার্লস গ্র্যান্ট (১৮৫৮ সাল পর্যন্ত যার হাতে সরকারের প্রায় সব ক্ষমতা ছিল) নিজে একজন সক্রিয় খ্রিষ্টান মিশনারি ছিলেন। তিনি এবং তার বেশিরভাগ দেশবাসী বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর ব্রিটেনকে ভারতবর্ষের শাসনভার দিয়েছেন, যাতে এ দেশকে পৌত্তলিকতার অন্ধকার থেকে বের করে এনে খ্রিষ্টের আলোর পথে পরিচালিত করা যায়। উপমহাদেশের প্রায় অর্ধেক স্কুল পরিচালনা করত গ্র্যান্টের মতো মিশনারিরা, যারা স্থানীয়দের খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করার জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাহায্য পেত।

অবশ্য সব ঔপনিবেশিক শাসক ব্রিটেনের এ মিশনারি এজেন্ডার সঙ্গে একমত ছিলেন না। ১৮৪২-১৮৪৪ সাল পর্যন্ত গভর্নর জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব পালন করা লর্ড এলেনবরো বারবার তার দেশবাসীকে সতর্ক করেছিলেন, সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের এই উৎসাহ শুধু সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং এটি ব্যাপক জনরোষ এবং সম্ভবত প্রকাশ্য বিদ্রোহের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তা সত্ত্বেও এলেনবরোও সম্ভবত ট্রেভেলিয়ানের সঙ্গে একমত হতেন, যিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে ভারতবর্ষের ধর্ম ‘এত বেশি অনৈতিকতা এবং শারীরিক অসারতার সঙ্গে জড়িত, ইউরোপীয় বিজ্ঞানের আলোর সামনে এটি মুহূর্তেই ভেঙে পড়বে।’

তিতুমীর তার লক্ষ্য অর্জনে সফল হননি। তবে তাই বলে তার বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছে, তাও বলা যাবে না। তার এবং অন্যদের আন্দোলনের রেশ ধরেই ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ব্রিটিশরাজকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আর এর রেশ ধরেই আরও পরে আমাদের স্বাধীনতা আসে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কৃষক বিদ্রোহের যে অল্প কয়েকজন নেতা অবহেলিত নন, তাদের মধ্যে তিতুমীর একজন। স্কুলপাঠ্য ইতিহাসে তার জায়গা আছে, তাকে ঘিরে লেখা হয়েছে নাটক, উপন্যাস। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ইবনে মিজান ‘শহীদ তিতুমীর’ নামে সিনেমাও বানিয়েছিলেন। তবে একটু খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে, তিতুমীর সম্পর্কে জানি আমরা সবচেয়ে কম। এ অভাবটাই আমাদের পূরণ করতে হবে।

মোহাম্মদ হাসান শরীফ : সাংবাদিক

থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের সেই হাতি আদালতের নির্দেশে ফিরছে মালিকের কাছে

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের সেই হাতি আদালতের নির্দেশে ফিরছে মালিকের কাছে

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় সড়কে হাতি নিয়ে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে ইজিবাইক দুর্ঘটনায় ১০ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জব্দ হয়ে এক সপ্তাহ ধরে থানা হেফাজতে থাকা হাতিটি অবশেষে আদালতের নির্দেশে মালিকের কাছে ফিরছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) আদালত এক আদেশে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে হাতিটি তার প্রকৃত মালিকের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।

এর আগে গত ২৮ জুলাই দুপুরে সদরপুর উপজেলার আটরশি এলাকায় হাতি নিয়ে চাঁদা তোলার সময় চাঁদা এড়াতে গিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে মায়ের সঙ্গে থাকা ১০ মাস বয়সী আরিশা জান্নাত গুরুতর আহত হয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা হাতির মাহুতকে আটক করে গণপিটুনি দেয় এবং হাতিটিকে আটকে রাখে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মাহুতকে উদ্ধার করে আটক করে এবং হাতিটিকে জব্দ করে সদরপুর থানায় নিয়ে আসে।

পরদিন পুলিশ আটক মাহুত জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার মাদারের চর গ্রামের আনিসউদ্দিনের ছেলে বকুল মিয়াকে (২৪) আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। একই সঙ্গে জব্দকৃত হাতিটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে নাকি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে-সে বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করে।

আদালতের আদেশ অনুযায়ী হাতিটির মালিক হিসেবে নওগাঁ জেলার বাসিন্দা ব্যবসায়ী দুলাল দেওয়ানের কাছে প্রাণীটি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জানা গেছে, তিনি নিজে সার্কাস পরিচালনা না করলেও বিভিন্ন সার্কাস দলের কাছে হাতিটি ভাড়া দিয়ে থাকেন।

তবে আদালতের নির্দেশ এলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হাতিটি সদরপুর থানা প্রাঙ্গনেই ছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেটি মালিকের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

গত সাত দিন ধরে হাতিটি সদরপুর থানা প্রাঙ্গনে বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। এ সময় হাতিটির দেখভাল ও পরিচর্যার জন্য মালিকের পক্ষ থেকে নাজমুল সরদার (১৭) নামে আরেক মাহুতকে সদরপুর থানায় পাঠানো হয়। তিনি নিয়মিত হাতিটিকে গোসল করানো, খাবার খাওয়ানো, সকালে হাঁটানো এবং সার্বক্ষণিক পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করেন।

এক সপ্তাহ ধরে থানায় হাতিটি রাখার ফলে খাদ্যের ব্যবস্থা করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কলাগাছ, ঘাস ও অন্যান্য খাদ্যের প্রয়োজন হয়। থানা প্রাঙ্গণে এমন কোনো স্থায়ী খাদ্যব্যবস্থা না থাকায় পুলিশ ও মাহুতকে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও হাতির মালিকের সহযোগিতায় খাদ্যের ব্যবস্থা করা হলেও তা সবসময় পর্যাপ্ত ছিল না।

থানায় অবস্থানকালে বিশাল আকৃতির হাতিটি স্থানীয় মানুষেরও ব্যাপক কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। প্রতিদিন শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে সদরপুর থানায় এসে হাতিটিকে দেখতে ভিড় করেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশকেও সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।

সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে আদালতের আদেশ হাতে পেয়েছি। আদালত হাতিটিকে তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুতই হাতিটি মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

ঘুম আসছে না? অনিদ্রা দূর করতে জেনে নিন ৭ কার্যকর উপায়

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ঘুম আসছে না? অনিদ্রা দূর করতে জেনে নিন ৭ কার্যকর উপায়

সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতে বিছানায় গেলেও অনেকের চোখে ঘুম আসে না। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এপাশ-ওপাশ করেন, আবার কারও মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়। এমন সমস্যা এক-দুদিন হলে চিন্তার কারণ না হলেও দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা হতে পারে অনিদ্রা (ইনসমনিয়া)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ও মস্তিষ্ক ঠিকভাবে বিশ্রাম নিতে পারে না। ফলে পরদিন ক্লান্তি, কাজে অমনোযোগ, খিটখিটে মেজাজ, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এমনকি দীর্ঘমেয়াদে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

অনেকেই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ঘুমের ওষুধ সেবন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে প্রাকৃতিকভাবেই অনিদ্রা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন হয় অনিদ্রা?

অনিদ্রার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা

বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন)

আশপাশের অতিরিক্ত শব্দ

অস্বস্তিকর বিছানা বা ঘুমের পরিবেশ

মদ্যপানের অভ্যাস

অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইন গ্রহণ

রাতের শিফটে কাজ করার অভ্যাস

অনিদ্রা দূর করতে যা করবেন

১. নিয়মিত মেডিটেশন করুন

মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন মানসিক চাপ কমাতে এবং মনকে শান্ত রাখতে কার্যকর। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট মেডিটেশন করলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে।

২. ল্যাভেন্ডার অয়েলের ব্যবহার

ল্যাভেন্ডার অয়েল দীর্ঘদিন ধরে অ্যারোমাথেরাপিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি মানসিক প্রশান্তি এনে ঘুমে সহায়তা করতে পারে। বালিশে সামান্য স্প্রে করা বা ঘাড় ও কাঁধে অল্প পরিমাণে ম্যাসাজ করেও ব্যবহার করা যায়।

৩. নির্দিষ্ট সময় ঘুমানোর অভ্যাস

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের ‘বডি ক্লক’ বা সার্কাডিয়ান রিদমকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এতে ধীরে ধীরে ঘুমের সমস্যা কমতে পারে।

৪. ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খান

ম্যাগনেসিয়াম পেশি শিথিল করতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। ডার্ক চকলেট, বাদাম, অ্যাভোকাডোসহ ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত কোমল পানীয় ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা ভালো।

৫. মেলাটোনিন বাড়ায় এমন খাবার

মেলাটোনিন হলো ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। ডিম, দুধ, মাছ, কলা, মাশরুম, বাদাম ও আখরোটের মতো খাবার শরীরে মেলাটোনিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি ঘুমানোর আগে মোবাইল বা অন্যান্য স্ক্রিনের ব্যবহার কমানোও জরুরি।

৬. নিয়মিত শরীরচর্চা

প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট ব্যায়াম করলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম না করে অন্তত তিন ঘণ্টা আগে শরীরচর্চা শেষ করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

৭. ৪-৭-৮ শ্বাস-প্রশ্বাস পদ্ধতি

অনিদ্রা কমাতে ‘৪-৭-৮’ শ্বাস-প্রশ্বাস কৌশল বেশ জনপ্রিয়। এ পদ্ধতিতে চার সেকেন্ড শ্বাস নিতে হবে, সাত সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখতে হবে এবং আট সেকেন্ড ধরে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হবে। কয়েকবার অনুশীলন করলে শরীর ও স্নায়ু শিথিল হতে পারে।

আরও কিছু অভ্যাস বদলাতে হবে

ঘুমানোর আগে এক গ্লাস হালকা গরম দুধ পান করা উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি রাতে অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার, ভারী খাবার ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং ঘুমানোর পরিবেশ শান্ত ও আরামদায়ক রাখলে ভালো ঘুমের সম্ভাবনা বাড়ে।

তবে জীবনযাপনের পরিবর্তনের পরও যদি দীর্ঘদিন অনিদ্রা, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকে, তাহলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, অনিদ্রা অনেক সময় অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।

সূত্র : কালবেলা

সরকারি হচ্ছে ফরিদপুরের নগরকান্দার আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪১ অপরাহ্ণ
সরকারি হচ্ছে ফরিদপুরের নগরকান্দার আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় জাতীয়করণের উদ্যোগে নতুন অগ্রগতি এসেছে। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ ও সদস্য সচিব (মাননীয় সংসদ সদস্যগণের প্রতিশ্রুত ও প্রত্যাশিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সমন্বয় সেল) মো. উজ্জল হোসেন স্বাক্ষরিত ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখের এক চিঠিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে আধা-সরকারি (ডিও) পত্রের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়টির জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, নারী শিক্ষার প্রসার এবং পিছিয়ে পড়া জনপদের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৮৮ সালে নগরকান্দায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টি এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ করে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ইউএনও রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনা এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করবে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে শিক্ষক সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন এবং দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের মেয়েদের জন্য উন্নত শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ উদ্যোগে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনা হবে।