খুঁজুন
, ,

জাতীয় নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও কার্যকর হচ্ছেনা যেসব ধারা?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ
জাতীয় নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও কার্যকর হচ্ছেনা যেসব ধারা?

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে গণভোট। এই গণভোটে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার। মোট বৈধ ভোটের ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ খুলেছে।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবেন।

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত সংবিধানসম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অনুযায়ী সংস্কার আনবেন তাঁরা।

সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে দফায় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বৈঠকের পর সাংবিধানিক প্রস্তাবগুলো নিয়ে গণভোট আয়োজন করেছে।

বেশ কয়েকটি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবনায় বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি ছিল।

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে, দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি।

ফলে জুলাই সনদের যে সব বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নোট অব ডিসেন্ট নেই, সে সব প্রশ্নে সংস্কারগুলো নিয়ে তেমন কোন সংকট দেখছেন না সংবিধান বিশ্লেষকরা।

তবে, দুইকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষের গঠন নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে।

কেননা, বিএনপি তাদের ইশতেহারে সংসদের আসন সংখ্যার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করার বলেছে। এর বিপরীতে গণভোটের প্রশ্নে সরাসরি সংসদের উচ্চকক্ষের গঠনের কথা বলা হয়েছে আনুপাতিক হারে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বিএনপি যে ইশতেহার দিয়েছে সেটি কোনো ভোটের মাধ্যমে সরাসরি জনগণের সামনে হাজির করা হয়নি। কিন্তু সংসদের উচ্চকক্ষ আনুপাতিক ভোটের হারে গঠনের বিষয়টিতে সরাসরি মানুষ ভোট দিয়েছে”।

এছাড়াও জুলাই সনদের বেশ কিছু সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকায় গণভোটের হ্যাঁ জয়লাভ করার পরও সেগুলো বাস্তবায়ন হবে না বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গণভোটে খুলেছে সংস্কারের পথ

১২ই ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন, আর এর বিপরীতে ‘না’ ভোট দিয়েছেন দুই কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন।

অর্থাৎ প্রদত্ত ভোটের ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দেওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নিয়ে যে সংকট ছিল, সেটি কেটে গেছে।

মূলত সংবিধানসম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথমত, আইনি ভিত্তি দিতে আদেশ জারি। গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন রাষ্ট্রপতি।

বাস্তবায়নের দ্বিতীয় স্তরে বলা হয়েছে গণভোটের কথা। এই গণভোট হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে।

জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পর এর বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধ রাজপথ পর্যন্ত গড়ায়।

শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবির মুখে সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের সিদ্ধান্তের কথা জানান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

১২ই ফেব্রুয়ারির গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন সংস্কার বাস্তবায়নের তৃতীয় স্তর শুরু হবে।

আগামী মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। এক্ষেত্রে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে।

সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করবে।

শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সংসদ সদস্যরা দুটি শপথ গ্রহণ করবেন একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এই পরিষদের মেয়াদ হবে ১৮০ দিন।

সংবিধানে কি কি পরিবর্তন আসবে?

জুলাই সনদের ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে বেশ কিছু প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে।

গণভোটের ‘হ্যাঁ’ জয়ের ফলে যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নের পথ খুলেছে, তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব হলো প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে।

এছাড়া সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে।

বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী।

এ ছাড়া কোনো বিষয়ে সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার আওতা বাড়বে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে। এ বিষয়গুলোতে বিএনপির আপত্তি নেই।

জুলাই সনদে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন। এই প্রস্তাবে প্রথমে আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাজী হয় বিএনপি।

যে কারণে বিএনপি নির্বাচনের আগে তাদের ইশতেহারে বিষয়টি স্পষ্টও করেছে। বিএনপির ইশতেহারেও বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদই হোক তিনি সর্বোচ্চ দশ বছরের বেশি অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে থাকবেন না, এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই সনদে।

তবে এই প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল। যে কারণে তারা সেই বিষয়টি ইশতেহারেও যুক্ত করেছে। ফলে দলীয় প্রধান আর প্রধানমন্ত্রী একই পদে থাকা নিয়ে জুলাই সনদে সংস্কার প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

আইনজীবী জাহেদ ইকবাল বলেন, “সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশেই বলা হয়েছে যে রাজনৈতিক দল বিজয় লাভ করবে তার ইশতেহার অনুযায়ী সুবিধামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। যে কারণে বিএনপির যেগুলোতে নোট অব ডিসেন্ট ছিল, সেগুলো তারা বাস্তবায়নে বাধ্য নয়। সেগুলো তারা ইশতেহারেও উল্লেখ করেছে”।

এখন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতিকে কাজ করতে হয়। তবে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।

বিএনপি তাদের ইশতেহারে উল্লেখ করেছে, সংবিধানে একজন উপ-রাষ্ট্রপতির পদও সৃষ্টি করা হবে। তিনি রাষ্ট্রপতির মতোই নির্বাচিত হবেন। যদিও সেটি জুলাই সনদে নেই। যেহেতু বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে সংশোধনের পর নতুন সংবিধানে যুক্ত হতে পারে বিষয়টি।

উচ্চকক্ষের গঠন নিয়ে নানা প্রশ্ন

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার গণভোটের ব্যালটে চারটি বিষয় যুক্ত করেছে। কিন্তু চারটি প্রশ্ন থাকলেও সেখানে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ একটিতে ভোট দিতে হয়েছে ভোটারদের। যে কারণে শুরু থেকেই এটি নিয়ে নানা ধোঁয়াশা ছিল।

গণভোটের ওই চারটি প্রশ্নের ‘খ’ প্রস্তাবে আনুপাতিক উচ্চকক্ষের বিষয়টি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

পরের প্রশ্নে আবার বলা হয়েছে, সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

সর্বশেষ প্রশ্নে বলা হয়েছে, জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহার অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে বিএনপি এককভাবে ২৯০ আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৪৯.৯৭ শতাংশ, জামায়াত এককভাবে ২২৭ আসনে নির্বাচন করে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

তবে জোটবদ্ধ ভোটের হিসেবে বিএনপি ৫১ শতাংশের বেশি ও জামায়াত-এনসিপি জোট ৩৮ দশমিক ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আবার আসন সংখ্যার হিসেবে বিএনপি জোট ২১২টি এবং জামায়াত- এনসিপি জোট জিতেছে ৭৭টি আসন।

এখন আসন সংখ্যার হিসেবে যদি জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়, তাহলে বিএনপি জোট ১০০টির মধ্যে ৭০টি, জামায়াতে ইসলামী অন্তত ২৬টি, এনসিপি ২টি আসন পেতে পারে।

এর বিপরীতে ভোটের আনুপাতিক হারের বিবেচনায় উচ্চকক্ষ গঠন হলে বিএনপি জোটের আসন কমে হবে ৫২ থেকে ৫৩ টি, আর জামায়াত জোটের অন্তত ৩৮টি।

জুলাই সনদে ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন নিয়ে বলা হলেও এ নিয়ে আপত্তি ছিল। এর বিপরীতে বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে তারা ক্ষমতায় গেলে উচ্চকক্ষ গঠন করবে আসন সংখ্যার ভিত্তিতে।

এই প্রশ্ন নিয়ে নির্বাচনের দিন থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।

তবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, গণভোটের ব্যালটে চারটি ক্যাটাগরি ছিল। সেখানে উচ্চকক্ষের গঠন যে ভোটের আনুপাতিক হারে হবে, সেটার ওপর সরাসরি ভোট হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

মি. হায়দার বলছেন, “উচ্চকক্ষ বিষয়ে ব্যালটে সরাসরি ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। আর বিএনপির ইশতেহার গণভোটে পাশ হয়নি”।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, “গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপিত একটা ইস্যু ডাইরেক্টলি (প্রত্যক্ষভাবে) অ্যাপ্রুভ হইছে, আরেক ইস্যু ইনডাইরেক্টলি (পরোক্ষভাবে) ঘোষণা হয়েছে দলের পক্ষ থেকে, তাহলে কোনটা প্রাধান্য পাবে”?

তবে, এটি নিয়ে যে পরবর্তী আলোচনা বির্তক চলবে সেটি একবাক্যে বলেছে অন্তর্বর্তী সরকার ও সংবিধান বিশ্লেষকদের অনেকেই।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ফরিদপুরে ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৩:০৭ অপরাহ্ণ
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ফরিদপুরে ১১ দলীয় জোটের বিক্ষোভ

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদ দ্রুত কার্যকরের দাবিতে ফরিদপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ১১ দলীয় ঐক্য জোট। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা অংশ নেন। তারা দাবি করেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

শনিবার (৪ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জনতা ব্যাংক মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ।

সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক মাওলানা মো. বদরুদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং দলীয় মুখপাত্র মুফতি আবু নাসির আইয়ুবী ও অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের যৌথ সঞ্চালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য প্রফেসর আবদুত তাওয়াব।

এ সময় আরও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ফরিদপুর জেলা সভাপতি মাওলানা আমজাদ হোসাইন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক ডা. বায়েজিদ আহমাদ শাহেদ, খেলাফত আন্দোলন ফরিদপুর জেলা সভাপতি মাওলানা মিজানুর রহমান, এলডিপি সভাপতি মো. কামরুল ইসলামসহ ১১ দলীয় ঐক্য জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

বক্তারা বলেন, গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের মতামত এবং জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।

নেতারা আরও বলেন, দাবি বাস্তবায়নে গড়িমসি করা হলে সারাদেশে আরও বৃহত্তর ও কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। গণতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও তারা ঘোষণা দেন।

সমাবেশে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ১১ দলীয় ঐক্য জোটের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচি চলাকালে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল এবং বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দাবিসংবলিত স্লোগান দেন।

ভাঙ্গায় গুলিতে যুবক নিহত: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে মামলা, কমিটি বিলুপ্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১:২৯ অপরাহ্ণ
ভাঙ্গায় গুলিতে যুবক নিহত: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে মামলা, কমিটি বিলুপ্ত

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে গুলিতে সুমন শেখ নামে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিবকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ মামলার একদিন পরই ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল।

শনিবার (৪ জুলাই) সকালে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান হত্যা মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

জানা যায়, গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পূর্বশত্রুতার জেরে ভাঙ্গা পৌরসভার হাসামদিয়া ও কাপুড়িয়া সদরদী মহল্লার বাসিন্দাদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হন কাপুড়িয়া সদরদী গ্রামের মিলন শেখের ছেলে সুমন শেখ (২৩)। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নিহতের বাবা মিলন শেখ গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ভাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছে ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব ও পূর্ব হাসামদিয়া মহল্লার বাসিন্দা সজীব মাতুব্বরকে (২৮)।

পুলিশ জানায়, মামলার পর থেকে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামলার প্রধান আসামি সজীব মাতুব্বর এখনও পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, ঘটনার পর শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে নিহত সুমন শেখের বাড়িতে যান ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন) আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল। তিনি নিহতের কবর জিয়ারত করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান।

সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সংসদ সদস্য বলেন, “মামলা তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। এই মামলায় কেউ কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যারা অভিযুক্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আজই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দলীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।”

সংসদ সদস্যের ওই বক্তব্যের প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যেই জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোজাম্মেল হোসেন ও সদস্যসচিব শাহরিয়ার শিথিল স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “অনিবার্য কারণবশত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, ভাঙ্গা উপজেলা শাখার আহ্বায়ক কমিটি ৩ জুলাই থেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো।”

কমিটি বিলুপ্তির বিষয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব শাহরিয়ার শিথিল বলেন, ভাঙ্গা উপজেলা কমিটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। সর্বশেষ কমিটির এক শীর্ষ নেতা হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি হওয়ায় এবং মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সুপারিশে উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক প্রভাব যেন তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব সজীব মাতুব্বরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তিনি পলাতক থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

ডিম ছাড়ার মৌসুমেও সালথায় চায়না দুয়ারির দাপট, হুমকিতে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
ডিম ছাড়ার মৌসুমেও সালথায় চায়না দুয়ারির দাপট, হুমকিতে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি (চায়না জাল) দিয়ে অবাধে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। আষাঢ় মাসজুড়ে যখন দেশীয় প্রজাতির অধিকাংশ মাছ ডিম ছাড়ে ও বংশবিস্তার করে, ঠিক সেই সময় নির্বিচারে মাছ ধরায় জলজ জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় মাছের উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

শুক্রবার (৩ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় খাল, বিল, নালা ও নদীর বিভিন্ন স্থানে চায়না দুয়ারি বসিয়ে দিন-রাত মাছ ধরা হচ্ছে। এসব ফাঁদে শুধু বড় মাছই নয়, রেণু, পোনা এবং ডিমওয়ালা মাছও আটকা পড়ছে। ফলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এভাবে নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযান না থাকায় অসাধু জেলেরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতে একদিকে যেমন দেশীয় মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের বাসিন্দা মজিবুর মাতুব্বর বলেন, “আগে বর্ষাকালে খাল-বিলে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারির কারণে ছোট-বড় সব মাছ ধরা পড়ে যাচ্ছে। মাছ ডিম দেওয়ার আগেই ধরে ফেলায় আগের মতো মাছ আর পাওয়া যায় না। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চালানো প্রয়োজন।”

একই উপজেলার বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন বলেন, “চায়না দুয়ারি একবার বসালে পানির ভেতরের প্রায় সব ধরনের মাছ আটকা পড়ে। এতে ছোট মাছও রক্ষা পায় না। কয়েকজনের লাভের জন্য পুরো এলাকার মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। বিষয়টি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়না দুয়ারি বা সূক্ষ্ম ফাঁসের অবৈধ জাল ব্যবহারের ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব জাল ব্যবহার দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কারণে সরকার বিভিন্ন সময় এ ধরনের অবৈধ উপকরণ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

এ বিষয়ে সালথা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তরুণ বসু ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “চায়না দুয়ারি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং যেখানে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। অবৈধভাবে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর। নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে স্থানীয়দেরও সচেতন হয়ে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাই।”