খুঁজুন
শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ২৮ চৈত্র, ১৪৩২

ভোটের মাঠে শৃঙ্খলা ফেরাতে সেনাবাহিনীর যে কার্যকর ভূমিকা সত্যিই প্রশংসনীয়?

আব্দুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:২৬ পূর্বাহ্ণ
ভোটের মাঠে শৃঙ্খলা ফেরাতে সেনাবাহিনীর যে কার্যকর ভূমিকা সত্যিই প্রশংসনীয়?

একটি নির্বাচন কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান বা ফলাফল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতা, সামাজিক সহনশীলতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন সেই পরীক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

নানা আশঙ্কা, রাজনৈতিক উত্তাপ ও গুজবের ভেতর দিয়ে দেশ যখন ভোটের দিনে উপনীত হয়, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটাই—নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন ভোটগ্রহণ। সেই প্রত্যাশা পূরণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়।

নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কা এবং অতীতের অভিজ্ঞতা ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর মোতায়েন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল জনআস্থার বার্তা। ভোটকেন্দ্রের আশপাশে তাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি ভোটারদের আশ্বস্ত করেছে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কোনো অপশক্তি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারবে না।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাদের দক্ষতাকে আরও পরিণত করেছে। দেশের ভেতরে দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো নির্মাণ ও জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের সাফল্য রয়েছে। ফলে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন ছিল সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রয়াসের ধারাবাহিকতা।

ভোটের দিন ভোর থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে দেখা গেছে, সেনাসদস্যরা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও অযথা হস্তক্ষেপ নয়, আবার প্রয়োজনীয় মুহূর্তে দ্রুত উপস্থিতি—এই ভারসাম্যই ছিল কার্যক্রমের বৈশিষ্ট্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে তারা নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলেন, যা ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও সংঘাতপ্রবণ এলাকায় তাদের উপস্থিতি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর ছিল।

গুজব প্রতিরোধ ছিল আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভিত্তিহীন তথ্য মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়াতে পারে। সেনাবাহিনীর টহল ও নজরদারি গুজব-প্রসূত বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সহায়ক হয়েছে। কোথাও বিচ্ছিন্ন উত্তেজনা দেখা দিলেও দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে, যা পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সমন্বয়কে নির্দেশ করে।

তবে এই সাফল্যের বড় দিক হলো নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা সহায়ক—প্রভাব বিস্তারকারী নয়। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ত না হয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করে। এবারের নির্বাচন সেই সীমারেখা রক্ষার একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

নির্বাচন নিয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রূপ। তবে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে—এ কথা অনস্বীকার্য। নির্বাচন-পরবর্তী বড় ধরনের সহিংসতা না হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এর পেছনে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং সেনাবাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টা কাজ করেছে।

ভবিষ্যতের জন্য এ অভিজ্ঞতা তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, জনআস্থা অর্জন এবং বাহিনী মোতায়েনের যৌক্তিকতা—এসব প্রশ্নের উত্তরে এবারের অভিজ্ঞতা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধিই টেকসই সমাধান। সংবেদনশীল সময়ে সেনাবাহিনীর সহায়ক ভূমিকা কার্যকর হলেও গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয় বেসামরিক কাঠামোর উন্নয়নে।

সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন একটি সামষ্টিক প্রয়াস। সেই প্রয়াসে সেনাবাহিনী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তাদের পেশাদার আচরণ, সংযম ও দায়িত্ববোধ একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত ফরিদপুরের দিপালি, বাড়িতে শোকের মাতম

মুস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:০৫ অপরাহ্ণ
ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত ফরিদপুরের দিপালি, বাড়িতে শোকের মাতম

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের বোমা হামলায় ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার এক প্রবাসী নারী নিহত হয়েছেন। নিহত দিপালী (৩৪) উপজেলার পূর্ব চর শালেপুর গ্রামের বাসিন্দা সেক মুকার মেয়ে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (০৮ এপ্রিল) দিবাগত রাতে বৈরুতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে দিপালী ছিলেন চতুর্থ। পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে প্রায় দুই বছর আগে তিনি লেবাননে পাড়ি জমান এবং সেখানে গৃহকর্মীর কাজ করছিলেন।

দিপালীর ছোট বোন লাইজু বেগম জানান, প্রতিদিনের মতো বুধবার বিকেলেও ইমুতে তার সঙ্গে কথা হয়। তখনও দিপালী স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছিলেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে প্রায় এক মাস আগে তিনি কর্মস্থল পরিবর্তন করে তার গৃহকর্তার পরিবারের সঙ্গে বৈরুতে আশ্রয় নেন।

লাইজু বেগম বলেন, “পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে আপুকে ফোন দিলে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। পরে আপুর মালিকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। একপর্যায়ে তাদের পরিবারের এক সদস্যের মাধ্যমে জানতে পারি, বুধবারের বোমা হামলায় আমার আপুসহ তাদের পরিবারের আরও ছয়জন মারা গেছেন।”

জানা গেছে, হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় দিপালীকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে হার মানেন। বর্তমানে তার মরদেহ বৈরুতের একটি হাসপাতালে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চর হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সেক ফালু জানান, “দিপালী খুবই অসচ্ছল পরিবারের মেয়ে ছিল। সংসারের হাল ধরতেই সে বিদেশে গিয়েছিল। আমরা চাই তার মরদেহ দ্রুত দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।”

এদিকে, উপজেলা প্রশাসনও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে। চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া মমতাজ বলেন, “দিপালী নিহত হওয়ার খবর আমরা পেয়েছি। ইতোমধ্যে ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। বিধি মোতাবেক তার মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে লেবাননসহ বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

দিপালীর অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এই নারীকে হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা। দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে যথাযথ দাফনের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসীও।

ফরিদপুরে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে বিধবাকে হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ, ঢাকায় গ্রেফতার যুবক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:০৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে বিধবাকে হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ, ঢাকায় গ্রেফতার যুবক

ফরিদপুরে ফ্যামিলি কার্ড ও বিধবা ভাতার কার্ড করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক অসহায় বিধবাকে আবাসিক হোটেলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত সুজন শেখকে (৩৫) রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-১০)।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকার হাজারীবাগ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র‍্যাব-১০ এর কোম্পানি কমান্ডার মো. তারিকুল ইসলাম।

জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারী ফরিদপুর শহরের আলীপুর এলাকার বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন তিনি। প্রায় ১০ বছর আগে স্বামী হারানোর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করছেন। জীবিকার তাগিদে অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে দিন পার করেন। সরকারি কোনো সহায়তা না পাওয়ায় তিনি ছিলেন চরম হতাশায়।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী সুজন শেখ তাকে ফ্যামিলি কার্ড ও বিধবা ভাতার কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। গত ২ এপ্রিল সকালে উপজেলা পরিষদে নেওয়ার কথা বলে তিনি ওই নারীকে রিকশায় তুলে নেন। পরে বাস টার্মিনাল সংলগ্ন একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে গিয়ে সেটিকেই অফিস বলে পরিচয় দেন।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সেখানে নেওয়ার পর তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস (ওসিসি) সেন্টারে ভর্তি করা হয়। চারদিন চিকিৎসা শেষে গত ৬ এপ্রিল তিনি বাড়ি ফেরেন।

পরবর্তীতে ৭ এপ্রিল ফরিদপুর কোতোয়ালী থানায় সুজন শেখের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী নারী।

বিচার দাবি করে তিনি বলেন, “আমি কোনো অফিস চিনতাম না। তার কথায় বিশ্বাস করে গিয়েছিলাম। সরকারের সুবিধা পাইতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে আমার সর্বনাশ করছে। আমি এর বিচার চাই।”

এদিকে অভিযুক্ত সুজন শেখ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, এটি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তিনি বলেন, ওই নারী তার বাড়িতে যাতায়াত করতেন এবং ঘটনার দিন একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে মারধর করা হয়েছিল, যার জের ধরে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুজন শেখের সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির সখ্য রয়েছে বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। তবে ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ কে কিবরিয়া স্বপন বলেন, “আমাদের দলে সুজন নামে কোনো সক্রিয় নেতা বা কর্মী আছে বলে জানা নেই। অপরাধী যেই হোক, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।”

ফরিদপুর কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, “ভুক্তভোগী প্রায় ৫০ বছর বয়সী একজন নারী। ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। আমরা শুরু থেকেই আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছিলাম। র‍্যাব তাকে গ্রেফতার করেছে, এখন আইনি প্রক্রিয়া চলবে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অভিযুক্তকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হবে এবং মামলার তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে।

ফরিদপুরে সংঘর্ষের জেরে দুই মাস ধরে শতাধিক ব্যবসায়ীর দোকান বন্ধ

নুরুল ইসলাম নাহিদ, সালথা:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:১৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে সংঘর্ষের জেরে দুই মাস ধরে শতাধিক ব্যবসায়ীর দোকান বন্ধ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তীতে ফরিদপুরের একটি বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অব্যাহত হামলা ও হুমকির মুখে শতাধিক ব্যবসায়ী  তাদের দোকানে যেতে পারছেন না। এতে করে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েড়েছেন তারা, বেকার হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী ও শ্রমিকরা।

সালথা ও বেয়ালমারী উপজেলার দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে প্রতিপক্ষের ভয়ে গত দুই মাস শতাধিক ব্যবসায়ী স্থানীয় ময়েনদিয়া বাজারে থাকা তাদের দোকানে যেতে পারছেন না বলে  জানিয়েছেন। টানা দুই মাস ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে না পারায় দোকানে  কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হচ্ছে ।  এমন অবস্থায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।

সরেজমিনে সালথার খারদিয়া গ্রাম ও বোয়ালমারীর ময়েনদিয়া বাজারের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত অত্র এলাকার সবচেয়ে বড় হাট ময়েনদিয়া বাজার| বাজারে অন্তত এক হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে । দীর্ঘদিন ধরে বাজারটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নানের সাথে সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের খারদিয়া গ্রামের বিএনপি সমর্থক টুলু মিয়া এবং জিহাদ মিয়ার বিরোধ চলে আসছে।  টুলু মিয়া ও জিহাদ মিয়ার বাড়ি খারদিয়া গ্রামে আর আব্দুল মান্নানের বাড়ি ময়েনদিয়া বাজার এলাকায়।

স্থানীয়রা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ময়েনদিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন মান্নান চেয়ারম্যান| আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন হান্নান চেয়ারম্যানের বাড়ি পুড়িয়ে দেয় প্রতিপক্ষের লোকজন। একপর্যায় মান্নান চেয়ারম্যান ও তার নেতাকর্মীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়| পরে ময়েনদিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণে নেন টুলু ও জিহাদ মিয়া। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির এক নেতার সহযোগিতায় এলাকায় ফিরে আসেন মান্নান চেয়ারম্যান। এরপর মান্নান ও তার সমর্থকরা ময়েনদিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করলে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে সালথার খারদিয়া গ্রামের শতাধিক ব্যবসায়ী ময়েনদিয়া বাজারে থাকা তাদের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছেন না। বাজারের গেলেও মান্নানের সমর্থকরা তাদের উপর হামলা করে ও হুমকি ধামকি দেয়। এমন অবস্থায় গত দুই মাস ধরে খারদিয়া গ্রামের ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ রাখায় তাদের কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

খারদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও ময়েনদিয়া বাজারের মিনহাজ টেডার্সের মালিক মো. ফায়েক বলেন, দুই মাস ধরে ময়েনদিয়া বাজারে থাকার আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছি না। এতে আমার দোকানে সিমেন্ট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুধু আমি একা নয়, আমার মতো শতাধিক ব্যবসায়ী মান্নান চেয়ারম্যান ও তার ভাই সিদ্দিক মাতুব্বরের সমর্থকদের ভয়ে বাজারে থাকা তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না। এতে আমাদের ব্যবসায়ীদের কোটি টাকার সম্পদ ও মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা ব্যবসায়ী, আমাদের কোনো দলপক্ষ নেই। তারপরেও বাজারে যেতে দেয়া হচ্ছে না আমাদের।

কাপড় ব্যবসায়ী আকরাম শিকদার বলেন, সংঘর্ষ হয়েছে দুটি পক্ষের মধ্যে, কিন্তু আমাদের ব্যবসায়ীদের কি দোষ? আমাদের দোকান কেন খুলতে দিচ্ছে না। কোনো ব্যবসায়ী বাজারে গেলেও তাকে মারধর করা হয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে না পেরে আমরা পথে বসে যাচ্ছি।  আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা না খেয়ে মরবো। বিষয়টি আমরা প্রশাসনকে জানানো পরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

খারদিয়া গ্রামের ভ্যানচালক ছায়েদুল মুন্সী বলেন, কয়েকদিন আগে আমি ভাড়া নিয়ে ময়েনদিয়া বাজারে গেলে মান্নান চেয়ারম্যানের ভাই সিদ্দিক ও তার লোকজন আমাকে মারধর করে বলে, তোরা খারদিয়া গ্রামের কোনো লোকজন ময়েনদিয়া বাজারে আর আসবি না।

ময়েনদিয়া বাজারের ইজারাদার টুলু মিয়া বলেন, আমার বাড়ি খারদিয়া হওয়ায় সংঘর্ষের পর থেকে বাজার থেকে ইজারার টাকা তুলতে দিচ্ছে না মান্নান চেয়ারম্যানের সমর্থকরা। আমার লোকজন বাজারে গেলেই তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বাজার থেকে বের করে দেয়। এমন অবস্থায় বাজার থেকে ইজারার টাকাও তুলতে পারছি না।

শাহিন মিয়া নামে ময়েনদিয়া বাজারের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থেকে বাজারের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তারা নিজেরা ব্যবসা করতে না পারলে অন্যদেরও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং ব্যবসায়ীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে বর্তমানে বাজারের পরিস্থিতি  স্বাভাবিক রয়েছে।

অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জেলে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তার ভাই ময়েনদিয়া বাজারের বাসিন্দা সিদ্দিক মাতুব্বরের ছেলে মো. শাহিন মিয়া বলেন, গত ৫ আগস্টের ঘটনার পর তার চাচা পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মান্নান মাতুব্বরের বাড়িসহ তাদের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। এরপর প্রায় দেড় বছর তারা নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেননি।

তিনি বলেন, যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। তার দাবি, বাজারে এখনো স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে এবং অধিকাংশ ব্যবসায়ী নির্ভয়ে দোকান খুলছেন। যারা বাজারে আসতে পারছেন না বা আসছেন না, তাদের একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম  বলেন, অনেক আগে থেকেই ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রন নিয়ে ওই দুই পক্ষের মধে বিরোধ চলমান ছিলো, উভয় পক্ষের দায়ের করা একাধীক মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ গত ১৪  ফেব্রুয়ারী ময়েনদিয়া ও খারদিয়াবাসীর মধ্যে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়, বেশ কয়েকটি দোকানে অগ্নি সংযোগ ও লুটপাট করা হয়। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নজরে রেখছে জেলা পুলিশ বিভাগ।

তিনি বলেন, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দায়ের করা মামলায় আমরা বেশ কিছু আসামিকে ধরতে সক্ষম হয়েছি, আরো কয়েকজনকে খুঁজছি, আশা করি ধরতে সক্ষম হব শীঘ্রই। এ ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় চাপা ক্ষোভ রয়েছে। সাধারণ মানুষ ও নিরাপরাধ ব্যবসায়ীরা যাতে বাজার এলাকায় নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করতে পারে তার নিশ্চয়তা দিতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। কোন নিরীহ বা নির অপরাধ লোককে করা হবে না। কেউ কাউকে হুমকি দিলেও সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাধারণ মানুষের কাজকর্ম ও চলাচলে বাধা দিলে কোন ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।