খুঁজুন
মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, ৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ফরিদপুরের চারটি আসনে ভোটের ঝড়ে উড়ে গেল ১৯ প্রার্থীর জামানত!

হারুন-অর-রশীদ ও এহসানুল হক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরের চারটি আসনে ভোটের ঝড়ে উড়ে গেল ১৯ প্রার্থীর জামানত!

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর জেলার চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৯ জনই জামানত হারিয়েছেন। মোট প্রার্থীর প্রায় ৬৮ শতাংশ প্রয়োজনীয় ভোটের এক-অষ্টমাংশ অর্জন করতে না পারায় তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে চারটি আসনেই শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। রাতেই বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণ থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল কয়েকটি বড় দলের মধ্যে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ৪৪(৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী মোট প্রদত্ত বৈধ ভোটের ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কম ভোট পেলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এবারের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়-পরাজয়ের কারণে অধিকাংশ প্রার্থী এই শর্ত পূরণ করতে পারেননি।

🔹 ফরিদপুর-১ (মধুখালী-বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা):

এই আসনে মোট ভোটার ছিল ৫,১০,৫৪০ জন। বৈধ ভোট পড়ে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৯৮টি। জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৯ হাজার ৮৭৫ ভোট।

এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মো. ইলিয়াস মোল্লা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১,৫৪,১৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির খন্দকার নাসিরুল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীকে পান ১,২৬,৪৭৬ ভোট।

অন্য প্রার্থীদের মধ্যে

মো. আবুল বাসার খান (স্বতন্ত্র) ফুটবল প্রতীকে ৩৪,৩৮৭ ভোট, মো. গোলাম কবীর মিয়া (স্বতন্ত্র) মোটরসাইকেল প্রতীকে ২,১৫৯ ভোট, মৃন্ময় কান্তি দাস (বিএমজেপি) রকেট প্রতীকে ৭৮৬ ভোট, সুলতান আহম্মেদ খান (জাতীয় পার্টি) লাঙ্গল প্রতীকে ৫০৬ ভোট, মো. হাসিবুর রহমান (স্বতন্ত্র) হরিণ প্রতীকে ৪৫৫ ভোট এবং শেখ আব্দুর রহমান জিকো (স্বতন্ত্র) উট প্রতীকে ৮৪ ভোট পান।

এখানে বিজয়ী ও রানারআপ ছাড়া বাকি ছয়জনই জামানত হারিয়েছেন

🔹 ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা ও সালথা):

এ আসনে মোট ভোটার ছিল ৩,৩২,০৪১ জন। বৈধ ভোট পড়ে ২ লাখ ১৪ হাজার ৯১৬টি। জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ২৬ হাজার ৮৬৫ ভোট।
এ আসনে বিএনপির শামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকু ধানের শীষ প্রতীকে ১,২১,৬৯৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মো. আকরাম আলী রিক্সা প্রতীকে পান ৮৯,৩০৫ ভোট।

অন্য প্রার্থীরা

শাহ মো. জামাল উদ্দীন (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) হাতপাখা প্রতীকে ২,৩৬৮ ভোট,
ফারুক ফকির (গণঅধিকার পরিষদ) ট্রাক প্রতীকে ৬৭৫ ভোট, আকরামুজ্জামান (ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ) আপেল প্রতীকে ৬১৭ ভোট এবং মো. নাজমুল হাসান (বাংলাদেশ কংগ্রেস) ডাব প্রতীকে ২৫৭ ভোট পান।

এখানে বিজয়ী ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া বাকি চারজন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

🔹 ফরিদপুর-৩ (সদর উপজেলা):

এই আসনে মোট ভোটার ছিল ৪,৩২,৬২১ জন। বৈধ ভোট পড়ে ২ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৩টি। জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৪ হাজার ৮৯৩ ভোট।

এ আসনে বিএনপির চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ ধানের শীষ প্রতীকে ১,৪৮,৫৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. আবদুত তাওয়াব দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ১,২৪,১১৫ ভোট।

অন্যান্য প্রার্থীরা—

কে এম ছরোয়ার (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) হাতপাখা প্রতীকে ৪,০২২ ভোট, মোরশেদুল ইসলাম আসিফ (স্বতন্ত্র) হরিণ প্রতীকে ১,২৫৩ ভোট, মো. রফিকুজ্জামান মিয়া (বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি) কাস্তে প্রতীকে ৯৫৭ ভোট এবং
আরিফা আক্তার বেবী (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) তারা প্রতীকে ২৫১ ভোট পান।

এখানে বিজয়ী ও রানারআপ ছাড়া বাকি চারজন প্রার্থীর জামানত জব্দ হয়েছে।

🔹 ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা-সদরপুর ও চরভদ্রাসন):

এই আসনে মোট ভোটার ছিল ৪,৯৬,৭০৬ জন। বৈধ ভোট পড়ে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯২টি। জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৪ হাজার ৩৭৪ ভোট।

এ আসনে বিএনপির মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল ধানের শীষ প্রতীকে ১,২৭,৪৪৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. সরোয়ার হোসাইন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ৭৫,৮০৫ ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এ.এম. মুজাহিদ বেগ ফুটবল প্রতীকে পান ৫৬,১৬০ ভোট—এই তিনজন জামানত রক্ষা করেন।

অন্য প্রার্থীরা

মো. ইসহাক চোকদার (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) হাতপাখা প্রতীকে ১১,৪৯৮ ভোট, মুহাম্মদ মজিবুর হোসেইন (স্বতন্ত্র) ঘোড়া প্রতীকে ১,৭০৪ ভোট, মিজানুর রহমান (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস) রিক্সা প্রতীকে ১,১১৮ ভোট,
আতাউর রহমান (বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি) কাস্তে প্রতীকে ৭১৪ ভোট এবং মুফতি রায়হান জামিল (জাতীয় পার্টি) লাঙ্গল প্রতীকে ৫৫০ ভোট পান।

এদের মধ্যে পাঁচজনের জামানত জব্দ হয়েছে।

সার্বিক চিত্র:

ফরিদপুরের চারটি আসনে মোট ভোটার ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৭১ হাজার ৯০৮ জন। নির্বাচনে অংশ নেন ২৮ জন প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপি তিনটি আসনে (ফরিদপুর-২, ৩ ও ৪) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি আসনে (ফরিদপুর-১) জয়লাভ করে।

ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও ফলাফলে বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশ আসনেই ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে ব্যর্থ হন এবং তাদের বড় অংশ জামানত হারান।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, যারা নির্ধারিত ভোটের কম পেয়েছেন, তাদের জামানতের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হবে।

ফরিদপুরের সদরপুরে আইএফআইসি ব্যাংকের উদ্যোগে আর্থিক সাক্ষরতা বিষয়ক সেমিনার

সদরপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, ৪:৫১ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের সদরপুরে আইএফআইসি ব্যাংকের উদ্যোগে আর্থিক সাক্ষরতা বিষয়ক সেমিনার

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঞ্চয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে আর্থিক সাক্ষরতা বিষয়ক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল ১০টায় উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চর কৃষ্ণপুর গ্রামের চাইল্ড ড্রিম কিন্ডারগার্টেন স্কুলে এ সেমিনারের আয়োজন করে আইএফআইসি ব্যাংকের হাট কৃষ্ণপুর উপ-শাখা (পিএলসি)।

সেমিনারে ব্যাংকিং কার্যক্রম, সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তা, নিরাপদ লেনদেন, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এবং আর্থিক পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইএফআইসি ব্যাংকের হাট কৃষ্ণপুর উপ-শাখার অফিসার ইন-চার্জ প্রসেনজিৎ ভৌমিক, সেলস অ্যাসোসিয়েট আনন্দ রায় এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর হোসেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপ-শাখার ট্রানজ্যাকশন সার্ভিস অফিসার গোলাম রহমান পাভেল, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকবৃন্দ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

অনুষ্ঠানে অফিসার ইন-চার্জ প্রসেনজিৎ ভৌমিক বলেন, ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের আর্থিক বিষয়ে সচেতন করে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে তারা সঠিকভাবে অর্থ ব্যবস্থাপনা করতে সক্ষম হবে। তিনি অভিভাবকদের নিয়মিত সঞ্চয় গড়ে তোলা এবং নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

সেমিনার শেষে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। পাশাপাশি আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে বলে জানান আয়োজকরা।

“সত্য, সাহস আর মানবিকতার প্রতিচ্ছবি ছিলেন সাংবাদিক আজিজ”

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, ৪:৩৩ অপরাহ্ণ
“সত্য, সাহস আর মানবিকতার প্রতিচ্ছবি ছিলেন সাংবাদিক আজিজ”

সাংবাদিক সমাজে কিছু মানুষ থাকেন, যারা শুধুই একজন সংবাদকর্মী নন—একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আস্থা আর একটি ছায়ার নাম হয়ে ওঠেন। এম.এ আজিজ ছিলেন ঠিক তেমনই একজন মানুষ। ফরিদপুরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সবার প্রিয় “সাংবাদিক আজিজ ভাই” হিসেবে খ্যাত।

দৈনিক ভোরের ডাক পত্রিকার ফরিদপুর জেলা সংবাদদাতা হিসেবে দীর্ঘদিন নিষ্ঠা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। পাশাপাশি ফরিদপুর প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক হিসেবেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক, আন্তরিক এবং মানবিক গুণে ভরপুর।

তিনি মানুষের খুব কাছে যেতে জানতেন। ছোট-বড়, ধনী-গরিব, পরিচিত-অপরিচিত—সবাইকে আপন করে নিতেন সহজ হাসি আর মায়াভরা কথায়। কারও বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়াতে কখনো দ্বিধা করতেন না। একটি মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তৃণমূলের নির্যাতিত ও অসহায় মানুষও তার কাছ থেকে পেয়েছেন সাহস, সহযোগিতা ও ন্যায়বিচারের আশ্বাস। ব্যক্তিত্ব, সততা আর মানবিকতায় তিনি ছিলেন অনন্য এক মানুষ।

ফরিদপুরের সাংবাদিক অঙ্গনেও আজিজ ভাই ছিলেন এক আলোকবর্তিকা। নবীন সাংবাদিকদের হাতে-কলমে শিখিয়েছেন সংবাদকর্মের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ আর সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস। কেউ সমস্যায় পড়লে ছুটে যেতেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে। এজন্যই সাংবাদিক সমাজের সবার হৃদয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন গভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায়।

আজও খুব স্পষ্ট মনে পড়ে একটি দিনের কথা। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক আত্মীয়কে ভর্তি করাতে গিয়ে হঠাৎ দেখা হয়েছিল আজিজ ভাইয়ের সঙ্গে। আমাকে দেখেই তিনি যেন নিজের ছোট ভাইয়ের মতো পাশে দাঁড়ালেন। হাসপাতালের পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আত্মীয়ের চিকিৎসার বিষয়টি আন্তরিকভাবে দেখার অনুরোধ করেছিলেন। সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম—মানুষ হিসেবে তিনি কতটা বড় মনের ছিলেন।

সময়ের নির্মম নিয়মে সেই মানুষটি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। ২০২২ সালের ১৯ মে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরও একটি বছর। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর অশেষ কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি প্রিয় আজিজ ভাইকে।

মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে, ভালোবাসায় আর মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া স্মৃতিতে। এম.এ আজিজ তেমনই একজন মানুষ, যিনি ফরিদপুরের সাংবাদিক সমাজ ও অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছেন নিভৃত আলো হয়ে।

আল্লাহ যেন প্রিয় আজিজ ভাইকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। ওপারে ভালো থাকবেন আজিজ ভাই। আপনার মতো মানুষ কখনো হারিয়ে যান না, স্মৃতির ভাঁজে আজীবন বেঁচে থাকেন।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

ফরিদপুরে খাল পুনঃখনন দেখিয়ে বন বিভাগের দুই শতাধিক গাছ কাটার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে খাল পুনঃখনন দেখিয়ে বন বিভাগের দুই শতাধিক গাছ কাটার অভিযোগ

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে সরকারি খাল পুনঃখনন প্রকল্পকে ঘিরে বন বিভাগের সামাজিক বনায়নের কয়েকশ গাছ কেটে ফেলার অভিযোগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, খাল খননের প্রয়োজনের অতিরিক্ত গাছ কেটে প্রভাবশালীরা তা লোপাট করেছে। এ ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাব, বন বিভাগের তদারকির দুর্বলতা এবং সামাজিক বনায়ন কমিটির ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের তীর উঠেছে স্থানীয় রাজনৈতিক বিএনপি নেতাদের দিকেও। যদিও ওই নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

উপজেলার গুনবহা ইউনিয়নের নদীয়ারচাঁদ এলাকার ‘মধুমতি নদী থেকে কামারগ্রাম সুইচগেট পর্যন্ত’ প্রায় দুই কিলোমিটার খালের পুনঃখনন কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় বোয়ালমারীতে তিনটি খাল পুনঃখননের কাজ হচ্ছে। এর মধ্যে এই খালটির কাজ ঘিরেই সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক।

সোমবার (১৮ মে) এ ঘটনায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শিব্বির আহমেদকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী শনিবার (২৩ মে) সরেজমিন তদন্ত কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তদন্তে কতগুলো গাছ কাটা হয়েছে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত গাছ কাটা হয়েছে কিনা এবং কারা জড়িত, এসব বিষয় খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ফরিদপুর বন বিভাগের উদ্যোগে গুনবহা ইউনিয়নের তালতলা থেকে ভেন্নাতলা বাজার পর্যন্ত সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১০ হাজার গাছ রোপণ করা হয়। দীর্ঘদিনে নদের খালের দুই পাড়জুড়ে গড়ে ওঠে সবুজ বেষ্টনী। ওইসব গাছের মধ্যে অধিকাংশই ছিল মেহগনি ও শিশু প্রজাতির।

অভিযোগ উঠেছে, খাল পুনঃখননের সময় খালের দক্ষিণ পাড় থেকে অন্তত দুই থেকে তিন শতাধিক গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, বন বিভাগের অনুমতি ছাড়াই গাছ কাটা হয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী কাটা গাছ বন বিভাগের জিম্মায় জমা না দিয়ে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “খাল কাটার নামে বৃক্ষ নিধন” শিরোনামে ভিডিও ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে।

এরপর গত রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রাকিবুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে সামাজিক বনায়ন কমিটির সভাপতি ও নদেরচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হেমায়েতউদ্দিনের বাড়ি থেকে কেটে ফেলা প্রায় শতাধিক গাছের কান্ড ও গুড়ি জব্দ করা হয়। ঘটনার পর থেকেই হেমায়েতউদ্দিন পলাতক রয়েছেন বলে সূত্র জানায়।

স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, গুনবহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের সমর্থকরাই গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত। তবে তিনি নিজের ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন, খাল খনন প্রকল্পের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত থাকলেও গাছ কাটার ঘটনায় তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে বন বিভাগের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গাছ না কেটেও খাল খনন করা যেত। তাতে খাল থেকে যে মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে, সেই মাটি ধরে রাখতে গাছ থাকলে আরো ভালো হয়।

উপজেলা বন কর্মকর্তা দীন মোহাম্মদ মোল্লা বলেন, খাল ও খালপাড়ের গাছ পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে খননকাজের সুবিধার্থে গাছ অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে, তবে নিয়মের বাইরে কোনো কর্মকান্ড গ্রহণযোগ্য নয়। বন বিভাগ থেকে কাউকে গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের কথা প্রথমদিকে তো শুনতেই চান না তারা, পরে না হয় আপনারা লেখালেখি করার কারণে হইতো সম্ভব হয়েছে গাছ কাটা ঠেকানো।

বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রাকিবুল ইসলাম বলেন, বোয়ালমারী পাট উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। খালে পানি না থাকায় কৃষকরা পাট জাগ দিতে সমস্যায় পড়ছেন। খাল খননের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ সম্ভব হলে কৃষকরা উপকৃত হবেন। তবে নিয়মের বাইরে কোনো গাছ কাটা হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি জমির গাছ কেউ ব্যক্তিগতভাবে নিতে পারবে না; নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।

ফরিদপুর বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনো গাছ কাটার সুযোগ নেই। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, উদ্ধারকৃত গাছের গুড়ি গুলি নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে।