খুঁজুন
শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ২২ ফাল্গুন, ১৪৩২

পবিত্র রমজানে পাপে জড়ালে কী ক্ষতি হয়? ইসলাম যা বলে

মাওলানা আবদুল হাকিম
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৭:৩৪ এএম
পবিত্র রমজানে পাপে জড়ালে কী ক্ষতি হয়? ইসলাম যা বলে

জীবনের সব ধরনের পাপ থেকে পরিশুদ্ধতা অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ রমজান। পবিত্র এ মাসে মহান রবের ইবাদত-উপাসনায় আলোকিত হয় মুমিনের জীবন। সফল তো তারাই, যারা অতীতের পাপমোচন করাতে পারে অবারিত রহমত অর্জনের এ মাসে। তবে ব্যর্থ তারা, যারা রমজান মাস পেয়েও নিজের পাপমোচন করাতে পারে না।

রোজা রেখেও পাপে জড়ানোর পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। এদের ব্যাপারে স্বয়ং জিবরাইল (আ.) বদদোয়া করেছেন এবং নবী কারিম (সা.) রাহমাতুল্লিল আলামিন হয়েও ‘আমিন’ বলে সমর্থন জানিয়েছেন।

হাদিসে বর্ণিত আছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববীর মিম্বারের একেকটি সিঁড়িতে পা রাখার সময় ‘আমিন আমিন আমিন’ তিনবার বলেছিলেন। উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আজকে এমন একটি কাজ আপনি করলেন, যা কখনো করতে দেখিনি। এর কারণটা কী? আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, কী বিষয়ে? সাহাবায়ে কেরাম (রা.) বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি ‘আমিন আমিন আমিন’ তিনবার বললেন। তখন নবী কারিম (সা.) বললেন, আমি যখন মিম্বারের প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলাম, তখন জিবরাইল (আ.) বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেয়েও (তাদের খেদমত করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। তখন আমি তাকে সমর্থন করে বললাম ‘আমিন’ (হে আল্লাহ কবুল করো)। অতঃপর তিনি বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যে রমজান পেয়েও নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না। আমি তাকে সমর্থন করে বললাম ‘আমিন’। হজরত জিবরাইল (আ.) আবারও বললেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক যার কাছে আমার নাম আলোচিত হলো অথচ সে আমার ওপর দরুদ পড়ল না। আমি তার বক্তব্যকে সমর্থন করে বললাম ‘আমিন’। (ইবনে হিব্বান: ৯০৮; আল-আদাবুল মুফরাদ: হাদিস ৬৪৬)

অথচ আমাদের যেন বিকার নেই। ভাবনা নেই। রমজান মাস পেয়েও লাগামহীন পাপে বিভোর অনেকে। বড় আক্ষেপের বিষয়, এ পবিত্র মাসেও ভেসে আসে গান-বাজনার আওয়াজ। কেউ কেউ প্রকাশ্যে পানাহার করে বেড়ায়। নামাজ-রোজার কথা ভুলে গিয়ে চলে খেলাধুলার প্রতিযোগিতা। অবসরতা কাটাতে কোথাও জমে ওঠে জুয়া ও আড্ডার আসর। এসব রমজানের পবিত্রতা ও মহত্ত্বকে ধ্বংস করে। কেউ দিনভর রোজা রাখে, আবার গিবত, পরনিন্দা ও মিথ্যা কথাসহ বিভিন্ন পাপ কাজেও লিপ্ত থাকে। এমন ব্যক্তির ভাগ্যে শুধু ক্ষুধাই জোটে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কত রোজাদার আছে, যাদের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কত সালাত আদায়কারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।’ (ইবনে মাজা: ১৬৯০)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও তদানুযায়ী আমল করা বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি: ১৯০৩)

পাপের উপসর্গ নিয়ে বেড়ে উঠেছে যার জীবন, অন্যায়ের প্রবণতা মিশে আছে রক্ত কণিকায়, পবিত্র রমজান মাসেও যে ব্যক্তি পাপ-পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারছে না—তার উচিত আল্লাহর কাছে বেশি বেশি প্রার্থনায় মনোনিবেশ করা। কেননা দোয়া হলো মুমিনের হাতিয়ার। যেভাবে আল্লাহ শারীরিক অসুস্থতা থেকে সুস্থ করেন, সেভাবেই তিনি আত্মার ব্যাধির প্রতিকার করেন। আল্লাহর দরবারে ঝরা অশ্রু, বৃথা যায় না কখনো। পাপের ভারে ন্যুব্জ বান্দা যখন আল্লাহকে ডাকে তখন তিনি সাড়া দেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ডাকো আমায়, সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: ৬০)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘কে তিনি যিনি আর্তের ডাক শোনেন, যখন সে তাকে ডাকে এবং কে তার দুঃখ দূর করেন!’ (সুরা নামল: ৬২)। পাপের আঁধারে নিমজ্জিত ব্যক্তির পক্ষে রাতারাতি পাপমুক্ত হওয়া দুষ্কর, এর জন্য চাই ধৈর্য ও অবিরাম চেষ্টা। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে পরিচালিত হওয়ার চেষ্টা করে, আল্লাহ তার পথ খুলে দেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনকাবুত: ৬৯)

পাপের আনন্দ শেষ হয়ে থেকে যায় এর অশুভ পরিণাম। ইবাদতের কষ্ট শেষ হয়ে থেকে যায় এর শুভ পরিণাম। তাই পাপের শাস্তি ও এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে চিন্তার মাধ্যমে পাপমুক্ত হওয়া সহজ। আখেরাতের অপেক্ষমাণ কঠিন আজাব ছাড়াও এ পৃথিবীতে পাপের নগদ শাস্তি হলো—দুঃখ, দুর্দশা, অশান্তি, অস্থিরতা ও হতাশা। এ ছাড়া পাপের কারণে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার দূরত্ব তৈরি হয়; পাপী ব্যক্তি থেকে তার রহমতের দৃষ্টি উঠে যায়। তারা বিপদাপদ ও বিপর্যয়ে আপতিত হয়, দুরারোগ্য রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয় এবং রুজিরোজগারের সংকটে জর্জরিত হয়। গুনাহ যেমনভাবে মানুষের শারীরিক কষ্ট ও শাস্তির কারণ, তেমনিভাবে তা আত্মিক রোগব্যাধিরও কারণ। কারও থেকে একটি গুনাহ সংঘটিত হলে সেটি আরেকটি গুনাহতে লিপ্ত হওয়ার কারণ হয়। হাফেজ ইবনুল কাইয়্যুম (রহ.) বলেন, গুনাহের একটি নগদ শাস্তি হলো, এর দ্বারা সে আরেকটি গুনাহের শিকার হয়। অনুরূপভাবে নেক কাজের একটি নগদ পুরস্কার হলো, একটি নেক কাজ আরেকটি নেক কাজের দিকে টেনে নেয়। (মায়ারেফুল কোরআন: ৭/৭০১)।

রমজানে অভিশাপ্ত শয়তানকে বন্দি করে রাখা হলেও প্রত্যেকের সঙ্গে ‘নফসে আম্মারা’ কিন্তু ঠিকই রয়েছে, যা মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয় এবং কুপ্রবৃত্তির প্রতি আহ্বান করে। তাই সব ধরনের গুনাহের উপকরণ থেকে দূরে থাকতে হবে, বিশেষত দৃষ্টি হেফাজত করতে হবে।

রমজান সংযমের মাস, সাধনার মাস, ত্যাগের মাস। কিন্তু আমরা রমজানের এ বার্তাকে ভুলে গিয়ে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিদের অনুসৃত পথ পরিহার করে সেহরি ও ইফতারে এতটাই ভোজনবিলাসী হয়ে উঠি—যা রমজানের সংযম, সাধনা ও ত্যাগের বার্তাকে ভুলিয়ে দেয়। ফলে আমাদের কুপ্রবৃত্তি দুর্বল না হয়ে আরও হিংস্র ও পাশবিক হয়ে ওঠে। কাম, লিপ্সা, মোহ আরও বেড়ে যায়। সুকুমারবৃত্তিগুলো বিকশিত না হয়ে আরও নিস্তেজ হয়ে যায়।

রমজানে গুনাহ থেকে বাঁচতে হলে অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে সৎ সঙ্গ গ্রহণ করতে হবে। কেননা মানুষ পাপ কাজে অসৎ সঙ্গীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই পাপ থেকে বেঁচে থাকতে সৎ ও ভালো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত। মহানবী (সা.) ভালো মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘তুমি মুমিন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও সঙ্গী হবে না এবং তোমার খাদ্য যেন পরহেজগার লোকে খায়।’ (আবু দাউদ: ৪৮৩২)।

আমাদের সবার মনে সর্বদা এ চেতনা জাগ্রত রাখতে হবে—প্রতিমুহূর্তে আমরা যা করছি আল্লাহতায়ালা তা দেখছেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখেন।’ (সুরা হুজরাত: ১৮)। আর এভাবে আল্লাহর ধ্যান দিলে জাগরূক রাখতে পারলেই পাপমুক্ত জীবনযাপন সম্ভব। তখন কেউ কারও ওপর জুলুম করবে না, একে অন্যের হক নষ্ট করবে না। আল্লাহতায়ালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করবে না এবং যাবতীয় অন্যায়-অপরাধ ও পাপাচারে লিপ্ত হবে না। এরই নাম তাকওয়া। রহমতের এ বসন্তকালে আসুন আমরা খোদাভীতি অর্জন করি এবং নিজেদের পাপকর্মের জন্য খাঁটি মনে তওবা করে ভবিষ্যতেও যাবতীয় পাপকর্ম থেকে বেঁচে থাকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করে একটি পুণ্যময় রমজান কাটাই। তবেই অনিন্দ্য সুন্দর হবে আমাদের ইহকাল-পরকাল।

লেখক: ইমাম ও খতিব

 

নারীরা পরকীয়ায় বেশি জড়িয়ে পড়ে কেন? জানলে অবাক হবেন

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৯:৫৪ এএম
নারীরা পরকীয়ায় বেশি জড়িয়ে পড়ে কেন? জানলে অবাক হবেন

পরকীয়ায় নারীরা জড়িয়ে পড়ে কেন? সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত-নারী পরকীয়ায় জড়ালে সেটা নাকি “চরিত্রের সমস্যা”। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর পরকীয়া শরীর থেকে নয়, শুরু হয় মন থেকে।

১. মানসিক অবহেলা ও একাকীত্ব অনেক নারী সংসারে থেকেও ভীষণ একা। স্বামী শারীরিকভাবে পাশে থাকলেও মানসিকভাবে অনুপস্থিত। কথা নেই, যত্ন নেই, অনুভব করার কেউ নেই। এই দীর্ঘ একাকীত্ব একদিন তাকে এমন একজনের দিকে ঠেলে দেয়, যে অন্তত তার কথা শোনে।

২. ভালোবাসা ও স্বীকৃতির অভাব নারী চায় না অনেক কিছু-সে শুধু চায় কেউ তাকে বুঝুক, বলুক- “তুমি গুরুত্বপূর্ণ।” যখন স্বামীর কাছ থেকে সে স্বীকৃতি পায় না, আর অন্য কেউ একটু প্রশংসা করে, তখন সেই প্রশংসাই হয়ে ওঠে ভয়ংকর মায়া।

৩. দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি প্রতিদিন একই রুটিন, কোনো আবেগ নেই, কোনো রোমান্স নেই। নারীর মনও তো অনুভূতির-সে চায় নতুন করে ভালোবাসা অনুভব করতে। এই একঘেয়েমিই অনেক সময় তাকে ভুল সিদ্ধান্তে ঠেলে দেয়।

৪. দীর্ঘদিনের দমন করা কষ্ট অনেক নারী বছরের পর বছর অপমান, অবহেলা, কঠিন কথা, কিংবা নির্যাতন সহ্য করে। এক সময় সে ভেঙে পড়ে। আর তখন যে একটু সহানুভূতি দেখায়, সেই মানুষটাকেই সে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে।

৬৫. সামাজিক মাধ্যম ও সহজ যোগাযোগ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ-আজ যোগাযোগ খুব সহজ। একটা ইনবক্স, একটা “তুমি কেমন আছো?” এই ছোট কথাগুলোই অনেক সময় নারীর দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণ করে ফেলে।

৬. আত্মমূল্যবোধ হারিয়ে ফেলা যখন একজন নারী বারবার শুনতে থাকে-“তুমি কিছুই পারো না”, “তোমার কোনো মূল্য নেই”-তখন সে নিজেকেই ভুলে যায়। আর কেউ যদি তাকে নতুন করে মূল্যবান মনে করায়, সে সেখানে জড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু সত্যিটা কী?

নারীর পরকীয়া খুব কম ক্ষেত্রেই পরিকল্পিত। এটা বেশিরভাগ সময় অবহেলার প্রতিক্রিয়া। ভালোবাসা না পেলে, মানুষ মায়া খোঁজে। আর সেই মায়া একদিন পরকীয়ায় রূপ নেয়।

সমাধান কোথায়?

স্ত্রীকে শুধু দায়িত্ব নয়, মানুষ হিসেবে অনুভব করুন।

তার কথা শুনুন, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন।

ভালোবাসা প্রকাশে কৃপণতা করবেন না।

← মনে রাখুন-

যেখানে ভালোবাসা থাকে, সেখানে পরকীয়ার জায়গা হয় না।

শেষ কথা:

পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া কোনো নারী হঠাৎ খারাপ হয়ে যায় না।

সে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে-

অবহেলা, একাকীত্ব আর না-পাওয়ার ভারে।

তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত-

“নারী কেন পরকীয়ায় জড়ায়?” না, “আমরা তাকে কী দিতে পারিনি?”

‘গ্রামের সেই বন্ধুরা আজ আর নেই’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৮:৪০ এএম
‘গ্রামের সেই বন্ধুরা আজ আর নেই’

অনেক বছর পর আজ আবার গ্রামে ফিরেছি। বাস থেকে নামতেই কাঁচা রাস্তার ধুলো, বাতাসে ধানের গন্ধ আর দূরে বাঁশবাগানের মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে মনে হলো যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সময় কখনও থামে না। শুধু মানুষ বদলে যায়, দৃশ্যপট বদলে যায়, আর একসময় বুঝতে পারি—যাদের সঙ্গে জীবনটা শুরু হয়েছিল, তারা কেউ আর পাশে নেই।

আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম সেই পুরোনো রাস্তা ধরে। রাস্তার পাশে সেই পুকুরটা এখনও আছে। তবে আগের মতো কচুরিপানায় ভরা নয়। পাড়ে এখন ইট বসানো হয়েছে। পুকুরের দিকে তাকাতেই মনে পড়ে গেল সেই বিকেলগুলোর কথা—যখন আমরা পাঁচজন বন্ধু এখানে এসে ঝাঁপ দিতাম।

আমি, রফিক, জাহিদ, বাবলু আর শামীম।
আমাদের বন্ধুত্বটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু তাতে ছিল অদ্ভুত এক শক্তি। তখন মোবাইল ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না। ছিল শুধু মাঠ, নদী, কাদামাটি আর একে অপরের সঙ্গ।

স্কুল ছুটির পর আমরা দৌড়ে চলে যেতাম মাঠে। কেউ বল নিয়ে আসত, কেউ ব্যাট। কখনও ফুটবল, কখনও ক্রিকেট—যেটা পাওয়া যেত সেটাই খেলতাম। খেলার শেষে সবাই মিলে পুকুরে ঝাঁপ দিতাম। কারও মা দূর থেকে চিৎকার করে ডাকত—
“এই রফিক! বাড়ি আয়, সন্ধ্যা হয়ে গেছে!”
রফিক তখন হেসে বলত,
“আর পাঁচ মিনিট!”

সেই পাঁচ মিনিট কখনও পাঁচ মিনিটে শেষ হতো না।
একদিন বর্ষার বিকেলে আমরা সবাই মিলে নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়েছিলাম। নদীটা তখন বেশ ফুলে উঠেছিল। জাহিদ একটু ভয় পেয়েছিল। সে বলেছিল,
“দোস্ত, আজ না যাই?”
কিন্তু বাবলু বলেছিল,
“আরে ভয় কিসের? আমরা তো আছিই!”
আমরা সবাই হেসেছিলাম। সেই হাসির শব্দ এখনও যেন বাতাসে ভেসে আসে।

গ্রামের জীবন ছিল সহজ। বিকেলে তালগাছের ছায়ায় বসে গল্প করা, মেলা এলে সবাই মিলে ঘুরতে যাওয়া, ঈদের দিন নতুন জামা পরে একে অপরের বাড়িতে বেড়ানো—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের আনন্দ।

কিন্তু সময় ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।
প্রথমে জাহিদ চলে গেল শহরে পড়তে। সে বলেছিল,
“ভালো রেজাল্ট করলে ঢাকায় কলেজে পড়ব।”
আমরা সবাই তাকে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল কয়েকদিনের জন্যই যাচ্ছে। কিন্তু সেই কয়েকদিন ধীরে ধীরে কয়েক বছরে বদলে গেল।

তারপর রফিকও কাজের জন্য চলে গেল চট্টগ্রামে। বাবলু বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত। একদিন সত্যিই সে মালয়েশিয়া চলে গেল। শামীম গ্রামের বাজারে একটা দোকান দিল।
আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শহরে চলে গেছি।

প্রথম দিকে আমরা ফোনে কথা বলতাম। মাঝে মাঝে ঈদের সময় দেখা হতো। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল, ততই যোগাযোগ কমে গেল।
একদিন খবর পেলাম—রফিক আর নেই।
কারখানায় কাজ করার সময় একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল। খবরটা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। বিশ্বাসই হচ্ছিল না।
তারপর কয়েক বছর পর শুনলাম শামীম অসুস্থ হয়ে মারা গেছে।

বাবলু এখনও বিদেশেই আছে, কিন্তু বহু বছর তার কোনো খবর নেই। জাহিদ নাকি ঢাকায় বড় চাকরি করে, কিন্তু তার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল প্রায় দশ বছর আগে।

আজ এত বছর পর গ্রামে ফিরে বুঝতে পারছি—আমাদের সেই ছোট্ট পৃথিবীটা আর নেই।
আমি হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরোনো স্কুলের সামনে এসে দাঁড়ালাম। স্কুলের দেয়াল নতুন করে রং করা হয়েছে। মাঠটাও আগের চেয়ে ছোট মনে হচ্ছে।
এক কোণে কয়েকটা ছোট ছেলে ক্রিকেট খেলছে। তাদের হাসির শব্দ শুনে হঠাৎ মনে হলো—আমরাও তো একদিন এমনই ছিলাম।

হয়তো তারা এখন বুঝতে পারছে না, কিন্তু একদিন তারাও বড় হবে। কেউ শহরে যাবে, কেউ বিদেশে। কেউ হয়তো আর ফিরেও আসবে না।
আমি মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাদের খেলা দেখলাম।
হঠাৎ মনে হলো, যদি এখন রফিক এসে বলে—
“এই দোস্ত, খেলবি?”
যদি জাহিদ এসে বলে—
“আজ নদীতে যাবি?”

যদি বাবলু সেই আগের মতো হেসে ওঠে।
কিন্তু জানি, সেটা আর কখনও হবে না।
বিকেলের সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। বাতাসে আবার সেই পুরোনো গ্রামের গন্ধ। কিন্তু এই গন্ধের ভেতরেও একটা শূন্যতা আছে।
আমি পুকুরের পাড়ে গিয়ে বসে পড়লাম। পানিতে সূর্যের আলো ঝিলমিল করছে।

মনে হলো, আমাদের শৈশবটা ঠিক এই পানির ঢেউয়ের মতো—একসময় ছিল, খুব কাছেই ছিল। কিন্তু এখন শুধু স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।
হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বললাম—
“বন্ধুরা, তোমরা যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।
এই গ্রামটা এখনও আছে, এই পুকুরটা এখনও আছে…
শুধু তোমরা আর নেই।”

সন্ধ্যার আজানের ধ্বনি ভেসে এলো দূরের মসজিদ থেকে।
আর আমি বুঝলাম—জীবন সামনে এগিয়ে যায়, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর কোথাও না কোথাও সেই গ্রামের বন্ধুরা চিরকাল বেঁচে থাকে।

লেখক: হারুন-অর-রশীদ, সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

বসন্তে বাড়ে নানা রোগ, সুস্থ থাকতে খান যেসব মৌসুমি খাবার?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৮:০৩ এএম
বসন্তে বাড়ে নানা রোগ, সুস্থ থাকতে খান যেসব মৌসুমি খাবার?

ঋতু পরিবর্তনের সময়, বিশেষ করে বসন্তকালে বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখের প্রকোপ বাড়ে। তবে প্রকৃতিতে যেমন রোগ আছে, তেমনি রয়েছে তার সমাধানও। বিশেষজ্ঞদের মতে, যে ঋতুর যে রোগ, সেই ঋতুর শাক-সবজি ও ফলেই লুকিয়ে থাকে তার প্রতিকার। তাই বাজারি খাবারের বদলে মৌসুমি খাবার খেলে শরীর সুস্থ থাকে।

ছেলেবেলায় অনেকের সকাল শুরু হতো নিমপাতা ও কাঁচা হলুদ খেয়ে। খালি পেটে ৪-৫টি নিমপাতা চিবিয়ে খাওয়ার পর মুখের তেতো কাটাতে খাওয়া হতো কাঁচা হলুদ, গোলমরিচ ও আখের গুড়। এসব উপাদান জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে। এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে হাঁচি-কাশি, জ্বর ও পেটের সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

নিমপাতায় থাকা নিম্বিন ও নিম্বোলাইডসহ প্রায় ১৩০টি উপাদান, হলুদের কারকিউমিন এবং গোলমরিচের পিপারিন শরীরকে বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি জোগায়।

কাঁচা নিমপাতা খেতে না পারলে ভাতের সঙ্গে নিম-বেগুনের তরকারি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে একদিকে জীবাণুনাশক গুণ পাওয়া যায়, অন্যদিকে বেগুনের পুষ্টিগুণও শরীরকে সমৃদ্ধ করে। এতে প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান পাওয়া যায়।

কম ক্যালোরি ও বেশি ফাইবার থাকায় ওজন নিয়ন্ত্রণেও এটি সহায়ক।

এ সময় সজনে ডাঁটা ও ফুল খাওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে শরীর প্রোটিন, ভিটামিন, ক্যালশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট পায়। এটি শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হাঁপানির প্রকোপ কমাতেও সজনে উপকারী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বসন্তকালে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি খাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। পালং শাক, মেথি শাক, মুলা শাক, ধনেপাতা, পেঁয়াজকলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলা, মটরশুঁটি, বিট, গাজর, ব্রোকোলি, ক্যাপসিকাম, টমেটো, নতুন আলু, শিম, বিনস, কুমড়ো ও পটল, এসব সবজি বিভিন্নভাবে খাওয়া যেতে পারে। সেদ্ধ, তরকারি, স্যুপ বা সালাদ হিসেবে এসব খেলে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও ফাইটোকেমিক্যাল পায়। এতে ঋতু পরিবর্তনের সময় অসুখ-বিসুখের ঝুঁকি কমে।

ভাতের সঙ্গে লেবু খাওয়াও উপকারী। ডাল, সালাদ বা ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে লেবু খেলে শরীর কিছুটা ভিটামিন সি পায়।

রাতে নয়, দিনে ফল

ফল দিনে খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে প্রাকৃতিক চিনি থাকায় রাতে ফল খেলে ওজন বাড়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। দিনের বেলায় ফল খেলে শরীরের বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে সেই চিনি খরচ হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের সময় সুস্থ থাকতে বেশি দাম দিয়ে অসময়ের ফল-সবজি না কিনে মরসুমি শাক-সবজি ও ফল খাওয়াই সবচেয়ে ভালো। এতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে।