খুঁজুন
মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

নববর্ষে মুমিনের আনন্দ, প্রত্যয় ও পরিকল্পনা

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
নববর্ষে মুমিনের আনন্দ, প্রত্যয় ও পরিকল্পনা

ইসলাম তার পরিচয়, বিধান ও বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র একটি দ্বিন ও ধর্ম। ইসলামের শিক্ষা হলো মুসলমানরা তাদের প্রাত্যহিক জীবনে স্বকীয়তা রক্ষা করবে, সে তার জীবনের কোনো পর্যায়ে নিজের মুসলিম পরিচয়কে ভুলে যাবে না, সে অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অন্ধ অনুকরণ করবে না।

এই নির্দেশনা মুসলমানের ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মুসলমানের সামাজিক ও জাতীয় জীবনেও তা প্রযোজ্য। নববর্ষ উদযাপনের ক্ষেত্রে ইসলাম মানুষকে বাস্তবমুখী হওয়ার নির্দেশনা দেয়।

 

ইসলাম বলে, একজন মুমিনের জীবনে নববর্ষ নিছক আনন্দের বিষয় নয়, বরং নিজের তা প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির হিসাব করা এবং আগামী দিনে ভালো কাজ করার প্রত্যয় গ্রহণের সময়।

নববর্ষে সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের প্রত্যাশা

ইসলাম নববর্ষে বিশেষ উৎসব আয়োজনের প্রবর্তক নয়।
ইসলাম মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়। আর ইসলামের দৃষ্টিতে নববর্ষের সঙ্গে মানুষের কল্যাণ ও অকল্যাণের বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এই উদযাপন কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের দৃষ্টি ও মনোযোগ তার মহান স্রষ্টা থেকে ফিরিয়ে নেয়।

তবে মুমিন এই দিনে আল্লাহর কাছে সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা করতে পারে। যেভাবে মহানবী (সা.) প্রত্যেক নতুন মাসের শুরুতে আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করতেন। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নতুন চাঁদ দেখে পাঠ করতেন—‘হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ওপর চাঁদকে উদিত করুন শান্তি ও ঈমানের সঙ্গে, নিরাপত্তা ও ইসলামের সঙ্গে এবং আমাদের সেসব কাজের ক্ষমতা দানের সঙ্গে, যা আপনি ভালোবাসেন এবং যাতে আপনি খুশি হন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৫১)

নববর্ষে মুমিনের করণীয়
উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতায় আবদ্ধ না থেকে মুমিন ভালো কাজের সুযোগ হিসেবে নববর্ষে কয়েকটি কাজ করতে পারে।
তা হলো—

১. প্রাপ্তির জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা : মুমিন যখন সুস্থ স্বাভাবিকভাবে একটি বছর পূর্ণ করবে, সে বছরজুড়ে ভালো কাজ করবে এবং আল্লাহর নিয়ামত লাভে সক্ষম হবে, তখন সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা আদায় করো তবে আমি অবশ্যই (আমার নিয়ামত) বাড়িয়ে দেব। আর (আমার দান) অস্বীকার করলে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অতি কঠোর।’
(সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৭)

২. দুঃখ ও বেদনার জন্য ধৈর্য ধারণ : মুমিনের যদি একটি বছরও এমন যায় যে সে সারা বছর নানা ধরনের বিপদ-আপদে জর্জরিত ছিল, তবু সে আল্লাহর অকৃতজ্ঞ হবে না, বরং একে ভাগ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে ধৈর্য ধারণ করবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে।
আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা তাদের যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই আছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৫৫-১৫৭)

৩. অতীতের ভালো-মন্দ যাচাই করা : মুমিন বিগত বছরে কোন কাজটি ভালো হলো এবং কোন কাজটি মন্দ হলো তা যাচাই করে দেখবে। যদি সে কোনো ভালো কাজ করতে সক্ষম হয়, তবে সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করবে এবং মন্দ কাজ করলে আল্লাহর কাছে তাওবা করবে। আত্মজিজ্ঞাসা বা ভালো-মন্দের যাচাই মুমিনকে ভবিষ্যতের বিপদ থেকে রক্ষা করে। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কাছ থেকে হিসাব নেওয়ার আগে তোমরা নিজেদের হিসাব গ্রহণ কোরো। তোমাদের আমলনামা পরিমাপ করার আগে তোমরা তা পরিমাপ কোরো। কেননা আজ তোমার নিজের হিসাব গ্রহণ আগামীকাল তোমার থেকে হিসাব গ্রহণের তুলনায় সহজ।’
(মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৬৩৩)

৪. ভালো কাজের প্রত্যয় গ্রহণ : মুমিন সময়ের প্রতিটি সূচনায় নেক আমল বা ভালো কাজের প্রত্যয় গ্রহণ করে, এটাই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তোমাদের যে জীবিকা দিয়েছি তোমরা তা থেকে ব্যয় করবে তোমাদের কারো মৃত্যু আসার আগে; অন্যথায় মৃত্যু এলে সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’
(সুরা : মুনাফিকুন, আয়াত : ১০)

৫. উত্তম পরিকল্পনা গ্রহণ : হাদিসের ভাষ্য অনুসারে মুমিনের চেষ্টা থাকবে যেন তার গতকালের তুলনায় আজকের দিনটি উত্তম হয়। আর উত্তম দিন মানুষের উত্তম পরিকল্পনা ও আন্তরিক চেষ্টা ছাড়া আসে না। তাই মুমিনের উচিত নববর্ষের সময় উত্তম পরিকল্পনা গ্রহণ করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ততক্ষণ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়।’
(সুরা : রাআদ, আয়াত : ১১)

মোটকথা, নববর্ষ উদযাপনে মুমিনের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে আল্লাহর কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে এবং তার আগামী দিনের পথচলা হবে ভালো কাজ ও উত্তম পরিকল্পনার মাধ্যমে। কেননা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর এই যে মানুষ তাই পায় যা সে করে, আর এই যে তার কর্ম অচিরেই দেখান হবে, অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে।’
(সুরা : নাজম, আয়াত : ৩৯-৪১)
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ফরিদপুরে এনসিপির স্মারকলিপি

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ণ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ফরিদপুরে এনসিপির স্মারকলিপি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের অবাধ চলাচল বন্ধ এবং তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে ফরিদপুরে স্মারকলিপি প্রদান করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

সোমবার (০১ জুন) এনসিপির ফরিদপুর জেলা শাখার উদ্যোগে এ স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিটি মাননীয় সংসদ সদস্য (ফরিদপুর-৩), জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং পুলিশ সুপার (এসপি), ফরিদপুর বরাবর জমা দেওয়া হয়।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রকাশ্যে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় জড়িত এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার আসামিরা এখনও ফরিদপুর শহরে অবাধে চলাফেরা করছে। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

এনসিপি নেতৃবৃন্দ বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হামলার ঘটনাগুলো শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ ছিল না, বরং গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনগণের ন্যায্য দাবির বিরুদ্ধে সহিংসতার বহিঃপ্রকাশ। তাই অভিযুক্তদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।

স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়।

স্মারকলিপি প্রদানকালে এনসিপি ফরিদপুর জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তারা হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান।

ফরিদপুরে বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ৯:১১ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার

ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের চক ভবানীপুর গ্রামে পারিবারিক বিরোধের জেরে স্ত্রীকে জোরপূর্বক সঙ্গে নিতে এসে পিস্তল প্রদর্শন ও গুলি ছোড়ার অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি ৯ এমএম পিস্তল ও এক রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। অভিযুক্ত রেজাউল শিকদার বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

সোমবার (০১ জুন) সকাল ১০টার দিকে চক ভবানীপুর গ্রামের সালেহা বেগমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, উদ্ধারকৃত পিস্তলের চেম্বারে একটি তাজা গুলি পাওয়া গেলেও এর ম্যাগাজিন উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার উত্তমপুর গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল শিকদার ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ চলছিল। প্রায় এক বছর ধরে তারা আলাদা বসবাস করছিলেন। সম্প্রতি ঈদের ছুটিতে সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন শারমিন।

রোববার গভীর রাতে রেজাউল শিকদার শ্বশুরবাড়িতে এসে স্ত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় শারমিন যেতে অস্বীকৃতি জানালে উভয়ের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়। একপর্যায়ে রেজাউল কোমর থেকে একটি পিস্তল বের করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে তিনি এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন বলেও দাবি করেন স্থানীয়রা।

এ সময় উপস্থিত পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। পরে শারমিনের মা সালেহা বেগম কৌশলে পিস্তলটি নিজের হেফাজতে নেন। রাত পেরিয়ে সকালে বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও পুলিশকে জানানো হলে কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে অস্ত্র ও গুলি জব্দ করে।

তবে পুলিশের আগমনের খবর পেয়ে কিংবা স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্ত রেজাউল শিকদার ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি পিস্তলের ম্যাগাজিন সঙ্গে নিয়ে পালিয়েছেন।

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান বলেন, “উদ্ধারকৃত বিদেশি পিস্তল ও গুলি থানায় জব্দ রাখা হয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে এবং এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।”

‘জুলাই আন্দোলন কি ভুল ছিল?’—কান্নাভেজা সেই লাইভ থেকে নেতৃত্বের মঞ্চে বৈশাখী

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ৬:১৮ অপরাহ্ণ
‘জুলাই আন্দোলন কি ভুল ছিল?’—কান্নাভেজা সেই লাইভ থেকে নেতৃত্বের মঞ্চে বৈশাখী

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এক তরুণীর নাম বৈশাখী ইসলাম বর্ষা। বয়সে তরুণ হলেও সাহস, প্রতিবাদী মনোভাব এবং সামাজিক সচেতনতার কারণে ইতোমধ্যে তিনি স্থানীয়ভাবে পরিচিত একটি নাম। ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের সংগ্রাম—সব মিলিয়ে বৈশাখী ইসলাম বর্ষার জীবন যেন এক চলমান লড়াইয়ের গল্প।

২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের ভবুকদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বৈশাখী ইসলাম বর্ষা। তার বাবা মো. ছাবু শেখ কৃষিকাজের পাশাপাশি গাছের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। মা একজন গৃহিণী। চার ভাই-বোনের মধ্যে বৈশাখী সবার বড়। মেঝো বোন চৈতী বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষার্থী, ছোট ভাই ফাহিম নবম শ্রেণিতে এবং মাহিম পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।

ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও স্বপ্নবাজ ছিলেন বৈশাখী। গ্রামের ৩৩ নম্বর ভবুকদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর মাধ্যমিক পর্যায়ে ফুলসুতি আব্দুল আলেম চৌধুরী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৮৯ অর্জন করেন। পরবর্তীতে ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৮৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।

বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয়বারের মতো প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফরিদপুরের তুষারস কেয়ার নামক একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিরলস পরিশ্রম করছেন।

তবে বৈশাখীর পরিচয় শুধু একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি নিজেকে সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে চান। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ তার জীবনদর্শনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। সেই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাকে বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখায়।

জুলাই আন্দোলনের সময় রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বৈশাখী। আন্দোলনের পর তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফরিদপুর জেলার সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্দোলনের সময়কার অভিজ্ঞতা তাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে আরও সচেতন করে তোলে।

বৈশাখীর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ৩০ মে। অভিযোগ রয়েছে, সেদিন তার ছোট বোন চৈতীকে স্থানীয় কয়েকজন বখাটে ইভটিজিং করে। বিষয়টি জানতে পেরে বৈশাখী প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ করেন। এরপর স্থানীয় কিছু বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাইভে এসে বৈশাখী প্রশ্ন তুলেছিলেন, “জুলাই আন্দোলন করা কি আমার ভুল ছিল? ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় আমাকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হলো!” তার সেই আবেগঘন বক্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এরপর জুলাই আন্দোলনের সহযোদ্ধারা তার পাশে দাঁড়াতে গেলে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এগিয়ে আসে। পরবর্তীতে বৈশাখী ইসলাম বর্ষা বাদী হয়ে নগরকান্দা থানায় দুটি মামলা দায়ের করেন। পাশাপাশি পুলিশও একটি পৃথক মামলা করে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে।

এই ঘটনার পর বৈশাখী উপলব্ধি করেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য শুধু ব্যক্তিগত প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সংগঠিত শক্তি। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র শক্তিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির ফরিদপুর জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

রাজনীতি সম্পর্কে বৈশাখীর দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ব্যতিক্রমী। তার মতে, রাজনীতি হওয়া উচিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার হাতিয়ার। তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেও তিনি মনে করেন।

শুধু রাজনীতি নয়, নিজের আর্থিক স্বাবলম্বিতার জন্যও সংগ্রাম করছেন এই তরুণী। উচ্চশিক্ষা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। সেই প্রয়োজন থেকেই তিনি “বৈশাখী চৈতিকা” নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করেন। সেখানে নকশিকাঁথা ডিজাইনের শাড়ি, হাতের তৈরি জুয়েলারি, চুড়ি ও বিভিন্ন নারীদের পণ্য বিক্রি করেন।

বৈশাখী বলেন, “আমি চাই নিজের পায়ে দাঁড়াতে। পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে নিজের পড়াশোনা ও রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে। ব্যবসা থেকে যা আয় হয়, তা দিয়েই নিজের অনেক প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করি।”

তার এই উদ্যোক্তা মনোভাব অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, রাজনীতি এবং ব্যবসা—তিনটি ক্ষেত্র একসঙ্গে সামলানো সহজ নয়। কিন্তু বৈশাখী মনে করেন, কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস থাকলে অসম্ভব কিছু নয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্ব দেওয়ার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। স্কুলজীবন থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাকে সমবয়সীদের থেকে আলাদা করেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বৈশাখী ইসলাম বর্ষা বলেন, “আমি ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই। একজন সৎ, শিক্ষিত ও মানবিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চাই। পাশাপাশি আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখি। কারণ আইন পেশার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করার সুযোগ রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমি গ্রামের মেয়ে। গ্রামকে ভালোবাসি। ভবিষ্যতে গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করতে চাই। বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে। যেন কোনো মেয়েকে ইভটিজিং বা সামাজিক হয়রানির শিকার হয়ে নীরবে কষ্ট পেতে না হয়।”

গ্রামের সাধারণ পরিবেশ থেকে উঠে আসা বৈশাখী ইসলাম বর্ষার জীবন সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং সাহসিকতার এক অনন্য উদাহরণ। প্রতিবন্ধকতা, হামলা, হুমকি কিংবা সামাজিক চাপ—কোনো কিছুই তাকে তার অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। বরং প্রতিটি চ্যালেঞ্জ তাকে আরও দৃঢ় করেছে।

শিক্ষা, রাজনীতি, সামাজিক সচেতনতা এবং আত্মনির্ভরতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই তরুণীর ভবিষ্যৎ যাত্রা কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এতটুকু বলা যায়, বৈশাখী ইসলাম বর্ষা ইতোমধ্যেই ফরিদপুরের তরুণ প্রজন্মের কাছে সাহস, প্রতিবাদ এবং স্বপ্ন দেখার এক প্রতীক হয়ে উঠেছেন।