রাত বাড়লেই কেন পুরোনো মানুষের কথা বেশি মনে পড়ে?
হয়তো কোনও নোটিফিকেশন নেই, কোনও ফোনকল না, তবু হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় বহুদিন কথা না হওয়া কারও কথা। পুরোনো একটা চ্যাট খুলে দেখতে ইচ্ছে করে। কোনও ছবির দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর হালকা চাপ লাগে। দিনের ব্যস্ততায় যাদের কথা মনেই পড়ে না, রাতের নির্জনতায় তারাই অদ্ভুতভাবে ফিরে আসে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে শুধু স্মৃতি নয়—কাজ করে একাকিত্ব, অসমাপ্ত আবেগ এবং মস্তিষ্কের নিজস্ব কিছু মানসিক প্রক্রিয়া।
দিনের বেলায় মানুষ ব্যস্ত থাকে। কাজ, ক্লাস, যানজট, ফোনকল, নোটিফিকেশন, মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে মস্তিষ্কের ভেতর এক ধরনের অবিরাম শব্দ চলতে থাকে। কিন্তু রাত গভীর হলে সেই শব্দ কমে আসে। চারপাশ চুপ হয়ে যায়। আর ঠিক তখনই অনেকের মনে ভেসে ওঠে পুরনো কোনও মুখ, বহুদিন আগের কোনও চ্যাট, কিংবা অসমাপ্ত থেকে যাওয়া একটি সম্পর্ক।
রাত মানেই ভেতরের শব্দ শোনা
দিনের ব্যস্ততায় মানুষ অনেক অনুভূতি চাপা দিয়ে রাখে। তখন মস্তিষ্ক মূলত কাজ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রতিক্রিয়া জানানো এবং দৈনন্দিন চাপ সামলানোর মোডে। কিন্তু রাতের নীরবতায় বাইরের উদ্দীপনা কমে গেলে ভেতরের অনুভূতিগুলো সামনে চলে আসে।
এই সময় পুরনো স্মৃতি, অপূর্ণতা, আফসোস কিংবা আবেগঘন মুহূর্তগুলো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যেসব সম্পর্ক হঠাৎ শেষ হয়েছে, ব্যাখ্যা ছাড়া ভেঙেছে, কিংবা ‘আরও কিছু হতে পারত’ ধরনের অনুভূতি রেখে গেছে—সেগুলো রাতেই বেশি মনে পড়ে।
ঘুমের আগে মানুষ বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে
ঘুমানোর আগে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকে। তখন চিন্তা আরও ব্যক্তিগত ও আবেগকেন্দ্রিক হয়ে যায়। একই সঙ্গে একাকিত্বের অনুভূতিও বাড়তে পারে।
অনেকেই খেয়াল করেন, সারাদিন যার কথা একবারও মনে হয়নি, রাত বাড়তেই তার পুরনো ছবি দেখতে ইচ্ছে করছে, পুরনো কথোপকথন পড়তে ইচ্ছে করছে কিংবা হঠাৎ তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুঁ মারতে মন চাইছে।
মনোবিজ্ঞানে একে অনেক সময় ‘আবেগগত পুনরাবৃত্তি’ বলা হয়। অর্থাৎ মস্তিষ্ক পরিচিত কোনও আবেগের কাছে বারবার ফিরে যায়—সেটি সুখের হোক বা কষ্টের।
অসমাপ্ত সম্পর্ক সহজে ভুলতে পারে না মস্তিষ্ক
যে সম্পর্কের স্পষ্ট সমাপ্তি নেই, সেগুলো মানুষ সাধারণত বেশি মনে রাখে। কেউ হয়তো হঠাৎ দূরে সরে গেছে, কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি, কিংবা সম্পর্কটা ঠিক কোথায় শেষ হলো তা কখনও পরিষ্কার হয়নি।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের ভেতরে এক ধরনের অসমাপ্ত প্রশ্ন তৈরি করে। আর মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই অসমাপ্ত জিনিসের উত্তর খুঁজতে চায়।
তাই গভীর রাতে পুরনো মানুষের কথা মনে পড়া অনেক সময় ভালোবাসার চেয়েও বেশি, এক ধরনের মানসিক অপূর্ণতার প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্মৃতিকে আরও দীর্ঘ করছে
আগে সম্পর্ক শেষ মানেই দূরত্ব তৈরি হতো। এখন বাস্তবতা ভিন্ন। কেউ হয়তো জীবনে নেই, কিন্তু তার ছবি আছে, পুরনো বার্তা আছে, অনলাইন উপস্থিতি আছে।
ফলে মানুষ অনেক সময় বাস্তবের চেয়ে স্মৃতির ভেতর বেশি আটকে থাকে। রাতের নির্জনতায় সেই স্মৃতিগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
সব মনে পড়া মানেই ফিরে যেতে চাওয়া নয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরোনো মানুষের কথা মনে পড়া মানেই তাকে আবার জীবনে ফেরত চাওয়া নয়। অনেক সময় সেটা জীবনের একটি সময়কে মিস করা, কোনও অনুভূতির প্রতি নস্টালজিয়া, কিংবা নিজের পুরোনো সংস্করণটিকে খুঁজে ফেরার অনুভূতিও হতে পারে।
কারণ, কিছু মানুষ চলে গেলেও, তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সময়গুলো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। আর রাত—সেই পুরনো দরজাগুলো নীরবে খুলে দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
সূত্র : বাংলাট্রিবিউন

আপনার মতামত লিখুন
Array