খুঁজুন
, ,

গোড়ায় গলদ রেখে নকল দমন: শিক্ষার মানোন্নয়ন কি তবে কেবলই শ্লোগান?

এহসানুল হক মিয়া
প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৩৩ অপরাহ্ণ
গোড়ায় গলদ রেখে নকল দমন: শিক্ষার মানোন্নয়ন কি তবে কেবলই শ্লোগান?

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নকল প্রতিরোধ দীর্ঘদিনের আলোচিত একটি বিষয়। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বারবার এই ইস্যুকে সামনে আনছেন—যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমানে প্রচলিত সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে আগের মতো সরাসরি নকলের সুযোগ অনেকটাই কমে এসেছে। কারণ এখন প্রশ্ন মুখস্থনির্ভর নয়; বরং বিশ্লেষণধর্মী ও প্রয়োগভিত্তিক

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—নকল কমলেই কি শিক্ষার মান বেড়েছে? উত্তরটি এতটা সরল নয়।

সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর আগে পরীক্ষায় মূল্যায়ন ছিল কঠোর—গণিত বিষয়ের ক্ষেত্রে সঠিক উত্তরে পূর্ণ নম্বর, ভুল হলে শূন্য। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে আংশিক সঠিক উত্তরের জন্য আংশিক নম্বর দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নীতিগতভাবে এটি শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নম্বর প্রদানে অতিরিক্ত উদারতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে প্রকৃত মেধা যাচাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভালো ও দুর্বল শিক্ষার্থীর মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এখন নকল দমন নয়, বরং বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যায়নের মান নিশ্চিত করা।

শিক্ষাব্যবস্থার এই পর্যায়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি—

প্রথমত, শিক্ষকদের নিয়মিত ও কার্যকর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কারিকুলাম পরিবর্তন করলেই হবে না, সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য শিক্ষকদের দক্ষ করে তোলা অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বশীল তদারকি জোরদার করতে হবে, যাতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ থাকে।

তৃতীয়ত, খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা ও কঠোরতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ না করলে শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখা সম্ভব নয়।

চতুর্থত, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান উন্নয়নে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালু করতে হবে। বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদান কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারছে না, যার প্রভাব সরাসরি পরীক্ষার ফলাফলে পড়ছে।

এর পাশাপাশি শিক্ষকদের আর্থিক ও পেশাগত প্রণোদনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অনুপ্রাণিত শিক্ষকই একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।

নতুন কারিকুলাম (জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২১) , বাস্তবায়ন ২০২৩, তবে ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পরে তা স্থগিত ও পুনর্বিবেচনার পর্যায়ে রয়েছে। এটা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও এর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশেষ করে গণিতসহ কিছু বিষয়ের বই যথেষ্ট আধুনিক ও সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নম্বরভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি হঠাৎ করে বাতিল করার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পরিমাপের একটি কার্যকর মাধ্যমকে দুর্বল করে দিয়েছে। উন্নত পাঠ্যবই ও নম্বরভিত্তিক মূল্যায়নের সমন্বয় ঘটানো গেলে শিক্ষার মান আরও উন্নত হতে পারত।

নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে যে সমস্যাগুলো স্পষ্ট হয়েছে, সেগুলোও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই—

– তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়ন, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক কেউই প্রস্তুত ছিল না

– সব শ্রেণি ও বিষয়ে একযোগে পরিবর্তন আনার অযৌক্তিকতা

– মূল্যায়ন কাঠামোর হঠাৎ পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তি

শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি চাপিয়ে দেওয়া যায় না; বরং সময় নিয়ে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হয়। অতীতে সৃজনশীল পদ্ধতি ধাপে ধাপে চালু হওয়ায় তা সহজে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। নতুন কারিকুলামের ক্ষেত্রেও যদি একই কৌশল অনুসরণ করা হতো, তাহলে হয়তো আজকের চিত্র ভিন্ন হতে পারত।

সবশেষে বলা যায়, শুধুমাত্র নকল দমন দিয়ে শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক ও ধীরস্থির পরিকল্পনা, যেখানে মূল্যায়নের ন্যায্যতা, শিক্ষার মান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সক্ষমতা—সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

নইলে ‘নকলমুক্ত পরীক্ষা’ অর্জন হলেও ‘মানসম্মত শিক্ষা’ অধরাই থেকে যাবে।

লেখক:

সহকারী শিক্ষক (গণিত),

পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ফরিদপুর।

সাংবাদিক :

দৈনিক আজকালের খবর ও বিডি২৪লাইভ.কম।

সদরপুরে মাদক সেবন ও সাপ্লাইয়ের অপরাধে যুবকের ১৫ দিনের জেল-জরিমানা

শিশির খাঁন
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৩:২২ অপরাহ্ণ
সদরপুরে মাদক সেবন ও সাপ্লাইয়ের অপরাধে যুবকের ১৫ দিনের জেল-জরিমানা

ফরিদপুরের সদরপুরে অভিযান চালিয়ে নুর ইসলাম (১৮) নামে এক ইয়াবাসেবী ও সাপ্লায়ারকে ৪ পিস ইয়াবা সহ আটক করে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেছে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাত অনুমানিক সাড়ে ৮ টার দিকে উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের নয়াকান্দি গ্রামে সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া এই দণ্ডাদেশ ও জরিমানা প্রদান করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত ও জরিমানা কৃত নুর ইসলাম নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের শ্রীরামদিয়া গ্রামের
আলামীন মাতুব্বরের ছেলে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, আজ শুক্রবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৮ টার দিকে সদরপুর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের নয়াকান্দি গ্রামে অভিযান চালিয়ে নুর ইসলাম (১৮) নামে এক ইয়াবাসেবী ও ইয়াবা সাপ্লায়ারকে আটক করা হয়।

তল্লাশীকালে তার কাছ থেকে ৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়। স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ এর ৩৬ এর ৫ ধারা মোতাবেক তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। জব্দকৃত ইয়াবা বড়ি জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সহযোগিতা করেন সদরপুর থানার একদল পুলিশ সদস্য ।

সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আনজুম পিয়া বলেন, সমাজে মাদকের বিস্তার রোধে এ ধরনের বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ফরিদপুরে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে অবৈধ ডিএনসির অভিযোগ

এন কে বি নয়ন, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ২:৫৪ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে অবৈধ ডিএনসির অভিযোগ

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের এক পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার বিরুদ্ধে সরকারি কক্ষে অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে ডিএনসি (ডাইলেশন অ্যান্ড কিউরেটেজ) করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ডিএনসির পর এক গৃহবধূর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

অভিযুক্ত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার নাম জাহানারা বেগম। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, রোগীর কাছ থেকে কোনো টাকা নেননি।

ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ জুলাই নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল ইউনিয়নের দক্ষিণ কান্দী গ্রামের রফিকুল ইসলামের স্ত্রী হিরামনি দুই মাসের গর্ভধারণজনিত শারীরিক জটিলতা নিয়ে ভাঙ্গা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে যান। সেখানে গর্ভপাতের উদ্দেশ্যে ডিএনসি করার জন্য তার পরিবারের কাছ থেকে আড়াই হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরে সরকারি কার্যালয়ের একটি কক্ষেই পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা জাহানারা বেগম ডিএনসি করেন।

পরিবারের দাবি, ডিএনসির তিন দিন পর হিরামনির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পুনরায় জাহানারা বেগমের কাছে গেলে তিনি আবারও ডিএনসি করার কথা বলেন এবং এ জন্য আরও এক হাজার টাকা দাবি করেন। একই সঙ্গে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন।

কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে হিরামনিকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার আরও অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক গত বৃহস্পতিবার তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় এ ধরনের সেবার জন্য রোগীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিধান নেই। এছাড়া একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার ডিএনসি করার আইনগত বা প্রশাসনিক এখতিয়ারও নেই। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগী হিরামনি বলেন, “আমি অসুস্থ হওয়ার পর জাহানারা ম্যাডাম টাকা নিয়ে হাসপাতালের কক্ষেই আমার ডিএনসি করেন। পরে আবার অসুস্থ হলে তিনি বলেন, আবার ডিএনসি করতে হবে এবং টাকা নিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি হতে বলেন।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা জাহানারা বেগম বলেন, “আমি হিরামনির কাছ থেকে কোনো টাকা নেইনি। তিনি নিজের ইচ্ছায় অন্যত্র চলে গেছেন।”

ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সোহাগ মিয়া বলেন, “ডিএনসির পর অসুস্থ হয়ে ভর্তি হওয়া রোগী হিরামনির শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।”

এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মা ও শিশু স্বাস্থ্যবিষয়ক মেডিকেল অফিসার ডা. ইব্রাহীম খলিল বলেন, একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার ডিএনসি করার কোনো সুযোগ বা বিধান নেই। তবে তিনি ক্যামেরার সামনে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পানিতে ডুবে মৃত্যু: এক নীরব ঘাতক, ঝুঁকিতে আমাদের শিশুরা

নিকোলাস বিশ্বাস
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৭:৩১ পূর্বাহ্ণ
পানিতে ডুবে মৃত্যু: এক নীরব ঘাতক, ঝুঁকিতে আমাদের শিশুরা

আজ (২৫ জুলাই) বিশ্ব ′পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস′। ২০২১ সালে প্রথমবারের মত এই দিবস পালিত হয়। প্রতি বছর এই দিবস উপলক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিপাদ্য বিষয় বেছে নেওয়া হয়। এবারের প্রতিপাদ্য হল: “Unite to Turn the Tide” – অর্থাৎ, আসুন, সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত থামাই।

এটি কেবল একটি আন্তর্জাতিক দিবসের প্রতিপাদ্য নয়; বরং পানির সঙ্গে আমাদের সহাবস্থানকে আরও নিরাপদ, সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তোলার একটি বৈশ্বিক আহ্বান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নেতৃত্বে পরিচালিত বিশ্বব্যাপী এ প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করে আসুন আমরা প্রতিরোধযোগ্য ′পানিতে ডুবে মৃত্যু′র মিছিল বন্ধ করি এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রয়োজনীয় ভূমিকার পালন করি।

বাংলাদেশ নদী, খাল, বিল, হাওর ও পুকুরে সমৃদ্ধ একটি জলভূমির দেশ। পানি আমাদের জীবন, জীবিকা, কৃষি, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের অভাবে এই জীবনদায়ী পানিই মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় শোক ও বেদনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সাম্প্রতিক সিসিটিভি ভিডিও বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি ছোট শিশু একটি পুকুরে ডুবন্ত অবস্থায় বাঁচার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছে। অপরদিকে, আরেকটি শিশু ঐ পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো চিৎকার করছে এবং মরিয়া হয়ে পানিতে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে বন্ধুকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। আশে-পাশে বাড়িঘর থাকলেও কেউ সেই আর্তনাদ শুনতে পায়নি। অবশেষে পাশের একটি বাড়ি থেকে একজন ব্যক্তি বেরিয়ে এসে উদ্ধার করতে এগিয়ে যান। কিন্তু শিশুটির শেষ পরিণতি কি হয়েছিল, তা ভিডিওটিতে আর জানা যায়নি।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রতিনিয়ত অসংখ্য শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়, অথচ অধিকাংশ ঘটনাই সংবাদ শিরোনামে আসে না। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি পরিবারের বেদনা। বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হওয়া সত্ত্বেও পানিতে ′ডুবে মৃত্যু′ এখনো সবচেয়ে অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি। সংক্রামক রোগ, অপুষ্টি কিংবা সড়ক দুর্ঘটনা জনস্বাস্থ্য আলোচনায় প্রাধান্য পেলেও পানিতে ′ডুবে মৃত্যু′ রয়ে যায় আড়ালে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এটি সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) জরিপ অনুযায়ী, আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যার বড় একটি অংশই শিশু ও কিশোর-কিশোরী। এসব মৃত্যুর সর্বোচ্চ হার বরিশাল অঞ্চলে। অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর, জলাভূমি এবং মৌসুমি বন্যাপ্রবণ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশে পানিতে ′ডুবে মৃত্যু′র ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। বিশ্বব্যাপী পানিতে ′ডুবে মৃত্যু′র প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে এই ঝূঁকি আরো বেড়েছে।

প্রতিদিনের নীরব ঝুঁকি

জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। গ্রামীণ এলাকায় অধিকাংশ ঘটনা ঘটে বাড়ির কয়েক মিটারের মধ্যেই থাকা পুকুর, ডোবা কিংবা জলাশয়ে। অর্থাৎ বিপদ দূরে নয়, পরিবারের কাছেই ওত পেতে থাকে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ এ সময় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বাড়ির আঙিনা, রাস্তা ও মাঠ সাময়িক জলাশয়ে পরিণত হয়। অল্প সময়ের জন্যও কোনো ছোট শিশু নজরদারির বাইরে চলে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অপূরণীয় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এ সময়টায় সবাইকে বিশেষভাবে সর্তক থাকতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার সময়টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় অভিভাবকরা সাধারণতঃ গৃহস্থালি বা কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকেন, ফলে ছোট শিশুরা অরক্ষিত থেকে যায়। মাত্র দুই বা তিন মিনিটের অসতর্কতা একটি পরিবারের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে যা তাদের জন্য নিয়ে আসতে পারে গভীর শোক আর কান্না।

পানিতে ′ডুবে মৃত্যু′র সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো এর নীরবতা। সিনেমায় যেমন দেখা যায়, বাস্তবে পানিতে ডুবে যাওয়া মানুষ – বিশেষ করে শিশুরা – সাধারণতঃ হাত নেড়ে বা চিৎকার করে সাহায্য চাইতে পারে না। আশে-পাশের মানুষের অজান্তেই তারা নীরবে পানির নিচে তলিয়ে যায়। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পানিতে ′ডুবে মৃত্যু′কে “নীরব কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সংকট” হিসেবে অভিহিত করেছে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।

২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৫ জুলাইকে সারা বিশ্ব ′পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস′ হিসেবে ঘোষণা করে। এ ব্যাপারে বিশ্ব ষ্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বন্যা ও জলাবদ্ধতা ক্রমেই বাড়ছে। তাই পানিতে ′ডুবে মৃত্যু′ প্রতিরোধকে কেবল মৌসুমি উদ্যোগ নয়, জাতীয় জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকারে পরিণত করা উচিৎ।

কেন এই মৃত্যু থামছে না?

বাংলাদেশে অধিকাংশ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ পরিস্থিতিতে। বাড়ির পাশের পুকুর, রাস্তার ধারের ডোবা কিংবা বৃষ্টির পানিতে ভরা গর্ত মুহূর্তেই প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত হয়। এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী ও চলাফেরায় সক্রিয় হলেও তারা বিপদের মাত্রা বুঝতে পারে না। এ সময় রান্না, কাপড় ধোয়া বা অন্য কোনো কাজে সামান্য ব্যস্ত হয়ে পড়লে অভিভাবকের অজান্তেই শিশুটি ঝুঁকির মুখে পড়ে যা পরিবার ও সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বের বৃহত্তম নদীবাহিত দেশগুলোর একটি হওয়ায় এখানে হাজার হাজার নদী, খাল, বিল ও জলাশয় রয়েছে। বর্ষাকালে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ঘনঘন বন্যা চারপাশে নতুন নতুন ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় সৃষ্টি করে ও বিপদ ডেকে আনে। চলতি বছরের প্রবল বৃষ্টিপাত এ বিপদকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।

প্রতিরোধই একমাত্র সমাধান

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সহজ ও লক্ষ্যভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। এ সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। এজন্য নিম্নে উল্লেখিত বিষয়গুলোর উপর দৃষ্টিপাত করা অতীব জরুরি: —

১. ছোট শিশুদের কখনোই পানির কাছাকাছি একা না রাখা।

২. বাড়ির আশপাশের পুকুর ও ডোবার চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা বা বেড়া নির্মাণ করা।

৩. দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক ডে-কেয়ার কেন্দ্র স্থাপন করা।

৪. বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সাঁতার শিক্ষা ও পানি নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা।

৫. জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্ধারকৌশল ও কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন (CPR)-এর প্রশিক্ষণ দেওয়া।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে, এসব উদ্যোগ কার্যকর। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (CIPRB) -এর উদ্যোগে পরিচালিত আঁচল (কমিউনিটি শিশুযত্ন মডেল) এবং সুইমসেইফ (SwimSafe) কর্মসূচি শিশুদের পানিতে ′ডুবে মৃত্যু′র হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সফল হয়েছে। সমাধান আমাদের জানা আছে; এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং দেশব্যাপী কার্যকর বাস্তবায়ন। গবেষণালব্ধ ফলাফল গুরুত্বের সাথে কাজে লাগানো উচিৎ।

পানিতে ′ডুবে মৃত্যু′ প্রতিরোধকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা – এই চারটি সরকারি খাতের সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে কাঙ্খিত ফল আসবে না।

সচেতনতা থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ

বিশ্ব ′পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস′ যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; এটি হতে হবে বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা। বাংলাদেশকে এ খাতে সরকারি বিনিয়োগ, গণসচেতনতামূলক প্রচার এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া প্রতিটি শিশু একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ – একজন সম্ভাব্য শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী কিংবা জাতীয় নেতা – যার স্বপ্ন অকালেই নিভে যায়।

পানিতে ডুবে কোনো শিশুর মৃত্যু কখনোই কাম্য হতে না। সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ, নিরাপত্তা শিক্ষা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারে এবং এই নীরব সংকট তথা পানিতে ′ডুবে মৃত্যু′র অবসান ঘটাতে সক্ষম হবে। প্রতিটি শিশুর জীবনই অমূল্য, কোনো অবস্থাতেই সেই জীবনের মূল্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

লেখক:
ডেভেলপমেন্ট প্রাক্টিশনার এবং ″জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল″ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com