খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

যুদ্ধ থামাতে নয়, দারিদ্র্য দূর করলেই আসবে শান্তি

মোহাম্মদ ফাছিহ-উল ইসলাম শাইয়্যান
প্রকাশিত: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:৩৪ পূর্বাহ্ণ
যুদ্ধ থামাতে নয়, দারিদ্র্য দূর করলেই আসবে শান্তি

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলতে আমরা কী বুঝি? সীমান্তে সেনা, আকাশে যুদ্ধবিমান, সমুদ্রে নৌবহর—এ দৃশ্যই আমাদের মানসচক্ষে ভাসে। জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়, যা নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়— ক্ষুধার্ত, বেকার ও হতাশ জনগোষ্ঠী নিয়ে কি কোনো রাষ্ট্র নিরাপদ থাকতে পারে?

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বাস্তবতা বলছে, জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শান্তির ওপর নির্ভরশীল। আর এ স্থিতিশীলতার ভিত্তি হলো দারিদ্র্য হ্রাস ও জীবিকার নিরাপত্তা।

বাজেটের আয়নায় নিরাপত্তা নীতি: প্রতিরক্ষা বনাম কৃষি

২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ১৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। অন্যদিকে, একই বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৭ হাজার ২১৪ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ৩.৮ শতাংশ।

এ পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে—রাষ্ট্র নিরাপত্তার ধারণা এখনো প্রধানত সামরিক খাতে কেন্দ্রীভূত। অথচ দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিনির্ভর।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দের অংশ প্রায় ৫.৮-৬ শতাংশের কাছাকাছি, যা বিশেষজ্ঞদের মতে প্রয়োজনের তুলনায় কম। অর্থাৎ, বাজেটের আকার বাড়লেও কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভাগ বাড়ছে না।

কৃষি বাজেট কমে গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে

বাজেটে কৃষির অংশ কমে গেলে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়। কৃষিতে বিনিয়োগ কমে গেলে উৎপাদন ঝুঁকি বাড়ে, গ্রামীণ দারিদ্র্য বাড়ে, শহরমুখী অভিবাসন বাড়ে এবং সামাজিক অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। ইতিহাস বলছে, খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বহু দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণঅভ্যুত্থান ও সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে গ্রামীণ দারিদ্র্য বাড়া মানে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি। অর্থনৈতিক হতাশা, রাজনৈতিক চরমপন্থা, সামাজিক বিভাজন ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, যা কোনো যুদ্ধবিমান দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

যৌথ কৃষি অবকাঠামো: নতুন ধরনের নিরাপত্তা বিনিয়োগ

এ প্রেক্ষাপটে একটি নতুন নীতিধারণা সামনে আসছে—যৌথ কৃষি অবকাঠামো (Shared Agricultural Infrastructure)। এটি শুধু কৃষি প্রযুক্তি নয়; এটি একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শাসন কাঠামো, যেখানে সরকার, আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি ও কৃষকরা যৌথভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে আধুনিক করে তোলে।

এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে:

ক. স্যাটেলাইটভিত্তিক রোগ ও আবহাওয়া পূর্বাভাস

খ. ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ ও ডেটা প্ল্যাটফর্ম

গ. স্মার্ট কৃষি ভ্যালু চেইন ও বাজার তথ্য ব্যবস্থা

ঘ. আন্তর্জাতিক কৃষি ডেটা শেয়ারিং অবকাঠামো

বাংলাদেশে GEOPOTATO প্রকল্প দেখিয়েছে, স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে আগাম সতর্কতা দিলে ফসল ক্ষতি কমে এবং কৃষকের আয় বাড়ে। অর্থাৎ, কৃষিতে প্রযুক্তি বিনিয়োগ মানে দারিদ্র্য হ্রাস আর দারিদ্র্য হ্রাস মানে সামাজিক স্থিতিশীলতা।

আন্তর্জাতিক ব্যবসা: ভূরাজনৈতিক অংশীদার

আন্তর্জাতিক কৃষি ও প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, মূলধন ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক। তারা কৃষি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করলে তা শুধু CSR নয়, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কৌশল। স্থিতিশীল কৃষি অর্থনীতি মানে স্থিতিশীল বাজার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা মানে বিনিয়োগ নিরাপত্তা। সামাজিক শান্তি মানে সরবরাহ চেইনের ধারাবাহিকতা। অতএব, কৃষি অবকাঠামোতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ একটি নতুন ধরনের শান্তি কূটনীতি।

শান্তি: সামরিক ভারসাম্য নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা

শান্তি সাধারণত সামরিক ভারসাম্য বা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে অর্জিত হয় বলে মনে করা হয়। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে রাজনৈতিক চুক্তি টেকে না। আফগানিস্তান, ইরাক বা দক্ষিণ সুদানের মতো দেশগুলোতে রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হয়েছে মূলত অর্থনৈতিক পুনর্গঠন দুর্বল থাকার কারণে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শান্তি একটি উদ্ভূত সামাজিক অবস্থা, যা দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা থেকে জন্ম নেয়। অর্থাৎ, শান্তি সামরিক বাজেটের মাধ্যমেই শুধু নয়, মানুষের জীবিকার মাধ্যমেও।

বাংলাদেশের জন্য নীতিগত প্রশ্ন

বাংলাদেশ কি প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াবে, নাকি কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৌশলগত বিনিয়োগ করবে? প্রশ্নটি সামরিক বনাম কৃষি নয়; প্রশ্নটি স্বল্পমেয়াদি নিরাপত্তা বনাম দীর্ঘমেয়াদি শান্তি। যদি কৃষি অবকাঠামো, ডিজিটাল কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় আকারে বিনিয়োগ করা হয়, তবে তা—ক. দারিদ্র্য কমাবে; খ. গ্রামীণ স্থিতিশীলতা বাড়াবে; গ. শহরমুখী অভিবাসন কমাবে; ঘ. সামাজিক বিভাজন হ্রাস করবে; ঙ. দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। এগুলোই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রকৃত ভিত্তি।

রাজনৈতিক অর্থনীতির নতুন দর্শন

এ দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে। আমরা দারিদ্র্যকে মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখি; কিন্তু বাস্তবে এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভূরাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি ক্ষুধার্ত রাষ্ট্র কখনো নিরাপদ রাষ্ট্র হতে পারে না, যত যুদ্ধবিমানই থাকুক না কেন।

নিরাপত্তার নতুন সংজ্ঞা

একবিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞা বদলাতে হবে। নিরাপত্তা শুধু সীমান্তে নয়; নিরাপত্তা মানুষের পেটে, কৃষকের জমিতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে। যদি বাংলাদেশ দারিদ্র্য দূরীকরণ ও কৃষি অবকাঠামোকে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে তা শুধু উন্নয়ন নয়, একটি টেকসই শান্তি রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে তুলবে। সামরিক বাজেট প্রয়োজন; কিন্তু শান্তির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো দারিদ্র্য দূরীকরণ।

লেখক: আইটি উদ্যোক্তা

 

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা