‘ফুটপাতের সেই নারী, যাকে দেখেও কেউ দেখেনি’
সন্ধ্যা পেরিয়ে ঘড়ির কাঁটা রাত আটটার দিকে এগোচ্ছে। ফরিদপুর শহরের জেলা কারাগারের সামনের ব্যস্ত সড়কটি তখনও জেগে আছে। একের পর এক ট্রাক, অটোরিকশা আর মোটরসাইকেল ছুটে যাচ্ছে নিজেদের গন্তব্যে। আকাশ থেকে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে—এমন বৃষ্টি, যা ভেজায়ও, আবার অদ্ভুত এক বিষণ্নতাও ছড়িয়ে দেয়।
সেই ব্যস্ততার মাঝেই রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসে আছেন এক উসকোখুসকো চুলের নারী। বয়স কত, তা বোঝার উপায় নেই। ময়লা কাপড়ে জড়ানো শরীর, ক্লান্ত চোখ, শুকিয়ে যাওয়া মুখ। তিনি ছিন্নমূল, নাকি মানসিক ভারসাম্যহীন—কেউ জানে না। হয়তো জানার প্রয়োজনও মনে করেনি কেউ।
মানুষগুলো পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। কারও হাতে বাজারের ব্যাগ, কারও হাতে অফিসের ফাইল, কেউ আবার মোবাইলের পর্দায় ডুবে আছে। কিন্তু একবারের জন্যও কেউ থেমে জিজ্ঞেস করল না, “মা, আজ কিছু খেয়েছেন?”
নারীটি নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন। কখনো হেসে উঠছেন, কখনো আবার অদৃশ্য কাউকে উদ্দেশ করে অভিমান করছেন। মনে হয়, তারও একদিন সংসার ছিল। হয়তো কোনো সন্তানের মুখে তিনি ভাত তুলে দিতেন, হয়তো কেউ তাকে “মা” বলে ডাকত। সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতে সব হারিয়ে আজ তিনি শুধু শহরের এক কোণে পড়ে থাকা বিস্মৃত মানুষ।
সড়কের লাইটের মিটিমিটি আলো এসে পড়ছে তার গায়ে। সেই আলো যেন তাকে আলোকিত করছে না, বরং আমাদের অন্ধত্বকেই স্পষ্ট করে দিচ্ছে। রাত যত গভীর হবে, ফুটপাতটাই হবে তার বিছানা। আকাশ হবে তার ছাদ, আর বৃষ্টির শব্দ হবে রাতের সঙ্গীত।
আমরা প্রতিদিন অসংখ্য খবর পড়ি, অসংখ্য ঘটনা দেখি। কিন্তু এমন একটি মানুষের নীরব কান্না কোনো শিরোনাম হয় না। কারণ তিনি গুরুত্বপূর্ণ নন; তিনি ভোট নন, ক্ষমতা নন, আলোচনার বিষয়ও নন।
হয়তো আগামীকালও তিনি এখানেই বসে থাকবেন। আবারও হাজার মানুষ তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাবে। কেউ তাকাবে না, কেউ থামবে না। তবু পৃথিবী তখনও দাবি করবে—মানুষ নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে মানবিক প্রাণী।
হয়তো সত্যিকারের মানবতা শুরু হয় না বড় বড় দান দিয়ে; শুরু হয় একটি প্রশ্ন থেকে—”আপনি কি আজ কিছু খেয়েছেন?” কখনো কখনো একটি উষ্ণ দৃষ্টি, একটি শুকনো কাপড়, কিংবা এক প্লেট ভাতই একজন মানুষের কাছে পুরো পৃথিবী হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

আপনার মতামত লিখুন
Array