‘গ্রামের সেই বন্ধুরা আজ আর নেই’
অনেক বছর পর আজ আবার গ্রামে ফিরেছি। বাস থেকে নামতেই কাঁচা রাস্তার ধুলো, বাতাসে ধানের গন্ধ আর দূরে বাঁশবাগানের মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে মনে হলো যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সময় কখনও থামে না। শুধু মানুষ বদলে যায়, দৃশ্যপট বদলে যায়, আর একসময় বুঝতে পারি—যাদের সঙ্গে জীবনটা শুরু হয়েছিল, তারা কেউ আর পাশে নেই।
আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম সেই পুরোনো রাস্তা ধরে। রাস্তার পাশে সেই পুকুরটা এখনও আছে। তবে আগের মতো কচুরিপানায় ভরা নয়। পাড়ে এখন ইট বসানো হয়েছে। পুকুরের দিকে তাকাতেই মনে পড়ে গেল সেই বিকেলগুলোর কথা—যখন আমরা পাঁচজন বন্ধু এখানে এসে ঝাঁপ দিতাম।
আমি, রফিক, জাহিদ, বাবলু আর শামীম।
আমাদের বন্ধুত্বটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু তাতে ছিল অদ্ভুত এক শক্তি। তখন মোবাইল ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না। ছিল শুধু মাঠ, নদী, কাদামাটি আর একে অপরের সঙ্গ।
স্কুল ছুটির পর আমরা দৌড়ে চলে যেতাম মাঠে। কেউ বল নিয়ে আসত, কেউ ব্যাট। কখনও ফুটবল, কখনও ক্রিকেট—যেটা পাওয়া যেত সেটাই খেলতাম। খেলার শেষে সবাই মিলে পুকুরে ঝাঁপ দিতাম। কারও মা দূর থেকে চিৎকার করে ডাকত—
“এই রফিক! বাড়ি আয়, সন্ধ্যা হয়ে গেছে!”
রফিক তখন হেসে বলত,
“আর পাঁচ মিনিট!”
সেই পাঁচ মিনিট কখনও পাঁচ মিনিটে শেষ হতো না।
একদিন বর্ষার বিকেলে আমরা সবাই মিলে নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়েছিলাম। নদীটা তখন বেশ ফুলে উঠেছিল। জাহিদ একটু ভয় পেয়েছিল। সে বলেছিল,
“দোস্ত, আজ না যাই?”
কিন্তু বাবলু বলেছিল,
“আরে ভয় কিসের? আমরা তো আছিই!”
আমরা সবাই হেসেছিলাম। সেই হাসির শব্দ এখনও যেন বাতাসে ভেসে আসে।
গ্রামের জীবন ছিল সহজ। বিকেলে তালগাছের ছায়ায় বসে গল্প করা, মেলা এলে সবাই মিলে ঘুরতে যাওয়া, ঈদের দিন নতুন জামা পরে একে অপরের বাড়িতে বেড়ানো—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের আনন্দ।
কিন্তু সময় ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।
প্রথমে জাহিদ চলে গেল শহরে পড়তে। সে বলেছিল,
“ভালো রেজাল্ট করলে ঢাকায় কলেজে পড়ব।”
আমরা সবাই তাকে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল কয়েকদিনের জন্যই যাচ্ছে। কিন্তু সেই কয়েকদিন ধীরে ধীরে কয়েক বছরে বদলে গেল।
তারপর রফিকও কাজের জন্য চলে গেল চট্টগ্রামে। বাবলু বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত। একদিন সত্যিই সে মালয়েশিয়া চলে গেল। শামীম গ্রামের বাজারে একটা দোকান দিল।
আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শহরে চলে গেছি।
প্রথম দিকে আমরা ফোনে কথা বলতাম। মাঝে মাঝে ঈদের সময় দেখা হতো। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল, ততই যোগাযোগ কমে গেল।
একদিন খবর পেলাম—রফিক আর নেই।
কারখানায় কাজ করার সময় একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল। খবরটা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। বিশ্বাসই হচ্ছিল না।
তারপর কয়েক বছর পর শুনলাম শামীম অসুস্থ হয়ে মারা গেছে।
বাবলু এখনও বিদেশেই আছে, কিন্তু বহু বছর তার কোনো খবর নেই। জাহিদ নাকি ঢাকায় বড় চাকরি করে, কিন্তু তার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল প্রায় দশ বছর আগে।
আজ এত বছর পর গ্রামে ফিরে বুঝতে পারছি—আমাদের সেই ছোট্ট পৃথিবীটা আর নেই।
আমি হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরোনো স্কুলের সামনে এসে দাঁড়ালাম। স্কুলের দেয়াল নতুন করে রং করা হয়েছে। মাঠটাও আগের চেয়ে ছোট মনে হচ্ছে।
এক কোণে কয়েকটা ছোট ছেলে ক্রিকেট খেলছে। তাদের হাসির শব্দ শুনে হঠাৎ মনে হলো—আমরাও তো একদিন এমনই ছিলাম।
হয়তো তারা এখন বুঝতে পারছে না, কিন্তু একদিন তারাও বড় হবে। কেউ শহরে যাবে, কেউ বিদেশে। কেউ হয়তো আর ফিরেও আসবে না।
আমি মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাদের খেলা দেখলাম।
হঠাৎ মনে হলো, যদি এখন রফিক এসে বলে—
“এই দোস্ত, খেলবি?”
যদি জাহিদ এসে বলে—
“আজ নদীতে যাবি?”
যদি বাবলু সেই আগের মতো হেসে ওঠে।
কিন্তু জানি, সেটা আর কখনও হবে না।
বিকেলের সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। বাতাসে আবার সেই পুরোনো গ্রামের গন্ধ। কিন্তু এই গন্ধের ভেতরেও একটা শূন্যতা আছে।
আমি পুকুরের পাড়ে গিয়ে বসে পড়লাম। পানিতে সূর্যের আলো ঝিলমিল করছে।
মনে হলো, আমাদের শৈশবটা ঠিক এই পানির ঢেউয়ের মতো—একসময় ছিল, খুব কাছেই ছিল। কিন্তু এখন শুধু স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।
হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বললাম—
“বন্ধুরা, তোমরা যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।
এই গ্রামটা এখনও আছে, এই পুকুরটা এখনও আছে…
শুধু তোমরা আর নেই।”
সন্ধ্যার আজানের ধ্বনি ভেসে এলো দূরের মসজিদ থেকে।
আর আমি বুঝলাম—জীবন সামনে এগিয়ে যায়, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর কোথাও না কোথাও সেই গ্রামের বন্ধুরা চিরকাল বেঁচে থাকে।
লেখক: হারুন-অর-রশীদ, সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

আপনার মতামত লিখুন
Array