খুঁজুন
সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ২৩ চৈত্র, ১৪৩২

জনপ্রিয়তার চাপে তাইজুল, মিলছে না অবসর, ঘুম-আরাম সব উধাও

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:৫২ পূর্বাহ্ণ
জনপ্রিয়তার চাপে তাইজুল, মিলছে না অবসর, ঘুম-আরাম সব উধাও

স্বাধীনতা দিবসে জিলাপি বিক্রির ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাইজুল ইসলাম। এরপর থেকে বিভিন্ন মিডিয়ায় তাকে নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। 

প্রতিদিন তার বাড়িতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে উৎসুক জনতা। কেউ সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, আবার পারিবারিক অসচ্ছলতা দেখে কেউ কেউ দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। এসব প্রতিশ্রুতি ও টানা সাক্ষাৎকার দিতে দিতে তাইজুলের এখন দিশেহারা অবস্থা। দিনের স্বাভাবিক কাজ করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাইজুল জানান, প্রতিদিন এত মিডিয়া ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর আসে যে নিজের কাজ কিছুই করতে পারছি না। ঠিকমতো বিশ্রাম নিতেও পারছি না।

নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর ইউনিয়নের ঢাকডহর সরকার পাড়া গ্রামের বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম তাজু। পেশায় একজন রাজমিস্ত্রির হেলপার। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তাইজুল সবার বড়। বাবা ও মা শ্রবণ প্রতিবন্ধী। তাই তার আয়েই চলে পুরো সংসার। বাড়িভিটা না থাকায় অন্যের জমিতে দুটো টিনের ঘর তুলে গাদাগাদি করে থাকতে হয় তাদের।

গত দেড় বছরে প্রায় ১৪০টি ভিডিও করেছেন বলে জানান তাইজুল। তার তাজু ২.০ নামের ফেসবুক পেজটিতে ফলোয়ারের সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার। ভাইরাল হওয়ার পর এখন প্রায় ১ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, মিডিয়ায় আলোচিত হওয়ার পর থেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন তাইজুল। সবাই এসে নানা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে। অনেকে আবার উপঢৌকন নিয়ে এসে রিলস বানায়। তাদের কিছুই বলতে পারছেন না তাইজুল। বাধ্য হয়ে তাদের সঙ্গে ভিডিও করছেন।

তাইজুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের পাশে একটি জিলাপির দোকানে গিয়ে ভিডিও করেছিলাম। সেই ভিডিওটা দিয়েই আমি প্রথম ভাইরাল হই। কেউ ভিডিওটি বিনোদন হিসেবে প্রশংসা করেন, কেউবা ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করেন। তবে ভিডিওটি প্রায় ৫ মিলিয়ন মানুষ দেখেন। এরপর থেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছি।

সূত্র : যুগান্তর

পর্নো সাইটে নিজের আপত্তিকর ছবি দেখে যে কারণে চমকেছিলেন জাহ্নবী?

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ
পর্নো সাইটে নিজের আপত্তিকর ছবি দেখে যে কারণে চমকেছিলেন জাহ্নবী?

বলিউড অভিনেত্রী জাহ্নবী কাপুর কিশোর বয়সে ভীতিকর এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পর্নো সাইটে নিজের আপত্তিকর ছবি দেখতে পান। শুরুতে বিষয়টিকে অনলাইনের অংশ হিসেবেই মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এই ঘটনা তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।

কয়েক দিন আগে রাজ শামানির পডকাস্টে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে ভয়ংকর সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছিলেন তিনি। জাহ্নবী কাপুর সরাসরি জানান তিনি ঠিক জানেন না এটা ডিপফেক হতে পারে তবে তেমন কিছুই ছিল এবং তিনি একটি পর্নো সাইটে তার একটি ছবি দেখেছিলেন।

ঘটনাটি জাহ্নবীর স্কুলে আইটি ক্লাসে ঘটেছিল। তার ভাষ্যমতে তাদের স্কুলে আইটি ক্লাস ছিল। ছেলেরা মজা করার জন্য এসব সাইটে যেত এবং সেখানে তার ছবিও ছিল। আর এটা স্কুলেই ঘটেছিল তাই এটি খুব ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ছিল।

তারপরও বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন জাহ্নবী। তা জানিয়ে তিনি বলেন একটা সময় তিনি ভেবেছিলেন এর মূল্য তাকে দিতে হবে কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে কোনো নৈতিকতা থাকে না।

এখন জাহ্নবীর দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এই ধরনের ছবি এখনো তাকে প্রভাবিত করে। জাহ্নবী কাপুর জানান এটা নিয়ে তিনি শান্তিতে নেই। তার এমন কিছু ছবি বাইরে ঘুরছে এমনকি অফিশিয়াল সংবাদমাধ্যমেও শেয়ার করা হচ্ছে যেগুলো পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে বানানো। তিনি কখনো ওই ধরনের পোশাক পরেননি বা ওইভাবে ছবিও তোলেননি।

এসব ছবি জাহ্নবীর ওপরে কীভাবে প্রভাব ফেলছে তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন এসব এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয় যেন এগুলো তিনি প্রকাশ করেছেন। এতে নির্দিষ্ট একটা ধারণা তৈরি হয়। আগামীকাল যদি কোনো পরিচালককে তিনি বলেন যে তিনি কিছু পোশাক পরতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন না তখন কেউ ওই ছবিগুলো দেখিয়ে বলতে পারে তিনি তো আগে এটা করেছেন। তারা না বললেও এটা মনে প্রশ্ন জাগাবে।

বিষয়টি জাহ্নবী কাপুরকে কষ্ট দেয়। তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি সামলানোর উপায়ও খুঁজে পেয়েছেন। তিনি বলেন তার মনে হয় না অভিযোগ করার মতো খুব শক্তিশালী কণ্ঠ তার আছে। একটা মানসিকতা আছে যে তার জীবনে এত কিছু আছে তাই একটু সহ্য করা উচিত এবং অভিযোগ করা উচিত নয়। তাই তিনি মনে করেন না তার কণ্ঠের তেমন কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা আছে। এর বিরুদ্ধে কথা বললে প্রতিক্রিয়া আসবে আর সেটা হয়তো মূল সমস্যাটাকেই আড়াল করে দেবে।

‘ধড়ক’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে পা রাখেন জাহ্নবী। এরপর ‘রুহি’ ‘গুঞ্জন সাক্সেনা দ্য কার্গিল গার্ল’ ‘ঘোস্ট স্টোরিজ’ ও ‘পরম সুন্দরী’ সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। দক্ষিণী সিনেমায়ও অভিষেক হয়েছে তার। ‘দেবারা’ শিরোনামের এই সিনেমায় নায়ক হিসেবে পেয়েছেন জুনিয়র এনটিআরকে।

জাহ্নবী কাপুর অভিনীত সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘সানি সংস্কারি কি তুলসি কুমারী’। সিনেমাটিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন বরুণ ধাওয়ান। জাহ্নবীর পরবর্তী সিনেমা ‘পেদ্দি’। সিনেমাটিতে রাম চরণের বিপরীতে অভিনয় করছেন এই অভিনেত্রী। তেলেগু ভাষার এই সিনেমা পরিচালনা করছেন বুচি বাবু সানা। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৩০ এপ্রিল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে এটি।

সূত্র : কালবেলা

গুম প্রতিরোধ, বিচার ব্যবস্থা সংস্কারসহ ২০ অধ্যাদেশ নিয়ে বিএনপির আপত্তি কেন?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:১২ পূর্বাহ্ণ
গুম প্রতিরোধ, বিচার ব্যবস্থা সংস্কারসহ ২০ অধ্যাদেশ নিয়ে বিএনপির আপত্তি কেন?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। আর ২০টি অধ্যাদেশ আপাতত আর আইনে রূপান্তর হচ্ছে না।

গত বৃহস্পতিবার সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সুপারিশ প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেন।

সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী যে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালীকরণ, দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগের মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও আইনজীবীরা বলছেন, যে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া সংস্কার উদ্যোগ হোঁচট খাবে।

এর বিপরীতে, ওইগুলো আইনে পরিণত করলে একদিকে যেমন জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেতো, অন্যদিকে গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতিসহ বাড়তো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।

যদিও বিএনপি দাবি করছে, যে অধ্যাদেশগুলো বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো বিশেষ কমিটির সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতেই করা হয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ও ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য ইফতেখারুজ্জামান মনে করছেন, আমলাতন্ত্রের পরামর্শ অনুযায়ীই বর্তমান সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে চাইছে না। এর ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটা থমকে যাবে।

বিশেষ কমিটির সভাপতি ও বিএনপি নেতা জয়নুল আবেদীন বলেছেন, “আমাদের বিশেষ কমিটির তিনটি মিটিং হয়েছে, সেখানে বিরোধী দলেরও সদস্য রয়েছেন। সেখানে সবগুলো অধ্যাদেশ ভালভাবে আলাপ আলোচনা করেই এই সুপারিশ করা হয়েছে”।

ভবিষ্যতে যাচাই বাছাই করে এসব বিষয় আবার বিল আকারে আনা হতে পারে বলেও তিনি বলছেন।

কমিটির বিভিন্ন বৈঠক ও সদস্যদের সুপারিশ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে বিরোধী দল ছাড়াও ওই কমিটিতে থাকা সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্যও শুরুতে কমিটির কাছে আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন, যদিও পরে তা প্রত্যাহার করেন।

গুম প্রতিরোধে অধ্যাদেশের কী হবে?

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিএনপির অনেক নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছিলেন। এছাড়াও জামায়াতসহ ভিন্নমত দমনে বিগত সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগও উঠেছিল।

যে কারণে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গুমের তদন্তে আলাদা কমিশন গঠন করে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

গুম থেকে সব ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এ অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

এতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এর সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

তবে ওই বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারিকৃত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’টি বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করেনি। এর ফলে এই অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারাবে।

বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে সরকারের আপত্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্ব অনুমতি নিতে হবে।

বিরোধী দল এতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। তারা বলেছেন, যে কারণেই কোনো সংস্থা, বাহিনী কাউকে আটক করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের সামনে উপস্থাপন না করলে, তা সংবিধানের লঙ্ঘন।

বিশেষ কমিটি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরে সংসদে উত্থাপনের সুপারিশ করেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অধ্যাদেশটি সম্পর্কে মতামতে বলেছে, ‘গুম একটি সংবেদনশীল অপরাধ। এর সঙ্গে সরকারের শৃঙ্খলা-বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায় সম্পৃক্ত’। তাই অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তর না করে সংশোধনসহ নতুন আইন করার মতামত দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

গুম সংক্রান্ত এই অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে সরকারের আইন মন্ত্রণালয় যে আপত্তি জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে খোদ বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ও কমিটির সদস্য নওশাদ জমির নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। এর পেছনে তার যুক্তিও তিনি তুলে ধরেছেন বিশেষ কমিটির কাছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, “বিগত সরকারের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি গুমের স্বীকার হয়েছে বিএনপি। এই অধ্যাদেশে বিতর্কিত কিছু থাকলে সেটি সংশোধনী আকারে উপস্থাপন করা যেতো”।

এর পেছনে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের ইশারাকে দায়ী হিসেবে দেখছেন ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেছেন, “যে অধ্যাদেশগুলো বাদ দেওয়া বা রিভিউয়ের নামে ফেলে দেওয়ার পায়তারা চলছে বা কমিটি থেকে এই ধরনের সুপারিশ এসেছে সেগুলো আমলাতন্ত্রের পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে হচ্ছে। এখানে মূল প্রতিরোধক শক্তি হচ্ছে আমলাতন্ত্র”।

বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, “আমরা মনে করি যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেগুলো সংসদে আলাপ আলোচনা করে নির্ধারিত করা ভাল”।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্ন

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় থেকে শুরু করে বিচার বিভাগের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ ছিল।

যে কারণে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সামনে আসে।

অধ্যাপক ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করে।

এতে বলা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে।

এছাড়া নিম্ন আদালতের বিচারকের নিয়োগ বা বদলির জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে এসব বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরিভাবে সুপ্রিম কোর্টের কাছে যেত, যা বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয় করে থাকে। এই অধ্যাদেশটিও কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

আইনজীবীরা বলছেন, এই আইন থাকলে অধিকতর যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগের সুযোগ বাড়ে; কিন্তু বর্তমান সরকার এই অধ্যাদেশ অনুমোদন করছে না। ফলে নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত বিচারক নিয়োগ আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল মনে করেন, এই অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ার ফলে একদিকে যেমন দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, অন্যদিকে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপির যে কমিটমেন্ট ছিল তাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

তিনি বলছেন, “এই অধ্যাদেশে কোনো দুর্বলতা বা ঘাটতি থাকলে সরকার সেটি সংশোধনের কথা বলতে পারত। সেসব না করে পুরোপুরি আইনটি বাতিল করা কোন সমাধান নয়”।

যদিও সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলছেন, “এমন অনেক আইন আছে সেগুলো সংবিধানের মূল আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। সেই জিনিসগুলো পার্লামেন্টে বিল আকারে আসবে। সেগুলো আমরা পরীক্ষা করবো, পার্লামেন্টে আলোচনার পর সেগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে”।

মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতার প্রশ্ন

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। সেই সময় বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছিল।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। সংস্থাটিকে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন ও কার্যকর করতে কিছু মৌলিক পরিবর্তন এনে অধ্যাদেশ করেই জারি করা হয়েছিল অধ্যাদেশ।

এতে মানবাধিকার কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে গুম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও সংস্থার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তসহ ব্যাপক ক্ষমতা পেয়েছিল।

এছাড়া মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের নিয়োগ সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে সার্চ কমিটির বিধান করা হয়। সরকার চাইলেই যাতে সরিয়ে দিতে না পারে, সে জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণ পদ্ধতিতে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে অপসারণের বিধান করা হয়েছিল।

কিন্তু সরকার যে ১৬টি বিল এখনই সংসদে বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করা হয়েছে তার মধ্যে এই বিলটিও বেশ আলোচিত।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ও ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন স্বাধীন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে সেটি এখন আবার ব্যাকফায়ার করবে। যেটি হবে সরকারের জন্য আত্মঘাতী। এটি হয়তো বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ভূলে গেছে”।

বিশেষ কমিটি মানবাধিকার কমিশনের অধ্যাদেশটিও বিল আকারে সংসদের উপস্থাপনের পক্ষে ছিল জামায়াতে ইসলামী। যে কারণে বিশেষ কমিটির এই সিদ্ধান্তে জামায়াত এমপিরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।

এর বাইরেও বিএনপির এমপি ও কমিটির সদস্য নওশাদ জমিরও নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। সেখানে আইন মন্ত্রণালয়ের আপত্তিগুলোর পক্ষে বিপক্ষে দুই ধরনের মতামতও দিয়েছেন মি. জমির।

সেখানে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনাগুলোর অসঙ্গতিও তিনি তুলে ধরেছেন তার নোট অব ডিসেন্টে।

১৫টিতে সংশোধন, কার্যকারিতা হারাচ্ছে ২০টি

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।

গত ১২ই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সংবিধান অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, ১০ই এপ্রিলের মধ্যে এই অধ্যাদেশগুলো সংসদ অনুমোদন না করলে সেটা কার্যকারিতা হারাবে।

সংসদের প্রথম দিনই বিএনপি নেতা ও বরিশাল- ৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনকে সভাপতি করে ১৩ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয় অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য। যেই কমিটির ১০ সদস্য বিএনপির এবং বাকি তিনজন জামায়াতে ইসলামীর।

সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনই অধ্যাদেশগুলো যাচাই–বাছাই করে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ১১৩টি অনুমোদনের সুপারিশ করে।

এর মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ অনুমোদনের জন্য হুবহু বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল করা এবং ১৬টি এখনই সংসদে বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।

এই ১৬টি পরবর্তী সময়ে যাচাই–বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।

অর্থাৎ এই ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। এর মধ্যে আছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত একটি, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত দুটি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত তিনটি, গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত দুটি, দুদক সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ। এছাড়া আছে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ।

আগামী সোমবার থেকে অধ্যাদেশগুলো অনুমোদনের কার্যক্রম শুরু করবে জাতীয় সংসদ। যেসব অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হচ্ছে, সেগুলোর পাশাপাশি যে চারটি রহিত করা হবে, সেগুলোও বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে।

রোববার থেকে আবার অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এই অধিবেশনে বিল আনা হবে ১১৭টি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা বিল উত্থাপনের পর এখানে সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে আলোচনা করবেন। এই আলোচনায় অংশ নেবেন বিরোধী দলের সদস্যরাও।

তবে, তাঁদের সংশোধনী গ্রহণ করা হবে কি না, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকারের ইচ্ছার ওপর।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

ক্ষমতার বিড়ম্বনা ও সুদিনে সংকট

ড. মো. শওকত হোসেন
প্রকাশিত: সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ
ক্ষমতার বিড়ম্বনা ও সুদিনে সংকট

দার্শনিক হবসের ‘লেভিয়াথান’ নামক একটি গ্রন্থ আছে। রাষ্ট্রবিষয়ক নানাবিধ আলোচনার মধ্যে রাষ্ট্র নির্মাণের পেছনের পরিস্থিতির কিছু কাল্পনিক ব্যাখ্যাও তুলে ধরেছেন তিনি এই বিখ্যাত গ্রন্থে। তার মতে, রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পূর্বে প্রকৃতির রাজ্য বিরাজিত ছিল। এই প্রকৃতির রাজ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, এখানে মানুষ ছিল অবাধভাবে স্বাধীন। সবাই যথেচ্ছা সুযোগের সন্ধানে লিপ্ত ছিল। কোনো প্রতিষ্ঠান বা সুগঠিত কর্তৃপক্ষ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করত না; যে যার মত সুযোগ নেওয়ার উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল সেই প্রকৃতির রাজ্যে।

তথাপিও যেমন খুশি তেমন ইচ্ছা অবাধ স্বাধীনতার এই জামানা মানুষের জন্য শান্তিময় ছিল না, বরং তা ছিল সংঘাতময়। এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ হচ্ছে : মানুষের চাহিদা অপরিসীম, মানুষ অল্পে তৃপ্ত হয় না। সুযোগ অবারিত থাকলে যে যার মতো করে সর্বোচ্চ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। আর এই অবস্থা কারো জন্য সুখকর হয় না, এই কারণে যে, কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। তাই তথাকথিত নিকটজন বলতে কেউ থাকেনা। সবাই সবার সাথে প্রতিযোগিতা করে; আর এই প্রতিযোগিতার এক পর্যায়ে সংঘাত ও সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রকৃতির রাজ্যের অবস্থা ব্যাখ্যায় এক কথায় এই বাস্তবতাকে হবস চিহ্নিত করেছেন প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রত্যেকের যুদ্ধ হিসেবে। আসলে অবাধ সুযোগ সংঘাতকেই যেন স্বাগত জানায়।

রাষ্ট্র উৎপত্তির পেছনের ইতিহাস যাই হোক না কেন, আর সেক্ষেত্রে হবসের প্রকল্প সত্য হোক বা মিথ্যা হোক- সে আলোচনা এখন আর খুব দরকারি না। কেননা বাস্তবতা হলো এখন রাষ্ট্র আছে। পৃথিবীময় মানুষ এখন এক একটি রাজনৈতিক সমাজে বসবাস করছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে মানুষের সমাজজীবন পরিচালিত হচ্ছে। তবে সব রাষ্ট্রের বাস্তবতা এক রকম নয়। সরকার ব্যবস্থার ধরন অনুযায়ী অনেকাংশে রাষ্ট্রের প্রকৃতি নির্ভর করে। আর শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ধারণ করে রাষ্ট্রের গতি-প্রকৃতি ও জনগণের সুবিধা-অসুবিধা।

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সাংবিধানিকভাবে এই রাষ্ট্রে জনগণকেই বলা হয় সকল ক্ষমতার অধিকারী। জনগণ প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করে। যদিও সেই সরকারে জনগণের কর্তৃত্ব বা অধিকার কতটা সুরক্ষা পায় তাও নির্ভর করে শাসক শ্রেণির মানসিকতা, দক্ষতা ও রাজনৈতিক দর্শনের উপর। সংসদীয় গণতন্ত্রে আসন ভিত্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার তারতম অনুযায়ী সরকারের ক্ষমতা নির্ধারিত হয়। ২০২৬- এর নির্বাচনের পরে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। এমনকি সংসদে দুই তৃতীয় অংশের বেশি আসন নিয়ে এক নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে দলটি। এই বাস্তবতায় সরকারের ক্ষমতা এখন একচ্ছত্র। আর যেহেতু এটি একটি দলীয় সরকার, তাই সরকারি দলের নেতা কর্মী সমর্থক ও সুনজরপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণের সামনে এখন সৃষ্টি হয়েছে অবারিত সুযোগ, অপার সম্ভাবনা। সংগত কারণেই এই বাস্তবতায় এইসব সুযোগধারী বা সম্ভাবনাময়ী ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও তৈরি হয়েছে এক ধরনের নিরলস প্রতিযোগিতা। অনেকেই বিরতিহীনভাবে দৌড়াচ্ছেন। কোনটা রেখে কোনটা নেবেন, কোথায় গিয়ে থামবেন-তা কেউ কেউ বুঝে উঠতে পারছেন না।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘হেথা নয়- অন্য কোথা, অন্য কোথা— অন্য কোনখানে?’ কেউ পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না, কেউ কম পাচ্ছেন, আবার কেউ যা পাওয়ার কথা তার চেয়েও বেশি পাচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন যে, পেয়ে খুশি হওয়া মানুষের চেয়ে না পেয়ে বা অল্প পেয়ে অখুশি মানুষের সংখ্যাই বেশি। আরো ছোট করে বললে সরকার দলের অসংখ্য চাহিদাওয়ালা মানুষই থেকে যাচ্ছে নাখোশ, এমনকি ক্ষুব্ধ। দলের উপর, দলের কোনো কোনো নেতার উপর, সরকারের উপর, এমনকি সহযোদ্ধা প্রিয়জনদের উপরও অনেকেই হয়ে উঠছেন ক্রমশ আস্থাহীন।

এই বাস্তবতা দার্শনিক হবসের প্রকৃতির রাজ্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এবং সুবিধার সন্ধানে প্রতিদ্বন্দ্বী মানুষের মধ্যে সম্পর্কের বাঁধন বিনষ্ট হয়ে সংঘাত যদি ব্যাপকতার হয়ে ওঠে, তবে তা নিতান্তই অশনি সংকেত। সরকারের বড় পদে গেলে বা সরকার পরিচালনার উচ্চ অবস্থায় অধিষ্ঠিত হলে অনেক সময় এই বাস্তবতাকে টের পাওয়া যায় না। কেননা সবাই তাদের কাছে তোষামোদি করেন, দলের প্রতি দেশের প্রতি তাদের কমিটমেন্ট ও প্রেম দেখানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে তারা যে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে ভিতর থেকে দলের শক্তিকেই খর্ব করে ফেলে তা বাইরে থেকে অনেক সময় বোধগম্য হয় না।

এমন পরিস্থিতিতে বিরুদ্ধ পক্ষ অর্থাৎ সরকারবিরোধীরা, এমনকি দেশবিরোধীরাও সুযোগ করে নেওয়ার বা দলীয়ভাবে সংগঠিত হওয়ার এবং শক্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পায়। সরকারি দলের পক্ষেও সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সেবা সুচারুভাবে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা ব্যাহত হয়। শাসক দলের নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী দল পরিচালনা এবং দলকে জনবান্ধব হিসেবে ধরে রাখাও ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে।

ভূমিধস বিজয় নিয়ে গঠিত তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তাদের অনুসারীদের দৌড় সামলানো, সংঘাত এড়ানো এবং সমন্বিতভাবে সুযোগসমূহের যুক্তিযুক্ত সুনিপুণ বণ্টনের। দল ঠিক রাখতে হলে অনেককেই যেমন অখুশি করা যায় না, তেমনি নানামুখী চাহিদাধারীদের মধ্যে সুসমন্বয় করা একটি জটিল যজ্ঞ। ছোট মাঝারি নেতা কর্মী সমর্থকরা যখন দেখে দুঃসময়ে সকলেই একসাথে ছিল, নির্যাতন নিষ্পেষণ সবকিছু সহ্য করেছে, বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয়েছে, কিন্তু সুসময়ে এসে মুষ্টিমেয় মানুষেরাই শুধু সৌভাগ্যের পরশ পাচ্ছে, তাহলে তাদের মনে না পাওয়ার যন্ত্রণা ক্রমশ বেড়ে চলবে, ক্ষোভ দানা বাঁধবে।

বর্তমান বাস্তবতায় অনেকেই অনেক আলোকিত আলয়ে সৌভাগ্যের সাহচর্য নিতে দেখা যাচ্ছে। আবার কাউকে কাউকে গাড়ির পেছনে দৌড়াতে, নিরাপত্তাকর্মীদের অথবা নিজ দলের অপেক্ষাকৃত বড় কর্তাদের ধাক্কা খেতে দেখা যাচ্ছে। যেসব নেতা অনেক বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে দৈনন্দিন ওঠা-বসা ও যোগাযোগ রাখতেন, তারা কেউ কেউ সৌভাগ্যবান হাওয়ায় ঐসকল পরিচিত জনের ফোন কল পর্যন্ত ইগনোর করছেন। তারা ভীষণ ব্যস্ত- দেশ জাতির বড় বড় দায়িত্ব নিয়ে। আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে এসবের বিরূপ প্রতিফলন হতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই।

সুস্থতা যে কত নিয়ামত এবং অসুখ যে কত যন্ত্রণাময়, তা যেমন সুস্থ অবস্থায় উপলব্ধি করতে হয়; তেমনি অবারিত সুদিন আসলে দুর্দিনের দুরবস্থা এবং অনাহুত অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত আগামীর কথা যথাযথভাবে চেতনায় রাখাটাই জরুরি কাজ হওয়া উচিত।

লেখক : অধ্যাপক (দর্শন বিভাগ), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়