খুঁজুন
, ,

ভাইরাল লাইলি খালার আমলনামা, যে গল্প সবার অজানা?

মফিজ ইমাম মিলন
প্রকাশিত: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
ভাইরাল লাইলি খালার আমলনামা, যে গল্প সবার অজানা?

বাংলা ভাষায় ‘আমলা’ শব্দের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের প্রেক্ষিত ভিন্নতর। আরবিতে ‘আমল’ শব্দের অর্থ কাজ। সে নিরিখে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আমল বা কাজ করে, তারাই আমলা। উৎপত্তি আর বুৎপত্তি—যে অর্থেই ব্যবহার করি না কেন, আমলাতন্ত্রের শানে নুযুল কিন্তু আমাদের সামনে এক ভিন্ন বাস্তবতা হাজির করে। শিল্পী লাইলির আমলনামা কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টোটা।

লাইলি বেগম কবে, কার কাছে থেকে ‘খালা’ উপাধি পেয়েছেন, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে ষাটোর্ধ্ব এই নারীর ক্ষেত্রে বয়সটাই হয়তো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফরিদপুরের ছয় দশকের ধুলো, বালি, ময়লা আর অমলিন সময় লাইলির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে রয়েছে। তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলও কম নয়। কারণ তিনি আজন্ম ভবঘুরে।

কোনো পাসপোর্ট তিনি বানাননি, কিন্তু দিল্লির আজমির শরীফ যেন তাঁর হাতের মুঠোয়। বাড়ি থেকে না বলে-কয়ে অজানার পথে রওনা দিতে তাঁর যতটুকু সময় লাগে, ততটুকুই। অক্ষরজ্ঞানহীন এই মানুষটির সবচেয়ে বড় সখ—‘মানুষ দেখা’। তিনি প্রায়ই প্রশ্ন করেন, “আল্লার দুনিয়ায় কত পদের মানুষ, কিন্তু কারো সঙ্গে কারো মিল নাই কেন?” এর সদুত্তর কোনোদিনই তাঁকে দিতে পারিনি। তবে মানুষ দেখতে যাওয়ার সফরসঙ্গী হয়েছি কয়েকবার। হাটে, নৌকাঘাটে, রেলস্টেশনে—যেখানে মানুষের ভিড়, লাইলি সেখানেই।

২০০০ সাল থেকে প্রায় সাত বছর আমি ফরিদপুর শিল্পকলা একাডেমির সেক্রেটারি ছিলাম। প্রথম দিকে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে লাইলি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। মাঝেমধ্যে বায়না ধরতেন—
“স্যার, একটা গান শোনাই?”

বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকাতাম। একদিন জোর করেই আমাকে মেহেদী হাসানের একটি গজল শোনালেন। বাহবা দিতেই গেয়ে উঠলেন রুনা লায়লার ১৪ বছর বয়সে গাওয়া পাকিস্তানি ছবি আঞ্জুমান-এর সেই বিখ্যাত উর্দু গান— “আপ কি দিল মে আনজুমান মে, হুসনে বান কার আগায়া…”

পারিবারিকভাবে আমরা সবাই মেহেদী হাসান আর নূরজাহানের ভক্ত। কিন্তু সেদিন বুঝতে পারিনি—আমি রুনা লায়লার ভক্ত হলাম, নাকি লাইলির।

পিয়নরা ভীষণ বিরক্ত হতো তাঁকে নিয়ে। ওয়ান টাইম কাপ ছাড়া চা দিত না। তাও কখনো ফুরিয়ে যেত। লাইলি সব বুঝতেন। তরমুজের বিচির মতো পান খাওয়া দাঁত বের করে হেসে বলতেন— “স্যার, কত খাওয়া যাবি চা?”

একদিন আবদার করে বললেন—“স্যার, আমারে হারমোনিয়াম শিখাইবেন না?”

স্থানীয় শিক্ষকদের অনুরোধ করলাম, তাঁকে একটু গানবাজনা শেখানোর জন্য। একসময় তিনি নিজেই সুর তুলতে শিখে গেলেন। এরপর ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের প্রায় সব অনুষ্ঠানে লাইলি অপরিহার্য হয়ে ওঠেন।

২০০৩ সালে কবি জসীমউদ্দীনের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জসীম পল্লী মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। পল্লীকবির সৃষ্ট নায়ক-নায়িকাদের যেন বাস্তবে হাজির করা হয়েছিল সেই মেলায়। কবিতার আসমানী, লোকগানের কিংবদন্তি হাজেরা বিবি, তাম্বুলখানা থেকে আদর্শ কৃষক গণি মিয়া, আর ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আনা হয়েছিল লাঠিয়াল রুপাইকে।

তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন তরুণ কর্মকর্তা জালাল আহমেদ। তিনি সবার জন্য ভালো উপহারের ব্যবস্থা করতে বললেন। গায়িকা লাইলির কথা বলতেই তাঁর জন্য শাড়ি-কাপড়ের ব্যবস্থা করা হয়। জেলা প্রশাসক গান শুনে তাঁকে কাপড় উপহার দিয়েছেন—এ কথা লাইলি নিজেই মাইকের মতো প্রচার করতে লাগলেন।

শহরের সবাই লাইলিকে চেনেন—তা নয়। তবে শিল্প-সংস্কৃতির মানুষদের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর ঠিকানা অবশ্য কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। একসময় পৌর বিসর্জনঘাটের কাছে থাকতেন। স্বামী মারা গেছেন প্রায় দশ বছর আগে। দুই ছেলে, দুই মেয়ে—সবাই বিবাহিত। স্থায়ী ঠিকানা বলতে কিছু নেই। কখনো শহরতলির হারুকান্দীতে ছেলের বাসায়, কখনো ঝিলটুলীর মালেক মীর বাড়িতে রাত কাটান। শুধু ওয়াজ মাহফিল নয়—যেখানে রামকীর্তন, যেখানে তিন রথের মেলা, সেখানেই তাঁর উপস্থিতি।

যোগাযোগের সুবিধার্থে কয়েক বছর আগে তাঁকে অল্প দামের একটি বাটন ফোন কিনে দিয়েছিলাম। ফোন হাতে নিয়েই প্রশ্ন করলেন— “এইটার সঙ্গে কি কানেকশন পাওয়া যাবে?”

কার সঙ্গে—জিজ্ঞেস করতেই ফোনটা আমার হাত থেকে নিয়ে দূরে পানিতে ছুড়ে ফেললেন। তারপর বললেন—“এই জ্ঞান নিয়ে আবার গানবাজনা করেন আপনারা!”

লাইলির সেই মারফতি কথার অর্থ আজও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি ফরিদপুর হেরিটেজ প্রথম অনুষ্ঠান করেছিল লাইলিকে প্রধান অতিথি করে। সেটি ছিল তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন। অধ্যাপক আলতাফ হোসেন, ফারাহ দিবা আহমেদ, শামীম আরা বেগম, মৃধা রেজাউল, অধ্যাপক হিমু, শরীফসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। ভিন্ন মাত্রার এক আয়োজন ছিল সেদিন।

প্রায় ১৫ বছর আগে আমরা একবার ‘পাগল সম্মেলন’ করেছিলাম। মূল চরিত্র ছিলেন প্রফেসর আলতাফ হোসেন। সেই অনুষ্ঠানেও লাইলি গান গেয়েছিলেন। তবে সেখানে গোলমাল বেঁধেছিল গান নিয়ে। কেউ চায় না লাইলি একা গান গাইুক—সব ‘পাগল’ একসঙ্গে গাইবে! অথচ লাইলি সুর, তাল, লয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। কিন্তু পাগলরা কি আর গ্রামার মানে?

গত ২ এপ্রিল ২০২৬, ফরিদপুর হেরিটেজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইসমাইল জবিউল্লাহ। তাঁর সঙ্গে কথা ছিল—ফরিদপুরে এলে তাঁকে লাইলির গান শোনাব। শুনিয়েছিলামও। দুই সংসদ সদস্য—চৌধুরী নায়াব ইউসুফ ও শহীদুল ইসলাম বাবুল—দুজনেই বললেন, “আমরা বক্তব্য রাখব না, লাইলির গান শুনব।”

ইসমাইল জবিউল্লাহ সাহেব ডিসি থাকাকালীন সময় থেকেই লাইলিকে চিনতেন। তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা। অসাধারণ বিনয়ী ও চৌকস প্রশাসক। তিনি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলেছিলেন— “এমন কিছু করবেন না, যাতে জবিউল্লাহ সাহেব অসন্তুষ্ট হন।”

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২৪ মে, উপমহাদেশের রাজনৈতিক সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত এবং নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুরের ময়েজ মঞ্জিলে নজরুল জন্মোৎসবের আয়োজন করা হয়। যথারীতি সাহিত্য পরিষদের একনিষ্ঠ সদস্য শরীফ খান দায়িত্ব নেন লাইলিকে অনুষ্ঠানে আনার। যথাসময়ে লাইলি উপস্থিত হন। আমি মঞ্চের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে দর্শক সারিতে তাঁর পাশে গিয়ে বসি।

সকলের অনুরোধে লাইলি দুটি গান গাইলেন। মুহূর্তেই শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু মাগরিবের আজান হয়ে যাওয়ায় অনুষ্ঠান শেষ করতে হয়। “ওয়ান মোর, ওয়ান মোর”—শব্দগুলো বাতাসে ভাসতে থাকে।

রিকশাভাড়া বাবদ তাঁকে তিনশ টাকা দিলে তিনি একশ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন— “অত লাগবে না। যাগো পেটে খিদে, তাগো বেশি দেন।”

এর মধ্যেই টেলিভিশনের এক এ-গ্রেডের ধোপদুরস্ত শিল্পী এক এমপির কাছে নালিশ করেন—“রাস্তার শিল্পীরা গান গায়, আর আমি এ-গ্রেডের শিল্পী হয়েও সুযোগ পাই না!”

‘রাস্তার শিল্পী’ বলতে তিনি লাইলিকেই বুঝিয়েছিলেন।

শিল্পী লাইলিকে নিয়ে পোস্ট দিতে কাউকে কেউ উদ্বুদ্ধ করেনি। তিনি ভাইরাল হয়েছেন নিজের গুণে। তাঁর গাওয়া “নয়ন ভরা জল গো তোমার” গানটি শুনলেই বোঝা যায়।

তবে নজরুল জন্মোৎসব এখানেই শেষ হয়নি।

রাত ১০টার দিকে ফরিদপুর জেলা বিএনপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক ফোন করে জানতে চান—নজরুল জন্মোৎসব ময়েজ মঞ্জিলে কেন? আমি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করি—১৯৩৯ সালে ময়েজ মঞ্জিলের মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী এবং কোমরপুরের হুমায়ুন কবির মিলে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ গঠন করেছিলেন। নজরুলের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই জায়গাটির সঙ্গে।

ওপাশ থেকে উত্তর আসে—“কবে কে কী কইরা থুইয়া গেছে, তার জন্য এখন ময়েজ মঞ্জিলে অনুষ্ঠান মানা যাবে না!”

আমি বলি—“অশিক্ষিত লোকের মতো কথা বলো না।”

তিনি আরও রেগে গিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় বলতে থাকেন—ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ ভেঙে-চুরে গুঁড়িয়ে দেবেন।

আমি যদি তাঁর অতীত না জানতাম, তাঁর জাতগোষ্ঠী না চিনতাম, তাহলে হয়তো চুপ থাকতাম। আমার মাতুলকুলের চার পুরুষ এই শহরের মানুষ। আমরা কি মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছি? আমাকে কিছু বলতে হলে বাখুন্ডা পার হয়ে, জোয়ারের মোড় ছাড়িয়ে, মহিলা রোড ডিঙিয়ে তালমার মোড়ে গিয়ে বলতে হবে।

এই শহরে চাঁদাবাজ, ধান্ধাবাজ আমি নই। আশির দশক থেকে ফরিদপুরের যত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তার প্রতিটির শুরুতে আমি জড়িত ছিলাম। কোনো সংগঠন থেকে ১০ টাকারও কোনো ভাউচার দেখাতে পারলে আর সমাজসেবা করব না।

আমি যেহেতু রাজনীতি করি না, কোনো দলের সদস্য নই—তাই সবার কাছেই যাই। প্রতিষ্ঠানের জন্য যাই, ব্যক্তিস্বার্থে নয়। হ্যাঁ, এ কে আজাদের কাছেও গেছি, ভবিষ্যতেও যাব—প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে। তিনি শিশু চিকিৎসাকেন্দ্র ও মুসলিম মিশনে যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছেন, শহীদুল হাসান সাহেব ছাড়া আর কে দিয়েছেন?

যাই হোক, কথা অন্যদিকে চলে গেল। আসলে মফস্বল শহরে সাহিত্যচর্চা আর সমাজসেবার কাজ করতে কত ব্যথা আর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা আমাদের হাসিমুখ দেখে বোঝা যায় না।

সেদিন ময়েজ মঞ্জিলে লাইলি খালা গান গেয়েছিলেন। সেই লাইলি খালা—যাকে আমি শিল্পকলার সেক্রেটারি থাকাকালে হারমোনিয়ামের সামনে বসিয়েছিলাম। যে আমার কাছে আসত জোর করে দুটি গান শোনানোর জন্য।

সেই অনুষ্ঠানের ভিডিও, বিশেষ করে লাইলি খালার গান, ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর শত শত ফোন পেয়েছি। ফেসবুক সয়লাব হয়ে গেছে। তাই মনে হলো, লাইলি খালা সম্পর্কে কিছু লিখে রাখা দরকার।

দরদি এই শিল্পী নিজের কথা ভদ্রলোকদের কাছে গুছিয়ে বলতে পারেন না। মানুষ দেখতে ছুটে বেড়ানো এই আজন্ম ভবঘুরে নারী ভদ্রসমাজের সঙ্গেও খুব একটা মিশতে চান না। ভিউ-বাণিজ্য তাঁকে বিরক্ত করে। তিনি অন্য সবার মতো নন। তিনি সত্যিকারের ভবঘুরে। মানুষ দেখা পাগল।

লাইলি খালা বলেন—“এক মানুষের সঙ্গে আরেক মানুষের কোনো মিল নাই। এক জীবনে কি মানুষ দেখা ফুরায়, স্যার?”

এই হলো, আপাতত বর্তমানে ভাইরাল শিল্পী লাইলি খালার বৃত্তান্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, ফরিদপুর।

খাল খনন শেষে ৭৩ লাখ টাকা বাঁচিয়ে সরকারি কোষাগারে ফেরালেন সালথার ইউএনও

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
খাল খনন শেষে ৭৩ লাখ টাকা বাঁচিয়ে সরকারি কোষাগারে ফেরালেন সালথার ইউএনও

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, অপচয় কিংবা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ প্রায়ই আলোচনায় আসে। কিন্তু সেই প্রচলিত চিত্রের বাইরে গিয়ে ফরিদপুরের সালথা উপজেলা প্রশাসন গড়েছে এক ব্যতিক্রমী নজির। উপজেলার তিনটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত মান বজায় রেখে সম্পন্ন করার পর অব্যয়িত ৭৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৫ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

সরকারি অর্থের সাশ্রয়ী ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এই উদ্যোগের নেতৃত্বে ছিলেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন। প্রশাসনের এই পদক্ষেপ ইতোমধ্যে স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সুশীল সমাজের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আটঘর, রামকান্তপুর ও সোনাপুর ইউনিয়নের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখননের জন্য মোট ১ কোটি ৬৭ লাখ ৪৯ হাজার ৪০৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় মোট ৪ দশমিক ৫৩৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমানো এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা।

প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পরে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে কাজের মান ও অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়মিত তদারকি করা হয়েছে। বিশেষ করে ইউএনও দবির উদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে একাধিকবার প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন।

কাজের গুণগত মান, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।

প্রায় তিন মাসব্যাপী খননকাজ শেষে শ্রমিকদের মজুরি, যন্ত্রপাতি ব্যবহার, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়সহ সব বিল পরিশোধ করা হয়। এরপরও ৭৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৫ টাকা অব্যয়িত থাকে। সরকারি আর্থিক বিধিমালা অনুসরণ করে সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) একাধিক সদস্য বলেন, শুরু থেকেই ইউএনও দবির উদ্দিন প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, কাজের মান যাচাই এবং ব্যয়ের প্রতিটি খাত পর্যবেক্ষণের কারণে কোনো ধরনের অপচয় বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে নির্ধারিত মান অক্ষুণ্ন রেখেই কম ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে খালগুলো ভরাট হয়ে থাকায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যেত না। পুনঃখননের ফলে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্যও রক্ষা পাবে। পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা আশা করছেন।

সালথা উপজেলার বাসিন্দা আরমান মাতুব্বর ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “সরকারি প্রকল্পে কাজ শেষ হওয়ার পর টাকা ফেরত গেছে—এমন ঘটনা আমরা খুব একটা শুনি না। ইউএনও দবির উদ্দিন দেখিয়ে দিয়েছেন, সততা ও আন্তরিকতা থাকলে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব। আমরা এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।”

একই উপজেলার আনোয়ার মোল্যা বলেন, “খাল পুনঃখননের কাজও ভালো হয়েছে, আবার সরকারের অনেক টাকাও বেঁচেছে। এতে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বেড়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা চাইলে যে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করা যায়, সালথার এই উদ্যোগ তার বড় উদাহরণ।”

সালথা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মো. আছাদ মাতুব্বর ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “রাজনীতি যার যার জায়গায় থাকলেও ভালো কাজের প্রশংসা করতেই হবে। সরকারি অর্থ জনগণের সম্পদ। সেই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে অব্যয়িত টাকা কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রশংসনীয়। এমন উদ্যোগ অন্য উপজেলাগুলোর জন্যও অনুসরণীয় হতে পারে।”

সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার খায়রুল বাসার আজাদ ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে উন্নয়নের সুফল জনগণ পায়। সালথা উপজেলা প্রশাসন যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সত্যিই ইতিবাচক। ভবিষ্যতেও এ ধরনের স্বচ্ছ প্রশাসনিক চর্চা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা করি।”

সালথা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “সরকারি প্রকল্পে ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার সংস্কৃতি শক্তিশালী হলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অপচয় রোধে এটি অন্য প্রশাসনিক ইউনিটগুলোর জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”

সালথা প্রেসক্লাবের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কাজের মান অক্ষুণ্ন রেখে অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার ঘটনা সত্যিই প্রশংসনীয়। এটি প্রমাণ করে, সৎ ও দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্ব থাকলে জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। ইউএনও দবির উদ্দিনের নেতৃত্বে সালথা উপজেলা প্রশাসন যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা শুধু সালথা নয়, দেশের অন্যান্য প্রশাসনিক ইউনিটের জন্যও অনুসরণীয় হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি করবে।”

এ বিষয়ে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “সরকারি অর্থ জনগণের আমানত। এই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে মান বজায় রেখে প্রয়োজনীয় ব্যয় করেছি। কাজ শেষ হওয়ার পর যে অর্থ অবশিষ্ট ছিল, সরকারি বিধি অনুযায়ী তা কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের কল্যাণে বরাদ্দকৃত প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই প্রশাসনের অঙ্গীকার। ভবিষ্যতেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, যেখানে প্রায়ই সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, সেখানে সালথা উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। শুধু অর্থ সাশ্রয়ই নয়, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সততা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার যে উদাহরণ তৈরি হয়েছে, তা অন্য প্রশাসনিক ইউনিটগুলোর জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন তারা।

ফরিদপুরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শিক্ষকদের মতবিনিময় সভা, দুই প্রকল্প রাজস্ব খাতে নেওয়ার দাবি

মো. সাখাওয়াত হোসেন, ফরিদপুর
প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শিক্ষকদের মতবিনিময় সভা, দুই প্রকল্প রাজস্ব খাতে নেওয়ার দাবি

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ের উদ্যোগে ‘দারুল আরকাম ইসলামী শিক্ষা পরিচালনা ও সুসংহতকরণ প্রকল্প’ এবং ‘নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নয়নে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’ প্রকল্পের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অংশগ্রহণে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে ফরিদপুর জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মিলনায়তনে এ সভার আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে দুই প্রকল্পের বর্তমান কার্যক্রম, শিক্ষার মানোন্নয়ন, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশে শিক্ষকদের ভূমিকা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মাদ ইয়াছিন মোল্যার সভাপতিত্বে এবং কম্পিউটার অপারেটর মো. ইউনুস মণ্ডলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ।

বক্তারা বলেন, দারুল আরকাম ইসলামী শিক্ষা পরিচালনা ও সুসংহতকরণ প্রকল্প এবং মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম দেশের ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং শিশুদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব প্রকল্পে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকারা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও প্রকল্পভিত্তিক হওয়ায় তাদের চাকরির স্থায়িত্ব ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এ সময় বক্তারা প্রধান অতিথির মাধ্যমে দুই প্রকল্পকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপস্থাপনের আহ্বান জানান এবং সংসদে বিষয়টি উত্থাপনের অনুরোধ করেন।

জবাবে সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ শিক্ষকদের আশ্বস্ত করে বলেন, “আমাদের পরিবারের কাজ ইসলামকে সমুন্নত রাখা।” তিনি আরও বলেন, “আমি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের জন্য কাজ করি। শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।”

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফরিদপুর জেলার ফিল্ড অফিসার মো. রাসেল, মাস্টার ট্রেইনার মাওলানা রুহুল আমিন রহমানী, ফরিদপুর মুসলিম মিশনের সম্পাদক ও তমুদ্দুন মজলিস বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি প্রফেসর এম. এ. সামাদ, যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর এবিএম আব্দুস সাত্তার এবং ফরিদপুর কোতোয়ালি থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. রেজাউল ইসলাম।

এ ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসা ও মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শেষপর্বে বাংলাদেশ দারুল আরকাম শিক্ষক কল্যাণ সমিতি, ফরিদপুর জেলা শাখার পক্ষ থেকে উপস্থিত সকলের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

পরে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন ফরিদপুর জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা মো. তবীবুর রহমান।

দুই কিডনি অকেজো, থেমে যাচ্ছে ৩৩ বছর বয়সী সুমনের জীবনের গল্প!

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ
দুই কিডনি অকেজো, থেমে যাচ্ছে ৩৩ বছর বয়সী সুমনের জীবনের গল্প!

একসময় ছিলেন সংবাদকর্মী। মানুষের সুখ-দুঃখ, অন্যায়ের প্রতিবাদ আর এলাকার নানা ঘটনার খবর পৌঁছে দিতেন সবার কাছে। পরে জীবনের স্বপ্ন বদলে যায়। ইউটিউবকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলেন নতুন এক পথচলা। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পরিশ্রম করে নিজের জগতে ডুবে থাকতেন। ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন। অনেকেই ভাবতেন, হয়তো কাজের ব্যস্ততায় সময় পান না। কেউ কেউ বলতেন, ইউটিউব থেকেই মাসে লাখ টাকা আয় করেন, তাই আর আগের মতো মেলামেশা হয় না।

কিন্তু কেউ জানতেন না, সেই নীরবতার আড়ালে একদিন এমন ভয়ংকর বাস্তবতা অপেক্ষা করছে।

ফরিদপুরের সালথা উপজেলা সদরের বাসিন্দা মো. সুমন। বয়স মাত্র ৩৩ বছর। বাবা মো. শাহজাহান ফকির, যিনি একসময় সালথা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য ছিলেন। বাবার পথ ধরেই সুমনও সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। ঢাকা থেকে ডিগ্রি শেষ করে এলাকায় ফিরে দৈনিক সকালের সময় পত্রিকার সালথা উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি ইউটিউব কনটেন্ট তৈরিতে নিজেকে ব্যস্ত করে তোলেন। ২০২০ সালে সালথা প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিক কিছু নিয়মের কারণে বাবা-ছেলে দু’জনেরই সদস্যপদ আর থাকেনি। তবুও সাংবাদিকতার প্রতি ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

যারা সুমনকে কাছ থেকে চিনতেন, তারা বলেন—তিনি ছিলেন অত্যন্ত নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী একজন মানুষ। কারও সঙ্গে বিরোধ নয়, সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। হাসিমুখে কথা বলা, মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো—এসবই ছিল তার স্বভাব।

এরপর হঠাৎ করেই তিনি যেন হারিয়ে গেলেন সবার চোখের আড়ালে। দুই-তিন বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেই, বন্ধুদের সঙ্গে নেই, সহকর্মীদের সঙ্গেও নেই। সবাই ভেবেছিল, হয়তো নতুন স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত আছেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও নির্মম।

শনিবার (১১ জুলাই) সুমনের বাবা শাহজাহান ফকির যখন কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “আমার ছেলেটা ভালো নেই”, তখন যেন বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।

জানা গেল, প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে চিকিৎসকদের পরীক্ষায় ধরা পড়ে—সুমনের দুটি কিডনিই প্রায় সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। সেই থেকে শুরু হয় জীবন বাঁচানোর লড়াই। নিয়মিত চিকিৎসা, দামি ওষুধ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম—সব মিলিয়ে প্রতি মাসেই প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় এক লাখ টাকা। ইতোমধ্যে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় আট লাখ টাকা। কিন্তু সেই লড়াই এখন থমকে দাঁড়িয়েছে অর্থের অভাবে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, সুমনকে বাঁচাতে হলে দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। আর এই চিকিৎসায় প্রয়োজন প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা—যা একটি মধ্যবিত্ত তো দূরের কথা, অনেক সচ্ছল পরিবারের পক্ষেও জোগাড় করা কঠিন।

একজন অসহায় বাবা যখন নিজের সন্তানের দিকে তাকিয়ে কিছুই করতে পারেন না, তখন সেই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

শাহজাহান ফকির কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। বিক্রি করার মতো তেমন কোনো সম্পত্তিও নেই। চিকিৎসা চালাতে চালাতে যা ছিল, তাও শেষ হয়ে গেছে। টাকার অভাবে এখন চিকিৎসাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমার ছেলেটা ছটফট করে। ওর দিকে তাকালে বুকটা ভেঙে যায়। কিন্তু আমি একজন বাবা হয়েও কিছু করতে পারছি না। মাঝেমধ্যে নিজেকেই খুব অসহায় মনে হয়। আহারে জীবন!”

সুমনের ব্যক্তিগত জীবনও ছোট্ট অথচ স্বপ্নে ভরা। তার আয়ান নামে ছয় বছরের একটি ছেলে রয়েছে। বাবার অসুস্থতা হয়তো সে পুরোপুরি বোঝে না, কিন্তু প্রতিদিন বাবাকে কষ্ট পেতে দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে শেখছে—জীবন কত কঠিন হতে পারে। একজন শিশুর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা তার বাবা। সেই বাবাকেই যদি মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে হয়, তবে সেই পরিবারের যন্ত্রণা কল্পনাও করা কঠিন।

একসময় যিনি মানুষের খবর তুলে ধরতেন, আজ তিনিই মানুষের সহানুভূতি আর ভালোবাসার অপেক্ষায়। যে মানুষটি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে ব্যস্ত ছিলেন, আজ তার একমাত্র স্বপ্ন—আরও কিছুদিন বেঁচে থাকা, নিজের সন্তানকে বড় হতে দেখা, পরিবারের পাশে ফিরে দাঁড়ানো।

সমাজে অনেক হৃদয়বান মানুষ আছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান আছেন, যারা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। সবার সামান্য সহযোগিতাও কখনো কখনো একটি জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে। হয়তো কারও এক দিনের ব্যয়, কারও একটি ছোট অনুদান, কারও একটি মানবিক সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার সুযোগ এনে দিতে পারে সুমনের জন্য।

জীবন বড় অদ্ভুত। আজ যে মানুষটি অন্যের গল্প লিখতেন, আজ তার নিজের জীবনই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক গল্প। এই গল্পের শেষটা যেন মৃত্যু দিয়ে না হয়—এই প্রত্যাশাই সবার।

যদি কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন বা দানশীল প্রতিষ্ঠান সুমনের চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে চান, তাহলে যোগাযোগ করতে পারেন তার বাবা মো. শাহজাহান ফকিরের সঙ্গে।

যোগাযোগ: ০১৭১৩-৫১৭৪৪৮ (বাবা)
অথবা প্রতিবেদক: ০১৭৪৪৪৮৫৩০০

হয়তো আপনার একটি সহযোগিতাই ফিরিয়ে দিতে পারে একটি ছয় বছরের শিশুর বাবাকে, একজন অসহায় মায়ের সন্তানকে এবং একজন ভেঙে পড়া বাবার মুখের হারিয়ে যাওয়া হাসিটুকু।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।