যতদিন সংসদে দুর্নীতিমুক্ত ও ঋণখেলাপিমুক্ত সংসদ সদস্য না যাবে, ততদিন বাংলাদেশে সংবিধান থেকে জাতি ন্যায়বিচার পাবে না। কারণ, you will never find justice when criminal politicians make the law।
এটি কেবল একটি বাক্য নয়। এটি রাষ্ট্রের ভেতরের অমীমাংসিত সংকটের সংক্ষিপ্ত সারাংশ। এখানে প্রশ্ন ব্যক্তির নয়, কাঠামোর। প্রশ্ন দলীয় নয়, নৈতিকতার।
সংবিধান একটি জাতির সর্বোচ্চ নীতিপত্র। সেখানে ন্যায়, সমতা, মানবাধিকার ও জবাবদিহির অঙ্গীকার লেখা থাকে। কিন্তু সেই সংবিধান বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের হাতে, যদি তারাই দুর্নীতি, ঋণখেলাপি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তবে সংবিধানের ভাষা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। ন্যায়বিচার তখন নথিতে থাকে, বাস্তবে নয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিযোগিতা নীতির লড়াই নয়, প্রভাবের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি, ভোটের পরে প্রভাব বিস্তার। রাষ্ট্রীয় সম্পদকে জনসম্পদ হিসেবে নয়, দলীয় সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ বারবার উঠেছে। ঋণখেলাপিরা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, আর সাধারণ আমানতকারীরা অনিশ্চয়তায় থেকেছে। বড় প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, অথচ জবাবদিহি দুর্বল।
চাঁদাবাজি ও প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে বলে নাগরিকদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মনে করে, যোগ্যতা নয়, সংযোগই সাফল্যের পথ। এই ধারণা রাষ্ট্রের জন্য গভীর বিপদের সংকেত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ভোটের প্রতি আস্থার সংকট। যদি নাগরিক বিশ্বাস করতে না পারেন যে তাদের ভোটই প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করে, তবে গণতন্ত্র কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। গণতন্ত্রের প্রাণ হলো আস্থা। সেই আস্থা ক্ষয় হলে সংবিধানের প্রতিশ্রুতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় মূল প্রশ্নটি স্পষ্ট। আইন প্রণেতারা যদি নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হন, তবে আইন কি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে? যখন অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বা আর্থিক অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিরা আইন প্রণয়ন করেন, তখন আইনের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা কমে যায়। আইনের শাসন তখন ব্যক্তির শাসনে রূপ নিতে শুরু করে।
সমাধান ব্যক্তিবিশেষকে অপছন্দ করা নয়। সমাধান হলো কাঠামোগত শুদ্ধি। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নে নৈতিক মানদণ্ড কঠোর করা, ঋণখেলাপি ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের সংসদে প্রবেশ বন্ধ করা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাস্তব অর্থে শক্তিশালী করা জরুরি।
রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে প্রথমে সংসদকে শুদ্ধ করতে হবে। কারণ সংসদই আইন তৈরি করে, আর আইনই রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে। আইন যদি নৈতিকতার উপর দাঁড়ায়, রাষ্ট্র টিকে থাকে। আইন যদি স্বার্থের উপর দাঁড়ায়, রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে।
অতএব এই বাক্যটি কেবল প্রতিবাদ নয়, একটি সতর্কবার্তা।
ন্যায়বিচার কাগজে লেখা থাকে না, তা মানুষের হাতে গড়ে ওঠে।
আর সেই হাত যদি কলুষিত হয়, তবে সংবিধানও ন্যায় দিতে পারে না।
শেষ প্রশ্নটি এড়ানো যায় না। রাষ্ট্রের জনগণ যেমন, তার নেতৃত্বও সাধারণত তেমনি হয়। বাংলাদেশের জন্য কি এই কথাটি প্রযোজ্য?
গণতন্ত্রে নেতৃত্ব আকাশ থেকে নামে না। নেতৃত্ব উঠে আসে সমাজের ভেতর থেকে। যদি সমাজ দুর্নীতিকে সহনীয় মনে করে, যদি ঋণখেলাপিকে কৌশলী ব্যবসায়ী হিসেবে দেখে, যদি ভোট জালিয়াতিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে মেনে নেয়, যদি চাঁদাবাজিকে প্রভাবের অংশ মনে করে, তবে সেই মানসিকতার প্রতিফলনই একদিন সংসদে বসে। তখন আমরা কেবল নেতৃত্বকে দোষ দিই, কিন্তু আয়নায় নিজেদের দেখি না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে জনগণ দায়ী বলেই রাষ্ট্র ব্যর্থ। বরং এর অর্থ, পরিবর্তনের শক্তিও জনগণের ভেতরেই আছে। সমাজ যদি নৈতিক মানদণ্ড উঁচু করে, যদি ভোটাররা প্রশ্ন করতে শেখে, যদি দলীয় অন্ধত্বের বদলে নৈতিকতার ভিত্তিতে প্রতিনিধি বেছে নেয়, তবে সংসদ বদলাবে। সংসদ বদলালে আইন বদলাবে। আইন বদলালে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে।
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি তাই দ্বিমুখী। নেতৃত্ব কি জনগণের প্রতিচ্ছবি, নাকি জনগণকে এমন কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে যেখানে বিকল্পই সংকুচিত? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে কাঠামো ভাঙতে হবে। যদি প্রথমটি আংশিক সত্য হয়, তবে মানসিকতা বদলাতে হবে।
অতএব, যতদিন সংসদে দুর্নীতিমুক্ত ও ঋণখেলাপিমুক্ত প্রতিনিধি না যাবে, ততদিন সংবিধানের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে না। কিন্তু সেই পরিবর্তনের চাবিকাঠি জনগণের হাতেই।
প্রশ্ন এখন একটাই। আমরা কি কেবল অভিযোগ করব, নাকি নিজেদের রাজনৈতিক নৈতিকতাকেও পুনর্গঠন করব?
লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
আপনার মতামত লিখুন
Array