বর্ষার আগের সেই গুমট বিকেলগুলো আজও মাঝে মাঝে হঠাৎ ফিরে আসে। দূরের আকাশে কালো মেঘ জমে, তালগাছের মাথা দুলে ওঠে, আর দক্ষিণা বাতাস কেমন যেন পুরোনো দিনের গন্ধ বয়ে আনে। মনে হয়, এই তো একটু পরেই গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে ছুটে আসবে আমার সেই বন্ধুরা—রফিক, কালাম, জসিম, নুরু কিংবা ছোট্ট বাবলু। কেউ হাতে বাঁশের লাটিম, কেউবা পুরোনো ফুটবল, কেউ আবার গামছা কাঁধে নিয়ে ছুটে আসবে নদীর ঘাটে।
কিন্তু না, সময় বদলেছে। সেই বন্ধুরা আজ আর নেই। কেউ শহরের ইট-পাথরের জীবনে হারিয়ে গেছে, কেউ বিদেশের ব্যস্ততায় ডুবে আছে, কেউবা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। তবুও গ্রামের বাতাসে আজও তাদের হাসির শব্দ ভেসে আসে।
আমাদের গ্রামটার নাম ছিল খোয়াড়। ছোট্ট একটা গ্রাম। চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঝখানে সরু মেঠোপথ, আর গ্রামের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদী ‘মালঞ্চ’। ভোর হলে নদীর ঘাটে কুয়াশা নেমে আসত। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ শোনা যেত। আর আমরা তখন ঘুম ভেঙে দৌড়ে বেরিয়ে পড়তাম মাঠের দিকে।
শৈশবের দিনগুলো কত সহজ ছিল! তখন সুখ মানে ছিল বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলে ফুটবল খেলা। আনন্দ মানে ছিল বর্ষার জলে ভিজে বাড়ি ফেরা। কষ্ট মানে ছিল মা বকাঝকা করে খেলতে যেতে না দেওয়া।
আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল রফিক। খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে। কিন্তু হাসতে শুরু করলে পুরো আকাশ কেঁপে উঠত। ওর বাবা ছিলেন জেলে। ভোরে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন। মাঝে মাঝে রফিকও যেত বাবার সঙ্গে। স্কুলে এসে আমাদের গল্প করত—কীভাবে নদীর মাঝে জোৎস্না পড়ে চিকচিক করে, কীভাবে মাঝরাতে হঠাৎ বড় মাছ জালে ধরা পড়ে।
একদিন বর্ষাকালে আমরা সবাই মিলে নদীতে নেমেছিলাম। আকাশ তখন মেঘে ঢাকা। দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আমরা কেউ কচুরিপানার ভেলায় চড়েছি, কেউ সাঁতার কাটছি। হঠাৎ রফিক বলল, —“দেখিস, একদিন আমরা সবাই বড় হবো। কিন্তু এই নদী আমাদের ভুলবে না।”
তখন কথাটার মানে বুঝিনি। আজ বুঝি, নদী সত্যিই আমাদের ভুলে যায়নি। বরং আমরাই নদীকে ফেলে চলে গেছি।
বিকেল হলেই গ্রামের বটতলায় আড্ডা বসত। কালাম ছিল সবচেয়ে দুষ্টু। ও ছাড়া কোনো খেলাই জমত না। কখনো কারও গাছ থেকে কাঁচা আম পেড়ে আনত, কখনো গোপনে কারও পুকুরে ঝাঁপ দিত। একবার মেম্বার সাহেবের বাগান থেকে লিচু পেড়ে এনে সবাইকে খাইয়েছিল। পরে ধরা পড়ে এমন দৌড় দিয়েছিল যে আমরা হাসতে হাসতে পেট ব্যথা করে ফেলেছিলাম।
শীতের সকালে আমরা খেজুরের রস খেতে যেতাম। গ্রামের শেষ মাথায় ছিল ভোলা মোল্যা কাকার খেজুর গাছ। ভোরে তিনি হাঁড়ি নামাতেন। আমরা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তিনি হেসে বলতেন, —“এই পোলা-পাইনগুলা আবার আইছে!”
তারপর কাঁচা মাটির ভাঁড়ে রস ঢেলে দিতেন। সেই রসের স্বাদ আজও পৃথিবীর কোনো দামী পানীয়তে পাইনি।
আমাদের গ্রামের স্কুলটাও ছিল খুব মায়াময়। টিনের ছাউনি, সামনে বিশাল মাঠ, আর পাশে একটা পুরোনো কড়ই গাছ। গরমের দুপুরে ক্লাস করতে করতে বাইরে তাকালে দেখা যেত মাঠের ওপরে সাদা বক উড়ছে। মাঝে মাঝে মন চাইলেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমরা চলে যেতাম নদীর ধারে।
একদিন স্কুল পালিয়ে আমরা সবাই মিলে মেলায় গিয়েছিলাম। সে এক অন্যরকম আনন্দ! বাঁশির শব্দ, নাগরদোলা, বাতাসে জিলাপির গন্ধ। বাবলু একটা কাঠের বাঁশি কিনেছিল। সারাদিন সেটা বাজিয়ে পুরো গ্রাম মাথায় তুলেছিল।
সন্ধ্যা নামলে গ্রামের পরিবেশ বদলে যেত। পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ত। বাড়ি বাড়ি কুপি জ্বলত। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত। আমরা তখনও মাঠে খেলতাম। মায়ের ডাক শুনেও ফিরতাম না। শেষে বাবা লাঠি হাতে বের হলে দৌড়ে বাড়ি ফিরতাম।
আমার মা প্রায়ই বলতেন, —“এই সময়গুলা একদিন আর পাইবা না।” তখন মনে হতো মা বুঝি অকারণেই এসব বলেন। কিন্তু আজ শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে বুঝি, মা ভুল বলেননি।
সময় খুব নিঃশব্দে মানুষকে বদলে দেয়। এসএসসি পাশ করার পর একে একে সবাই ছড়িয়ে গেল। কেউ কলেজে, কেউ কাজে, কেউ দূর শহরে। গ্রামের আড্ডা ফাঁকা হতে লাগল।
প্রথমে কালাম গেল ঢাকায়। গার্মেন্টসে চাকরি নিল। কিছুদিন পর শুনলাম বিদেশে চলে গেছে। তারপর বাবলু। সে নাকি চট্টগ্রামে ব্যবসা শুরু করেছে। জসিম পুলিশে চাকরি পেল। রফিকই শুধু গ্রামে ছিল।
বহু বছর পর এক বর্ষার দিনে আমি গ্রামে ফিরলাম। চারদিকে সবকিছু যেন একই আছে, অথচ কোথাও যেন আগের সেই প্রাণ নেই। নদীর ঘাট আছে, কিন্তু সেখানে আর কিশোরদের হাসির শব্দ নেই। মাঠ আছে, কিন্তু সেখানে আর বিকেলের ফুটবল খেলা হয় না। বটগাছ আছে, কিন্তু তার নিচে আর আড্ডা বসে না।
আমি হাঁটতে হাঁটতে রফিকদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে শুনলাম, বছর দুয়েক আগে নদীতে ঝড়ের রাতে নৌকা ডুবে সে মারা গেছে।
খবরটা শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। মনে হলো, আমার শৈশবের একটা বড় অংশ যেন নদীর জলে ভেসে চলে গেছে।
সেদিন সন্ধ্যায় আমি একা নদীর ধারে গিয়ে বসেছিলাম। আকাশে কালো মেঘ। দক্ষিণা বাতাস বইছে। দূরে কোথাও শালিক ডাকছে। হঠাৎ মনে হলো, রফিক যেন পাশে বসে আছে।
মনে পড়ল, সেই কথাটা— “একদিন আমরা সবাই বড় হবো। কিন্তু এই নদী আমাদের ভুলবে না।”
আমার চোখ ভিজে উঠল।
রাত বাড়তে লাগল। গ্রামের পথ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম সেই পুরোনো স্কুলের দিকে। কড়ই গাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের রং উঠে গেছে। মাঠের ঘাস বড় হয়ে গেছে।
হঠাৎ মনে হলো, সময় আসলে মানুষকে একা করে দেয়। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কাটত, একসময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু স্মৃতিগুলো রয়ে যায়।
পরদিন সকালে আমি আবার বটতলায় গেলাম। সেখানে এখন একটা চায়ের দোকান। দোকানদার আমাকে চিনতে পারেনি। আমি চুপচাপ বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দূর থেকে একটা ছোট ছেলে দৌড়ে এলো। হাতে ফুটবল।
ছেলেটাকে দেখে মনে হলো, এ যেন আমাদেরই ছোটবেলা। আমি মুচকি হেসে বললাম, —“খেলা করিস?” সে হেসে বলল, —“জি চাচা, বিকেলে সবাই মিলে খেলি।”
তার হাসির ভেতরে আমি যেন আবার কালামদের দেখতে পেলাম। মনে হলো, সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু গ্রামের শৈশব কখনো মরে না। শুধু নতুন মুখে ফিরে আসে।
বিকেলে যখন গ্রাম ছেড়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, তখন আকাশে হালকা বৃষ্টি নামছিল। কাঁচা রাস্তার ধুলো ভিজে মাটির গন্ধ ছড়াচ্ছিল চারদিকে। আমি শেষবারের মতো পিছনে তাকালাম।
দূরে তালগাছ দুলছে। নদীর জল চিকচিক করছে। বাতাসে কেমন এক মায়া।
মনে হলো, গ্রামের সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা এখনও কোথাও আছে—হয়তো বাতাসে, হয়তো নদীর জলে, হয়তো সন্ধ্যার আজানের ধ্বনিতে।
শুধু আমরা আর আগের মতো ফিরে যেতে পারি না।
জীবন মানুষকে বড় করে দেয়, ব্যস্ত করে দেয়, দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু শৈশবের স্মৃতিগুলো কখনো পুরোনো হয় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি আপন হয়ে ওঠে।
আজও যখন শহরের ব্যস্ত রাতে জানালার পাশে দাঁড়াই, দূরের আকাশে মেঘ দেখি, তখন গ্রামের কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই মেঠোপথ, সেই নদী, সেই মাঠ, আর সেই বন্ধুগুলোর কথা। যারা আজ আর নেই, কিন্তু আমার প্রতিটি স্মৃতির ভেতর এখনও বেঁচে আছে।
দখিনা বাতাস আজও কত কথা বলে। গুমট হাওয়া আজও বুকের ভেতর পুরোনো দিনের দরজা খুলে দেয়। শুধু সময়ের পালাবদলে হারিয়ে গেছে কিছু মুখ, কিছু হাসি, কিছু বিকেল।
তবুও গ্রামের সেই শৈশব আজও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে।
লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর
আপনার মতামত লিখুন
Array