খুঁজুন
শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ২২ ফাল্গুন, ১৪৩২

আপনার ওপর কত জাকাত ফরজ? হিসাব করবেন যেভাবে

আবু সাঈদ
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৭:৫২ এএম
আপনার ওপর কত জাকাত ফরজ? হিসাব করবেন যেভাবে

সামর্থবান প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য জাকাত দেওয়া ফরজ। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেক এমন ব্যক্তি সামর্থ্যবান, যার কাছে সাড়ে বাহান্ন তোলা রুপা বা তার সমপরিমাণ মূল্যের নির্দিষ্ট সম্পদ রয়েছে। (রদ্দুল মুহতার : ২/২৫৯) সুতরাং যার কাছে এই পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার উপর জাকাত ফরজ। নির্দিষ্ট সময় তাকে জাকাত আদায় করতে হবে।

সব সম্পদে জাকাত আসে না। কেবলমাত্র পাঁচ ধরনের সম্পদে জাকাত আদায় করতে হয়। তা হলো স্বর্ণ, রুপা, নগদ ক্যাশ, ব্যবসায়ী পণ্য এবং গবাদি পশু (যদি গবাদি পশুর জন্য বছরের অধিকাংশ সময় খাবারের ব্যবস্থা করা না লাগে এবং মাঠের ঘাসেই তার পেট চলে, তাহলে জাকাত আসবে। অন্যথায় আসবে না।) এই পাঁচ জিনিসের মধ্য থেকে যেসব জিনিস আছে, তার মোট মূল্য যদি সাড়ে বাহান্ন তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ হয়, তাহলে জাকাত দিতে হবে। এগুলোর বাইরে অন্যান্য সম্পদে -হোক তা হীরা, জাওহার বা এজাতীয় কোনো মূল্যবান জিনিস- জাকাত আসবে না। (ফিকহি মাকালাত : ৩/১৪৮; আল বাহরুর রায়েক : ২/৩৬১; বাদায়েউস সানায়ে : ২/৯১; রদ্দুল মুহতার : ২/২৬৩)

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তি যেদিন সামর্থ্যবান হয়, সেদিনটি তার বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হয়। কারণ, এমন সামর্থ্যবান অবস্থায় থেকে এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ঠিক ওই দিনটিতেই জাকাত ফরজ হয়। ওই দিনের জাকাতযোগ্য সম্পদ অনুযায়ীই জাকাত আদায়ের পরিমাণ নির্ধারিত হয়। যেমন কেউ মুহাররমের ৫ তারিখে সামর্থ্যবান হলো, এরপর আগামী বছর মুহাররমের ৫ তারিখেও যদি তার কাছে নেসাব পরিমাণ জাকাতযোগ্য সম্পদ থাকে, তাহলে নতুন বছরের ৫ মুহাররম তার ওপর জাকাত ফরজ হবে এবং সেদিন যে পরিমাণ সম্পদ থাকে, তার আলোকে জাকাত আদায়ের পরিমাণ নির্ধারিত হবে। (ফিকহি মাকালাত : ৩/১৬৩-১৭০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/১৭৫; আল বাহরুর রায়েক : ২/৩৫৬; রদ্দুল মুহতার : ২/২৯৪)।

যে দিন জাকাত ফরজ হবে (যেমন উপরোক্ত উদাহরণে নতুন বছরের ৫ মুহাররম), ওই দিন ব্যক্তির কাছে থাকা জাকাতযোগ্য সম্পদের একটি তালিকা করতে হবে। এরপর এসব সম্পদের সর্বমোট মূল্য হিসাব করে বের করতে হবে। অতঃপর জাকাতযোগ্য সম্পদের মূল্য থেকে ঋণের টাকা -যদি থেকে থাকে- বাদ দিতে হবে। তারপর যে টাকাটা অবশিষ্ট থাকে, তার আড়াই শতাংশ হিসাব করে জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।

বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিত বলা যাক। জাকাতের হিসাব বের করতে আমাদের চার ধাপে কাজ করতে হবে। প্রথম কাজ হলো, জাকাতযোগ্য সম্পদের একটি তালিকা তৈরি করা। আমরা প্রথমেই বলেছি, জাকাতযোগ্য সম্পদ পাঁচটি- স্বর্ণ, রুপা, নগদ ক্যাশ, ব্যবসায়ী পণ্য এবং গবাদি পশু। এর মধ্যে স্বর্ণ-রুপার স্থিতি সহজেই নিরুপণ করা যায়। গবাদি পশুরু বিষয়টিও স্পষ্ট। কিন্তু নগদ ক্যাশ ও ব্যবসায়ী পণ্য বিভিন্ন পন্থায় সংরক্ষিত থাকে। সেজন্য অনেক ক্ষেত্রে তা নির্ধারণে বিভ্রম ঘটতে পারে। হিসাবের সুবিধার্তে আমরা একটি তালিকা নমুনা হিসেবে পেশ করছি-

যেমন থাকতে পারে স্বর্ণ, রুপা, নগদ অর্থ, প্রাপ্য ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রা, ব্যাংকে রক্ষিত অর্থ, ফেরতযোগ্য বীমা পলিসিতে জমাকৃত অর্থ, শেয়ার, বন্ডের ক্রয়মূল্য, ঐচ্ছিক প্রভিডেন্ট ফান্ডের মূল টাকা, বিক্রিত পণ্যের বাকি মূল্য, বিক্রির উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত বস্তু, ব্যবসার কাঁচামাল এবং অংশীদারিত্ব ব্যবসায় বিনিয়োগকৃত মূল পূঁজি ইত্যাদি।

এভাবে বিভিন্ন রূপে নগদ ক্যাশ এবং ব্যবসায়ী পণ্য থাকতে পারে। এসবের হিসাব বের করতে হবে। এটি জাকাত হিসাবের ক্ষেত্রে প্রথম কাজ।

দ্বিতীয় কাজ হলো, এসব সম্পদের মূল্য বের করতে হবে। মূল্য বের করার ক্ষেত্রে উত্তম হলো, এসব পণ্যের বাজারদর হিসাব করা। অর্থাৎ আপনি যদি এখন বাজার থেকে পণ্যটি ক্রয় করেন, কত টাকা দিয়ে কিনতে হবে, ওই পরিমাণ টাকা মূল্য ধরতে হবে। এভাবে প্রত্যেকটি পণ্যের বাজারদর খোঁজ করে মূল্য হিসাব করা। তারপর সবগুলো মূল্য যোগ করে দেখতে হবে আপনার কাছে কত টাকা আছে।

অবশ্য পণ্যটির বিক্রয় মূল্যের আলোকেও হিসাব করা যায়। অর্থাৎ আপনি পণ্যটি এখন বিক্রি করতে গেলে বাজারে কত টাকায় বিক্রি করতে পারবেন, সেটাকে মূল্য হিসেবে হিসাব করা। তবে ক্রয়মূল্য ধরা হলে যেহেতু দরিদ্রদের উপকার বেশি হয়, সেজন্য ক্রয়মূল্য ধরাটাই উত্তম। (ফাতাওয়া উসমানী : ২/৬৬)।

তৃতীয় কাজ হলো আপনার যদি কোনো ঋণ থেকে থাকে, ওই ঋণের টাকা জাকাতযোগ্য সম্পদের সর্বমোট মূল্য থেকে বাদ দিতে হবে। তবে এই ঋণের মধ্যে ব্যবসার ঋণ উদ্দেশ্য নয়। ঋণের একটি সম্ভাব্য তালিকা এমন হতে পারে-

ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নেওয়া ঋণ; বাকিতে ক্রয়কৃত পণ্যের অপরিশোধিত ঋণ, যা জাকাতবর্ষের মধ্যেই আদায় করতে হবে; স্ত্রীর মোহর, যা চলতি বছরই দেওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা রয়েছে; ফ্ল্যাট, দোকান, বাড়ি ইত্যাদি ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সিকিউরিটি হিসেবে নেওয়া অর্থ। ভাড়াটিয়া এর জাকাত আদায় করবে। তবে বাড়ি বা দোকানের মালিক যদি এর জাকাত আদায় করে ফেলে, তাহলে ওই টাকা হস্তগত হওয়ার আগে ভাড়াটিয়াকে এর জাকাত দিতে হবে না। যেন একই সম্পদে দুবার জাকাত না দিতে হয়। আর বাড়ি বা দোকানের মালিক প্রতি বছর এর জাকাত আদায় করে থাকলে, যে বছর সে উক্ত টাকা ফেরত দেবে, কেবল সেই বছর তা বাদ দিয়ে জাকাত হিসাব করবে; কর্মচারীদের অনাদায়ী বেতন-ভাতা; অনাদায়ী বাড়ি বা দোকান ভাড়া; ট্যাক্স ও বিদ্যুৎ ইত্যাদির বিল, যা আগে শোধ করা হয়নি এবং জাকাতবর্ষের মধ্যেই শোধ করতে হবে; অতীতের জাকাত যা এখনও আদায় করা হয়নি; ব্যবসার উদ্দেশ্যে নেওয়া ঋণ, যা দিয়ে জাকাতযোগ্য সম্পদ ক্রয় করা হয়েছে। যেমন, পণ্য বা কাঁচা মাল ইত্যাদি।

এগুলো হলো ঋণের সম্ভাব্য তালিকা। তৃতীয় কাজ হলো এসব ঋণ খুঁজে বের করা। তারপর তার মূল্য যোগ করে যত টাকা হয়, তা জাকাতের নেসাব থেকে বাদ দেওয়া। (আল বাহরুর রায়েক : ২/৩৫৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/১৭২; রদ্দুল মুখতার : ২/২৬০)।

চতুর্থ কাজ হলো, জাকাতের নেসাবে অবশিষ্ট যে টাকা আছে, তার থেকে আড়াই শতাংশ টাকা জাকাত হিসেবে আদায় করা।

এভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জাকাতযোগ্য সম্পদের হিসাব করে জাকাত আদায় করতে হয়। তবে এক্ষেত্রে উত্তম হলো, কোনো শরীয়াহ বিশেষজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে জাকাতের হিসাব সম্পন্ন করা। নিজে নিজে জাকাতের হিসাব করা সমুচিত নয়। কারণ, হতে পারে আপনার সম্পদের এমন কোনো দিক আছে, যেটাকে আপনি জাকাতযোগ্য মনে করছেন না। অথচ শরীয়তের দৃষ্টিতে তাতেও জাকাত আসে। বর্তমানে নগদ ক্যাশ ও ব্যবসায়ী পণ্য নানা উপায়ে গচ্ছিত থাকে। তাই এমন ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সেজন্য শরীয়াহ বিশেষজ্ঞ কোনো আলেমের মাধ্যমে জাকাতের হিসাব করিয়ে নেওয়াটা নিরাপদ।

মনে রাখতে হবে, জাকাত রমজানের সাথে সম্পৃক্ত কোনো ইবাদত নয়। বরং যেদিন ব্যক্তি সামর্থ্যবান হবে, তার ঠিক এক বছর পরে একই দিন তার ওপর জাকাত ফরজ হয়। ঠিক এক বছর পরেই জাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ বের করে জাকাত আদায়ের পরিমাণ নির্ধারণ করে নিতে হবে। এরপর ইচ্ছে হলে একসঙ্গে জাকাতের হকদারদের মাঝে ওই টাকা বিতরণ করে দিতে পারে। আবার অল্প অল্প করে বিভিন্ন সময় তা আদায় করা যেতে পারে।

কারো যদি রজমানে জাকাত আদায় করার ইচ্ছে থাকে, তাহলে তার উচিৎ হলো যেদিন জাকাত ফরজ হবে, সেদিন জাকাতের হিসাব করে টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করা। এরপর রমজানের সময় ওই টাকা জাকাতের হকদারদের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া। তবে উত্তম হবে- যেদিন জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করা হলো, সেদিন থেকে অল্প অল্প করে জাকাত দিতে শুরু করা। এরপর যখন রমজান মাস আসে, তখন বাকিটুকু হকদারদের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া।

 

ঈদের আগে দামপতনে বিপাকে ফরিদপুরের পেঁয়াজচাষি, লোকসানে বিক্রি করছেন আগাম ফসল

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও নুরুল ইসলাম নাহিদ, সালথা:
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম
ঈদের আগে দামপতনে বিপাকে ফরিদপুরের পেঁয়াজচাষি, লোকসানে বিক্রি করছেন আগাম ফসল

ফরিদপুরের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই জেলার অন্যতম প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানকার হাজার হাজার কৃষকের জীবিকা অনেকটাই নির্ভর করে এই ফসলের ওপর। প্রতিবছরের মতো এবারও দুই উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক পরিসরে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এই দুই উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করা হয়েছে।

তবে ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও হঠাৎ করে বাজারে দাম কমে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। বিশেষ করে রমজান মাসের আগে নগদ টাকার প্রয়োজন মেটাতে অনেক কৃষক অপরিপক্ক পেঁয়াজ তুলে বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু বাজারে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় তারা এখন লোকসানের মুখে পড়েছেন।

গত বছরের লাভ, এ বছরের হতাশা:

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর মৌসুমের শুরুতেই পেঁয়াজের দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। অনেক কৃষক তখন অপরিপক্ক পেঁয়াজ তুলে বাজারে বিক্রি করে বেশ লাভবান হয়েছিলেন।

গত মৌসুমে প্রতিমণ পেঁয়াজ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল। এতে কৃষকেরা উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কারণে এবারও অনেকে আগাম পেঁয়াজ তুলে বাজারে নিয়ে আসেন।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাইকারি বাজারে দাম কমে যাওয়ায় বর্তমানে প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯৫০ থেকে ১১০০ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচই উঠছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।

বাজারে ক্রেতা কম, হতাশ কৃষক:

শুক্রবার (৬ মার্চ) সকালে সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের বালিয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই অনেক কৃষক মাথায় বা ভ্যানে করে পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে এসেছেন। কিন্তু ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম।

পাইকাররা কম দামে পেঁয়াজ কিনছেন, আবার অনেক সময় দরদাম না মেলায় কৃষকেরা পণ্য নিয়ে বসে থাকছেন দীর্ঘ সময়। শেষ পর্যন্ত সংসারের প্রয়োজনে অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে হতাশ মনে বাড়ি ফিরছেন।

উৎপাদন খরচই উঠছে না:

বালিয়া বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “এবার পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ অনেক বেশি হয়েছে। সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরি, সেচ এবং পরিবহন খরচ মিলিয়ে প্রতিমণ পেঁয়াজ উৎপাদনে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৯০০ থেকে ১১০০ টাকা দরে। ফলে প্রতিমণে অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লোকসান হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “রমজান মাসে সংসারের খরচ বেশি থাকে। সেই কারণে বাধ্য হয়েই আগাম পেঁয়াজ তুলে বাজারে আনতে হয়েছে। এখন কম দামে বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সংসার তো চালাতে হবে।”

অপরিপক্ক পেঁয়াজ সংরক্ষণও সম্ভব নয়:

কৃষকেরা জানান, বর্তমানে যে পেঁয়াজ বাজারে আসছে সেগুলো পুরোপুরি পরিপক্ক হয়নি। এসব পেঁয়াজ পরিপক্ক হতে আরও এক থেকে দেড় মাস সময় লাগবে।

অপরিপক্ক অবস্থায় তোলা পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না। ঘরে রেখে দিলে দ্রুত পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে হলেও বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

ব্যবসায়ীরাও বিপাকে:

পেঁয়াজের বাজার খারাপ হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও খুব বেশি লাভ করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন পাইকাররা।

স্থানীয় পেঁয়াজ ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক বলেন,
“গত এক সপ্তাহ ধরে পেঁয়াজের বাজার খুব খারাপ। আমরা বর্তমানে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতিকেজি ২৫ থেকে ২৬ টাকা দরে পেঁয়াজ কিনছি। পরে এসব পেঁয়াজ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে হচ্ছে। সেখানে অনেক সময় প্রতিকেজিতে ১ থেকে ২ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “কৃষক ভালো দাম পেলে আমাদের ব্যবসাও ভালো হয়। কিন্তু বাজার খারাপ থাকলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, ব্যবসায়ীরাও সমস্যায় পড়েন।”

ভালো দামের প্রত্যাশা:

ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক মনে করেন, যদি পেঁয়াজের দাম প্রতিমণ ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে থাকে, তাহলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালাতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।

কৃষি বিভাগের পরামর্শ:

সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুদর্শন সিকদার বলেন, “সাধারণত পেঁয়াজ উত্তোলনের মূল সময় আর এক মাস পর শুরু হবে। কিন্তু অনেক কৃষক এখনই পেঁয়াজ তুলে বাজারে বিক্রি করছেন। এতে ফলন কম হওয়ার পাশাপাশি দামও কম পাচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “অপরিপক্ক অবস্থায় পেঁয়াজ তোলা হলে এর আকার ছোট হয় এবং সংরক্ষণক্ষমতাও কমে যায়। তাই কৃষকদের আমরা পরামর্শ দিচ্ছি, যতটা সম্ভব পরিপক্ক হওয়ার পরই পেঁয়াজ তুলতে।”

বিপুল উৎপাদনের সম্ভাবনা:

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সালথা ও নগরকান্দায় আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পেঁয়াজের ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে এবং রোগবালাই কম হয়, তাহলে এবার দুই উপজেলায় বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তবে বাজারদর স্থিতিশীল না থাকলে সেই সুফল কৃষকেরা নাও পেতে পারেন।

কৃষকের দাবি:

স্থানীয় কৃষকেরা মনে করেন, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে মৌসুমের শুরুতে বাজারে অস্থিরতা কমাতে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি।

কৃষকেরা জানান, যদি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পেঁয়াজ চাষে কৃষকের আগ্রহ আরও বাড়বে এবং দেশের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই অঞ্চল।

সার্বিক পরিস্থিতি:

ফরিদপুরের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার কৃষি অর্থনীতির বড় অংশই নির্ভর করে পেঁয়াজ চাষের ওপর। তাই বাজারে দাম কমে গেলে এর প্রভাব সরাসরি পড়ে হাজারো কৃষক পরিবারের ওপর।

বর্তমানে আগাম পেঁয়াজ কম দামে বিক্রি করে অনেক কৃষক লোকসানে পড়লেও তারা আশা করছেন, মৌসুমের মূল সময়ে বাজারদর কিছুটা বাড়বে।

তবে কৃষক, ব্যবসায়ী ও কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে।

নারীরা পরকীয়ায় বেশি জড়িয়ে পড়ে কেন? জানলে অবাক হবেন

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৯:৫৪ এএম
নারীরা পরকীয়ায় বেশি জড়িয়ে পড়ে কেন? জানলে অবাক হবেন

পরকীয়ায় নারীরা জড়িয়ে পড়ে কেন? সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত-নারী পরকীয়ায় জড়ালে সেটা নাকি “চরিত্রের সমস্যা”। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর পরকীয়া শরীর থেকে নয়, শুরু হয় মন থেকে।

১. মানসিক অবহেলা ও একাকীত্ব অনেক নারী সংসারে থেকেও ভীষণ একা। স্বামী শারীরিকভাবে পাশে থাকলেও মানসিকভাবে অনুপস্থিত। কথা নেই, যত্ন নেই, অনুভব করার কেউ নেই। এই দীর্ঘ একাকীত্ব একদিন তাকে এমন একজনের দিকে ঠেলে দেয়, যে অন্তত তার কথা শোনে।

২. ভালোবাসা ও স্বীকৃতির অভাব নারী চায় না অনেক কিছু-সে শুধু চায় কেউ তাকে বুঝুক, বলুক- “তুমি গুরুত্বপূর্ণ।” যখন স্বামীর কাছ থেকে সে স্বীকৃতি পায় না, আর অন্য কেউ একটু প্রশংসা করে, তখন সেই প্রশংসাই হয়ে ওঠে ভয়ংকর মায়া।

৩. দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি প্রতিদিন একই রুটিন, কোনো আবেগ নেই, কোনো রোমান্স নেই। নারীর মনও তো অনুভূতির-সে চায় নতুন করে ভালোবাসা অনুভব করতে। এই একঘেয়েমিই অনেক সময় তাকে ভুল সিদ্ধান্তে ঠেলে দেয়।

৪. দীর্ঘদিনের দমন করা কষ্ট অনেক নারী বছরের পর বছর অপমান, অবহেলা, কঠিন কথা, কিংবা নির্যাতন সহ্য করে। এক সময় সে ভেঙে পড়ে। আর তখন যে একটু সহানুভূতি দেখায়, সেই মানুষটাকেই সে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে।

৬৫. সামাজিক মাধ্যম ও সহজ যোগাযোগ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ-আজ যোগাযোগ খুব সহজ। একটা ইনবক্স, একটা “তুমি কেমন আছো?” এই ছোট কথাগুলোই অনেক সময় নারীর দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণ করে ফেলে।

৬. আত্মমূল্যবোধ হারিয়ে ফেলা যখন একজন নারী বারবার শুনতে থাকে-“তুমি কিছুই পারো না”, “তোমার কোনো মূল্য নেই”-তখন সে নিজেকেই ভুলে যায়। আর কেউ যদি তাকে নতুন করে মূল্যবান মনে করায়, সে সেখানে জড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু সত্যিটা কী?

নারীর পরকীয়া খুব কম ক্ষেত্রেই পরিকল্পিত। এটা বেশিরভাগ সময় অবহেলার প্রতিক্রিয়া। ভালোবাসা না পেলে, মানুষ মায়া খোঁজে। আর সেই মায়া একদিন পরকীয়ায় রূপ নেয়।

সমাধান কোথায়?

স্ত্রীকে শুধু দায়িত্ব নয়, মানুষ হিসেবে অনুভব করুন।

তার কথা শুনুন, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন।

ভালোবাসা প্রকাশে কৃপণতা করবেন না।

← মনে রাখুন-

যেখানে ভালোবাসা থাকে, সেখানে পরকীয়ার জায়গা হয় না।

শেষ কথা:

পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া কোনো নারী হঠাৎ খারাপ হয়ে যায় না।

সে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে-

অবহেলা, একাকীত্ব আর না-পাওয়ার ভারে।

তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত-

“নারী কেন পরকীয়ায় জড়ায়?” না, “আমরা তাকে কী দিতে পারিনি?”

‘গ্রামের সেই বন্ধুরা আজ আর নেই’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ৮:৪০ এএম
‘গ্রামের সেই বন্ধুরা আজ আর নেই’

অনেক বছর পর আজ আবার গ্রামে ফিরেছি। বাস থেকে নামতেই কাঁচা রাস্তার ধুলো, বাতাসে ধানের গন্ধ আর দূরে বাঁশবাগানের মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে মনে হলো যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সময় কখনও থামে না। শুধু মানুষ বদলে যায়, দৃশ্যপট বদলে যায়, আর একসময় বুঝতে পারি—যাদের সঙ্গে জীবনটা শুরু হয়েছিল, তারা কেউ আর পাশে নেই।

আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম সেই পুরোনো রাস্তা ধরে। রাস্তার পাশে সেই পুকুরটা এখনও আছে। তবে আগের মতো কচুরিপানায় ভরা নয়। পাড়ে এখন ইট বসানো হয়েছে। পুকুরের দিকে তাকাতেই মনে পড়ে গেল সেই বিকেলগুলোর কথা—যখন আমরা পাঁচজন বন্ধু এখানে এসে ঝাঁপ দিতাম।

আমি, রফিক, জাহিদ, বাবলু আর শামীম।
আমাদের বন্ধুত্বটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু তাতে ছিল অদ্ভুত এক শক্তি। তখন মোবাইল ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না। ছিল শুধু মাঠ, নদী, কাদামাটি আর একে অপরের সঙ্গ।

স্কুল ছুটির পর আমরা দৌড়ে চলে যেতাম মাঠে। কেউ বল নিয়ে আসত, কেউ ব্যাট। কখনও ফুটবল, কখনও ক্রিকেট—যেটা পাওয়া যেত সেটাই খেলতাম। খেলার শেষে সবাই মিলে পুকুরে ঝাঁপ দিতাম। কারও মা দূর থেকে চিৎকার করে ডাকত—
“এই রফিক! বাড়ি আয়, সন্ধ্যা হয়ে গেছে!”
রফিক তখন হেসে বলত,
“আর পাঁচ মিনিট!”

সেই পাঁচ মিনিট কখনও পাঁচ মিনিটে শেষ হতো না।
একদিন বর্ষার বিকেলে আমরা সবাই মিলে নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়েছিলাম। নদীটা তখন বেশ ফুলে উঠেছিল। জাহিদ একটু ভয় পেয়েছিল। সে বলেছিল,
“দোস্ত, আজ না যাই?”
কিন্তু বাবলু বলেছিল,
“আরে ভয় কিসের? আমরা তো আছিই!”
আমরা সবাই হেসেছিলাম। সেই হাসির শব্দ এখনও যেন বাতাসে ভেসে আসে।

গ্রামের জীবন ছিল সহজ। বিকেলে তালগাছের ছায়ায় বসে গল্প করা, মেলা এলে সবাই মিলে ঘুরতে যাওয়া, ঈদের দিন নতুন জামা পরে একে অপরের বাড়িতে বেড়ানো—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের আনন্দ।

কিন্তু সময় ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।
প্রথমে জাহিদ চলে গেল শহরে পড়তে। সে বলেছিল,
“ভালো রেজাল্ট করলে ঢাকায় কলেজে পড়ব।”
আমরা সবাই তাকে স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল কয়েকদিনের জন্যই যাচ্ছে। কিন্তু সেই কয়েকদিন ধীরে ধীরে কয়েক বছরে বদলে গেল।

তারপর রফিকও কাজের জন্য চলে গেল চট্টগ্রামে। বাবলু বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখত। একদিন সত্যিই সে মালয়েশিয়া চলে গেল। শামীম গ্রামের বাজারে একটা দোকান দিল।
আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শহরে চলে গেছি।

প্রথম দিকে আমরা ফোনে কথা বলতাম। মাঝে মাঝে ঈদের সময় দেখা হতো। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল, ততই যোগাযোগ কমে গেল।
একদিন খবর পেলাম—রফিক আর নেই।
কারখানায় কাজ করার সময় একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল। খবরটা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। বিশ্বাসই হচ্ছিল না।
তারপর কয়েক বছর পর শুনলাম শামীম অসুস্থ হয়ে মারা গেছে।

বাবলু এখনও বিদেশেই আছে, কিন্তু বহু বছর তার কোনো খবর নেই। জাহিদ নাকি ঢাকায় বড় চাকরি করে, কিন্তু তার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল প্রায় দশ বছর আগে।

আজ এত বছর পর গ্রামে ফিরে বুঝতে পারছি—আমাদের সেই ছোট্ট পৃথিবীটা আর নেই।
আমি হাঁটতে হাঁটতে সেই পুরোনো স্কুলের সামনে এসে দাঁড়ালাম। স্কুলের দেয়াল নতুন করে রং করা হয়েছে। মাঠটাও আগের চেয়ে ছোট মনে হচ্ছে।
এক কোণে কয়েকটা ছোট ছেলে ক্রিকেট খেলছে। তাদের হাসির শব্দ শুনে হঠাৎ মনে হলো—আমরাও তো একদিন এমনই ছিলাম।

হয়তো তারা এখন বুঝতে পারছে না, কিন্তু একদিন তারাও বড় হবে। কেউ শহরে যাবে, কেউ বিদেশে। কেউ হয়তো আর ফিরেও আসবে না।
আমি মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাদের খেলা দেখলাম।
হঠাৎ মনে হলো, যদি এখন রফিক এসে বলে—
“এই দোস্ত, খেলবি?”
যদি জাহিদ এসে বলে—
“আজ নদীতে যাবি?”

যদি বাবলু সেই আগের মতো হেসে ওঠে।
কিন্তু জানি, সেটা আর কখনও হবে না।
বিকেলের সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। বাতাসে আবার সেই পুরোনো গ্রামের গন্ধ। কিন্তু এই গন্ধের ভেতরেও একটা শূন্যতা আছে।
আমি পুকুরের পাড়ে গিয়ে বসে পড়লাম। পানিতে সূর্যের আলো ঝিলমিল করছে।

মনে হলো, আমাদের শৈশবটা ঠিক এই পানির ঢেউয়ের মতো—একসময় ছিল, খুব কাছেই ছিল। কিন্তু এখন শুধু স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।
হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বললাম—
“বন্ধুরা, তোমরা যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।
এই গ্রামটা এখনও আছে, এই পুকুরটা এখনও আছে…
শুধু তোমরা আর নেই।”

সন্ধ্যার আজানের ধ্বনি ভেসে এলো দূরের মসজিদ থেকে।
আর আমি বুঝলাম—জীবন সামনে এগিয়ে যায়, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর কোথাও না কোথাও সেই গ্রামের বন্ধুরা চিরকাল বেঁচে থাকে।

লেখক: হারুন-অর-রশীদ, সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।