খুঁজুন
শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

‘গ্রামের সেই বিকেলগুলো আর ফিরে আসে না’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১০:০১ পূর্বাহ্ণ
‘গ্রামের সেই বিকেলগুলো আর ফিরে আসে না’

বর্ষার আগের সেই গুমট বিকেলগুলো আজও মাঝে মাঝে হঠাৎ ফিরে আসে। দূরের আকাশে কালো মেঘ জমে, তালগাছের মাথা দুলে ওঠে, আর দক্ষিণা বাতাস কেমন যেন পুরোনো দিনের গন্ধ বয়ে আনে। মনে হয়, এই তো একটু পরেই গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে ছুটে আসবে আমার সেই বন্ধুরা—রফিক, কালাম, জসিম, নুরু কিংবা ছোট্ট বাবলু। কেউ হাতে বাঁশের লাটিম, কেউবা পুরোনো ফুটবল, কেউ আবার গামছা কাঁধে নিয়ে ছুটে আসবে নদীর ঘাটে।

কিন্তু না, সময় বদলেছে। সেই বন্ধুরা আজ আর নেই। কেউ শহরের ইট-পাথরের জীবনে হারিয়ে গেছে, কেউ বিদেশের ব্যস্ততায় ডুবে আছে, কেউবা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। তবুও গ্রামের বাতাসে আজও তাদের হাসির শব্দ ভেসে আসে।

আমাদের গ্রামটার নাম ছিল খোয়াড়। ছোট্ট একটা গ্রাম। চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঝখানে সরু মেঠোপথ, আর গ্রামের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদী ‘মালঞ্চ’। ভোর হলে নদীর ঘাটে কুয়াশা নেমে আসত। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ শোনা যেত। আর আমরা তখন ঘুম ভেঙে দৌড়ে বেরিয়ে পড়তাম মাঠের দিকে।

শৈশবের দিনগুলো কত সহজ ছিল! তখন সুখ মানে ছিল বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলে ফুটবল খেলা। আনন্দ মানে ছিল বর্ষার জলে ভিজে বাড়ি ফেরা। কষ্ট মানে ছিল মা বকাঝকা করে খেলতে যেতে না দেওয়া।

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল রফিক। খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে। কিন্তু হাসতে শুরু করলে পুরো আকাশ কেঁপে উঠত। ওর বাবা ছিলেন জেলে। ভোরে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন। মাঝে মাঝে রফিকও যেত বাবার সঙ্গে। স্কুলে এসে আমাদের গল্প করত—কীভাবে নদীর মাঝে জোৎস্না পড়ে চিকচিক করে, কীভাবে মাঝরাতে হঠাৎ বড় মাছ জালে ধরা পড়ে।

একদিন বর্ষাকালে আমরা সবাই মিলে নদীতে নেমেছিলাম। আকাশ তখন মেঘে ঢাকা। দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আমরা কেউ কচুরিপানার ভেলায় চড়েছি, কেউ সাঁতার কাটছি। হঠাৎ রফিক বলল, —“দেখিস, একদিন আমরা সবাই বড় হবো। কিন্তু এই নদী আমাদের ভুলবে না।”

তখন কথাটার মানে বুঝিনি। আজ বুঝি, নদী সত্যিই আমাদের ভুলে যায়নি। বরং আমরাই নদীকে ফেলে চলে গেছি।

বিকেল হলেই গ্রামের বটতলায় আড্ডা বসত। কালাম ছিল সবচেয়ে দুষ্টু। ও ছাড়া কোনো খেলাই জমত না। কখনো কারও গাছ থেকে কাঁচা আম পেড়ে আনত, কখনো গোপনে কারও পুকুরে ঝাঁপ দিত। একবার মেম্বার সাহেবের বাগান থেকে লিচু পেড়ে এনে সবাইকে খাইয়েছিল। পরে ধরা পড়ে এমন দৌড় দিয়েছিল যে আমরা হাসতে হাসতে পেট ব্যথা করে ফেলেছিলাম।

শীতের সকালে আমরা খেজুরের রস খেতে যেতাম। গ্রামের শেষ মাথায় ছিল ভোলা মোল্যা কাকার খেজুর গাছ। ভোরে তিনি হাঁড়ি নামাতেন। আমরা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তিনি হেসে বলতেন, —“এই পোলা-পাইনগুলা আবার আইছে!”

তারপর কাঁচা মাটির ভাঁড়ে রস ঢেলে দিতেন। সেই রসের স্বাদ আজও পৃথিবীর কোনো দামী পানীয়তে পাইনি।

আমাদের গ্রামের স্কুলটাও ছিল খুব মায়াময়। টিনের ছাউনি, সামনে বিশাল মাঠ, আর পাশে একটা পুরোনো কড়ই গাছ। গরমের দুপুরে ক্লাস করতে করতে বাইরে তাকালে দেখা যেত মাঠের ওপরে সাদা বক উড়ছে। মাঝে মাঝে মন চাইলেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমরা চলে যেতাম নদীর ধারে।

একদিন স্কুল পালিয়ে আমরা সবাই মিলে মেলায় গিয়েছিলাম। সে এক অন্যরকম আনন্দ! বাঁশির শব্দ, নাগরদোলা, বাতাসে জিলাপির গন্ধ। বাবলু একটা কাঠের বাঁশি কিনেছিল। সারাদিন সেটা বাজিয়ে পুরো গ্রাম মাথায় তুলেছিল।

সন্ধ্যা নামলে গ্রামের পরিবেশ বদলে যেত। পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ত। বাড়ি বাড়ি কুপি জ্বলত। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত। আমরা তখনও মাঠে খেলতাম। মায়ের ডাক শুনেও ফিরতাম না। শেষে বাবা লাঠি হাতে বের হলে দৌড়ে বাড়ি ফিরতাম।

আমার মা প্রায়ই বলতেন, —“এই সময়গুলা একদিন আর পাইবা না।” তখন মনে হতো মা বুঝি অকারণেই এসব বলেন। কিন্তু আজ শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে বুঝি, মা ভুল বলেননি।

সময় খুব নিঃশব্দে মানুষকে বদলে দেয়। এসএসসি পাশ করার পর একে একে সবাই ছড়িয়ে গেল। কেউ কলেজে, কেউ কাজে, কেউ দূর শহরে। গ্রামের আড্ডা ফাঁকা হতে লাগল।

প্রথমে কালাম গেল ঢাকায়। গার্মেন্টসে চাকরি নিল। কিছুদিন পর শুনলাম বিদেশে চলে গেছে। তারপর বাবলু। সে নাকি চট্টগ্রামে ব্যবসা শুরু করেছে। জসিম পুলিশে চাকরি পেল। রফিকই শুধু গ্রামে ছিল।

বহু বছর পর এক বর্ষার দিনে আমি গ্রামে ফিরলাম। চারদিকে সবকিছু যেন একই আছে, অথচ কোথাও যেন আগের সেই প্রাণ নেই। নদীর ঘাট আছে, কিন্তু সেখানে আর কিশোরদের হাসির শব্দ নেই। মাঠ আছে, কিন্তু সেখানে আর বিকেলের ফুটবল খেলা হয় না। বটগাছ আছে, কিন্তু তার নিচে আর আড্ডা বসে না।

আমি হাঁটতে হাঁটতে রফিকদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে শুনলাম, বছর দুয়েক আগে নদীতে ঝড়ের রাতে নৌকা ডুবে সে মারা গেছে।

খবরটা শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। মনে হলো, আমার শৈশবের একটা বড় অংশ যেন নদীর জলে ভেসে চলে গেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় আমি একা নদীর ধারে গিয়ে বসেছিলাম। আকাশে কালো মেঘ। দক্ষিণা বাতাস বইছে। দূরে কোথাও শালিক ডাকছে। হঠাৎ মনে হলো, রফিক যেন পাশে বসে আছে।

মনে পড়ল, সেই কথাটা— “একদিন আমরা সবাই বড় হবো। কিন্তু এই নদী আমাদের ভুলবে না।”
আমার চোখ ভিজে উঠল।

রাত বাড়তে লাগল। গ্রামের পথ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম সেই পুরোনো স্কুলের দিকে। কড়ই গাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের রং উঠে গেছে। মাঠের ঘাস বড় হয়ে গেছে।

হঠাৎ মনে হলো, সময় আসলে মানুষকে একা করে দেয়। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কাটত, একসময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু স্মৃতিগুলো রয়ে যায়।
পরদিন সকালে আমি আবার বটতলায় গেলাম। সেখানে এখন একটা চায়ের দোকান। দোকানদার আমাকে চিনতে পারেনি। আমি চুপচাপ বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দূর থেকে একটা ছোট ছেলে দৌড়ে এলো। হাতে ফুটবল।

ছেলেটাকে দেখে মনে হলো, এ যেন আমাদেরই ছোটবেলা। আমি মুচকি হেসে বললাম, —“খেলা করিস?” সে হেসে বলল, —“জি চাচা, বিকেলে সবাই মিলে খেলি।”

তার হাসির ভেতরে আমি যেন আবার কালামদের দেখতে পেলাম। মনে হলো, সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু গ্রামের শৈশব কখনো মরে না। শুধু নতুন মুখে ফিরে আসে।

বিকেলে যখন গ্রাম ছেড়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, তখন আকাশে হালকা বৃষ্টি নামছিল। কাঁচা রাস্তার ধুলো ভিজে মাটির গন্ধ ছড়াচ্ছিল চারদিকে। আমি শেষবারের মতো পিছনে তাকালাম।
দূরে তালগাছ দুলছে। নদীর জল চিকচিক করছে। বাতাসে কেমন এক মায়া।

মনে হলো, গ্রামের সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা এখনও কোথাও আছে—হয়তো বাতাসে, হয়তো নদীর জলে, হয়তো সন্ধ্যার আজানের ধ্বনিতে।
শুধু আমরা আর আগের মতো ফিরে যেতে পারি না।

জীবন মানুষকে বড় করে দেয়, ব্যস্ত করে দেয়, দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু শৈশবের স্মৃতিগুলো কখনো পুরোনো হয় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি আপন হয়ে ওঠে।

আজও যখন শহরের ব্যস্ত রাতে জানালার পাশে দাঁড়াই, দূরের আকাশে মেঘ দেখি, তখন গ্রামের কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই মেঠোপথ, সেই নদী, সেই মাঠ, আর সেই বন্ধুগুলোর কথা। যারা আজ আর নেই, কিন্তু আমার প্রতিটি স্মৃতির ভেতর এখনও বেঁচে আছে।

দখিনা বাতাস আজও কত কথা বলে। গুমট হাওয়া আজও বুকের ভেতর পুরোনো দিনের দরজা খুলে দেয়। শুধু সময়ের পালাবদলে হারিয়ে গেছে কিছু মুখ, কিছু হাসি, কিছু বিকেল।

তবুও গ্রামের সেই শৈশব আজও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

ফরিদপুরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে কুপিয়ে জখম

ভাঙ্গা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ৩:২৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে কুপিয়ে জখম

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বাস ও পরিবহনে চাঁদাবাজির ঘটনায় দুই অভিযুক্তকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়ার ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ফেসবুকে শেয়ার করায় সাইদুর রহমান মিঠু শিকদার (৪২) নামে এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে পুলিশের দাবি, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।

আহত সাইদুর রহমান মিঠু ভাঙ্গা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক পদে রয়েছেন এবং ভাঙ্গা পৌরসভার কাপুড়িয়া সদরদি এলাকার শাহজাহান শিকদারের ছেলে। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাত ৯ টায় কাপুড়িয়া সদরদি এলাকায় তাঁর ওপর দুই দফায় হামলার ঘটনা ঘটে। একই এলাকার শাহী মুন্সির ছেলে এলাকার সোহান মুন্সি (২৮) ও হোগলাডাঙ্গী সদরদি এলাকার লিয়াকত মোল্যার ছেলে শোয়েব মোল্যার (৩০) নেতৃত্বে ১০ থেকে ১৫ জন দেশীয় অস্ত্র হাতুড়ি, চাকু ও লোহার পাইপ নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। পরে তাকে উদ্ধার করে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়।

শুক্রবার (১৫ মে) দুপুর ১২ টায় আহত সাইদুর রহমান মিঠুর ছোট ভাই রাজু শিকদার জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতেই তাঁর ভাইকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁর মাথায় কোপের কারনে ৬টি সেলাই ও পাজরের একটি হাড় ভেঙে গিয়েছে বলে তিনি জানান।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সোহান ও শোয়েব চিহ্নিত চাঁদাবাজ এবং নিক্সন চৌধুরীর ক্যাডার ছিল। ওরা ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে বিভিন্ন কাউন্টারে চাঁদাবাজি সহ প্রভাব বিস্তার করে। গত ১২ মে তাঁদের পুলিশ ধরে নিয়ে যায় এবং পরে বিএনপির সেক্রেটারী আইযূব মোল্যা গিয়ে ছাড়িয়ে আনে। এগুলো নিয়ে নিউজ হয় এবং আমার ভাই সেই নিউজগুলো শেয়ার করেছিল- এটাই আমার ভাইয়ের অপরাধ ছিল।

তিনি বলেন, যে কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে সোহান ও শোয়েবেরে নেতৃত্বে আমার ভাইয়ের ওপরে হামলা চালানো হয়েছে। তাঁরা সন্ধ্যায় প্রথমে আমার ভাইকে লাঠি ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করে। তখন বার বার পুলিশের সহযোগিতা চাইলেও পাইনি এবং হামলাকারীরা আবারও ওঁৎ পেতে থাকে। রাত ৯টার দিকে ভাঙ্গা হাসপাতালে নেয়ার সময় আবারও হামলা চালিয়ে চাকু দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় আমার মা ও আমাকেও মারধর করে হামলাকারীরা।

এছাড়া সাইদুর রহমান মিঠু অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে ওদের ছাড়িয়ে নেয়ার খবরগুলো দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষায় আমার ফেসবুকে শেয়ার করেছিলাম এবং আমার ফেসবুক থেকেও অনেক শেয়ার হয়েছিল। এই কারণে হামলার আধাঘণ্টা পূর্বে আইয়ূব মোল্যার (উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক) ছেলে রাজু মোল্যা আমার ছোট ভাইকে হুমকি দিয়ে বলেছিল- ‘তোর ভাইকে দেখায় দেব’। এরপর সন্ধ্যায় বাড়ির পাশে কয়েল আনতে গেলে অতর্কিতভাবে ওরা এসে হাতুড়ি দিয়ে মারতে থাকে। এসময় একটি দোকানে দৌঁড়ে গিয়ে আমি আশ্রয় নিই। তখন বার বার ওসিকে ফোন দিলে কেটে দেন এবং ৯৯৯-এ কল দিলেও পুলিশ দেরি করে আসে। এরপর আমাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে আবারও হামলা চালিয়েছে।

এ ঘটনার বিষয়ে জানতে সোহান মুন্সি পলাতক থাকায় তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ূব মোল্যা বলেন, ‘ঘটনাটি আসলেই ন্যাক্কারজনক, ঠিক করেনি। আমি ওসিকে ফোন দিয়ে বলেছি- আইনগত ব্যবস্থা নিতে। অন্যায়ের সাথে আমি নেই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে- আমরা প্রাথমিকভাবে জেনেছি। এখনও থানায় কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি, অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ এছাড়া চাঁদাবাজে অভিযুক্ত সোহান ও শোয়েবকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়ার সংবাদ শেয়ার করায় এই হামলার সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে কি-না; সে বিষয়ে তিনি জানেন না বলে মন্তব্য করেন।

উল্লেখ্য, গত ১২ মে চাঁদাবাজির অভিযোগে সোহান মুন্সি ও শোয়েব মোল্যা নামে দুই যুবককে ভাঙ্গা থানায় নেওয়া হয়। পরে রাতে গিয়ে তাঁদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্যা। পরে ওসির কক্ষের ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া একই দিন বিকালে ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের অদূরে সার্বিক পরিবহনের রবিন নামে এক চেকারকে ভয়ভীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে ওই দুই যুবকের বিরুদ্ধে। এ সংক্রান্তে গতকাল বৃহস্পতিবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

ফ্রিজের বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের চাপ কমানোর ১২ উপায়

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ
ফ্রিজের বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের চাপ কমানোর ১২ উপায়

আধুনিক ব্যস্ত জীবনে রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং গৃহস্থালির এক অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। তবে মাসের শেষে যখন বিদ্যুৎ বিলের কাগজটি হাতে আসে, তখন অনেকেরই কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আপনার ঘরের কোন যন্ত্রটি নিঃশব্দে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে কাজ করে আপনার বিদ্যুৎ বিলের অংকটা বাড়িয়ে দিচ্ছে? উত্তরটি হলো আপনার প্রিয় ফ্রিজ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একটি সাধারণ পরিবারের মোট বিদ্যুৎ খরচের প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ ব্যয় হয় কেবল ফ্রিজের পেছনে। যেহেতু এটি বছরের ৩৬৫ দিনই চালু থাকে, তাই এর সামান্যতম অদক্ষতাও আপনার পকেটের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দুশ্চিন্তার কারণ নেই; সামান্য কিছু সচেতনতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দৈনন্দিন অভ্যাসে ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন আনলে ফ্রিজের এই বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। এতে কেবল আপনার মাস শেষের খরচই কমবে না, বরং পরিবেশ রক্ষায় এবং ফ্রিজের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতেও আপনি অবদান রাখতে পারবেন।

আপনার ফ্রিজকে আরও সাশ্রয়ী ও কার্যকর করে তুলতে নিচের ১২টি অব্যর্থ উপায় মেনে চলতে পারেন:

১. সঠিক তাপমাত্রা নির্ধারণ: ফ্রিজের তাপমাত্রা সঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ অংশের জন্য ৩°সে থেকে ৫°সে এবং ফ্রিজারের জন্য -১৮°সে তাপমাত্রা আদর্শ। এর চেয়ে বেশি ঠান্ডা করলে কম্প্রেশারের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে এবং বিদ্যুৎ অপচয় হয়।

২. পরিমিত খাবার রাখা: ফ্রিজ একেবারে খালি না রেখে মাঝারি অবস্থায় পূর্ণ রাখা ভালো, কারণ ভেতরে থাকা খাবার ঠান্ডা ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত খাবার বোঝাই করবেন না, কারণ এতে বাতাস চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সিস্টেমকে বেশি কাজ করতে হয়।

৩. নিয়মিত ডিফ্রস্ট করা: ফ্রিজে বরফের স্তর যদি ০.৬ সেন্টিমিটার (প্রায় ১/৪ ইঞ্চি) এর বেশি হয়ে যায়, তবে তা ইনসুলেশন হিসেবে কাজ করে এবং কম্প্রেশারকে দীর্ঘক্ষণ চালাতে বাধ্য করে। তাই প্রতি ৬ মাস অন্তর বা বরফ জমলে নিয়মিত ডিফ্রস্ট করুন।

৪. দরজার সিল বা গ্যাসকেট পরীক্ষা: ফ্রিজের দরজার রাবার বা সিল নষ্ট হয়ে গেলে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যায়। একটি কাগজের টুকরো দরজায় আটকে পরীক্ষা করে দেখুন; যদি কাগজটি সহজে টেনে বের করা যায়, তবে বুঝতে হবে সিলটি পাল্টানো প্রয়োজন।

৫. বারবার দরজা খোলা বন্ধ না করা: যতবার ফ্রিজের দরজা খোলা হয়, ততবার ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যায় এবং বাইরের গরম বাতাস ভেতরে ঢোকে। এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে একসাথে প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে নিন।

৬. সঠিক স্থানে ফ্রিজ স্থাপন: ফ্রিজ কখনোই ওভেন, চুলা বা সরাসরি রোদ পড়ে এমন জানালার পাশে রাখা উচিত নয়। বাইরের তাপ ফ্রিজকে ঠান্ডা রাখতে বাধা দেয়, ফলে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যায়। এছাড়া ফ্রিজের চারপাশে বাতাস চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখুন।

৭. ভারী কভার ব্যবহার এড়িয়ে চলা: ফ্রিজের ওপর বা চারপাশে ভারী কভার ব্যবহার করলে বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয় এবং তাপ আটকে যায়। এর ফলে কম্প্রেশারকে দীর্ঘ সময় চলতে হয়। প্রয়োজনে বাতাস চলাচলে সহায়ক হালকা কভার ব্যবহার করতে পারেন।

৮. অপ্রয়োজনীয় ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার সরানো: ফ্রিজে অতিরিক্ত বা মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার জমিয়ে রাখবেন না। নিয়মিত পরিষ্কার করলে ফ্রিজের ভেতরে বাতাস চলাচল (Airflow) উন্নত হয় এবং এটি আরও কার্যকরভাবে কাজ করে।

৯. খাবার ঢেকে রাখা: খাবার সবসময় এয়ারটাইট পাত্রে বা ভালোভাবে মুড়িয়ে রাখুন। খোলা খাবার থেকে আর্দ্রতা নির্গত হয়ে ফ্রিজের ভেতরে আর্দ্রতা বাড়িয়ে দেয়, যা কম্প্রেশারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

১০. গরম খাবার সরাসরি না রাখা: রান্না করা খাবার সরাসরি ফ্রিজে রাখবেন না। গরম খাবার ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা ঠান্ডা করতে কম্প্রেশারকে অনেক বেশি বিদ্যুৎ খরচ করতে হয়। খাবার ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আসার পর ফ্রিজে রাখুন।

১১. কনডেন্সার কয়েল পরিষ্কার রাখা: ফ্রিজের পেছনের বা নিচের কনডেন্সার কয়েলে ধুলোবালি জমলে তা তাপ নিঃসরণে বাধা দেয়। এতে কম্প্রেশারকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখতে বেশি শক্তি খরচ করতে হয়। তাই নিয়মিত এই কয়েলগুলো পরিষ্কার রাখা জরুরি।

১২. আধুনিক ও স্মার্ট প্রযুক্তির ফ্রিজ ব্যবহার: আপনার ফ্রিজটি যদি অনেক পুরনো হয়, তবে সেটি অনেক বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নাও হতে পারে। বর্তমানের ইনভার্টার প্রযুক্তি বা স্মার্ট সেন্সরযুক্ত ফ্রিজগুলো ব্যবহারের ধরণ বুঝে শীতলীকরণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, যা বিদ্যুৎ বিল অনেক কমিয়ে আনে।

মনে রাখবেন, আপনার ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলো মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় এবং ফ্রিজের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তথ্যসূত্র: ইলেক্ট্রোলাক্স ইন্ডিয়া

ফরিদপুরে মসজিদের ভেতরে শিশু বলাৎকার চেষ্টার ঘটনায় এক ব্যক্তির ৭ বছরের কারাদণ্ড

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১০:১৩ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে মসজিদের ভেতরে শিশু বলাৎকার চেষ্টার ঘটনায় এক ব্যক্তির ৭ বছরের কারাদণ্ড

ফরিদপুরের নগরকান্দায় মসজিদের ভেতরে এক শিশু বালককে বলাৎকার চেষ্টার ঘটনায় হাফেজ মাওলানা আলী হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (১৪ মে) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা ও দায়রা জজ শামীমা পারভীনের আদালতে এ রায় ঘোষণা করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গোলাম রাব্বানী রতন জানান, মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ, চিকিৎসা প্রতিবেদন ও সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।

তিনি বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও বলাৎকার চেষ্টার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে আদালত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এ রায় সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নগরকান্দা উপজেলার ছাগলদী দক্ষিণপাড়া এলাকার বাসিন্দা মনির হোসেন তার নাবালক ছেলেকে স্থানীয় একটি মাদরাসায় পড়াতেন। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য অভিযুক্ত আলী হোসেনের কাছে যাতায়াত ছিল শিশুটির।

ঘটনার দিন ২০২৫ সালের ৬ মার্চ সকালে শিশুটি অভিযুক্তের দোকানে গেলে কৌশলে তাকে পাশের একটি মসজিদের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শিশুটিকে একা পেয়ে বলাৎকারের চেষ্টা চালানো হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

একপর্যায়ে শিশুটি চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে অভিযুক্তকে আটক করে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে হেফাজতে নেয়।

ঘটনার পর শিশুটির বাবা নগরকান্দা থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এ রায় দেন।