খুঁজুন
, ,

‘গ্রামের সেই বিকেলগুলো আর ফিরে আসে না’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১০:০১ পূর্বাহ্ণ
‘গ্রামের সেই বিকেলগুলো আর ফিরে আসে না’

বর্ষার আগের সেই গুমট বিকেলগুলো আজও মাঝে মাঝে হঠাৎ ফিরে আসে। দূরের আকাশে কালো মেঘ জমে, তালগাছের মাথা দুলে ওঠে, আর দক্ষিণা বাতাস কেমন যেন পুরোনো দিনের গন্ধ বয়ে আনে। মনে হয়, এই তো একটু পরেই গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে ছুটে আসবে আমার সেই বন্ধুরা—রফিক, কালাম, জসিম, নুরু কিংবা ছোট্ট বাবলু। কেউ হাতে বাঁশের লাটিম, কেউবা পুরোনো ফুটবল, কেউ আবার গামছা কাঁধে নিয়ে ছুটে আসবে নদীর ঘাটে।

কিন্তু না, সময় বদলেছে। সেই বন্ধুরা আজ আর নেই। কেউ শহরের ইট-পাথরের জীবনে হারিয়ে গেছে, কেউ বিদেশের ব্যস্ততায় ডুবে আছে, কেউবা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। তবুও গ্রামের বাতাসে আজও তাদের হাসির শব্দ ভেসে আসে।

আমাদের গ্রামটার নাম ছিল খোয়াড়। ছোট্ট একটা গ্রাম। চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঝখানে সরু মেঠোপথ, আর গ্রামের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদী ‘মালঞ্চ’। ভোর হলে নদীর ঘাটে কুয়াশা নেমে আসত। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ শোনা যেত। আর আমরা তখন ঘুম ভেঙে দৌড়ে বেরিয়ে পড়তাম মাঠের দিকে।

শৈশবের দিনগুলো কত সহজ ছিল! তখন সুখ মানে ছিল বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলে ফুটবল খেলা। আনন্দ মানে ছিল বর্ষার জলে ভিজে বাড়ি ফেরা। কষ্ট মানে ছিল মা বকাঝকা করে খেলতে যেতে না দেওয়া।

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল রফিক। খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে। কিন্তু হাসতে শুরু করলে পুরো আকাশ কেঁপে উঠত। ওর বাবা ছিলেন জেলে। ভোরে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন। মাঝে মাঝে রফিকও যেত বাবার সঙ্গে। স্কুলে এসে আমাদের গল্প করত—কীভাবে নদীর মাঝে জোৎস্না পড়ে চিকচিক করে, কীভাবে মাঝরাতে হঠাৎ বড় মাছ জালে ধরা পড়ে।

একদিন বর্ষাকালে আমরা সবাই মিলে নদীতে নেমেছিলাম। আকাশ তখন মেঘে ঢাকা। দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আমরা কেউ কচুরিপানার ভেলায় চড়েছি, কেউ সাঁতার কাটছি। হঠাৎ রফিক বলল, —“দেখিস, একদিন আমরা সবাই বড় হবো। কিন্তু এই নদী আমাদের ভুলবে না।”

তখন কথাটার মানে বুঝিনি। আজ বুঝি, নদী সত্যিই আমাদের ভুলে যায়নি। বরং আমরাই নদীকে ফেলে চলে গেছি।

বিকেল হলেই গ্রামের বটতলায় আড্ডা বসত। কালাম ছিল সবচেয়ে দুষ্টু। ও ছাড়া কোনো খেলাই জমত না। কখনো কারও গাছ থেকে কাঁচা আম পেড়ে আনত, কখনো গোপনে কারও পুকুরে ঝাঁপ দিত। একবার মেম্বার সাহেবের বাগান থেকে লিচু পেড়ে এনে সবাইকে খাইয়েছিল। পরে ধরা পড়ে এমন দৌড় দিয়েছিল যে আমরা হাসতে হাসতে পেট ব্যথা করে ফেলেছিলাম।

শীতের সকালে আমরা খেজুরের রস খেতে যেতাম। গ্রামের শেষ মাথায় ছিল ভোলা মোল্যা কাকার খেজুর গাছ। ভোরে তিনি হাঁড়ি নামাতেন। আমরা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তিনি হেসে বলতেন, —“এই পোলা-পাইনগুলা আবার আইছে!”

তারপর কাঁচা মাটির ভাঁড়ে রস ঢেলে দিতেন। সেই রসের স্বাদ আজও পৃথিবীর কোনো দামী পানীয়তে পাইনি।

আমাদের গ্রামের স্কুলটাও ছিল খুব মায়াময়। টিনের ছাউনি, সামনে বিশাল মাঠ, আর পাশে একটা পুরোনো কড়ই গাছ। গরমের দুপুরে ক্লাস করতে করতে বাইরে তাকালে দেখা যেত মাঠের ওপরে সাদা বক উড়ছে। মাঝে মাঝে মন চাইলেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমরা চলে যেতাম নদীর ধারে।

একদিন স্কুল পালিয়ে আমরা সবাই মিলে মেলায় গিয়েছিলাম। সে এক অন্যরকম আনন্দ! বাঁশির শব্দ, নাগরদোলা, বাতাসে জিলাপির গন্ধ। বাবলু একটা কাঠের বাঁশি কিনেছিল। সারাদিন সেটা বাজিয়ে পুরো গ্রাম মাথায় তুলেছিল।

সন্ধ্যা নামলে গ্রামের পরিবেশ বদলে যেত। পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ত। বাড়ি বাড়ি কুপি জ্বলত। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত। আমরা তখনও মাঠে খেলতাম। মায়ের ডাক শুনেও ফিরতাম না। শেষে বাবা লাঠি হাতে বের হলে দৌড়ে বাড়ি ফিরতাম।

আমার মা প্রায়ই বলতেন, —“এই সময়গুলা একদিন আর পাইবা না।” তখন মনে হতো মা বুঝি অকারণেই এসব বলেন। কিন্তু আজ শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে বুঝি, মা ভুল বলেননি।

সময় খুব নিঃশব্দে মানুষকে বদলে দেয়। এসএসসি পাশ করার পর একে একে সবাই ছড়িয়ে গেল। কেউ কলেজে, কেউ কাজে, কেউ দূর শহরে। গ্রামের আড্ডা ফাঁকা হতে লাগল।

প্রথমে কালাম গেল ঢাকায়। গার্মেন্টসে চাকরি নিল। কিছুদিন পর শুনলাম বিদেশে চলে গেছে। তারপর বাবলু। সে নাকি চট্টগ্রামে ব্যবসা শুরু করেছে। জসিম পুলিশে চাকরি পেল। রফিকই শুধু গ্রামে ছিল।

বহু বছর পর এক বর্ষার দিনে আমি গ্রামে ফিরলাম। চারদিকে সবকিছু যেন একই আছে, অথচ কোথাও যেন আগের সেই প্রাণ নেই। নদীর ঘাট আছে, কিন্তু সেখানে আর কিশোরদের হাসির শব্দ নেই। মাঠ আছে, কিন্তু সেখানে আর বিকেলের ফুটবল খেলা হয় না। বটগাছ আছে, কিন্তু তার নিচে আর আড্ডা বসে না।

আমি হাঁটতে হাঁটতে রফিকদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে শুনলাম, বছর দুয়েক আগে নদীতে ঝড়ের রাতে নৌকা ডুবে সে মারা গেছে।

খবরটা শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। মনে হলো, আমার শৈশবের একটা বড় অংশ যেন নদীর জলে ভেসে চলে গেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় আমি একা নদীর ধারে গিয়ে বসেছিলাম। আকাশে কালো মেঘ। দক্ষিণা বাতাস বইছে। দূরে কোথাও শালিক ডাকছে। হঠাৎ মনে হলো, রফিক যেন পাশে বসে আছে।

মনে পড়ল, সেই কথাটা— “একদিন আমরা সবাই বড় হবো। কিন্তু এই নদী আমাদের ভুলবে না।”
আমার চোখ ভিজে উঠল।

রাত বাড়তে লাগল। গ্রামের পথ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম সেই পুরোনো স্কুলের দিকে। কড়ই গাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের রং উঠে গেছে। মাঠের ঘাস বড় হয়ে গেছে।

হঠাৎ মনে হলো, সময় আসলে মানুষকে একা করে দেয়। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কাটত, একসময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু স্মৃতিগুলো রয়ে যায়।
পরদিন সকালে আমি আবার বটতলায় গেলাম। সেখানে এখন একটা চায়ের দোকান। দোকানদার আমাকে চিনতে পারেনি। আমি চুপচাপ বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দূর থেকে একটা ছোট ছেলে দৌড়ে এলো। হাতে ফুটবল।

ছেলেটাকে দেখে মনে হলো, এ যেন আমাদেরই ছোটবেলা। আমি মুচকি হেসে বললাম, —“খেলা করিস?” সে হেসে বলল, —“জি চাচা, বিকেলে সবাই মিলে খেলি।”

তার হাসির ভেতরে আমি যেন আবার কালামদের দেখতে পেলাম। মনে হলো, সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু গ্রামের শৈশব কখনো মরে না। শুধু নতুন মুখে ফিরে আসে।

বিকেলে যখন গ্রাম ছেড়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, তখন আকাশে হালকা বৃষ্টি নামছিল। কাঁচা রাস্তার ধুলো ভিজে মাটির গন্ধ ছড়াচ্ছিল চারদিকে। আমি শেষবারের মতো পিছনে তাকালাম।
দূরে তালগাছ দুলছে। নদীর জল চিকচিক করছে। বাতাসে কেমন এক মায়া।

মনে হলো, গ্রামের সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা এখনও কোথাও আছে—হয়তো বাতাসে, হয়তো নদীর জলে, হয়তো সন্ধ্যার আজানের ধ্বনিতে।
শুধু আমরা আর আগের মতো ফিরে যেতে পারি না।

জীবন মানুষকে বড় করে দেয়, ব্যস্ত করে দেয়, দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু শৈশবের স্মৃতিগুলো কখনো পুরোনো হয় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি আপন হয়ে ওঠে।

আজও যখন শহরের ব্যস্ত রাতে জানালার পাশে দাঁড়াই, দূরের আকাশে মেঘ দেখি, তখন গ্রামের কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই মেঠোপথ, সেই নদী, সেই মাঠ, আর সেই বন্ধুগুলোর কথা। যারা আজ আর নেই, কিন্তু আমার প্রতিটি স্মৃতির ভেতর এখনও বেঁচে আছে।

দখিনা বাতাস আজও কত কথা বলে। গুমট হাওয়া আজও বুকের ভেতর পুরোনো দিনের দরজা খুলে দেয়। শুধু সময়ের পালাবদলে হারিয়ে গেছে কিছু মুখ, কিছু হাসি, কিছু বিকেল।

তবুও গ্রামের সেই শৈশব আজও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

ভাঙ্গায় নিজ ঘরে ঝুলছিল মোবাইল ব্যবসায়ীর লাশ

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৫:১৭ অপরাহ্ণ
ভাঙ্গায় নিজ ঘরে ঝুলছিল মোবাইল ব্যবসায়ীর লাশ

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মাসুম জোমাদ্দার (২৫) নামে এক মোবাইল ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত তরুণ ব্যবসায়ে লোকসান গুনে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক হতাশায় ভুগছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

​বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে ভাঙ্গা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাপুড়িয়া সদরদী গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে লাশটি উদ্ধার করে ভাঙ্গা থানা পুলিশ।

​নিহত মাসুম জোমাদ্দার ওই গ্রামের সিদ্দিক জোমাদ্দারের একমাত্র ছেলে। তিনি ভাঙ্গা বাজারের পদ্মা মোবাইল মার্কেটের ‘শাহানা টেলিকম’-এর স্বত্বাধিকারী ছিলেন।

​পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাসুম সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়িক কাজে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এরপর থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং চরম বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে নিজ কক্ষের সিলিং ফ্যানের সাথে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে স্বজনরা পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে ভাঙ্গা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।

​ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহালে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে। ব্যাবসায়িক ক্ষতির কারণে তিনি বিষণ্নতায় ভুগছিলেন বলে স্বজন ও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে।

​তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ বিষয়ে একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

ফরিদপুরে যৌন হয়রানির তদন্তে দোষী শিক্ষক, বাঁচার জন্য ছুটির ফাঁদ!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৩:১১ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে যৌন হয়রানির তদন্তে দোষী শিক্ষক, বাঁচার জন্য ছুটির ফাঁদ!

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা আরিফুজ্জামান মডেল পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন হয়রানি ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক নুরুদ্দোহা সোহেল এবার তিন মাসের চিকিৎসা ছুটির আবেদন করেছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হতেই তিনি এই ছুটির কৌশল অবলম্বন করেছেন বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।

​অন্যদিকে, তীব্র নিরাপত্তার শঙ্কা ও চরম মানসিক বিপর্যস্ততায় বিদ্যালয় থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) নিয়ে চলে গেছে ভুক্তভোগী সেই শিক্ষার্থী।

​খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদ্যালয়টির কারিগরি শাখার গণিত বিষয়ের সহকারী শিক্ষক নুরুদ্দোহা সোহেলের বিরুদ্ধে নিজ ছাত্রীকে হোয়াটসঅ্যাপে কুরুচিপূর্ণ বার্তা পাঠানোর অভিযোগ তুলে ভুক্তভোগীর পরিবার। গত ৫ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বরাবর এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়।

​অভিযোগের ভিত্তিতে আলফাডাঙ্গা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক ঘটনার তদন্ত শুরু করেন। তদন্ত শেষে দাখিল করা ১২ ফর্দের প্রতিবেদনে অভিযোগটিকে ‘সম্পূর্ণ সত্য ও বাস্তবসম্মত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে শিক্ষকের চরম নৈতিক স্খলনের দায়ে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে প্রতিবেদনটি ফরিদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পাঠায় উপজেলা প্রশাসন। একইসঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের বেতনও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।

​তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর অভিযুক্ত শিক্ষক নুরুদ্দোহা সোহেল কৌশল অবলম্বন করে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রথমে তিন দিনের ছুটি নেওয়ার পর তিনি নতুন করে তিন মাসের চিকিৎসা ছুটির একটি আবেদন জমা দেন। সাধারণত এ ধরনের ছুটির আবেদন প্রধান শিক্ষকের সুপারিশ সহ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আঞ্চলিক উপ-পরিচালকের (ডিডি) অনুমোদনের জন্য পাঠানোর নিয়ম রয়েছে।

​বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজাদুল ইসলাম জানান, “ওই শিক্ষক প্রথমে তিন দিনের ছুটি নিয়েছিলেন। পরে তিনি নতুন করে তিন মাসের চিকিৎসা ছুটির আবেদন জমা দিয়েছেন। আবেদনটি ইউএনও মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

​তবে এই অবস্থায় ছুটির আবেদন করাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেছেন আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহঃ শাহনুর জামান। তিনি বলেন, “শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরই প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তার চিকিৎসা ছুটির আবেদন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই তার আবেদনটির কোনো ফরওয়ার্ডিং পাঠানো হবে না। ইতোমধ্যে তার বেতনও স্থগিত করা হয়েছে।”

​এদিকে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর চরম নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক ধাক্কা সামলাতে না পেরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে আর ওই বিদ্যালয়ে না পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় তার পরিবার। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর উদ্দেশ্যে বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে ভুক্তভোগীর মা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে ছাড়পত্রের (টিসি) আবেদন করেন। আবেদনের পরপরই দুপুরে তাকে বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র প্রদান করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন প্রধান শিক্ষক আজাদুল ইসলাম।

বিন্না ঘাস কী, কেন এ নিয়ে বড় পরিকল্পনা সরকারের?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ
বিন্না ঘাস কী, কেন এ নিয়ে বড় পরিকল্পনা সরকারের?

বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটে, পতিত জমি কিংবা চরাঞ্চলে অনায়াসে বেড়ে ওঠে এক ধরনের লম্বা ঘাস। নাম বিন্না ঘাস, যার পরিচিতি ভেটিভার নামেও।

এতদিন পথের ধারে কিংবা পরিত্যক্ত জমিতে পড়ে থাকা এই ঘাসই এবার নদীভাঙন, মাটির ক্ষয়, পাহাড়ধস ও বিভিন্ন অবকাঠামো রক্ষায় বড় পরিসরে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিন্না ঘাসের শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

ফলে মাটি শক্তভাবে আটকে থাকে এবং বৃষ্টির পানি বা স্রোতের কারণে মাটির ক্ষয় কমে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাহাড়ের ঢাল, নদীর তীর, রাস্তার পাশ ও বাঁধ রক্ষায় এই ঘাস ব্যবহার করা হয়।
এ কারণেই বাংলাদেশে কোন কোন প্রকল্পে বিন্না ঘাস ব্যবহার করা সম্ভব, তা যাচাই করতে সরকার টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে এই ঘাস ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম প্রায় দুই দশক ধরে বিন্না ঘাস নিয়ে গবেষণা করছেন। সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত এই গবেষক মনে করেন, প্রকৌশলগতভাবে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা গেলে বিন্না ঘাস সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে মাটির ক্ষয় রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

অধ্যাপক শরীফুল ইসলামের গবেষণা অনুযায়ী, বিন্না ঘাসের শিকড় অত্যন্ত শক্তিশালী ও গভীর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা দুই থেকে চার মিটার পর্যন্ত মাটির গভীরে যেতে পারে। এই শিকড় মাটির কণাগুলোকে শক্তভাবে আটকে রাখে। ফলে ঢাল, বাঁধ কিংবা রাস্তার পাশের মাটি সহজে ধসে পড়তে পারে না।

বাংলাদেশে বিন্না ঘাস বেন্না ঘাস, খসখস কিংবা ছন নামেও পরিচিত। এটি একটি বহুবর্ষজীবী ঘাস। লম্বা ও সরু পাতার এই ঘাস ঘন ঝোপের মতো বেড়ে ওঠে এবং সাধারণত দেড় থেকে তিন মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকদের মতে, দেখতে সাধারণ হলেও বিন্না ঘাসের শিকড়ের কার্যকারিতা অসাধারণ। মাটির নিচে এর শিকড় জালের মতো ছড়িয়ে গিয়ে ভূমির বিভিন্ন স্তরকে ধরে রাখে। এ কারণেই ভূমিক্ষয় ও পাহাড়ধস ঠেকাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু মাটি ও অবকাঠামো রক্ষাই নয়, বিন্না ঘাসের অর্থনৈতিক ব্যবহারও রয়েছে। এর শিকড় থেকে সুগন্ধযুক্ত তেল পাওয়া যায়। সুগন্ধি, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন সুগন্ধি পণ্য তৈরিতে এই তেল ব্যবহার করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরেই ভেটিভার বা বিন্না ঘাসকে ভূমিক্ষয় নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ব্রাজিল, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে নদীর তীর, রাস্তার ঢাল, বাঁধ, পাহাড়ি এলাকা ও কৃষিজমি রক্ষায় এর ব্যবহার রয়েছে। দ্য ভেটিভার নেটওয়ার্ক ইন্টারন্যাশনালও ঢাল স্থিতিশীলতা ও ভূমিক্ষয় রোধে ভেটিভার ব্যবহারের জন্য প্রকৌশলভিত্তিক নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।

গবেষকদের মতে, বিন্না ঘাস লাগানোর কয়েক মাসের মধ্যেই এর শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বৃষ্টির সময় ঢাল, বাঁধ কিংবা রাস্তার পাশ দিয়ে পানির স্রোত নামার সময় শিকড়গুলো মাটিকে ধরে রেখে ক্ষয় কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে চরম ঠান্ডা থেকে প্রচণ্ড গরম-বিভিন্ন ধরনের পরিবেশেও এই ঘাস টিকে থাকতে পারে। বাংলাদেশে বিন্না ঘাসের ওপর দীর্ঘদিনের গবেষণায় ভূমিক্ষয়, পাহাড়ধস ও বাঁধ রক্ষায় এর সম্ভাবনা নিয়ে একাধিক কাজ হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সব জায়গায় বিন্না ঘাস দিয়ে বাঁধ বা মাটি রক্ষা করা সম্ভব নয়। খরস্রোতা নদীর তীব্র স্রোতের মুখে থাকা বাঁধে শুধু বিন্না ঘাস যথেষ্ট নাও হতে পারে। সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী জিও ব্যাগ, কংক্রিট ব্লক, রড বা অন্যান্য প্রকৌশলগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে পাহাড়ের ঢাল, রাস্তার পাশ, খালের পাড় কিংবা অপেক্ষাকৃত কম স্রোতের এলাকায় এটি কার্যকর হতে পারে।

এই ঘাস ব্যবহারের অন্যতম বড় সুবিধা হলো কম খরচ। প্রচলিত রড, সিমেন্ট, কংক্রিট ব্লক বা অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর তুলনায় বিন্না ঘাসের ব্যবহার অনেক সাশ্রয়ী হতে পারে বলে গবেষকদের দাবি। একই সঙ্গে এটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাবও তুলনামূলক কম।

বাংলাদেশে বিন্না ঘাস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার পেছনে রয়েছে নদীভাঙন, খাল রক্ষা ও অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাল খননের পাশাপাশি খালের পাড়, নদীর তীর, বাঁধ ও রাস্তার মাটি ক্ষয় থেকে রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

গত ৬ আগস্ট সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিন্না ঘাসের ব্যবহার নিয়ে একটি বৈঠক হয়। সেখানে বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বিন্না ঘাসকে কংক্রিট ব্লক ও জিও-ব্লকের পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। নদী ও খালের পাড়, উপকূলীয় বাঁধ, চর ও হাওর এলাকার রাস্তা এবং সড়ক ও রেলপথের পাশের মাটি রক্ষায় এর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বিন্না ঘাস ব্যবহার করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এসব ফলাফলের ভিত্তিতে এখন বড় পরিসরে প্রকল্প নেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।প্রস্তাবিত ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে নদীর তীর ও খালের পাড়ের ক্ষয়রোধ, উপকূলীয় বাঁধ সুরক্ষা, চর ও হাওর এলাকার রাস্তা স্থিতিশীল রাখা, পাহাড়ি ঢাল রক্ষা এবং সড়ক ও রেলপথের পাশের মাটি ক্ষয় কমানো। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রকল্পেও পর্যায়ক্রমে এর ব্যবহার বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে।

বুয়েটের গবেষকদের দীর্ঘদিনের গবেষণা এবং দেশে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ইতিবাচক ফলের পর এবার সরকারি পর্যায়ে বিন্না ঘাসের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে এতদিন মাঠে-ঘাটে অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই সাধারণ ঘাসই এখন বাংলাদেশের নদী, পাহাড়, বাঁধ ও সড়ক রক্ষায় একটি সাশ্রয়ী ‘প্রাকৃতিক প্রযুক্তি’ হিসেবে নতুন গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি