খুঁজুন
, ,

‘গ্রামের সেই বিকেলগুলো আর ফিরে আসে না’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১০:০১ পূর্বাহ্ণ
‘গ্রামের সেই বিকেলগুলো আর ফিরে আসে না’

বর্ষার আগের সেই গুমট বিকেলগুলো আজও মাঝে মাঝে হঠাৎ ফিরে আসে। দূরের আকাশে কালো মেঘ জমে, তালগাছের মাথা দুলে ওঠে, আর দক্ষিণা বাতাস কেমন যেন পুরোনো দিনের গন্ধ বয়ে আনে। মনে হয়, এই তো একটু পরেই গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে ছুটে আসবে আমার সেই বন্ধুরা—রফিক, কালাম, জসিম, নুরু কিংবা ছোট্ট বাবলু। কেউ হাতে বাঁশের লাটিম, কেউবা পুরোনো ফুটবল, কেউ আবার গামছা কাঁধে নিয়ে ছুটে আসবে নদীর ঘাটে।

কিন্তু না, সময় বদলেছে। সেই বন্ধুরা আজ আর নেই। কেউ শহরের ইট-পাথরের জীবনে হারিয়ে গেছে, কেউ বিদেশের ব্যস্ততায় ডুবে আছে, কেউবা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। তবুও গ্রামের বাতাসে আজও তাদের হাসির শব্দ ভেসে আসে।

আমাদের গ্রামটার নাম ছিল খোয়াড়। ছোট্ট একটা গ্রাম। চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঝখানে সরু মেঠোপথ, আর গ্রামের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদী ‘মালঞ্চ’। ভোর হলে নদীর ঘাটে কুয়াশা নেমে আসত। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ শোনা যেত। আর আমরা তখন ঘুম ভেঙে দৌড়ে বেরিয়ে পড়তাম মাঠের দিকে।

শৈশবের দিনগুলো কত সহজ ছিল! তখন সুখ মানে ছিল বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলে ফুটবল খেলা। আনন্দ মানে ছিল বর্ষার জলে ভিজে বাড়ি ফেরা। কষ্ট মানে ছিল মা বকাঝকা করে খেলতে যেতে না দেওয়া।

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল রফিক। খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে। কিন্তু হাসতে শুরু করলে পুরো আকাশ কেঁপে উঠত। ওর বাবা ছিলেন জেলে। ভোরে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন। মাঝে মাঝে রফিকও যেত বাবার সঙ্গে। স্কুলে এসে আমাদের গল্প করত—কীভাবে নদীর মাঝে জোৎস্না পড়ে চিকচিক করে, কীভাবে মাঝরাতে হঠাৎ বড় মাছ জালে ধরা পড়ে।

একদিন বর্ষাকালে আমরা সবাই মিলে নদীতে নেমেছিলাম। আকাশ তখন মেঘে ঢাকা। দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আমরা কেউ কচুরিপানার ভেলায় চড়েছি, কেউ সাঁতার কাটছি। হঠাৎ রফিক বলল, —“দেখিস, একদিন আমরা সবাই বড় হবো। কিন্তু এই নদী আমাদের ভুলবে না।”

তখন কথাটার মানে বুঝিনি। আজ বুঝি, নদী সত্যিই আমাদের ভুলে যায়নি। বরং আমরাই নদীকে ফেলে চলে গেছি।

বিকেল হলেই গ্রামের বটতলায় আড্ডা বসত। কালাম ছিল সবচেয়ে দুষ্টু। ও ছাড়া কোনো খেলাই জমত না। কখনো কারও গাছ থেকে কাঁচা আম পেড়ে আনত, কখনো গোপনে কারও পুকুরে ঝাঁপ দিত। একবার মেম্বার সাহেবের বাগান থেকে লিচু পেড়ে এনে সবাইকে খাইয়েছিল। পরে ধরা পড়ে এমন দৌড় দিয়েছিল যে আমরা হাসতে হাসতে পেট ব্যথা করে ফেলেছিলাম।

শীতের সকালে আমরা খেজুরের রস খেতে যেতাম। গ্রামের শেষ মাথায় ছিল ভোলা মোল্যা কাকার খেজুর গাছ। ভোরে তিনি হাঁড়ি নামাতেন। আমরা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তিনি হেসে বলতেন, —“এই পোলা-পাইনগুলা আবার আইছে!”

তারপর কাঁচা মাটির ভাঁড়ে রস ঢেলে দিতেন। সেই রসের স্বাদ আজও পৃথিবীর কোনো দামী পানীয়তে পাইনি।

আমাদের গ্রামের স্কুলটাও ছিল খুব মায়াময়। টিনের ছাউনি, সামনে বিশাল মাঠ, আর পাশে একটা পুরোনো কড়ই গাছ। গরমের দুপুরে ক্লাস করতে করতে বাইরে তাকালে দেখা যেত মাঠের ওপরে সাদা বক উড়ছে। মাঝে মাঝে মন চাইলেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আমরা চলে যেতাম নদীর ধারে।

একদিন স্কুল পালিয়ে আমরা সবাই মিলে মেলায় গিয়েছিলাম। সে এক অন্যরকম আনন্দ! বাঁশির শব্দ, নাগরদোলা, বাতাসে জিলাপির গন্ধ। বাবলু একটা কাঠের বাঁশি কিনেছিল। সারাদিন সেটা বাজিয়ে পুরো গ্রাম মাথায় তুলেছিল।

সন্ধ্যা নামলে গ্রামের পরিবেশ বদলে যেত। পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ত। বাড়ি বাড়ি কুপি জ্বলত। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত। আমরা তখনও মাঠে খেলতাম। মায়ের ডাক শুনেও ফিরতাম না। শেষে বাবা লাঠি হাতে বের হলে দৌড়ে বাড়ি ফিরতাম।

আমার মা প্রায়ই বলতেন, —“এই সময়গুলা একদিন আর পাইবা না।” তখন মনে হতো মা বুঝি অকারণেই এসব বলেন। কিন্তু আজ শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে বুঝি, মা ভুল বলেননি।

সময় খুব নিঃশব্দে মানুষকে বদলে দেয়। এসএসসি পাশ করার পর একে একে সবাই ছড়িয়ে গেল। কেউ কলেজে, কেউ কাজে, কেউ দূর শহরে। গ্রামের আড্ডা ফাঁকা হতে লাগল।

প্রথমে কালাম গেল ঢাকায়। গার্মেন্টসে চাকরি নিল। কিছুদিন পর শুনলাম বিদেশে চলে গেছে। তারপর বাবলু। সে নাকি চট্টগ্রামে ব্যবসা শুরু করেছে। জসিম পুলিশে চাকরি পেল। রফিকই শুধু গ্রামে ছিল।

বহু বছর পর এক বর্ষার দিনে আমি গ্রামে ফিরলাম। চারদিকে সবকিছু যেন একই আছে, অথচ কোথাও যেন আগের সেই প্রাণ নেই। নদীর ঘাট আছে, কিন্তু সেখানে আর কিশোরদের হাসির শব্দ নেই। মাঠ আছে, কিন্তু সেখানে আর বিকেলের ফুটবল খেলা হয় না। বটগাছ আছে, কিন্তু তার নিচে আর আড্ডা বসে না।

আমি হাঁটতে হাঁটতে রফিকদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে শুনলাম, বছর দুয়েক আগে নদীতে ঝড়ের রাতে নৌকা ডুবে সে মারা গেছে।

খবরটা শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। মনে হলো, আমার শৈশবের একটা বড় অংশ যেন নদীর জলে ভেসে চলে গেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় আমি একা নদীর ধারে গিয়ে বসেছিলাম। আকাশে কালো মেঘ। দক্ষিণা বাতাস বইছে। দূরে কোথাও শালিক ডাকছে। হঠাৎ মনে হলো, রফিক যেন পাশে বসে আছে।

মনে পড়ল, সেই কথাটা— “একদিন আমরা সবাই বড় হবো। কিন্তু এই নদী আমাদের ভুলবে না।”
আমার চোখ ভিজে উঠল।

রাত বাড়তে লাগল। গ্রামের পথ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম সেই পুরোনো স্কুলের দিকে। কড়ই গাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের রং উঠে গেছে। মাঠের ঘাস বড় হয়ে গেছে।

হঠাৎ মনে হলো, সময় আসলে মানুষকে একা করে দেয়। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন কাটত, একসময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু স্মৃতিগুলো রয়ে যায়।
পরদিন সকালে আমি আবার বটতলায় গেলাম। সেখানে এখন একটা চায়ের দোকান। দোকানদার আমাকে চিনতে পারেনি। আমি চুপচাপ বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দূর থেকে একটা ছোট ছেলে দৌড়ে এলো। হাতে ফুটবল।

ছেলেটাকে দেখে মনে হলো, এ যেন আমাদেরই ছোটবেলা। আমি মুচকি হেসে বললাম, —“খেলা করিস?” সে হেসে বলল, —“জি চাচা, বিকেলে সবাই মিলে খেলি।”

তার হাসির ভেতরে আমি যেন আবার কালামদের দেখতে পেলাম। মনে হলো, সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু গ্রামের শৈশব কখনো মরে না। শুধু নতুন মুখে ফিরে আসে।

বিকেলে যখন গ্রাম ছেড়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, তখন আকাশে হালকা বৃষ্টি নামছিল। কাঁচা রাস্তার ধুলো ভিজে মাটির গন্ধ ছড়াচ্ছিল চারদিকে। আমি শেষবারের মতো পিছনে তাকালাম।
দূরে তালগাছ দুলছে। নদীর জল চিকচিক করছে। বাতাসে কেমন এক মায়া।

মনে হলো, গ্রামের সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা এখনও কোথাও আছে—হয়তো বাতাসে, হয়তো নদীর জলে, হয়তো সন্ধ্যার আজানের ধ্বনিতে।
শুধু আমরা আর আগের মতো ফিরে যেতে পারি না।

জীবন মানুষকে বড় করে দেয়, ব্যস্ত করে দেয়, দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু শৈশবের স্মৃতিগুলো কখনো পুরোনো হয় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি আপন হয়ে ওঠে।

আজও যখন শহরের ব্যস্ত রাতে জানালার পাশে দাঁড়াই, দূরের আকাশে মেঘ দেখি, তখন গ্রামের কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই মেঠোপথ, সেই নদী, সেই মাঠ, আর সেই বন্ধুগুলোর কথা। যারা আজ আর নেই, কিন্তু আমার প্রতিটি স্মৃতির ভেতর এখনও বেঁচে আছে।

দখিনা বাতাস আজও কত কথা বলে। গুমট হাওয়া আজও বুকের ভেতর পুরোনো দিনের দরজা খুলে দেয়। শুধু সময়ের পালাবদলে হারিয়ে গেছে কিছু মুখ, কিছু হাসি, কিছু বিকেল।

তবুও গ্রামের সেই শৈশব আজও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় দৈনিক রানারের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন

মো. ইকবাল হোসেন, আলফাডাঙ্গা:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় দৈনিক রানারের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘দৈনিক রানার’-এর ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় আলোচনা সভা ও কেক কাটা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

​মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টায় আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাব কার্যালয়ে দৈনিক রানারের আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি ও প্রেসক্লাবের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

​প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা খান আসাদুজ্জামান টুনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সদস্য সচিব হারুনুর রশীদ, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য কামরুল ইসলাম ও হারুন অর রশীদ, সাবেক সভাপতি আমিনুর রহমান আচ্চু ও সেকেন্দার আলম।

​এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আমাদের সময়ের প্রতিনিধি আজিজুর রহমান দুলাল, দৈনিক আমার দেশের প্রতিনিধি গোলাম আজম মনির, প্রেসক্লাবের সাবেক দপ্তর সম্পাদক রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ মুস্তাফিজ, সদস্য কমরুল হক ভূঁইয়া, আবুল বাশার ও শহিদুল ইসলামসহ প্রেসক্লাবের অন্যান্য সদস্যরা।

​আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ। বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে সংবাদপত্র মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরা এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ পথচলায় দৈনিক রানার পাঠকের আস্থা অর্জন ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে যে ভূমিকা রেখে চলেছে, তা সত্যি প্রশংসনীয়।

​বক্তারা পত্রিকাটির উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করেন এবং এর সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।

​আলোচনা সভা শেষে এক আনন্দ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটা হয়।

পদ্মার গ্রাসে বিলীন স্বপ্নের ভিটেমাটি: ফরিদপুরে খোলা আকাশের নিচে শত শত পরিবার

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩১ অপরাহ্ণ
পদ্মার গ্রাসে বিলীন স্বপ্নের ভিটেমাটি: ফরিদপুরে খোলা আকাশের নিচে শত শত পরিবার

পদ্মার নির্মম ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ও ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ৪টি দুর্গম চরের হাজার হাজার মানুষ। তীব্র স্রোতে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বহু সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো। এতে এলাকাটিতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। ভিটেমাটি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে শত শত পরিবার।

​সম্প্রতি এলাকাটিতে সাংবাদিকদের আসার খবর পেয়ে জীবন-জীবিকা রক্ষা ও মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের দাবিতে আশ্রয়ণের ঘরের সামনেই মানববন্ধন করেন ক্ষতিগ্রস্ত নারী-পুরুষরা।

​স্থানীয় সূত্র জানায়, নর্থচ্যানেল ও ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জীবনজুড়ে নিত্য সংগ্রাম। বর্ষায় বন্যা আর নদীভাঙন, আবার শুষ্ক মৌসুমে মাইল কে মাইল হেঁটে ট্রলার ঘাটে পৌঁছাতে হয় তাদের। তবে এবারের নদীভাঙন তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে।

​নর্থচ্যানেল ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মোস্তফা হোসেন জানান, পদ্মার তীব্র তোড়ে গত কিছুদিন ধরে অব্যাহত ভাঙনে নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডসহ আশপাশের এলাকায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফলদ ও বনজ গাছপালাসহ নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে প্রায় ৭০০ বিঘা উর্বর ফসলি জমি। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিআরডি) প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল, মক্তব, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক এমনকি ১০টি আশ্রয়ণের ঘরও পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক পরিবার অতীতেও একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন।

​এ বিষয়ে স্থানীয় মজিবর মোল্লা বলেন, “ইতিমধ্যেই তিন শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি পদ্মার পেটে চলে গেছে। ভাঙনের মুখে অনেক পরিবার তড়িঘড়ি করে বসতভিটা সরিয়ে নেওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি।”

​জয়নাল মাতুব্বর ডাঙ্গীর বাসিন্দা মো. হিরু শেখ বলেন, “নর্থচ্যানেল ইউপির জয়নাল মাতুব্বর ডাঙ্গী, কবিরপুর ব্রিজ সড়ক এবং কবিরপুর এলাকাসহ প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা ও কাঁচা সরকারি সড়ক সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ব্রিজ, কালভার্ট, একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ ও কমিউনিটি ক্লিনিক নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ায় শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা একেবারেই স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।”

​সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর পাড়ে কেবলই ভিটেমাটি হারা মানুষের হাহাকার আর আর্তনাদ। গৃহহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলো বাঁধের ওপর ও খোলা আকাশের নিচে ত্রিপল টাঙিয়ে দিন কাটাচ্ছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।

​আক্ষেপ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা চায়না বেগম বলেন, “চোখের সামনে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সংসার আর জমিজমা পদ্মায় তলিয়ে গেল। আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা বাঁচতে চাই। নদীভাঙন বন্ধে স্থায়ী বাঁধ না হলে মানচিত্র থেকেই আমাদের নাম মুছে যাবে।”

​ভাঙনের শিকার হায়দার আলী জানান, পরিস্থিতি দিন দিন আরও আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। পদ্মার অব্যাহত আগ্রাসন থেকে বাকি গ্রামগুলো রক্ষা করতে অবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ দরকার। তারা সরকারের কাছে তিনটি প্রধান দাবি জানান— জরুরি ত্রাণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে জিও ব্যাগ ফেলা ও স্থায়ী গাইড বাঁধ নির্মাণ করা, এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য খাসজমি বরাদ্দসহ কৃষিঋণ মওকুফ ও আর্থিক অনুদান দেওয়া।

​ক্ষতির ভয়াবহতা তুলে ধরে নর্থচ্যানেল ইউপি চেয়ারম্যান হাজী মোফাজ্জল হোসেন এবং ডিক্রিরচর ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. হায়দার আলী খান বলেন, “হঠাৎ নদীভাঙনে বিঘা বিঘা জমি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হারিয়ে এই এলাকায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। নদীপাড়ের কৃষকদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে মানুষ এখন নিঃস্ব। ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে তারা অমানবিক দিন কাটাচ্ছে।”

​সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, “আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছি। পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙন প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিকল্পনা ভাবা হচ্ছে।”

​প্রকৃতির এই নির্মম তাণ্ডবে দিশেহারা ফরিদপুরের দুর্গম চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষগুলো এখন স্থায়ী সমাধান ও দ্রুত সরকারি সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

ফরিদপুরে সারের ডিলারশিপ নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, যুবদল কর্মীকে হাতুড়িপেটা

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে সারের ডিলারশিপ নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, যুবদল কর্মীকে হাতুড়িপেটা

ফরিদপুরের নগরকান্দায় সারের ডিলারশিপ নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তোলায় শেখ খোরশেদ আহমেদ দোলন (৫০) নামে এক যুবদল কর্মীকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে আরও তিনজন আহত হয়েছেন।

​সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাঙ্গাবাড়িয়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

​আহত দোলন রামনগর ইউনিয়নের দুলারডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা এবং জেলা যুবদলের সদস্য। আহত অন্য তিনজন হলেন— উত্তর গোপীনাথপুর গ্রামের সুমন তালুকদার (৩৬), গোপালপুর গ্রামের ওয়াজেদ মোল্যা (৫০) এবং বাড়ৈইডাঙ্গী গ্রামের মোস্তাক আহমেদ কলি মণ্ডল (৫০)।

​স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি রামনগর ইউনিয়নে সারের ডিলারশিপ নিয়োগের জন্য আবেদন করেন যুবদল সদস্য খোরশেদ আহমেদ দোলন এবং একই ইউনিয়নের বিএনপি নেতা মান্নান মণ্ডলের ছেলে শিবলী সাদিক ওরফে তুষার মণ্ডল (৩০)। এর মধ্যে মেসার্স এসএস এন্টারপ্রাইজের নামে চূড়ান্তভাবে ডিলারশিপ পান তুষার মণ্ডল। নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষে আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন দোলন।

​এরই ধারাবাহিকতায় গত রোববার (১১ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে নগরকান্দা প্রেসক্লাবে নিয়োগবঞ্চিতরা সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে দোলন ডিলারশিপ নিয়োগে অর্থের বিনিময়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানান।

​দোলনের বড় ভাই শেখ ফরিদ আহমেদ মিলনের অভিযোগ, ওই বক্তব্যের কারণে তুষার মণ্ডল ক্ষুব্ধ হন। এর জের ধরে সোমবার সন্ধ্যায় বাঙ্গাবাড়িয়া বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে থাকা দোলনের ওপর হামলা চালানো হয়।

​ফরিদ আহমেদ মিলন বলেন, “সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসেছিল দোলন। এ সময় তুষারের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল হাতুড়ি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ভাইকে বাঁচাতে গেলে অন্যদেরও পিটিয়ে আহত করা হয়। আমার ভাইয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক।”

​তিনি আরও বলেন, “সারা জীবন বিএনপি করেও আজ আমরা বঞ্চিত। টাকার বিনিময়ে ডিলারশিপ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভাই প্রতিবাদ করায় তাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

​ঘটনার বিষয়ে জানতে মেসার্স এসএস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তুষার মণ্ডলের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘ফোনে চার্জ নেই’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।

​নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ জানান, দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তবে হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।