খুঁজুন
রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৬ বৈশাখ, ১৪৩৩

“অন্তহীন এ জীবন”

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৩২ অপরাহ্ণ
“অন্তহীন এ জীবন”

বৃষ্টিভেজা বিকেলের শেষে আকাশটা আজ অদ্ভুত রকমের বিষণ্ন। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রাহাত চুপচাপ তাকিয়ে আছে দূরের কুয়াশা ঢাকা মাঠের দিকে। মাঠটা একসময় ছিল তার শৈশবের হাসি-আনন্দের কেন্দ্র, কিন্তু এখন যেন সবকিছু ফাঁকা, নির্জন—একদম তার নিজের জীবনের মতো।

রাহাত ভাবছিল—জীবনটা কি সত্যিই এতটা দীর্ঘ, নাকি শুধু টেনে নেওয়া কিছু নিঃশ্বাসের হিসাব?
তার মনে পড়ে, একসময় এই জীবনটাই ছিল স্বপ্নে ভরা। ছোট্ট গ্রাম, নদীর ধারে কাশবন, বিকেলে বন্ধুদের সাথে দৌড়ঝাঁপ—সবকিছুই যেন ছিল রঙিন। মা তখন বেঁচে ছিলেন। বাবার মুখে হাসি ছিল। সংসারে ছিল অভাব, কিন্তু ছিল শান্তি।
“জীবন মানে তো সুখ-দুঃখের মিশেল,”—মা প্রায়ই বলতেন।

কিন্তু তখন কে জানত, এই দুঃখ একদিন এতটা গভীর হয়ে উঠবে!

মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই রাহাতের জীবনটা যেন থমকে যায়। বাবা হয়ে ওঠেন নিরব মানুষ। কথা বলা কমে যায়, হাসি তো একেবারেই হারিয়ে যায়। আর রাহাত? সে ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—জীবন আসলে কোনো গল্প না, এটা এক ধরনের যুদ্ধ।
একদিন রাতে বাবার পাশে বসে রাহাত বলেছিল,
“আব্বা, মা থাকলে সবকিছু অন্যরকম হতো, না?”
বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন,
“মানুষ চলে যায়, কিন্তু জীবন থামে না। এইটাই সবচেয়ে কঠিন সত্য।”

সেদিন কথাটা বুঝতে পারেনি রাহাত। আজ বুঝতে পারে।
সময় গড়িয়ে যায়। রাহাত শহরে আসে পড়াশোনার জন্য। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন স্বপ্ন। সে ভাবতে শুরু করে—হয়তো জীবন আবার নতুন করে শুরু করা যায়।

শহরের ব্যস্ততা তাকে ধীরে ধীরে ভুলিয়ে দেয় গ্রামের স্মৃতি। কিন্তু কিছু কিছু স্মৃতি থাকে—যেগুলো কখনো মুছে যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার জীবনে আসে মায়া।

মায়া—নামের মতোই রহস্যময়। চোখে ছিল গভীরতা, হাসিতে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। প্রথম দিন ক্লাসে দেখা, তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব।
একদিন বিকেলে ক্যাম্পাসের গাছতলায় বসে মায়া হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি এত চুপচাপ কেন?”
রাহাত হেসে বলেছিল,
“চুপ থাকলেই কি খারাপ?”
মায়া বলেছিল,
“না, কিন্তু তোমার চুপ থাকায় একটা কষ্ট লুকিয়ে থাকে।”
সেদিন প্রথমবার কেউ তার ভেতরের কষ্টটা চিনে ফেলেছিল।

এরপর থেকে তাদের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। বন্ধুত্বের সীমা পেরিয়ে সেটা একসময় ভালোবাসায় রূপ নেয়।
মায়া বলত, “জানো, জীবনটা যতই কঠিন হোক, পাশে যদি একজন মানুষ থাকে, সবকিছু সহজ হয়ে যায়।”

রাহাত বিশ্বাস করতে শুরু করে—হয়তো তার জীবনও সুন্দর হতে পারে।
কিন্তু জীবন কি কখনো এত সহজ হয়?
একদিন হঠাৎ করেই মায়া দূরে সরে যেতে শুরু করে। ফোন ধরত না, মেসেজের উত্তর দিত না। দেখা হলে এড়িয়ে যেত।

রাহাত বুঝতে পারছিল না—কি হচ্ছে?
অবশেষে একদিন মায়া নিজেই দেখা করতে চাইল।
ক্যাম্পাসের সেই পুরোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল সে।

রাহাত কাছে যেতেই মায়া বলল,
“আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।”
কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল।
“কি?”—রাহাত শুধু এইটুকুই বলতে পারল।
মায়া মাথা নিচু করে বলল,
“বাড়ির সিদ্ধান্ত। আমি কিছু করতে পারিনি।”
“আর আমাদের ভালোবাসা?”—রাহাতের কণ্ঠ কাঁপছিল।

মায়া চোখ তুলে তাকাল। চোখে পানি।
“সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, রাহাত।”
সেদিন আকাশে রোদ ছিল, কিন্তু রাহাতের ভেতরটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।
মায়ার বিয়ের পর রাহাত পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। পড়াশোনায় মন বসে না, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
রাতে ঘুম আসে না। বারবার মনে পড়ে মায়ার কথা, তার হাসি, তার চোখ।
একদিন সে নিজেকে প্রশ্ন করে—
“এই জীবনটা কি সত্যিই বেঁচে থাকার মতো?”
কিন্তু তারপরই বাবার কথা মনে পড়ে—
“জীবন থামে না।”
সে বুঝতে পারে, জীবন থেমে থাকলেও সময় থামে না। সময় তাকে টেনে নিয়ে যায় সামনে।

বছর পেরিয়ে যায়।
রাহাত এখন চাকরি করে। একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে একা থাকে। বাইরে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক—চাকরি আছে, টাকা আছে, একটা স্থির জীবন।
কিন্তু ভেতরে?
ভেতরে এখনো সেই শূন্যতা।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। রাহাত ভিজতে ভিজতে হাঁটতে থাকে।
তার মনে হয়—জীবনটা ঠিক এই বৃষ্টির মতো। কখন যে শুরু হয়, কখন যে থামে—কেউ জানে না।

হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট মেয়ে তাকে ডাকল,
“ভাইয়া, ফুল নিবেন?”
রাহাত থেমে গেল।
মেয়েটার বয়স খুব বেশি হলে আট-নয় বছর। ভেজা কাপড়, হাতে কিছু ফুল।
“তুমি এখানে কেন?”—রাহাত জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটা হেসে বলল,
“ফুল বিক্রি করি। না হলে খাই কী?”
এই ছোট্ট মেয়েটার হাসি দেখে রাহাত অবাক হয়ে গেল। এত কষ্টের মধ্যেও সে হাসতে পারে!
রাহাত সব ফুল কিনে নিল।

মেয়েটা খুশিতে বলল,
“আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুক ভাইয়া!”
কথাটা শুনে রাহাতের চোখে পানি চলে এল।
সে ভাবল—
“আমার তো সব আছে, তবুও আমি সুখী না। আর এই মেয়েটার কিছুই নেই, তবুও সে হাসতে পারে!”
সেদিন রাতে রাহাত প্রথমবার নিজের জীবনকে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করল।
সে বুঝতে পারল—
জীবন শুধু নিজের কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার নাম না। জীবন মানে অন্যের জন্য কিছু করা, অন্যের হাসিতে নিজের সুখ খুঁজে পাওয়া।

পরের দিন থেকেই সে বদলে যেতে শুরু করে।
প্রতিদিন অফিস শেষে সে রাস্তার সেই বাচ্চাদের সাথে সময় কাটায়। তাদের পড়ায়, তাদের জন্য খাবার নিয়ে যায়।
ধীরে ধীরে তার জীবনে নতুন এক আলো আসতে শুরু করে।
একদিন সেই ছোট্ট মেয়েটা—যার নাম ছিল রিমি—হেসে বলল,
“ভাইয়া, আপনি আসলে ভালো লাগে।”
রাহাত হেসে বলল,
“আমারও ভালো লাগে।”
সেদিন অনেকদিন পর সে সত্যিকারের হাসল।
বছর কেটে যায়।

রাহাত এখন একটা ছোট্ট স্কুল চালায় পথশিশুদের জন্য। তার জীবনের লক্ষ্য বদলে গেছে।
একদিন সন্ধ্যায় স্কুলের ছাদে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার মনে পড়ে মা, মায়া, তার অতীত।
সবকিছুই যেন এখন একেকটা গল্প।

সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে—
জীবন কখনো থামে না। এটা চলতেই থাকে।
কখনো সুখে, কখনো দুঃখে।
কখনো হারিয়ে, কখনো খুঁজে পেয়ে।
হঠাৎ একদিন সে শুনতে পেল, কেউ তার নাম ধরে ডাকছে।
“রাহাত?”
পেছনে ফিরে সে অবাক হয়ে গেল।
মায়া দাঁড়িয়ে আছে।
সময়ের সাথে সে বদলে গেছে, কিন্তু চোখ দুটো আগের মতোই আছে।
“কেমন আছ?”—মায়া জিজ্ঞেস করল।

রাহাত একটু হেসে বলল,
“ভালো আছি।”
“তুমি?”—সে জিজ্ঞেস করল।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“ভালো থাকার চেষ্টা করছি।”
তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা।
তারপর মায়া বলল,
“তুমি বদলে গেছ।”
রাহাত হেসে বলল,
“জীবন বদলে দিয়েছে।”
মায়া চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“এই স্কুলটা তোমার?”
“হ্যাঁ।”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
“তুমি সত্যিই বড় কিছু করেছ।”
রাহাত কিছু বলল না।

সে বুঝতে পারছিল—সব কথা বলা যায় না।
মায়া চলে যাওয়ার আগে বলল,
“জানো, আমি অনেক সময় ভাবি—যদি সবকিছু অন্যরকম হতো?”
রাহাত শান্তভাবে বলল,
“সবকিছু যেমন হয়েছে, সেটাই ঠিক ছিল।”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
রাহাত বলল,
“কারণ এই পথেই আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি।”
মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
সে কিছু না বলে চলে গেল।
রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছে।
রাহাত ছাদের উপর বসে আছে।
তার মনে হচ্ছে—জীবনটা আসলে শেষ হওয়ার মতো না। এটা চলতেই থাকে, একের পর এক অধ্যায় নিয়ে।
কিছু মানুষ আসে, কিছু মানুষ চলে যায়।
কিছু স্বপ্ন ভেঙে যায়, কিছু স্বপ্ন নতুন করে জন্ম নেয়।

কিন্তু জীবন?
জীবন কখনো থামে না।
এটা এক অন্তহীন যাত্রা।
রাহাত চোখ বন্ধ করে।
তার মুখে এক শান্তির হাসি।
সে মনে মনে বলে—
“অন্তহীন এ জীবন… তবুও সুন্দর।”

 

লেখক: হারুন-অর-রশীদ, সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

ফরিদপুরে শুরু হয়েছে ৪৭তম বিজ্ঞান মেলা

মানিক কুমার দাস, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৩২ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে শুরু হয়েছে ৪৭তম বিজ্ঞান মেলা

ফরিদপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয়েছে ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ এবং বিজ্ঞান মেলা। “উদ্ভাবন নির্ভর বাংলাদেশ গঠনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এই মেলার উদ্বোধন করা হয় রোববার (১৯ এপ্রিল) সকালে শহরের তারার মেলা ঈশান মেমোরিয়াল স্কুল প্রাঙ্গণে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম, সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান এবং জেলা শিক্ষা অফিসার বিষ্ণু পদ ঘোষাল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সোহরাব হোসেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরে অতিথিরা বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন এবং শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী প্রকল্প ঘুরে দেখেন। মেলায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তি, রোবোটিক্স, পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন, কৃষি প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক বিভিন্ন প্রকল্প উপস্থাপন করে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকল্প নেই। একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য উদ্ভাবনী চিন্তা ও গবেষণার প্রসার অপরিহার্য।

তারা আরও বলেন, তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায় থেকেই গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ও হাতে-কলমে কাজের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।

বক্তারা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, বাস্তব সমস্যার সমাধানে নতুন নতুন উদ্ভাবনে এগিয়ে আসতে হবে। প্রযুক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তারা শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান।

জেলা প্রশাসন, ফরিদপুরের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই মেলা জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। মেলায় জেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেছে, যা তাদের সৃজনশীলতা ও মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মেলা প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে দিনভর প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়। নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রদর্শনী ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা, যা ভবিষ্যতের বিজ্ঞানমনস্ক বাংলাদেশ গঠনে আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এ বছর গরম কতটা দীর্ঘ হতে পারে?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ
এ বছর গরম কতটা দীর্ঘ হতে পারে?

বাংলা প্রবাদে শীতের তীব্রতা বোঝাতে যেমন নানা তুলনা আছে, তেমন গরম নিয়েও প্রবচন কম নেই। ‘চৈত্রের খরতাপ’ কিংবা ‘জ্যৈষ্ঠের তাপদাহ’— এই শব্দগুলোই বলে দেয়, বছরের একটি সময় জুড়ে এই অঞ্চলে গরমের প্রভাব কতটা পড়ে মানুষের জীবনে।

বাংলা পঞ্জিকার চৈত্র মাস সাধারণত ইংরেজি পঞ্জিকার মার্চ ও এপ্রিল মাসের মধ্যে পড়ে। আর জ্যৈষ্ঠ মাস পরে ইংরেজি মে ও জুন মাসের ভেতর। আর এর মাঝেই এপ্রিল-মে মাসে পড়ে বৈশাখ মাস।

অর্থাৎ, কাগজে-কলমে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মিলে গ্রীষ্মকাল হলেও বাংলাদেশে গরম শুরু হয় সেই মার্চ তথা চৈত্র মাস থেকেই। আর তা প্রলম্বিত হয় একেবারে শরৎকাল পর্যন্ত।

এ বছর মার্চে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঝড়-বৃষ্টির কারণে গরম অতটা টের পাওয়া না গেলেও এপ্রিলে, বিশেষ করে বৈশাখের শুরুতেই তাপপ্রবাহের দাপট টের পাওয়া যাচ্ছে।

এবার কতটা বাড়তে পারে তাপমাত্রা, আর গরমের তীব্রতাই বা চলতে পারে কতদিন?

আবহাওয়াবিদরা জানাচ্ছেন, ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গ্রীষ্মকাল দুই মাসজুড়ে থাকলেও মূলত গরমের সময়টা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

কতটা গরম পড়বে ২০২৬ সালে?

বাংলাদেশে এপ্রিল মাসকে বলা হয় সবচেয়ে উষ্ণ মাস।

আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত বাংলাদেশে এপ্রিল মাসের গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৩ দশমিক দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর মে মাসের গড় তাপমাত্রা ৩২ দশমিক নয় ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মার্চ মাসে ৩১ দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিস বলছে, এগুলো এই তিন মাসের স্বাভাবিক তাপমাত্রা, যা মূলত ১৯৯১ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত, মোট ৩০ বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গড়।

আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এ বছরের এপ্রিল মাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকবে। অর্থাৎ, ওই গড় তাপমাত্রার আশেপাশে থাকার সম্ভাবনা আছে।

“কিন্তু রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের কোথাও কোথাও তাপমাত্রা কখনও কখনও ৪২ ডিগ্রি পর্যন্তও উঠতে পারে, বিশেষ করে তাপপ্রবাহের সময়,” যোগ করেন তিনি।

পহেলা বৈশাখের পরপরই, গতকাল বুধবার ২৪ ঘণ্টার তাপমাত্রার রেকর্ডে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৩৯. ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, এপ্রিল মাসে সারাদেশে দুই থেকে চারটি মৃদু ও এক থেকে দুইটি তীব্র তাপপ্রবাহ হতে পারে। তখন কোথাও কোথাও ৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঈশ্বরদী, বদলগাছী ও রাজশাহীতে।

এদিকে, আগামী তিন মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এপ্রিল-জুনের মাঝে দেশে ছয় থেকে আটটি মৃদু এবং তিন থেকে চারটি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।

উল্লেখ্য, কোনো এলাকায় যদি তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে তাহলে তাকে বলে তীব্র তাপপ্রবাহ। তাপমাত্রা যখন ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে, তাকে বলে মাঝারি তাপপ্রবাহ এবং তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে সেটিকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলে।

বাংলাদেশে আগে মার্চ থেকে মে মাস ছিল তাপপ্রবাহের সময়। কিন্তু মানবসৃষ্ট কারণে এখন মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তাপপ্রবাহ থাকে। তাই, বিগত কয়েক বছরের মতো এ বছরের বর্ষাকালেও গরমের তীব্রতা থাকবে, বলছিলেন এই আবহাওয়াবিদ।

গরমের তীব্রতা অনুভব হবে কম

আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, এ বছর গরম পড়লেও তা ২০২৪ সালের মতো তীব্র হবে না।

কারণ হিসেবে বলছেন, এ বছর বজ্রঝড় বেশি হবে। ২০২৪ সালে বজ্রঝড়ের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় গত ৭৬ বছরের রেকর্ড ভেঙে তীব্র গরম পড়েছিলো বাংলাদেশে।

সাধারণত এপ্রিল মাসে গড়ে নয় দিন বজ্রঝড় হয় এবং মে মাসে হয় ১৩ দিন।

কী কারণে এবার বজ্রঝড় বেশি হবে?

জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, “এবার প্রশান্ত মহাসাগর পার হয়ে যে পূবালী বাতাস বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করবে, তার গতিবেগ কিছুটা হলেও বেশি থাকবে। এই কারণে সাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবার ২৬ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মাঝে ওঠানামা করার সম্ভাবনা আছে। এই ধরনের তাপমাত্রায় বিশাল জলরাশি থেকে বাষ্পায়নের হার, মানে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।”

“আর জলীয় বাষ্প বেশি হলে জলীয় বাষ্প সমৃদ্ধ বাতাসের ঊর্ধ্বগমন হয়, সারি সারি মেঘমালা তৈরি হয় ও বজ্রবৃষ্টি হয়। পাশাপাশি, এল নিনোর (উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোত) মতো কিছু বৈশ্বিক আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যও এই বজ্রঝড়ের জন্য ভূমিকা রাখবে,” যোগ করেন মি. মল্লিক।

মূলত, কোনো স্থানের তাপমাত্রা যদি অনেক বেশি বেড়ে যায় এবং সেখানে যদি বজ্রঝড় হয়, তাহলে প্রাকৃতিকভাবেই পরিবেশ ঠাণ্ডা হয়ে যায় অনেকটা।

কিন্তু এমন কোনো নিয়মতান্ত্রিক বিষয় নেই, যা অনুসরণ করে সঠিকভাবে বলা যাবে যে ঠিক কতদিন পর পর তাপপ্রবাহ এবং বজ্রঝড় হবে, উল্লেখ করেন তিনি।

তার ভাষ্যে, “বজ্রঝড়, তাপপ্রবাহ – এগুলো আবর্তিত হতে থাকবে। কখনো কখনো রোদ-বৃষ্টি চরম আকার ধারণ করবে। তখন বৃষ্টিপাত, শিলাবৃষ্টির কারণে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ হবে। “

এ বছর কি আবহাওয়াগত কোনো পরিবর্তন এসেছে?

এবার মার্চ মাসে ও এপ্রিলের শুরুতে বেশ কিছু দিন ধরে প্রায় সারা বাংলাদেশেই ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। এটি হয়েছে বজ্রমেঘ থেকে বা গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা থেকে।

দমকা বা ঝড়ো হাওয়ার সাথে বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টি ছিল। সবমিলিয়ে তাপমাত্রা হঠাৎ করে নেমে গেছে এবং মনে হয়েছে যেন ঠাণ্ডা পড়েছে।

“এই ধরনের বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা দুই থেকে ছয় ডিগ্রি নেমে যায়,” বলছিলেন মি. মল্লিক।

তার মতে, “এটা প্রতিবছরই হয়। আগে এইরকম কখনও ঘটে নাই-এমন ব্যাপার নেই।”

“মার্চ, এপ্রিল ও মে জুড়ে এভাবেই চলতে থাকে। এটি বাংলাদেশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কখনও তাপমাত্রা একটু কম-বেশি হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির এই আবর্তন প্রতি বছরই ঘুরে-ফিরে আসে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এবং স্থানীয় ও বৈশ্বিক আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের যে পরিবর্তনটা এত বছরে হয়েছে, সে কারণে আবহাওয়াগত একদম সঠিক সময়ে এটি না-ও হতে পারে।”

এদিকে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিনে দিন ও রাতের তাপমাত্রা বাড়তে পারে।

এছাড়া, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলাগুলো উপর দিয়ে বয়ে চলা মৃদু থেকে মাঝারী ধরনের তাপপ্রবাহ প্রশমিত হতে পারে।

আগামী কয়েকদিন ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টিরও সম্ভাবনা রয়েছে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

নামাজে রাকাত সংখ্যা ভুলে গেলে করণীয়

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ
নামাজে রাকাত সংখ্যা ভুলে গেলে করণীয়

আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তাঁর ইবাদতের জন্য। আর ইবাদতের শ্রেষ্ঠতম রূপ হলো নামাজ। নামাজ শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘নামাজ হলো দ্বীনের স্তম্ভ।’ অর্থাৎ, নামাজ ছাড়া ধর্মের ভিত্তি গড়ে ওঠে না।

রাসুল (সা.)-এর ভাষায়, ‘আমার চোখের স্নিগ্ধতা বা প্রশান্তি রয়েছে নামাজে।’ এ থেকেই বোঝা যায়, নামাজ শুধু শরীয়তের বিধান নয়, বরং তা একজন মুমিনের আত্মিক প্রশান্তির উৎস।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে’ (সুরা আনকাবুত : ৪৫)। অর্থাৎ, প্রকৃত নামাজি সব ধরনের অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা থেকে নিজেকে দূরে রাখেন।

তাই নিজেকে প্রকৃত নামাজি হিসেবে গড়ে তুলতে নামাজে একাগ্রতা অবলম্বন করতে হবে। এমনভাবে নামাজ পড়তে হবে, যেন আল্লাহ আমাকে দেখছেন। হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর ইবাদত করো এমনভাবে, যেন তাঁকে তুমি দেখতে পাচ্ছ। আর যদি দেখতে না পাও, তবে তিনি যেন তোমাকে দেখছেন।’ (বোখারি : ৫০, মুসলিম : ৮)

কিন্তু অনেক নামাজি প্রায় একটা সমস্যায় ভুগে থাকেন। সেটা হলো, মাঝেমধ্যেই নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে দ্বিধায় পড়েন। আদায়কৃত নামাজ তিন রাকাত হলো না চার রাকাত হলো, বিষয়টি মনে করতে পারেন না। আবার অনেকের নামাজের ভেতরেই সন্দেহ তৈরি হয়। ফলে কেউ সন্দেহ নিয়ে নামাজ শেষ করেন। আবার কেউ নতুন করে নামাজ আদায় করে থাকেন। এই অবস্থায় কীভাবে নামাজ আদায় করতে হবে, ফরিদপুর প্রতিদিনের পাঠকদের জন্য তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

ফুক্বাহায়ে কেরাম বলছেন, কেউ যদি এমন সমস্যার মুখোমুখি হন, তবে তিনি চিন্তা করে দেখবেন যে, তিনি আসলে কত রাকাত পড়েছেন। তখন প্রবল ধারণা যেটির পক্ষে সায় দেবে, তার ওপর ভিত্তি করে বাকি নামাজ পূর্ণ করবেন। আর যদি নামাজের রাকাতসংখ্যার ব্যাপারে প্রবল ধারণা না হয়, তাহলে কম সংখ্যাটা ধরবেন এবং এ হিসেবে বাকি নামাজ পূর্ণ করে সিজদা সাহু দেবেন

প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, নামাজে কত রাকাত পড়েছেন আপনার সন্দেহ হচ্ছে— তিন রাকাত নাকি চার রাকাত। এ ক্ষেত্রে প্রথম কথা হলো, যদি আপনার প্রবল ধারণা হয়, আমার কমেরটাই বেশি মনে হচ্ছে, অর্থাৎ তিন আর চারের মধ্যে সন্দেহকালে তিন রাকাতই বেশি মনে পড়ছে, তবে এ অবস্থায় আরেক রাকাত পড়ে সিজদা সাহু করে নেবেন। আর যদি দুটোই সমান সমান মনে হয়, অর্থাৎ তিনের পক্ষে মন টানে আবার চারের পক্ষেও মন টানে, তাহলে কমটা ধরে আরও এক রাকাত পড়ে সিজদা সাহু দিয়ে নামাজ শেষ করবেন। নামাজ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

হাদিস শরিফে হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারো যদি নামাজের মধ্যে সন্দেহ হয়, ফলে সে জানে না যে এক রাকাত পড়ল না কি দুই রাকাত, তাহলে সে যেন এক রাকাত ধরে নিয়ে নামাজ পড়ে। আর যদি দুই রাকাত পড়ল না তিন রাকাত, তা না জানে তাহলে যেন দুই রাকাত ধরে নামাজ পড়ে এবং (এসব ক্ষেত্রে) সালাম ফেরানোর পূর্বে দুটি সিজদা আদায় করে (অর্থাৎ সিজদা সাহু করে)।’ (তিরমিজি : ৩৯৮)