খুঁজুন
শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১২ বৈশাখ, ১৪৩৩

ক্ষমতা আইনকে অপহরণ করেছে

জিয়াদ মোতালা
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ
ক্ষমতা আইনকে অপহরণ করেছে

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের কোনো ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটিকে সীমান্তের বাইরে বিস্তৃত কোনো বৈধ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার উদ্যোগ বলা যায় না। এটি আসলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নগ্ন শক্তির প্রকাশ। এক ধরনের রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন, যেখানে কোনো আড়াল বা লজ্জা নেই।

এখানে আইনের জায়গা দখল করেছে ক্ষমতা। ন্যায়নীতির বদলে প্রাধান্য পেয়েছে নিজের পছন্দ ও স্বার্থ। বলপ্রয়োগকে দেখানো হচ্ছে নৈতিকতা ও সদগুণ হিসেবে। কিন্তু এটি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা নয়। বরং নীরবে সেই শৃঙ্খলাকেই হত্যা করা হচ্ছে।

যখন একটি রাষ্ট্র আইনকে অপহরণ করে অন্য একটি রাষ্ট্রের নেতাকে অপহরণের বৈধতা দেখাতে চায়, তখন সে আইন বা শৃঙ্খলা রক্ষা করে না, বরং সে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে তার আইনের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই। এ ধরনের কাজ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে না; উল্টো তা ভেঙে ফেলে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি ভয়ংকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এটি শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে অন্য একটি দেশের আগ্রাসন নয়। এটি বিশ্বব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্র চাইলে আইনকে পাশ কাটিয়ে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে। আর সেখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ লুকিয়ে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা কোনো দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের কোথাও কোনো ভিত্তি পায় না, একেবারেই না। এটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবেও গ্রহণযোগ্য নয়। আবার এটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনপ্রাপ্ত কোনো পদক্ষেপও নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনেক কিছু হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই এমন কোনো খোলা অনুমতিপত্র নয়, যার মাধ্যমে বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো অপহরণ করে সরকার পরিবর্তন করার অধিকার পায়।

মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মাদক পাচারের অভিযোগ দেখিয়ে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার যে দাবি তোলা হচ্ছে, তা বিশেষভাবে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। কারণ, আন্তর্জাতিক আইনে এমন কোনো নিয়মই নেই। কোনো চুক্তিতে নেই, প্রথাগত আইনে নেই, এমনকি কোনো গ্রহণযোগ্য আইনি ব্যাখ্যা বা বিচারিক সিদ্ধান্তেও নেই।

মানবাধিকার আইন মূলত রাষ্ট্রগুলোকে কিছু আচরণগত মানদণ্ড মেনে চলতে বাধ্য করে। কিন্তু এই আইন কোনো রাষ্ট্রকে একতরফাভাবে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে অন্য দেশের নেতাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয় না। যদি এমনটাই নিয়ম হতো, তাহলে বিশ্ব সবসময়ই এক ধরনের ‘আইনসম্মত বিশৃঙ্খলার’ মধ্যে ডুবে থাকত।

আসলে যুক্তরাষ্ট্র যদি এ তথাকথিত নীতির ব্যাপারে সত্যিই আন্তরিক হতো, তাহলে তাদের অবস্থানে ধারাবাহিকতা থাকা জরুরি ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ফলে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এ নিয়ে বিস্তৃত নথি রয়েছে এবং গণহত্যার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগও উঠেছে। সেই যুক্তি মানলে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আটক করার পক্ষে আইনগত ও নৈতিক যুক্তি আরও বেশি জোরালো হতো।

এ বাস্তবতা দেখায় যে, এখানে আসলে নীতি বা আইন নয়, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সুবিধাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক আইনকে বেছে বেছে ব্যবহার করা হচ্ছে নিজের স্বার্থে। আর এর ফল হচ্ছে এমন এক বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে আইন দুর্বলদের জন্য কঠোর, কিন্তু শক্তিশালীদের জন্য প্রায় অকার্যকর। তবুও এ ধরনের কোনো যুক্তি বাস্তবে বিবেচনাই করা হয় না। এর কারণ খুবই স্পষ্ট। এখানে আইন কাজ করছে না; কাজ করছে ক্ষমতা। ক্ষমতাই ঠিক করছে কে লক্ষ্যবস্তু হবে আর কে হবে না।

সরকার পরিবর্তন বা রেজিম চেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘদিনের অভ্যাস, যার পেছনে স্পষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে। ১৯৫৩ সালে ইরান, ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালা, ১৯৭৩ সালে চিলি এবং ২০০৩ সালে ইরাক। এসব ঘটনাই দেখায় যে, যুক্তরাষ্ট্র বারবার অন্য দেশের সরকার পরিবর্তনে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত থেকেছে।

কিন্তু কোনো দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করা একেবারেই নতুন এবং আরও ভয়ংকর এক ধাপ। এটি নৈতিক বা রাজনৈতিক দিক থেকে শুধু নিন্দনীয়ই নয়, বরং এটি সেই আচরণ, যাকে ঠেকানোর জন্যই ১৯৪৫ সালের পরের আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। বলপ্রয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা কোনো ছোটখাটো নিয়ম নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক জটিলতাও নয়। এটি আন্তর্জাতিক আইনের মূল ভিত্তি, তার প্রাণকেন্দ্র।

এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোনো অনুমোদন ছাড়াই শক্তি প্রয়োগ করার অর্থ হলো, খোলাখুলিভাবে ঘোষণা করা যে, আইন শুধু দুর্বলদের জন্য, শক্তিশালীদের জন্য নয়। এর মাধ্যমে বলা হচ্ছে, নিয়ম মানতে হবে শুধু তাদেরই, যাদের হাতে ক্ষমতা নেই।

যুক্তরাষ্ট্র এ বাস্তবতা খুব ভালো করেই বোঝে। তারা জানে যে, তারা আন্তর্জাতিক আইনের মূল নীতিগুলো ভেঙে ফেলছে। তবুও তারা তা করছে। আর এ কাজের মধ্য দিয়েই তারা আসলে জাতিসংঘ সনদভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ময়নাতদন্ত চালাচ্ছে। অর্থাৎ, যে ব্যবস্থা বিশ্বকে যুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি হয়েছিল, সে ব্যবস্থাকেই ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।

এ পচন এখানেই থেমে যায়নি। ওয়াশিংটন বহুবার জাতিসংঘ সনদ এবং জাতিসংঘ সদর দপ্তর চুক্তির অধীনে নিজেদের দায়িত্ব লঙ্ঘন করেছে। যেসব কর্মকর্তা তাদের পছন্দ নয়, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বারবার বাধা দেওয়া হয়েছে। গত বছর ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টকে সরাসরি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে না দেওয়া কোনো কূটনৈতিক ভুল বা সামান্য অসৌজন্য ছিল না। এটি ছিল বিশ্বের প্রধান বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাগতিক রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্পষ্ট চুক্তিভঙ্গ।

এ ঘটনার বার্তা ছিল একেবারে পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার এবং জাতিসংঘ সনদ মানার বিষয়টি এখন আর সবার জন্য সমান নয়; এটি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদনের ওপর।

জাতিসংঘ তৈরি করা হয়েছিল ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, ক্ষমতার তোষামোদ করার জন্য নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ সংস্থা ক্রমেই গুরুতর আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। ভেটো ক্ষমতার কারণে অচল হয়ে পড়া, স্বাগতিক দেশের চাপে নত হওয়া এবং সনদ ভাঙতে সক্ষম সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর দ্বারা উপেক্ষিত হওয়ার ফলে, জাতিসংঘ ধীরে ধীরে আইনের রক্ষক থেকে আইনের ক্ষয়কে বৈধতা দেওয়ার এক ধরনের মঞ্চসজ্জায় পরিণত হয়েছে।

এক সময় সত্য অস্বীকার করা আত্মপ্রবঞ্চনায় পরিণত হয়। এ ব্যবস্থা তার মূল প্রতিশ্রুতিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর কারণ এই নয় যে, আন্তর্জাতিক আইন অবাস্তব বা সরল চিন্তার ফল। যে রাষ্ট্র এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী, সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে আইন মানা ঐচ্ছিক।

এ কারণে এখন সে কথাটাই বলার সময় এসেছে, যা এতদিন বলা হয়নি। জাতিসংঘের সদর দপ্তর স্থায়ীভাবে এমন কোনো দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া উচিত, যে দেশ চুক্তিগত দায়বদ্ধতাকে বিরক্তিকর বাধা হিসেবে দেখে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি নতুন, বাস্তবসম্মত ও গভীর আলোচনা শুরু করতে হবে এমন একটি বিকল্প বৈশ্বিক কাঠামো নিয়ে, যার কর্তৃত্ব কোনো একটি রাজধানী, একটি ভেটো ক্ষমতা বা একটি মুদ্রার কাছে জিম্মি থাকবে না। প্রয়োজন হলে এমন একটি ব্যবস্থার কথাও ভাবতে হবে, যার ক্ষমতা জাতিসংঘের চেয়েও বেশি। কারণ, জাতিসংঘকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ফাঁপা করে দেওয়া হয়েছে।

আইন শুধু স্লোগান হয়ে টিকে থাকতে পারে না। হয় এটি সবচেয়ে বেশি শক্তি প্রয়োগকারীদেরও নিয়ন্ত্রণ করবে, নয়তো এটি শুধু দুর্বলদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ফাঁকা বুলি হয়ে থাকবে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে, তা কোনো শৃঙ্খলা রক্ষার উদাহরণ নয়। বরং এটি প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার জায়গা দখল করেছে ক্ষমতাবানদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ। আর পছন্দের কোনো সীমা নেই—কিছুই বেঁধে রাখতে পারে না।

লেখক: হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অব লর আইন বিভাগের অধ্যাপক। তিনি ১৯৯৫ সাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন কেপে পরিচালিত তুলনামূলক ও আন্তর্জাতিক আইন কর্মসূচির পরিচালক ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরের বাসিন্দা তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং সেই সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ

সংবাদ প্রকাশের পর: জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে পদক্ষেপের ঘোষণা দিলেন এমপি বাবুল

সদরপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:২৯ অপরাহ্ণ
সংবাদ প্রকাশের পর: জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে পদক্ষেপের ঘোষণা দিলেন এমপি বাবুল

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাইশরশি জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন ফরিদপুর-৪ (সদরপুর, ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসন) আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। এরই প্রেক্ষিতে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টার দিকে এমপি বাবুল সরেজমিনে জমিদার বাড়িটি পরিদর্শন করেন এবং সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, এই জমিদার বাড়িটি আমাদের এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। এটিকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। ইতোমধ্যে আমরা এটি অধিদপ্তর-এর আওতায় এনে সংরক্ষণের চেষ্টা করছি।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা এই জমিদার বাড়ির বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি গুপ্তধনের আশায় বউঘাট খননের ঘটনাও এলাকায় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

শহিদুল ইসলাম বাবুলের এ ঘোষণায় এলাকাবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।

ফরিদপুরে ৫ প্রাণহানির পরও নিরাপত্তাহীন কাফুরা রেলক্রসিং, নেই গেট-গেটম্যান—ঝুঁকিতে মানুষ

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৫০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ৫ প্রাণহানির পরও নিরাপত্তাহীন কাফুরা রেলক্রসিং, নেই গেট-গেটম্যান—ঝুঁকিতে মানুষ

ফরিদপুর সদর উপজেলার গেরদা ইউনিয়নের কাফুরা রেলক্রসিংটি দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই রেলক্রসিংয়ে নেই কোনো লেভেল ক্রসিং গেট, নেই গেটম্যান—ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন পথচারী ও যানবাহন চালকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুবার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি এই কাফুরা রেলক্রসিংয়েই ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় ট্রেন ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ৫ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন, যাদের তাৎক্ষণিকভাবে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকাগামী একটি ট্রেন রেলগেট অতিক্রম করার সময় একটি মাইক্রোবাস হঠাৎ লাইনের ওপর উঠে পড়লে এ সংঘর্ষ ঘটে। ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসটি প্রায় ৫০ গজ দূরে ছিটকে গিয়ে পাশের একটি পুকুরে পড়ে যায়।

দুর্ঘটনার সময় সেখানে কোনো গেট বা গেটম্যান না থাকাই বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে। এরপর স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে কর্তৃপক্ষ একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কাফুরা রেলক্রসিংয়ে এখনো নেই কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ট্রেন আসার সময় সতর্কবার্তা বা ব্যারিয়ার না থাকায় হঠাৎ করেই যানবাহন লাইনে উঠে পড়ছে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ওহিদুল ফকির বলেন, “প্রতিদিনই ভয় নিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। ট্রেন কখন আসবে, কোনো ধারণা থাকে না। দ্রুত এখানে গেটম্যান নিয়োগ জরুরি।”

অটোরিকশা চালক হামিদ শরীফ বলেন, “হঠাৎ ট্রেন চলে এলে দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় অল্পের জন্য বেঁচে যাই।”

এলাকার চা দোকানদার হেলাল বেপারি জানান, “ট্রেন এলে আমরা নিজেরাই রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করি।”

ঝালমুড়ি বিক্রেতা রফিক মোল্যা বলেন, “এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এত মানুষ মারা গেলেও কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই।”

চটপটি বিক্রেতা মো. হায়দার মন্ডল বলেন, “প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে এই রাস্তা দিয়ে। ঝুঁকি থাকলেও যেন কারো নজর নেই—এটা খুবই দুঃখজনক।”

এ বিষয়ে ফরিদপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার প্রহলাদ বিশ্বাস ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, “গেটম্যান নিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন।”

এ ব্যাপারে রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহাবুব হাসান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, এ ব্যাপারে পাকশীতে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনও এর কোনো সমাধান মিলেনি।

রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মোসা. হাসিনা খাতুন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “এটি সম্ভবত অননুমোদিত রেলগেট হওয়ায় গেটম্যান নেই। তবে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি। আমরা এলাকাবাসী ও ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুতই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সোহরাব হোসেন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “জননিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাইতো সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রীঘ্রই সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

যে বটগাছ জানে আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
যে বটগাছ জানে আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা

গ্রামের বটের ছায়ায় বসে থাকা হারানো শৈশব
বিকেলের আলোটা আজও ঠিক আগের মতোই নরম হয়ে আসে। হালকা সোনালি রোদ ধানের ক্ষেতে পড়ে যেন একরাশ স্মৃতি ঝলমল করে ওঠে।

গ্রামের সেই পুরোনো বটগাছটা—যার শেকড়গুলো মাটিতে নেমে এসে যেন আরেকটা পৃথিবী তৈরি করেছে—আজও দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আগের মতোই। শুধু বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে মানুষ, আর হারিয়ে গেছে এক টুকরো শৈশব।

রফিক আজ অনেক বছর পর গ্রামে ফিরেছে। শহরের ব্যস্ততা, চাকরি, সংসার—সব মিলিয়ে সে যেন ভুলেই গিয়েছিল এই মাটির গন্ধ। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই মনে হলো, একবার ফিরে দেখা দরকার। সেই জায়গাগুলোকে, যেগুলো তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোকে আগলে রেখেছিল।

বটগাছটার নিচে এসে দাঁড়াতেই বুকের ভেতর কেমন একটা হাহাকার উঠে গেল। কতদিন, কত বছর পরে সে এখানে এসেছে! অথচ জায়গাটা যেন ঠিক আগের মতোই আছে—শুধু নেই সেই মানুষগুলো, নেই সেই হাসির শব্দ।

ছোটবেলায় এই বটগাছটার নিচেই ছিল তাদের আস্তানা। বিকেল হলেই সে, বাবু, করিম, লিপি—সবাই একসাথে জড়ো হতো এখানে। কখনও গোল্লাছুট, কখনও কাবাডি, আবার কখনও শুধু গল্প আর হাসাহাসি। সময় যেন তখন থেমে থাকতো তাদের জন্য।

রফিক ধীরে ধীরে গাছটার একপাশে বসে পড়ল। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল গাছের খসখসে গা। মনে হলো, গাছটা যেন তাকে চিনে ফেলেছে। যেন বলছে—“এতদিন কোথায় ছিলি?”

হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল এক বিকেলের কথা।
সেদিন আকাশে মেঘ ছিল, হালকা বাতাস বইছিল। তারা সবাই মিলে লুকোচুরি খেলছিল। রফিক লুকিয়ে ছিল বটগাছের পেছনে। তখন লিপি এসে বলেছিল— “এই, তুই এখানে! আমি তোকে খুঁজেই পাচ্ছিলাম না।”

রফিক তখন মুচকি হেসে বলেছিল— “তুই খুঁজে পাবি না, আমি খুব ভালো লুকাই।”
লিপি হেসে বলেছিল— “বড় হয়ে তুই নিশ্চয়ই গুপ্তচর হবি!”

সেই হাসির শব্দটা আজও যেন বাতাসে ভাসে। কিন্তু লিপি এখন কোথায়? কেমন আছে? হয়তো সংসার নিয়ে ব্যস্ত, হয়তো এই গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে।

রফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শৈশবের বন্ধুরা একে একে হারিয়ে গেছে জীবনের স্রোতে। কেউ শহরে, কেউ বিদেশে, কেউ বা এই পৃথিবী ছেড়েই চলে গেছে। শুধু এই বটগাছটা রয়ে গেছে, সব স্মৃতি আগলে রেখে।
তার চোখের কোণে জল এসে গেল। সে চুপচাপ বসে রইল।

হঠাৎ দূর থেকে একটা বাচ্চার হাসির শব্দ ভেসে এলো। সে তাকিয়ে দেখল—কয়েকটা ছোট ছেলে-মেয়ে খেলছে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে একসময় তারা খেলত।

একটা ছোট ছেলে দৌড়ে এসে গাছটার পাশে দাঁড়াল, ঠিক যেভাবে রফিক দাঁড়াত ছোটবেলায়। ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল— “ধরতে পারবি না!”
এই দৃশ্যটা দেখে রফিকের বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু শৈশব—সে তো একই থাকে, শুধু মানুষ বদলে যায়।
সে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ছেলেগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।

“তোমরা কী খেলছো?”—সে জিজ্ঞেস করল।
একটা মেয়ে উত্তর দিল— “লুকোচুরি!”
রফিক হেসে বলল— “আমরাও এই গাছটার নিচে এই খেলাটাই খেলতাম।”

ছেলেমেয়েগুলো অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। যেন তারা বুঝতে পারছে না—এই মানুষটা কীভাবে তাদের মতোই একসময় এখানে খেলেছে।
একটা ছেলে বলল— “আপনি এখানে থাকতেন?”
রফিক মাথা নেড়ে বলল— “হ্যাঁ, অনেক দিন আগে।”

ছেলেটা বলল— “তাহলে আপনি আমাদের সাথে খেলবেন?”

প্রশ্নটা শুনে রফিক একটু থমকে গেল। কত বছর হয়ে গেছে সে এমন করে খেলেনি! কিন্তু আজ কেন যেন মনে হলো—আবার একবার ফিরে যাওয়া যাক সেই সময়ে।

সে মুচকি হেসে বলল— “খেলব।”
খেলা শুরু হলো। রফিক দৌড়াচ্ছে, লুকাচ্ছে, হাসছে—ঠিক যেমনটা করত ছোটবেলায়। কিছুক্ষণ জন্য সে ভুলেই গেল যে সে এখন বড় হয়ে গেছে, তার দায়িত্ব আছে, তার বাস্তবতা আছে।
সেই মুহূর্তে সে শুধু একজন শিশু—একজন হারানো শৈশব ফিরে পাওয়া মানুষ।

খেলা শেষ হওয়ার পর সে হাঁপাতে হাঁপাতে বটগাছটার নিচে বসে পড়ল। ছেলেমেয়েগুলোও তার পাশে এসে বসলো।
একটা মেয়ে জিজ্ঞেস করল— “আপনি আবার আসবেন?”

রফিক একটু চুপ করে থেকে বলল— “হ্যাঁ, আসব।”
কিন্তু সে জানে—জীবনের ব্যস্ততা তাকে আবার টেনে নিয়ে যাবে। হয়তো আবার অনেক বছর কেটে যাবে।

তবুও সে একটা প্রতিজ্ঞা করল—এই জায়গাটা, এই বটগাছটা, এই স্মৃতিগুলো—সে আর ভুলে যাবে না।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। পাখিরা বাসায় ফিরছে।
রফিক উঠে দাঁড়াল। একবার শেষবারের মতো গাছটার দিকে তাকাল।

তার মনে হলো—এই গাছটা শুধু একটা গাছ নয়। এটা তার শৈশব, তার স্মৃতি, তার হারানো সময়।
সে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। পেছনে পড়ে রইল বটগাছটা—কিন্তু তার ভেতরে থেকে গেল এক টুকরো শৈশব।

হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো—শৈশব কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সেটা কোথাও না কোথাও থেকে যায়—একটা গাছের ছায়ায়, একটা বিকেলের রোদে, বা কোনো পুরোনো হাসির শব্দে।
আর যখনই মানুষ একটু থেমে ফিরে তাকায়—সেই শৈশব আবার ফিরে আসে, খুব নীরবে, খুব গভীরভাবে।

রফিকের চোখে তখন আর জল নেই। আছে একরাশ শান্তি।
কারণ সে জানে—তার হারানো শৈশব পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
সে এখনো বসে আছে—গ্রামের বটের ছায়ায়। 🌿

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর