খুঁজুন
বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

১৮ মাসের দায়িত্বে টানলেন ইতি, বিদায়ী ভাষণে জাতির উদ্দেশে যা বললেন প্রধান উপদেষ্টা?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:০৬ এএম
১৮ মাসের দায়িত্বে টানলেন ইতি, বিদায়ী ভাষণে জাতির উদ্দেশে যা বললেন প্রধান উপদেষ্টা?

জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালনের পর একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “দীর্ঘ সময় পর একটি অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”

🇧🇩 নির্বাচন ও গণতন্ত্রে নতুন অধ্যায়:

প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন সূচনা। জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সকল পক্ষের সহযোগিতা এ নির্বাচনকে ঐতিহাসিক করেছে।

তিনি বিজয়ী ও পরাজিত সকল প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “গণতন্ত্রে হার-জিতই সৌন্দর্য। যারা জয়ী হয়েছেন তারা যেমন জনগণের আস্থা পেয়েছেন, তেমনি যারা জয়ী হননি তারাও উল্লেখযোগ্য সমর্থন অর্জন করেছেন।”

⚖️ তিন অঙ্গীকার:

সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের সংকটময় পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার তিনটি প্রধান লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে—সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন।
তিনি বলেন, প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করা হয়েছে প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি হয়েছে যার ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত
তিনি দাবি করেন, এসব পদক্ষেপ নাগরিক অধিকার, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে।

🚨 আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার:

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনর্গঠনের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “একসময় থানাগুলো ছিল জনশূন্য, মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করত। এখন সেই অবস্থা বদলেছে।”
তিনি আরও বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

👩 নারী ও শিশুর সুরক্ষায় উদ্যোগ:

নারীর ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি জানান, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, “নারীর অগ্রযাত্রা ছাড়া নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।”

💰 অর্থনীতি: সংকট থেকে উত্তরণ:

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং অর্থপাচার ছিল ব্যাপক। তিনি জানান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে তিনি প্রবাসীদের অবদানকে “অর্থনীতির প্রাণশক্তি” হিসেবে উল্লেখ করেন।

🌍 পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক:

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন আর নতজানু পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে না। জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে এবং সমাধানের প্রচেষ্টা চলছে।

🛡️ প্রতিরক্ষা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি:

সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

🚀 সম্ভাবনার বাংলাদেশ:

প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেন, “বাংলাদেশ এখন শুধু সংকট কাটিয়ে ওঠার গল্প নয়, এটি সম্ভাবনার দেশ।” তিনি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং সততার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

📜 জুলাই সনদ: বড় অর্জন:

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হলো “জুলাই সনদ”, যা গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে। তার মতে, “এই সনদ বাস্তবায়িত হলে স্বৈরাচারের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।”

🕊️ আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা:

গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করে তিনি বলেন, “তাদের আত্মত্যাগের কারণেই এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।” তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান।

🏛️ গণভবন হবে স্মৃতি জাদুঘর:

তিনি ঘোষণা দেন, পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে “জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর” হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস জানতে পারে।

🤝 ঐক্যের আহ্বান:

বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেন, “গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার যে চর্চা শুরু হয়েছে তা যেন অব্যাহত থাকে।” তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

🙏 বিদায়ের মুহূর্ত:

সবশেষে দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমার জন্য দোয়া করবেন। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।” এর মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন এবং নতুন সরকারের জন্য শুভকামনা জানান।

বোয়ালমারীতে গাছের গুড়ির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ গেল শিশুর

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম
বোয়ালমারীতে গাছের গুড়ির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ গেল শিশুর

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা গাছের গুড়ির নিচে চাপা পড়ে হুসাইন (০৯) নামের এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের দিকে বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ইউনিয়নের বড়গা এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। শিশুটি উপজেলার বড়গা গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা সোহেল শেখের ছেলে এবং বারাংকুলা কওমী মাদরাসার ছাত্র।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হুসাইন বাড়ি থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে মাদ্রাসায় ফিরছিল। এলাকার গাছ ব্যবসায়ী কদর মোল্যার রাস্তার পাশে ফেলে রাখা মেহগনি গাছের গুড়ির উপর খেলা করতে গিয়ে হঠাৎ গুড়ির উপর থেকে নিচে চাপা পড়ে হুসাইন। রাস্তা দিয়ে যাওয়া পথচারী ও আশপাশের লোকজন দেখতে পেয়ে হুসাইনকে উদ্ধার করে বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বোয়ালমারী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শিমুল মোল্যা বলেন, গাছের গুড়ির উপর দিয়ে হাঁটতে সময় নিচে পড়ে মারা যায়। কোথাও কাটা-ফাটা নাই। ছেলের মৃত্যুর জন্য তার বাবা কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নাই বলে জানিয়েছেন।

চাঁদা না পেয়ে ফরিদপুরে বাস কাউন্টারে হামলা, ম্যানেজারকে রক্তাক্ত জখম

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯:২২ পিএম
চাঁদা না পেয়ে ফরিদপুরে বাস কাউন্টারে হামলা, ম্যানেজারকে রক্তাক্ত জখম

ফরিদপুরে চাঁদার দাবিকৃত টাকা না পেয়ে একটি পরিবহন কাউন্টারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বিকাশ পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার নাজির বিশ্বাসকে (৪৫) দেশীয় অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে। আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা প্রায় ১১টার দিকে ফরিদপুর শহরের পৌর বাস টার্মিনালে অবস্থিত বিকাশ পরিবহনের কাউন্টারে এ হামলার ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ৬ জন দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার সময় তাদের হাতে রামদা, লোহার দণ্ডসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ছিল।

আহত নাজির বিশ্বাস নড়াইলের লোহাগাড়া উপজেলার লাহুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘ তিন বছর ধরে বিকাশ পরিবহনের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। প্রতিষ্ঠানের মালিকের মৃত্যুর পর থেকে তিনিই কার্যত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। প্রতিদিন এখান থেকে দূরপাল্লার উদ্দেশ্যে প্রায় ১২টি ট্রিপ পরিচালিত হয় বলে তিনি জানান।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাজির বিশ্বাস জানান, দীর্ঘদিন ধরেই একটি চক্র তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। প্রথমে তারা প্রতিটি ট্রিপ থেকে ৮টি করে সিট দাবি করে এবং প্রতিটি সিটের জন্য ১০০ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এতে রাজি না হওয়ায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরে তারা প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে এবং সর্বশেষ দুই লাখ টাকা এককালীন দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে।

তিনি আরও জানান, ঘটনার দিন সকালে দুর্বৃত্তরা এসে হুমকি দিয়ে যায়—চাহিদা পূরণ না করলে পরিবহন চলতে দেওয়া হবে না। কিছুক্ষণ পর তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ফিরে এসে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। একপর্যায়ে লোহার রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয় এবং রামদা দিয়ে কোপ দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তিনি হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দেন। এতে তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে।

নাজির বিশ্বাস দাবি করেন, হামলাকারীদের মধ্যে স্থানীয় মিলন, সবুজ ও প্রিন্স নামে তিনজনকে তিনি চিনতে পেরেছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবহন শ্রমিক ও সহকর্মীরা।

এ বিষয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।

ফরিদপুর থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী—যেভাবে শামা ওবায়েদের রাজনৈতিক উত্থান?

হারুন-অর-রশীদ ও মো. নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:৪২ পিএম
ফরিদপুর থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী—যেভাবে শামা ওবায়েদের রাজনৈতিক উত্থান?

ফরিদপুর-২ (সালথা–নগরকান্দা) আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে অবশেষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর শপথ নিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম।

নতুন সরকারের ২৪ সদস্যের প্রতিমন্ত্রী তালিকায় তার নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির ঘটনা নয়; বরং তৃণমূল রাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

শপথ গ্রহণের এই মুহূর্তে শামা ওবায়েদ শুধু একজন সংসদ সদস্য বা দলের সাংগঠনিক নেতা নন, বরং দেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত একজন নীতিনির্ধারক। ফলে তার ওপর প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনি দায়িত্বও হয়েছে বহুগুণ বেশি।

উত্তরাধিকার থেকে নেতৃত্বে উত্তরণ:

শামা ওবায়েদ ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয় শুরু হয় পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে। তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও প্রভাবশালী রাজনীতিক কে এম ওবায়দুর রহমানের কন্যা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কে এম ওবায়দুর রহমান ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে পরিচিত। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বগুণ এখনো দলীয় নেতাকর্মীদের অনুপ্রাণিত করে।

তবে শামা ওবায়েদের রাজনৈতিক পথচলা কেবল উত্তরাধিকার নির্ভর নয়। বাবার মৃত্যুর পর তিনি যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তা তাকে নতুনভাবে রাজনীতির ময়দানে দাঁড়াতে বাধ্য করে। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম অংশগ্রহণ করে পরাজিত হলেও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বরং পরাজয়কে শক্তিতে পরিণত করে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছেন।

তৃণমূল রাজনীতির শক্ত ভিত:

রাজনীতিতে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে শামা ওবায়েদ বেছে নেন তৃণমূলকেন্দ্রিক কৌশল। ফরিদপুরের নগরকান্দা ও সালথা উপজেলায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন পুনর্গঠন, কর্মীসংগ্রহ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখেন। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তার উদ্যোগ দলীয়ভাবে প্রশংসিত হয়।

দলীয় সূত্র জানায়, তিনি মাঠে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন, কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতেন এবং স্থানীয় সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করতেন। ফলে ধীরে ধীরে তিনি একজন ‘মাঠমুখী নেতা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তার সক্রিয় ভূমিকা দলের উচ্চপর্যায়ের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিপুল ভোটে জয়, জনসমর্থনের প্রতিফলন:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ ভোট পেয়ে ৩২ হাজার ৩৮৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হন। এই জয় শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিশ্রম ও জনসংযোগের প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আলী শরীফ ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, শামা ওবায়েদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং সংকটে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। ফলে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হতে সক্ষম হন।

তার বিজয়ের পর থেকেই এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। শপথ গ্রহণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে।

মন্ত্রিসভায় নারী নেতৃত্বের প্রতীক:

নতুন মন্ত্রিসভায় তিনজন নারী প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে একজন শামা ওবায়েদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের নারী নেতৃত্বের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলে নারী নেতৃত্বের বিকাশে তার অন্তর্ভুক্তি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

সালথা উপজেলা বিএনপি সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “শামা শুধু ওবায়দুর রহমানের কন্যা নন, তিনি নিজেই একজন দক্ষ সংগঠক। দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তার এই পদোন্নতি প্রাপ্য।”

শিক্ষিত ও আধুনিক নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি:

শামা ওবায়েদ ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা। ১৯৭৩ সালের ১৪ মে ফরিদপুরের নগরকান্দায় লস্করদিয়ায় জন্মগ্রহণ করা শামা ওবায়েদ ঢাকার ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে প্রায় ছয় বছর করপোরেট খাতে কাজ করেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে প্রশাসনিক দক্ষতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর চিন্তাভাবনা ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা তাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে রাখবে।

ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক ভারসাম্য:

রাজনৈতিক ব্যস্ততার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও শামা ওবায়েদ একজন সফল নারী। তার স্বামী সোভন ইসলাম একজন ব্যবসায়ী। তিনি দুই সন্তানের জননী। পারিবারিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার সক্ষমতা তাকে আরও দৃঢ় নেতৃত্বে পরিণত করেছে।

তার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, ব্যস্ত রাজনৈতিক জীবনেও তিনি পরিবারকে সময় দেন এবং সন্তানদের শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন তার ব্যক্তিত্বকে আরও পরিপূর্ণ করেছে।

অঙ্গীকার ও দায়িত্বের নতুন অধ্যায়:

নির্বাচনের আগে এক সাক্ষাৎকারে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছিলেন, “আমি রাজনীতিতে সুবিধা নিতে আসিনি; মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। কাজের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনই আমার লক্ষ্য।”

এখন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার সামনে রয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ। দেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বৈদেশিক কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তাকে নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রত্যাশাও পূরণ করতে হবে।

বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ:

সালথা উপজেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আসাদ মাতুব্বর ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, শামা ওবায়েদের এই পদোন্নতি ভবিষ্যতে তাকে আরও বড় দায়িত্বের পথে নিয়ে যেতে পারে। তার সাংগঠনিক দক্ষতা, মাঠমুখী রাজনীতি এবং জনসংযোগের ক্ষমতা তাকে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অনেকে মনে করছেন, যদি তিনি সফলভাবে তার বর্তমান দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবে ভবিষ্যতে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবেও তার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

ফরিদপুর থেকে জাতীয় মঞ্চে:

ফরিদপুরের আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ—শামা ওবায়েদের এই যাত্রা অনেক তরুণ নেতার জন্য অনুপ্রেরণার গল্প। তার রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করে, শুধু পারিবারিক পরিচয় নয়, বরং অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং জনগণের সঙ্গে সংযোগই একজন নেতাকে প্রতিষ্ঠিত করে।

শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার সামনে এখন নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই অধ্যায়ে তাকে প্রমাণ করতে হবে—তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী নন, বরং একজন দক্ষ নীতিনির্ধারক ও জননেত্রী।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন চোখ শামা ওবায়েদের দিকে—তিনি কতটা সফলভাবে এই নতুন দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটিই দেখার বিষয়।